গরমের প্রশান্তিতে ল্যুভার

যখন মানুষ সবে ঘরবাড়ি বানাতে শিখল, তখন ওটা ছিল চারটা দেয়াল আর একটা ছাউনি। রাতে কিছুই দেখা যেত না বিধায় সন্ধ্যার আগেই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া। কিন্তু দিনের বেলায় উত্তাপ বেশি থাকায় ঘরের ভেতর থাকাটাই দায়। ধীরে ধীরে মানুষ উপলব্ধি করল শুধু ঘুমাতে পারলেই ঘর হয় না; ঘর মানুষকে ধারণ করে, তাই একে আলো-বাতাসে পূর্ণতা দেওয়া দরকার। আবার সূর্যের তাপ, ধুলোবালি, ঝড়-বৃষ্টি থেকেও বাঁচতে হবে। আর তখনই আলো-বাতাসের প্রয়োজন অনুভূত হলো মানুষের। আবিষ্কৃত হলো জানালা। এ ছাড়া আবিষ্কৃত হলো মাচা। সেই মাচায় মানুষ লতানো ফলের গাছ লাগাতে শুরু করল। কৃষিকাজ আবিষ্কারের পরই মানুষ দেখতে পেল কিছু গাছ আছে যেগুলো শক্ত নয়, অন্য কোনো শক্ত গাছ বেয়ে ওপরের দিকে লতার মতো পেঁচিয়ে ওঠে। মূলত দড়ি বানানোর উদ্দেশ্যেই এসব গাছের দিকে মানুষের নজর পড়ে। শেষে দেখা যায় এসব গাছকে মানুষ জানালার পাশে লাগাতে শুরু করে মাচা বানিয়ে। মাচা বানানোর জন্য বাঁশের ব্যবহার তত দিনে শুরু হয়ে গেছে। এভাবেই হাজার বছরে এই মাচা বিষয়টা বেশ অনেকভাবেই বিবর্তিত হয়েছে মানুষের বহুমুখী ব্যবহারের হাত ধরে। শেষে যে বিবর্তন আমরা আজকে দেখতে পাই, এর নাম ল্যুভার। পারগোলা নামে যে বস্তুটি বিভিন্ন স্থাপত্যে স্থপতিরা ব্যবহার করেন সেটির কাজও মূলত একই। তপ্ত সূর্যালোক, ঝড়, বৃষ্টি ও ধুলোবালি থেকে মানব বসতিকে প্রশান্তি দেয় এই লুভ্যার। 

ল্যুভার বিশেষ কিছু বস্তুর সমান্তরাল বা আনুভূমিক অথবা কৌণিক অবস্থা যেখানে বস্তুগুলো একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে একই কোণে একের পর এক অবস্থান করে একটি সমাবেশ তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাসাবাড়ির এসির যে আউটলেট বা ইনলেট আছে, ওতে যে অ্যালুমিনিয়াম বা প্লাস্টিকের তৈরি ফিনগুলো একটার পাশে একটা বসে বাতাস আসা-যাওয়ার পথ তৈরি করে, তাকেই ল্যুভার বলা হয়। আগে ল্যুভার ব্যবহার হতো শুধু দরজা বা জানালায় যেন গরম বাতাস ঘর থেকে বেরোতে এবং বাইরের ঠান্ডা বাতাস সহজেই ঘরে প্রবেশ করতে পারে। এখন ল্যুভার ব্যবহার হয় দরজায়, জানালায়, জানালার পর্দা হিসেবে ব্লাইন্ডগুলো ল্যুভারের দৃষ্টান্ত। এটি বিভিন্ন স্থাপত্যের অতিরিক্ত অথচ জরুরি একটি অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন বিভিন্ন স্থানের বাড়িগুলোর একটি অংশ এখন ল্যুভারে আচ্ছাদিত থাকে। অনেক বাড়ির ছাদে থাকে কাঠ বা কাঠসদৃশ বস্তু দিয়ে তৈরি ল্যুভার ও পারগোলা। এসব স্থানের কাজই হলো বাড়ির ভেতরের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা। যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের (এয়ারকন্ডিশন) বাইরে গিয়ে একটা সলিউশন, যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রভাব বিস্তার করে, যা একই সঙ্গে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী।   

ল্যুভরের মূল ব্যবহার প্রধানত সূর্যের অতি আলোক রশ্মি থেকে ছায়া সৃষ্টি হলেও অনেক স্থপতি এঁকে ডিজাইন অনুষঙ্গ হিসেবেও ব্যবহার করেন। স্থাপত্যে দুটো প্র্যাকটিস আছে। এক. যেকোনো ডিজাইন উপাদান অবশ্যই কোনো একটি কার্যকর কারণের জন্য ব্যবহার করা হবে। দুই. কোনো কারণ ছাড়াই একটি ডিজাইন উপাদান ব্যবহার করা হবে। তবে প্রথমটিই প্রায় ৯০ শতাংশ স্থপতি বেছে নেন। ল্যুভার বেশি ব্যবহার করা হয় পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম অথবা উত্তর-পশ্চিম দিকে। কারণ সকালের মিষ্টি রোদ আসে এদিক থেকে। কিন্তু দুপুর হতে হতে সূর্য উত্তরায়নের সময় উত্তর, পশ্চিম এবং দক্ষিণায়নের সময় দক্ষিণ-পশ্চিমে হেলে যায়। তখন অতিরিক্ত তাপ ল্যুভার দিয়ে আটকানো হয়। কিন্তু আলো ঠিকই প্রবেশ করে। আর আলোছায়ার উপাদান ল্যুভারের কারণে স্বপ্নময় পরিবেশ তৈরি করে, যা ঠান্ডাও নয় আবার গরমও নয়। 

ল্যুভার যেভাবে কাজ করে

ঘরে প্রবেশ করা সূর্যালোক বেশ কিছু তরঙ্গে বিভাজিত হয়ে ভেতর থেকে গিয়ে তাপমাত্রা বাড়ায়। যতক্ষণ বাইরের তাপের সঙ্গে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা সমান না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত এই তাপ প্রবাহ চলতে থাকে। ফলে একপর্যায়ে ঘরের ভেতর থাকা অসাধ্য হয়ে পড়ে। আর এখানেই ল্যুভারের কীর্তি। ঘরের জানালায় যদি ল্যুভার শেড লাগানো থাকে, তাহলে সেই শেড টেনে দিলেই সূর্যালোক সরাসরি ঘরে প্রবেশে বাধা দেয় এবং ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা কম থাকে। 

দিক বিবেচনায় ল্যুভারের ব্যবহার

সূর্যের আলোর ওপর ভিত্তি করেই ল্যুভার ব্যবহার করা হয়। পূর্ব দিকে সূর্য ওঠার পর সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাপ বাড়তে থাকে। সকালের তাপ কম থাকার কারণ সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর কৌণিক অবস্থান। এ জন্য ঘরবাড়ির ওপর সূর্যের প্রভাব অনুযায়ী ল্যুভার বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করা হয়। যেমন-

উত্তর দিকে-একেবারে ফিক্সড অথবা পরিবর্তন করা যায় এমনভাবে লম্বালম্বি ল্যুভার ব্যবহার করতে হবে। শুধু জানালার অংশই নয়, এর ওপর-নিচেও যাতে এটি টানাটানি অবস্থান করতে পারে।

পূর্ব ও পশ্চিমে-একেবারে ফিক্সড অথবা পরিবর্তন করা যায় এমনভাবে আড়াআড়ি ল্যুভার ব্যবহার করা হয়। যেহেতু সকাল ও সন্ধ্যায় সূর্য আলো তেমন দেয় না, তাই এই আলো ঘরে প্রবেশ করার জন্যই এভাবে ল্যুভার ব্যবহার করা হয়।

উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমে-পরিবর্তনশীল পারগোলা সঙ্গে কম স্থায়ী শেড ব্যবহার করা হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমে-এই দিকটা প্রায়ই ঠান্ডা থাকে বলে ল্যুভার ব্যবহারের তেমন প্রয়োজন নেই। বরং এদিকে গাছপালা লাগানো যায়।  

গরমকালে সূর্যকে যেভাবে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে শীতকালে সেভাবে করে না। শীতকালে পৃথিবীর সঙ্গে সূর্যের দূরত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরলেও কেন্দ্রে ঘোরে না। যখন দুটো বস্তু একে অপরের পাশে ঘোরে, তখন তারা দুটির মধ্যকার একটি মধ্যবিন্দু বা ব্যারিসেন্টারকে কেন্দ্র করে ঘোরে। আর এই ঘূর্ণন ঘটে বস্তু দুটির ভরকেন্দ্রের ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে সূর্য অধিক ভারী বিধায় সূর্যের কেন্দ্রের একদম কাছে যে ব্যারিসেন্টার আছে, সেটাকে কেন্দ্র করে সূর্য ও পৃথিবী ঘুরছে। ফলে এই ঘূর্ণন বৃত্তাকার নয়, অনেকটা ডিম্বাকার। এই ডিম্বাকার ঘূর্ণনের ফলে সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব গ্রীষ্মকালে যেমন থাকে, শীতকালে তেমন থাকে না। একে আমরা উত্তরায়ন ও দক্ষিণায়ন হিসেবে জানি। গ্রীষ্মকালে যে ল্যুভার সূর্যরশ্মিকে ঘরে প্রবেশে বাধা দিয়ে ঘর ঠান্ডা রাখে, সেই ল্যুভারই শীতকালে ঘরের ভেতর প্রবেশ করতে সাহায্য করে। তখন গাছের পাতা ঝরে গিয়ে উত্তাপ এনে দেয় একেবারে ঘরের ভেতর। পৃথিবীর অনেক দেশে এই উত্তাপ কার্যকর হয় না। তবে এ দেশে এই সুবিধা আমরা বেশ ভালোভাবেই পাই।  

ল্যুভার ব্যবহারের সাধারণ নিয়ম 

যেকোনো ওপেনিং যেখান দিয়ে আলো-বাতাস আসবে, তার ওপর বড় ছাউনি ব্যবহার করা উচিত। যেমন বড় বড় ফিনের পারগোলা, জানালার বিশালাকার পাল্লা অথবা লম্বা বারান্দার ব্যবহার। হালকা রঙের শেড ব্যবহার করা উচিত। এগুলো অনেক বেশি তাপ প্রতিফলন করে। ফলে ঘর আরও বেশি গরম হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়। গাঢ় রঙের শেড তাপ ধরে রাখে এবং ঘরের ভেতর আরও গরম হাওয়া প্রবেশ করায়। ফলে ঘর বেশি গরম হয়ে যায়। ঘরের ভেতর অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ থামাতে ভেতর ও বাইরে গাছ লাগানো যেতে পারে। বিশেষ করে জানালার চারপাশে বড় আকারের গাছ থাকলে সেই ঘরে সূর্যের তাপ সহজে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে তাপমাত্রা কম থাকে। 

ল্যুভারের ফিনগুলো যেদিকে থাকবে

ল্যুভার মানেই একই উপকরণ বারবার বসানোর মাধ্যমে একটি হারমোনি তৈরি করা, যার ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করবে তবে এতটাই করবে যতটা আমরা চাই। এর কোণ নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। এর জন্য জানতে হবে সূর্য ঘরবাড়ির সঙ্গে কোন কোন কোণে আলো দেয়। এটা জানার জন্য ওপরের ছবিটির সাহায্য নিতে পারি। দেখা যায় একই সূর্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কোণে আলো দিচ্ছে। তাই যখনই ল্যুভার ডিজাইন করা হোক, এতে পরিবর্তন করা যায় এমন ফিন ব্যবহার করতে হবে। নইলে আমরা দিনের একটা সময় ঠিকই সূর্য থেকে রেহাই পাব। তবে অন্য সময়গুলো সেই ল্যুভার আর কাজ করবে না। তখন সেটি ব্যবহার অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। যখন গ্রীষ্মকালে সূর্য একেবারে মাথার ওপর থাকে তখন আমরা ল্যুভারগুলোকে ৪৫ ডিগ্রিতে রাখতে পারি। এই ডিগ্রিতে থাকলে সূর্যরশ্মি ঘরে প্রবেশ করতে পারে না। আবার শীতকালে ৪৫ ডিগ্রিতেই সূর্য বেশ সুন্দরভাবে প্রবেশ করতে পারে। তবে এটা দিনের সব সময় সমান হয় না। বেলা এগারোটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ৪৫ ডিগ্রি ল্যুভার রেখে একে এরপর ১৮০ ডিগ্রি আড়াআড়িতে রেখে দেওয়া যায়। তখন বেশ ভালো সূর্যালোক প্রবেশ করে। তাপমাত্রাও কমতে থাকে। ঘরের ভেতর আবহাওয়া ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায়। 

ল্যুভারের উচ্চতা

ল্যুভার বা পারগোলার উচ্চতা কেমন হবে তা ওপরের ছবি থেকে বুঝতে পারব। সূর্যের অবস্থা শীত ও গ্রীষ্মে একই থাকে না। একটু কৌণিক দিকে দক্ষিণে যখন সরে যায় তখন সূর্যালোক ঘরের অনেক ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু সেটিই গরমকালে অনেকটা কম প্রবেশ করে। আর এই দুই কোণকে কাজে লাগিয়ে আমরা ল্যুভরের হাইট (ওই) পেয়ে যাই। জানালা যে দেয়ালে আছে সেটার ওপরের মাথা থেকে জানালার শেষ পর্যন্ত যে দৈর্ঘ্য, এই দৈর্ঘ্যরে ল্যুভার বা পারগোলা ব্যবহার করা যায়। তবে ফিক্সড ল্যুভার ব্যবহার করতে হলে এমন একটা কোণ বেছে নিতে হবে, যা শীত ও গ্রীষ্মে সমানভাবে তাপ থেকে রক্ষা করবে। আর সেটিই ওপরের ছবিতে আঁকা আছে। ল্যুভার যদি ৪৫ ডিগ্রিতে ব্যবহার করি তবে এর স্পেসিং হবে এর দৈর্ঘ্যরে ৭৫%। মানে কোনো একটি ল্যুভার যদি ১ ফুট হয়, তাহলে এটি ৯ ইঞ্চি পরপর বসাতে হবে। তাহলে গ্রীষ্মকালের প্রখর সূর্যের তাপ-এর ভেতর দিয়ে প্রবেশ করবে না। আবার শীতকালের মিঠে রোদে ভরে যাবে ঘর। জানালায় ল্যুভার ব্যবহার করলেও একই নিয়মেই করব। ৪৫ ডিগ্রি কোণ একটি আদর্শ কোণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

পূর্ব ও পশ্চিমের জন্য ফিক্সড শেড

যেহেতু পূর্ব ও পশ্চিমের আলোক উৎস মধ্যাহ্নের মতো অতটা উজ্জ্বল নয়, তাই এই আলো একটা সময় পর্যন্ত সহনীয়। আর এই মাত্রার আলোর জন্য আড়াআড়ি শেড ব্যবহার করতে হবে। তবে এর ব্যবহারে আছে নানা উপায়। আড়াআড়ি শেড দিলে বাইরের দিকটা দেখতে সুবিধা হয়। আলোটাও বেশ ভালো প্রবেশ করে। সঙ্গে বাতাসের গতিও রুদ্ধ হয় না। কিন্তু তবুও অনেক সময় সূর্যের অবস্থানের কারণে গরম হাওয়া প্রবেশ বা তাপ প্রবেশ করতে পারে এ জন্য যদি একটি কোনাকুনি শেড ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি একই সঙ্গে বাইরের দিকটা দেখা বা আলো-বাতাস প্রবেশ করতে কোনো বাধা হয়ে দাড়াঁয় না। আবার আমাদের ছায়াও ঠিকমতোই দেয়। কিন্তু ঘরের ভেতর যদি উত্তর দিক থেকে তাপ প্রবেশ করে বা উত্তর-পশ্চিম থেকে দুপুরে যে তাপ বিকেল পর্যন্ত প্রবাহিত হয়, সেই তাপ থেকে রেহাই পাওয়ার একমাত্র উপায় জানালায় ভার্টিক্যাল ব্লাইন্ড ব্যবহার করা। এটা হাল আমলের ল্যুভার যা টেনে নামিয়ে ফেলা যায়; আবার ওঠানোও যায়। এরকম অ্যাডজাস্টেবল শেডের ব্যবহার করে সহজেই প্রখর রোদ থেকে বাঁচা সম্ভব। 

ল্যুভার শুধু রোদ থেকে নয়, বৃষ্টি ও ধুলোবালি থেকেও রক্ষা করে। বৃষ্টির ছাট এসে ঘরের ভেতর প্রবেশ করা থেকে রক্ষার জন্য জানালায় ল্যুভার ব্যবহার অনেক প্রাচীন। বৃষ্টির পানি ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বাঁকানো ল্যুভারের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে পারে না। কিন্তু এই বৃষ্টির ফোঁটার সংস্পর্শে আসা বাতাস ঠান্ডা হয়ে ঠিকই প্রবেশ করে ঘরের ভেতরে (চিত্র দ্রষ্টব্য)। এ কারণে আগে ঘরের বাইরের দিকের প্রতিটি জানালায় ল্যুভারের ব্যবহার দেখা যেত। আবার শুধু বৃষ্টিই নয়, ল্যুভারকে কোনাকুনি ৩০ ডিগ্রিতে ব্যবহার করলে সরাসরি ধেয়ে আসা ধুলো ঝড় থেকেও রেহাই পাওয়া যায়। বিনিময়ে বাড়তি পাওয়া যায় ঠান্ডা বাতাসও। 

হরেকরকম ল্যুভার 

ডিজাইনভেদে নানা রকমের ল্যুভার ব্যবহৃত হয়। অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি ল্যুভার সহজেই তাপ প্রতিফলন করে বলে বাইরে থেকে সহজে তাপ ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। আবার সূর্যের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে এদের নামিয়ে উঠিয়ে তাপ সহনীয় কোণ তৈরি করে নেওয়া যায়। অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি হওয়াতে এটি বেশ হালকা। ব্যবহারও অনেক সহজ। ৩৭ ডিগ্রি কোণে অবস্থান করা এই ল্যুভরের ছেদচিত্র দেখলেই আমরা পাই এর ফিনগুলো একটি বিশেষ কায়দায় এঁকে অপরের সঙ্গে এমনভাবে কোণ তৈরি করেছে যে এতে আলো প্রবেশের কোনো অবকাশই নেই। পুরো ল্যুভারটি ১৫২ মিলি বা ৭ ইঞ্চি চওড়া। এসব ল্যুভারে পাখি বা পোকামাকড় বা মশা নিরোধক নেটের ব্যবহার হয় অহরহ। একটা রোটেটর যোগ করা থাকে, যা প্রয়োগ করলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নানা দিকে ঘুরে যায়। 

কাঠের ল্যুভারে অ্যালুমিনিয়ামের মতো এসব ল্যুভারে মেকানিজম তেমন থাকে না। শুধু প্রতিটি ল্যুভার এঁকে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে সুতার সাহায্যে। একটা টান দিলে বাকি সব একসঙ্গে কোণ পরিবর্তন করে। এ ছাড়া আছে প্লাস্টিক ও কাচের তৈরি ল্যুভার। 

ট্রিপিক্যাল ল্যুভার সেকশন

যেসব ল্যুভার আমরা বিভিন্ন স্থাপনায় দেখতে পাই সেসব ট্রিপিক্যাল ল্যুভারের একটি ছেদচিত্র এটি। এতে পুরো ব্যাপারটা আমরা খালি চোখে উপলব্ধি করতে পারি। এই অ্যালুমিনিয়ামের ফিন যেগুলো ল্যুভার হিসেবে তাপ প্রতিফলন করে, এগুলো ওপরে-নিচে ফ্রেমসহকারে বসানো হয়। ফ্রেমের কোণগুলো বেশ মোটা আকৃতির অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে ঘেরা থাকে। মেকানিজম এমনই করা থাকে যে একটা টান দিয়ে কোণ ঘুরিয়ে দিলে পুরো ল্যুভারটাই পরিবর্তিত হয়ে যায়।

ল্যুভারের ব্যবহার পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ

ব্রিটিশদের হাত ধরে এ দেশে প্রবেশ করা ল্যুভার সাধারণত কাঠের খিড়কি বলে আমরা চিনি। তার আগে ল্যুভার চেনায় ওলন্দাজরা। এই খিড়কী দরজায় প্রবেশের পর বাঙালিরা এর উপকার সম্পর্কে জানতে পারে। বিশেষ করে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কাছে এর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলো ঠাকুরঘরে এর ব্যবহার করার মাধ্যমে। বিভিন্ন মন্দিরে এর বহুল ব্যবহার শুরু হয় গর্ভগৃহে যে দেবতা মূর্তি আছে তার অবস্থান ও ভেতরে কী ঘটছে সেটা দেখার জন্যই ল্যুভরের ব্যবহার হয় দরজা-জানালায়। আর বাঙালি মুসলমানদের এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল পর্দা করার জন্য। বাড়ির মহিলারা ঘরের ভেতর থাকলে সেই ঘরের ভেতরটাতে কী ঘটছে বা কারও অবস্থান সম্পর্কে জানার জন্যে এই ল্যুভারডোরের ব্যবহার শুরু হয়। 

শুধু কি দরজা-জানালা? লোকে তাদের ঘরের আলমারিও বানাতে শুরু করল এই ল্যুভার দিয়ে। বায়ুপ্রবাহ ঠিক রেখে কাপড় ঠিক রাখার জন্যই এই প্রচেষ্টা। এরপর অন্তত ২০০ বছর দেদারসে ল্যুভার ব্যবহার হয়েছে পুরো ভারতবর্ষে। স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৪৮ বছরে অনেক স্থাপনায় ল্যুভারডোর ব্যবহৃত হয়েছে। অফিস-আদালতে বা বিভিন্ন মজলিসে এই ল্যুভারের নানান ব্যবহার ঘটেছে। তবে তা কমে যাওয়া শুরু করেছে ভার্টিক্যাল ব্লাইন্ডের পরিবর্তে রোলার ব্লাইন্ডের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর। মানুষ ইচ্ছা করলেই বাইরের জানালা পুরোটাই একসঙ্গে বন্ধ বা খুলে দিতে পারছে। যখন চাইছে না, তখন সে একটুও আকাশ দেখবে না এমন ব্যবস্থাও করতে পারায় বাংলাদেশের স্থাপত্য ইতিহাস থেকে ল্যুভারের ব্যবহার কমতে শুরু করে। তা ছাড়া ঘরের ভেতর তেমন আলো-বাতাস প্রয়োজন নেই, একটা এসি যদি থাকে।  আর এভাবেই ল্যুভারের প্রয়োজনীয়তা কমছে। এসিতে ঘর ঠান্ডা থাকে; ঘরের রোগ-জীবাণু মরে যায়! এই ভাবনা থেকেই প্রতিটি বাসা-অফিসে এয়ারকন্ডিশনারের ব্যবহার শুরু হয়। ভেতরে ঠান্ডা এসির বাতাস। কিন্তু বাইরে সব বিশালাকার আউটলেট। বের হচ্ছে গরম বাতাস। ফলে প্রতিটি বাড়ির বাইরের অংশটা হচ্ছে এক একটা চুল্লি, যা তাপমাত্রাকে বাড়াচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। বর্তমানে তাই পরিবেশের কথা চিন্তা করে আবারও বাংলাদেশে ব্যবহার শুরু হয়েছে ল্যুভার আর পারগোলার। ঘরে ঘরে স্থপতিরা ডিজাইন করতে শুরু করেছেন পুরোনো আমলের সেই ল্যুভার দেওয়া দরজা-জানালা। ফলে আবারও এর ব্যবহার ও কদর বেড়েছে। ইকো উডের আগমন এতে যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা। এখন বিভিন্ন বাড়ির উঠানে-ঘরের দেয়ালজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ল্যুভারের প্রচলিত ব্যবহার বাড়ছে এবং এটি বেশ কার্যকর বলেই ধীরে ধীরে এর ব্যাপ্তিও বেড়েই চলছে। 

শুরু হয়েছে গ্রীষ্মকাল। প্রচন্ড দাবদাহ দেশজুড়ে। আমরাও পাল্লা দিয়ে এসি লাগাচ্ছি। সিএফসি গ্যাসে পূর্ণ হচ্ছে বায়ুমন্ডল। ক্ষয় হচ্ছে ওজোনস্তর। ধ্বংস হচ্ছে দ্রুততায়। এই তাপ পৃথিবীকে একটি কাচ বলয়ের মতো ঘিরে রয়েছে। আমাদের সহ্যের সীমায় চলে যাচ্ছে সবকিছু। পৃথিবীও সহ্য করে না এখন। ঝড়, বজ্রপাত, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েই চলেছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে দ্রুত বাড়ছে পানিস্তরের উচ্চতা। এভাবে পৃথিবীকে আমরা এগিয়ে দিচ্ছি ধ্বংসের দিকে। অথচ আমরা এসি না লাগিয়ে যদি প্রাকৃতিক উপায়কে কাজে লাগাই, হাজার বছরের এই ল্যুভারের কৌশলকে কাজে লাগিয়ে বাসস্থানকে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা করি, তবে এই পৃথিবী আমাদের আরও কিছু বছর বসবাসযোগ্য থাকবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা একটি সুন্দর পৃথিবী দিতে পারব, যেখানে ওরা সূর্যের প্রচন্ড দাবদাহ থেকে রেহাই পাবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সুন্দর জীবনের জন্য আমরা কি এটুকুও করতে পারি না?  

ক্যাপশন

স্থপতি ব্রায়ান মায়ারসন 

সানপাওয়ার ডিজাইন

এনভিরোনা স্টুডিওর ল্যুভার শেড।

ল্যুভার যেভাবে বৃষ্টির পানি থেকে আমাদের রক্ষা করে

একই ল্যুভারের মধ্য দিয়ে কীভাবে বাতাস প্রবাহিত হয়। 

ওপেনিংয়ে ল্যুভারের ব্যবহার। ম্যাটেরিয়েল ইকো উড টিম্বার টিউব। 

আউটডোর ম্যাটেরিয়েল হিসেবে ইকো উডের ব্যবহার। টিম্বার টিউবগুলো নির্দিষ্ট স্পেসিংয়ে ল্যুভার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। 

অ্যালুমিনিয়াম ল্যুভারের সেকশন

কীভাবে বৃষ্টির জল ঘরে প্রবেশের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করে ল্যুভার।

আঠারো শ শতকের শ্রীফলতলী জমিদারবাড়ির দরজা ও জানালায় ল্যুভারের ব্যবহার।

দরজা-জানালায় ইকো উড ল্যুভারের ব্যবহার। 
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৯তম সংখ্যা, মে ২০১৯

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top