ভাটায় ইট পোড়ানোর সময় যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নিঃসৃত হয় তাতে করে ঐ এলাকার মানুষের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে জীবনযাপন করা অনেক কষ্টকর হয়ে ওঠে। ইটভাটার ভষ্ম ও ধোঁয়া চারপাশে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে খুবই ক্ষতিকর। তাহলে ইটের বিকল্প কি? নির্মাণে বহুল ব্যবহৃত ইটের বিকল্প হিসেবে বিশ^ব্যাপি ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে কংক্রিট ব্লক। এই কংক্রিট ব্লক একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব, অন্যদিকে ব্যয়সাশ্রয়ীও বটে।
মারাত্নক পরিবেশ দূষণ রোধে ভাটায় উৎপাদিত ইটের ব্যবহার বন্ধে নেওয়া হচ্ছে বহুমুখী উদ্যোগ। কিন্তু আমাদের শখের ঘর-বাড়ি তৈরি করতে প্রয়োজন ইটের। রড, সিমেন্ট, বালুসহ আনুষঙ্গিক উপকরণেরও। বালু প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া গেলেও সিমেন্ট ও ইট তৈরি করা লাগে; রডও ব্যবহার উপযোগি করতে হয়। তবে এসব উপকরণের মধ্যে ইট তৈরিতেই সবচে বেশি পরিমান শক্তি লাগে। ইট তৈরিতে সাধারণত জমির উপরিভাগের মাটি সংগ্রহ করে পোড়ানো হয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় কাঠ। এতে দেশের আবাদি জমি যেমন উর্বরতা হারায়, তেমনি সংকুচিত হচ্ছে জমির পরিমাণও। এমনিতেই আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় আবাদি জমি অনেক কম। অন্যদিকে কাঠ পোড়ানোর ফলে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসের সাথে মিশে সৃষ্টি করছে পরিবেশ দূষণ। বনজ সম্পদ হুমকির মুখে। ভাটায় ইট পোড়ানোর সময় যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নিঃসৃত হয় তাতে করে ঐ এলাকার মানুষের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে জীবনযাপন করা রীতিমত কষ্টকর। ইটভাটার ভষ্ম ও ধোঁয়া চারপাশে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে খুবই ক্ষতিকর। এমতাবস্থায় ইটের বিকল্প কি? নির্মাণে বহুল ব্যবহৃত ইটের বিকল্প হিসেবে বিশ্ব ব্যাপি ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে কংক্রিট ব্লক। এই কংক্রিট ব্লক একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব, অন্যদিকে ব্যয়সাশ্রয়ীও বটে।
কংক্রিট ব্লক কী?
পাথর, মাটি, ড্রেজিং করা নদীর বালু, ককশিট, সিমেন্ট এইসব কাঁচামালে সাধারণত ব্লক তৈরি হয়। এই ব্লক সাধারণ ইটের তুলনায় হালকা ও মজবুত। হাইড্রোলিক প্রেশারের মাধ্যমে তৈরির কারণে অনেক বেশী শক্তিশালীও বটে। এতে আগুন, তাপ প্রতিরোধক কিংবা কোন রকম জ্বালানি ব্যবহারের দরকার হয় না। সর্বোপরি এটি পরিবেশবান্ধব। কারণ এটি তৈরিতে কোন রকম কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয় না। বালি, মাটির সাথে সিমেন্ট বা নুড়ি পাথর মিশিয়ে ব্লক তৈরি করা যায় সহজেই। নুড়ি পাথরছাড়াও মাটি, বালি, সিমেন্টের সংমিশ্রণে ব্লক তৈরি করা হয়। এটাই হল ব্লক তৈরির প্রধান উপাদান।
ইটের সঙ্গে ব্লকের পার্থক্য
- ইটের সাথে ব্লকের প্রধান পার্থক্য মূলত পরিবেশগত দিকে। ইট তৈরিতে ফসলি জমির উপরিভাগ পুড়িয়ে, কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করা হয়। এতে ঐ জমিতে আর ফসল ফলানো সম্ভব হয় না এবং মাটি ও কাঠ পোড়ানোর জন্য বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে ঘটে পরিবেশ দূষণ। অন্যদিকে নদীর ড্রেজিং করা পলি মাটি, বালি, সিমেন্ট, নুড়ি পাথর থেকে ব্লক তৈরি হয়। তাই পরিবেশ দূষণের কোন ভয় নেই।
- ইট তুলনামুলকভাবে ব্লকের থেকে ভারী। ব্লক ভূমিকম্প সহনশীল। রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও কোন সমস্যা নেই। অথচ ইটের তৈরি বহুতল ভবনগুলোতে ঝুঁকি অনেক বেশি।
- আগুনে পোড়া একটি ইটের দাম বাজারে ৭-৯ টাকা কিন্তু একটি ব্লকের দাম ৬-৭ টাকা। এই দিক থেকে দেখতে গেলে ব্লক সাশ্রয়ী। একটি ভবনের বর্তমানে এক বর্গফুটের নির্মাণ খরচ পড়বে ১,৮০০ টাকা। অন্যদিকে ব্লকের তৈরি ভবনের বর্গফুটের দাম পড়বে মাত্র ১১৫০ টাকা।
কংক্রিট ব্লকের রকমফের
ব্লক বিভিন্ন রকমের হতে পারে। তাছাড়া ব্লক বিভিন্নভাবে ব্যবহার করাও যেতে পারে। সাধারণত যেসব প্রচলিত ব্লক বাজারে পাওয়া যায় সেগুলো হচ্ছে-
- হলো কংক্রিট ব্লক
- হলো ওয়াল ব্লক
- হলো সিলিং ব্লক
- সলিড কংক্রিট ব্লক
- কার্ভ স্টোন
- সসার ড্রেন
- ইউনি পেভার
- রেক্টঙ্গুলার পেভার
- ইরোসান কন্ট্রোল ব্লক।
হলো কংক্রিট ব্লক
আমাদের প্রতিবেশী প্রায় সব দেশে এই হলো কংক্রিট ব্লক ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে সম্প্রতি এই ব্লকের ব্যবহার বেড়েছে। সরকারীভাবে এই ব্লক ইটের ব্যবহার করার জন্য নির্দেশ দেয়া সময়ের ব্যাপার। চট্টগ্রামের ২০ তলা বিশিষ্ট হোটেল রেডিসন ব্লু থেকে শুরু করে হালের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল সবই এই হলো ব্লকে তৈরি। এই ব্লকের বিভিন্ন উপযোগিতা রয়েছে। যেমন-
- মজবুত এবং ভূমিকম্পে তেমন কোন ঝুঁকি থাকে না
- সারা বছরই তৈরি করা যায়
- আগুন ও তাপ নিরোধক
- নোনা ধরে না, ফাঙ্গাস পরে না, ঘামেও না
- ব্যবহারের আগে ইটের মত পানিতে ভেজাতে হয় না
- পানির খরচ বা পাম্প বসানোর খরচ নেই
- বিদ্যুৎ বিল নেই
- স্যানিটারি পাইপ লাগানোর সময় দেওয়াল কাটা লাগে না।
হলো ওয়াল ব্লক দেওয়াল তৈরিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হলো সিলিং ব্লক সিলিঙের কাজে ব্যবহার করা হয়। এটি আকারে বড় হওয়ার কারণে এটি ব্যবহার ও বেশ সহজ। দেখা যায় ছয় পিস ইটের বদলে একটি হলো ব্লক ব্যবহার করলেই চলে। এতে সিমেন্টের খরচ বেঁচে যায়। এটি নিজেও সিমেন্টের তৈরি বলে এর সাথে সিমেন্টের বন্ডিং বেশ ভাল হয়। ফলত এটি বেশ সাশ্রয়ী। রোদ-বৃষ্টি যাই হোক-এটির প্রোডাকশন নষ্ট হয় না।
সলিড কংক্রিট ব্লক
এটি সিমেন্ট, বালি, পাথর এবং পানির সংমিশ্রণে তৈরি। এর ভেতর কোন ফুটো নেই। দেখতে ধুসর এই ব্লক ইট সাধারণত ঘরের ভেতরের দেওয়ালে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এছাড়াও ফাউন্ডেশনে, বাগানের দেয়াল, রাস্তার পাশের সীমানা প্রাচীরের দেয়াল নির্মানে রয়েছে এর বহুল ব্যবহার। এই ব্লক বেশ শক্ত, টেকসই ও ভূমিকম্প সহনশীল।
কার্ভ স্টোন উইথ সসার ড্রেন
এগুলো সাধারণত রাস্তায়, রোড ডিভাইডারের দুই পাশে, ট্রাফিক আইল্যান্ড ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয়। রাস্তাঘাট বানানোর পর সেই রাস্তা ও পেভমেন্টের সুরক্ষার জন্যে এটা মূলত ব্যবহার করা হয়। কার্ভ স্টোন উইথ সসার ড্রেনের ব্যবহার রাস্তার সৌন্দর্য অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। এটি মজবুত এবং টেকসই। রাস্তায় কোন এক্সিডেন্ট হলে যেন পেভমেন্ট ও রাস্তার পাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্থ না হয় এজন্য এর বহুল ব্যবহার পৃথিবীব্যাপী প্রচলিত।
ইউনি পেভার
এগুলো সাধারণত রাস্তায় ব্যবহৃত হয়। ফুটপাত, বাজারের রাস্তা, গাড়ি পার্কিং, রেলস্টেশন, এয়ারপোর্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হয়। শৈল্পিক ও নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এটি অতুলনীয়। এই ব্লক খুব সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়। এর ব্যবহার শুরু হয় তখনই যখন গাড়ি চলা ও মানুষের হাঁটাচলা একই সাথে সহ্য করতে পারবে এমন একটি ব্লকের প্রয়োজনীয়তা মানুষ অনুভব করল। এই ব্লকগুলো অন্য যেকোন ব্লকের মতোই টেকসই। ইন্টারলকিং অবস্থায় থাকে বলে এটি সহজে নষ্ট হয় না। পাঁচ টনের বেশি লোড বিয়ারিং ক্যাপাসিটির কারণে এটি এখন পার্কিং লটে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে।
রেক্টাঙ্গুলার পেভার
এই ধরণের ব্লক সাধারণত রাস্তা, ফুটপাত, রেলস্টেশনে ব্যবহার করা হয়। ইউনি পেভারের মতোই এটি বসানোর পর কিউরিং এর প্রয়োজন হয় না। সিমেন্টের সাধারণ বন্ডিং-এর মাধ্যমে এর ইন্সটলেশন হয়। পেভমেন্ট-এর ব্রিক হিসেবে এর ব্যবহার অনেক দেশেই বহুল প্রচলিত। গাঢ় ও হালকা অথবা নানা রঙের ও নানা রকমের ব্রিক বসিয়ে অপূর্ব টেক্সচার সার্ফেস তৈরিতে এর জুরি মেলা নেই।
ইরোসান কন্ট্রোল ব্লক
এই ব্লক কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। এগুলো সাধারণত নদীর পার, লেকের পাড়, জমির নিম্নাংশে, বাঁধ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। নদীর ভঙ্গুর পাড় মেরামতে এটি বসিয়ে দেয়া হয়। এটি যথেষ্ট মজবুত। দেখতেও সুন্দর। ফসলী জমিতে মাটির আঁইলের পরিবর্তে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি দিয়েই শহর ও গ্রামের নালা ও খালগুলো তৈরি করা হয়। এগুলোর পাড় যেন কোনভাবেই ভেঙ্গে গিয়ে ক্ষতি করতে না পারে এজন্যে এগুলো ব্যবহার হয়। আবার ফসলি জমির পাশে যে ছোট্ট খাল বয়ে যায় সেটার পাড়েও এটি বসিয়ে দিলে দিব্যি নদী নিজের আপন রুপে টিকে থাকে। নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষায় এর জুড়ি নেই।
হেক্সাগোনাল পেভার ব্লক
বাড়ির উঠানে, রাস্তায়, ফুটপাতে ব্যাবহার করা হয়। বাড়ির সামনে নান্দনিক উঠান তৈরিতে এটি ব্যবহার হয় সবচে বেশি। তাছাড়া এটি ইটের তুলনায় বেশ সাশ্রয়ী।
ব্লক ব্যবহারের সাধারণ নিয়মাবলি
- সাধারণ ইটের মত ব্লক পানিতে ভিজাতে হয় না;
- শুকনো ব্লক দিয়ে দেয়াল গাঁথনি দিতে হবে;
- সমান মেঝের উপর মশলা দিয়ে প্রথম লেয়ার ব্লক গাঁথতে হবে;
- ব্লকের ফাকা অংশে কোন রকম মশলা যাতে না পড়ে সেজন্য ব্লকের ফাঁকা অংশের উপর গজ বা পাট্টা ধরে দেয়াল গাঁথতে হবে;
- বীম বা ছাদের নিচে এক বা দেড় ইঞ্চি ফাঁকা রাখতে হবে, যা পরে প্লাস্টার করার সময় পাইসিপ্টিন দিয়ে ঢালাই দিয়ে পুরন করতে হবে;
- দেয়ালের এক প্রান্তে দেড় ইঞ্চি ফাঁকা রেখে ব্লক গাথা শুরু করতে হবে। যা ৫/৬ দিন পরে পাইসিপ্টিন দিয়ে ঢালাই দিয়ে পূর্ণ করতে হবে;
- একদিন সর্বোচ্চ ৯০ মিলি ব্লকে ৪ লেয়ার, ১০০ মিলি ব্লকে ৫ লেয়ার ও ১৮০ মিলি ব্লকে ৬ লেয়ার পর্যন্ত দেয়াল গাঁথা যাবে;
- পরের দিন স্বাভাবিক মশলা দিয়ে পরবর্তী নিয়মে গাঁথুনি দিতে হবে। তার আগেই পূর্বের দেয়ালে পানি দিয়ে কিউরিং করতে হবে;
- কমপক্ষে ১০ দিন দেয়াল পানি দিয়ে কিউরিং করতে হবে;
- দরজা, জানলা বা উন্মুক্ত অংশের ফাঁকা অংশে মেঝে থেকে লিন্টেল পর্যন্ত ৩ সুতা রড ব্যবহার করতে হবে এবং ব্লকের ফাঁকা স্থান গ্রাউট দিয়ে ঢালাই করে দিতে হবে;
- দশ ফুটের চেয়ে লম্বা দেয়ালের মাঝামাঝি একটি ফাঁকা অংশে মেঝে থেকে লিন্টেল লেভেল পর্যন্ত ৩ সুতা রড দিয়ে ব্লকের ফাঁকা স্থান গ্রাউট দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে;
- লিন্টেল ডিজাইন অনুযায়ী রড এবং ১: ২:৪ অনুপাতের কংক্রিট দিয়ে ঢালাই করে দিয়ে হবে;
- বৃষ্টির দিনে কাজের শেষে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে;
- প্লাস্টার করার আগে দেয়াল ভালোভাবে শুকাতে হবে;
- বাহিরের দেয়ালে ৩/৪ বার এবং ভিতরের দেয়ালে ২/৩বার প্লাস্টার করতে হবে; প্লাস্তারের গাঁথুনির জন্য মশলা ১:৫ হারে ব্যবহার করতে হবে। প্লাস্টার করার পরদিন থেকে কমপক্ষে ১০ দিন পানি দিয়ে কিউরিং করতে হবে;
- ব্লক লেয়িনের আগে দেয়ালের দৈর্ঘ্য মেপে নিতে হবে। ব্লকের মাপ অনুযায়ী জয়েন্ট মিলাতে হবে। এতে কোন ব্লক ভাঙ্গা বা কাটার প্রয়োজন হবে না। যদি ব্লকের একপাশে ব্লকের মাপ কম বা বেশি হয় সেক্ষেত্রে জয়েন্ট ছোট বা বড় করতে হবে। একইভাবে ছাদের উচ্চতা মেপে নিতে হবে এবং লেয়িং করতে হবে। ছাদের নিচে যদি ২-৩” অংশ ফাঁকা থাকে তাহলে তা ইটের টুকরা দিয়ে পূর্ণ করে দিতে হবে।
ইট ও কংক্রিট ব্লকের তুলনামূলক ব্যবহার
৯০ মিলি ব্লক ওয়ালের সাথে ৫ ইঞ্চি ইটের পার্থক্য (৫০০ ইটের পরিবর্তে ১১৩টি ইটের ব্লকের ব্যবহার)
| খরচ কমে | ওজন কমে | জায়গা বাড়ে (স্কয়ার ফুট) |
| ২০-২৫% | ৪০-৫০% | ৭-৯ |
১০০ মিমি ব্লক দেয়ালের সাথে ৫ ইঞ্চি ইটের দেয়ালের পার্থক্য (৫০০ টি ইটের পরিবর্তে ১১৩ টি ব্লকের ব্যবহার)
| খরচ কমে | ওজন কমে | জায়গা বাড়ে (স্কয়ার ফুট) |
| ২০-২৫% | ৩৫-৪৫% | ৫-৮ |
১৪০ মিমি ব্লক দেয়ালের সাথে ১০ ইঞ্চি ইটের দেয়ালের পার্থক্য (৯৫০ টি ইটের পরিবর্তে ১১৩ টি ব্লকের ব্যবহার)
| খরচ কমে | ওজন কমে | জায়গা বাড়ে (স্কয়ার ফুট) |
| ৩০-৩৫% | ৪৫-৫০% | ১২ |
১৯০ মিমি ব্লক দেয়ালের সাথে ১০ ইঞ্চি ইটের দেয়ালের পার্থক্য (৯৫০ টি ইটের পরিবর্তে ১১৩ টি ব্লকের ব্যবহার)
| খরচ কমে | ওজন কমে | জায়গা বাড়ে (স্কয়ার ফুট) |
| ৩৫-৪০% | ৫০-৫৫% | ৭-১০ |
ব্লকের আরও নানাবিধ ব্যবহার রয়েছে। যেমন এটি ভবনের ভেন্টিলেশনের কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে অনেকদিন ধরে। যেখানে মানুষ নিজেকে আড়াল রাখতে চায় অথচ বাইরের সৌন্দর্য ও আলো বাতাস থেকে ও বঞ্চিত হতে চায় না- সেসব যায়গায় ব্লক ইটের ব্যবহার এখন বেশ লক্ষণীয়। অনেক বাড়িতে এখন ব্লক ইট দিয়ে রান্নাঘর ও টয়লেটের দেয়াল এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যে- ভেতর থেকে বাইরের সবকিছু দেখা যায়। কিন্তু বাইরে থেকে কিছুই দেখা যায় না।
ব্লক সম্পর্কিত যত প্রশ্নের উত্তর
ব্লকের তৈরি দেয়াল কি নরম হয়?
না, কংক্রিট ব্লকের তৈরি দেয়াল মোটেও নরম হয় না। ভেতরটা ফাঁপা (হলো কংক্রিট ব্লক) হলেও এটা মোটেও নরম কিছু না। অনেক যায়গায় কংক্রিট ব্লকের ভেতর অয়ার ম্যাশ বা তারজালি ব্যবহার করা হয়। ফলে এটির ভেতরে একটি রেইনফোর্সমেন্ট তৈরি হয়। আবার এই কংক্রিট ব্লকের তৈরি দেয়াল এর মাঝে মাঝে মাঝে একটা তিন মিলিমিটারের রড বসিয়ে দিলে (গ্রেট বিমের ওপর) সেই দেয়ালের শক্তিমত্তা অনেক বেড়ে যায়। এটা একটি কংক্রিট ওয়ালকে ফেয়ারফেস কনক্রিটের মতো শক্ত করে তোলে।
এই ব্লক কি আগুনে পোড়ে?
না- কংক্রিট ব্লক আগুনে তেমন ক্ষতিগ্রস্থ হবার আগেই আগুন নিভিয়ে ফেলা সম্ভব। এটি যে তাপমাত্রায় গলে যাবে সেই তাপমাত্রা সাধারণ অগ্নিকান্ডে ঘটার আগেই আগুন নিভে যায়। আর এটি সিমেন্টের তৈরি বলে এটি তাপরোধী।
এটা তো মিস্ত্রি বানাতে পারবে না- কীভাবে পাব?
ইউটিউব থেকে দেখে আপনি নিজেই ব্লক তৈরীর পদ্ধতি শিখতে ও মেশিন বানাতে পারবেন। আর সিমেন্ট-বালি-পাথরকুচি হলেই এটি আপনি নিজের বাসাতেই তৈরি করতে পারবেন। তেমন কষ্টকর কোন বিষয় নয় এটি।
এটা খরচ কীভাবে কমায়?
একটি ইটের চাইতে কংক্রিট ব্লকের মাপ বেশ বড় হয়। ফলে আপনার ইট বানানোর খরচ এর চাইতে ব্লক তৈরির খরচ কমে যায়। খরচ কম বলতে মিস্ত্রি খরচ, গ্যাস চুল্লির খরচ, পরিবহন খরচ- সব একসাথে কমে যায়। এটি কনস্ট্রাকশন সাইটেই বানানো যায় বলে রোদ বৃষ্টি যে পরিবেশই হোক-এটি দিয়ে কনস্ট্রাকশন সম্ভব। একটা ব্লকের জায়গায় চার থেকে ছয়টি ইট বসানো যায়। ইটের প্রতিটি তলে যে সিমেন্ট প্রয়োজন- কংক্রিট ব্লকে তার ছয় ভাগের এক ভাগ ব্যবহার করলেই কাজ শেষ হয়ে যায়। এভাবেই খরচ কমে যায়। একটি ইট তৈরিতে যেখানে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়- সেখানে একটি কংক্রিট ব্লক তৈরিতে দিনের আধবেলা ও প্রয়োজন হয় না।
এটা কি যেখানে সেখানে বানানো যাবে? সবখানেই তো ইট পাওয়া যায়-এটা পাওয়া যাবে?
এটা ঘরে বসেই বানানো যায়। ঘরে ইট তৈরি করা না গেলেও ব্লক তৈরি করা যায়। ব্লকের সুবিধা এটাই। বিভিন্ন এলাকায় এখন ব্লকের কারখানা গড়ে উঠছে। সহজলভ্য বস্তু দিয়ে বানানো বলে এটি সরকারীভাবেই ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে সবাই। এটি কর্মসংস্থান তৈরিতেও নতুন ভুমিকা রাখছে।
এগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি প্রাকৃতিক আলো বাতাসে ভরপুর রাখে অন্দরমহল। ব্লক ব্যবহার বর্তমানে ইটের বিকল্প হিসেবে দেশে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। পাশ্চাত্য দেশে ব্লকের ব্যবহার এখন প্রচুর। বর্তমানে দেশেও এই ব্লক অনেক জায়গায় তৈরি হচ্ছে। তবে ব্লকের ব্যবহার যদি জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে যায় তাহলে ব্লকের চাহিদা অনেকগুণ বাড়বে এবং দেশে এর উৎপাদন হবে অনেক বেশি ।
বাংলাদেশের অবস্থা এই মুহুর্তে বেশ সংকটপূর্ণ। বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে দেশের নিচু অঞ্চলগুলো এখন বেশ ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এর সাথে চলছে নির্বিচারে রাস্তাঘাট বানিয়ে বনাঞ্চল ধবংসের কাজ টাও। তাই আমাদের সামনে এখন দুটো পথ খোলা আছে। প্রকৃতিকে রক্ষা এবং নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করতে হবে। আর এজন্যে ব্লক ইটের ব্যবহার হতে পারে আমাদের বাসযোগ্য পৃথিবী রক্ষায় মূল হাতিয়ার। তাছাড়া ইটের পরিবর্তে যদি ব্লক ইট ব্যবহার করা যায় সেক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণ অনেক কম হবে এবং দালান হবে মজবুত। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে দালান তৈরিতে ইটের ব্যবহার বন্ধ করা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ইটের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় আনার পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা পূরণ করতে সরকার এখনো সক্ষম হয় নি। এখনো পর্যন্ত সরকার এই ব্লক সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে না। প্রচারণার অভাবে মানুষ এই ব্যাপারে এখনো সঠিকভাবে অবগত নয়। এই পরিস্থিতিতে আর কালক্ষেপন না করে তাই যত দ্রুত সম্ভব কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাড়িয়ে পরিবেশ রক্ষা ও অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয় সাশ্রয় নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১২০তম সংখ্যা, এপ্রিল-আগস্ট ২০২০।