মানবসভ্যতার বিবর্তনে যিশুখ্রিষ্টের অবদান অনেক। বর্বরতার যুগ থেকে সভ্যতায় পদার্পণ মূলত যিশুর জন্মের পরপরই। খ্রিষ্টানদের হাতে ধর্মীয় চার্চগুলো স্থাপিত হয় এ সময়েই। এরপরই পাল্টে যায় পৃথিবীর দৃশ্যপট। ধীরে ধীরে শুরু হয় মানুষের মননে ধর্মীয় স্থাপনা স্থাপনের চিত্র পরিবর্তনের। একসময় এটা হয়ে ওঠে আইকনিক স্থাপত্য। আগে ইউরোপ আর মধ্য এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে চার্চের এই স্থাপত্যকলাই হয়ে দাঁড়ায় শহরের প্রাণ। এমনকি মানুষের জীবন ও জীবিকার মাধ্যম হয় এটি। ধর্মীয় বক্তব্য যা-ই হোক, এই ধর্মীয় স্থাপত্যকলার কারণেই পুরো মানবজাতি হয়ে ওঠে বেগবান। এবারের আলোচনা সেই চার্চ স্থাপত্যকলাকে ঘিরেই।
চার্চ আর্কিটেকচার বা চার্চ স্থাপত্যকলা মূলত গির্জার নির্মাণরীতিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। খ্রিষ্টধর্মের গত দুই হাজার বছরের ইতিহাসে, কখনো নতুন কিছু তৈরি করে বা কখনো অন্য কোনো কিছুকে নকল করে বা বিশ্বাসের পরিবর্তনশীলতা অনুসারে এলাকাভিত্তিক রীতিনীতি অনুসারে চার্চের গাঠনিক স্ট্রাকচার বিবর্তিত হচ্ছে। খ্রিষ্টধর্মের জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত খ্রিষ্টীয় স্থাপত্য ও নকশার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ বাইজেনটিয়ামের রোমানিসিক অ্যাবে চার্চ নামক বিশাল গির্জাগুলো, যা মূলত গোথিক ক্যাথেড্রাল আর রেনেসাঁ ব্যাসিলিয়াক।
এই সুসজ্জিত ও সুবিশাল স্থাপত্যের দিক দিয়ে সম্মানিত বিশাল স্থাপনাগুলো সেই যুগে ছিল উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। চার্চ হলো পবিত্রতম, যার ফলে চার্চগুলোজুড়ে গড়ে উঠেছে সুশীল মানবগোষ্ঠী, যারা নিজেদের সভ্য হিসেবে পৃথিবীতে ঘোষণা করেছিল। শুভশক্তির চর্চার মাধ্যমে অনেক অসভ্য ও বর্বর জনগোষ্ঠী পরে খ্রিষ্টধর্মে অন্তর্ভুক্ত হয়ে নিজেদের সভ্য হিসেবে পরিচিত দিয়েছিল। যাতে পুরো পৃথিবীতেই লেগেছিল রেনেসাঁর ছোঁয়া, মূলত যা একটি একক ধর্মকে কেন্দ্র করে, পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম ব্যতীত আর কোনো ধর্মে দেখা যায়নি। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অনেক চার্চ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে খুব কমসংখ্যকই গ্রেট ক্যাথেড্রালের মতো মহান স্থাপত্যকর্ম। বেশির ভাগই সহজ লিনিয়ার ফর্ম; এদের আবার এলাকাভিত্তিক ব্যাপক মিল-অমিল রয়েছে আর রয়েছে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য প্রযুক্তি আর ডিজাইন ও সাজসজ্জার ব্যবহার।
এই চার্চকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে চিত্রকলা। যিশু ও যিশু সম্পর্কিত মানুষগুলোকে বাইবেলের পাতা থেকে তুলে এনে চার্চের দেয়ালে আঁকা হলো। এর মাঝে বিভিন্ন রাজা নিজেদের ছবি আঁকাতেন শিল্পীদের দিয়ে। আবার নিজেদের প্যালেসে ধর্মীয় ছবি আঁকানোর ব্যবস্থাও করতেন। এভাবে শিল্পে ও স্থাপত্যে খ্রিষ্টধর্ম রেখেছিল অবদান। পরে কিছু বিদ্রোহী শিল্পী নগ্ন মানুষের ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে শুরু করেছিল রেনেসাঁ যুগের। মূলত ধর্মীয় চিত্রকলা আঁকার প্রথা তৈরি না হলে হয়তো চিত্রকলা নামের শাখাটিই বিলুপ্ত হয়ে যেত এত দিনে।
চার্চ স্থাপত্যকলার প্রথম দিককার ভবনগুলো প্রধানত অনন্য সাধারণ ভবনের অনুকরণেই নির্মিত। বিশেষভাবে খ্রিষ্টীয় নির্মাণরীতি অনুযায়ী নির্মিত চার্চের সঙ্গে সঙ্গে সেক্যুলার রীতিতে নির্মিত চার্চের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল। বিংশ শতাব্দীতে কংক্রিট কিংবা স্টিলের মতো নতুন নতুন ম্যাটেরিয়ালের ব্যবহার চার্চ গঠনে প্রভাব ফেলতে লাগল।
চার্চ স্থাপত্যের ইতিহাসকে সময়কাল, দেশ বা এলাকা এবং ধর্ম-সংক্রান্ত এই তিনভাগে বর্ণনা করা যায়। বিষয়টি জটিল, কেননা এক কাজের জন্য নির্মিত ভবনকে অন্য কাজেও ব্যবহার করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণকৌশল যেকোনো পরিবর্তনকে অনুমোদন দেয়, ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত ভবনগুলো তাদের পূর্বসূরিকেই কেবল অনুসরণ করে।
চার্চের উৎপত্তি ও বিকাশ
সবচেয়ে সাধারণ চার্চ স্থাপনাগুলো স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য নির্মাণসামগ্রীতে অন্যান্য সাধারণ ভবনের মতোই নির্মিত। এ ধরনের চার্চ সাধারণত আয়তাকার। আবার আফ্রিকায় যেখানে ‘বৃত্তাকার রীতিতে’ বসবাসের স্থান নির্মিত হয়, সেখানকার চার্চগুলোও বৃত্তাকার। ওখানকার সাধারণ চার্চ মাটির ইট, কঞ্চি আর খড়ি, চেরাই করা কাঠ বা পাথরের টুকরো দিয়ে নির্মিত। ছাদগুলো তালপাতা, কলাপাতা, ঢেউটিন কিংবা কখনো কখনো ছোট পাথর দিয়ে তৈরি। চতুর্থ শতাব্দী থেকে চার্চে স্থায়ীভাবে নির্মাণের জন্য পাকা ভবনে একই সঙ্গে শৈল্পিকতার ছোঁয়া লাগে।
যেকোনো যাজক সংঘ এলাকায়, চার্চটাই সবচেয়ে প্রাচীন ভবন হতে দেখা যায় এবং আয়তনে হয় সবচেয়ে বিশালাকৃতির। প্রায়ই এসব চার্চ সেই সময়ের সবচেয়ে মজবুত নির্মাণসামগ্রীতে নির্মিত, বেশির ভাগই ইট কিংবা পাথর তৈরি। প্রার্থনা করার সুবিধার্থে, চার্চে দুটো অংশ থাকত। একটি (হল) সর্বসাধারণের প্রার্থনার সময় ব্যবহৃত হতো, আরেকটি লাগে যাজকসভার মিটিংয়ের সময়। দুই রুমের স্ট্রাকচারের এই ফর্মুলায় অনেক সময় আইল, টাওয়ার/মিনার, চ্যাপেল, ভেস্ট্রিস, ট্রান্সেপ্টস এবং লাশঘরও সংযুক্ত হয়। অবশ্য অতিরিক্ত কক্ষগুলো মূল প্ল্যানের অংশও হতে পারে। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, বিশেষ করে সুপ্রাচীন চার্চগুলোর ক্ষেত্রে, মূল ভবনের সঙ্গে আলাদাভাবে বিশেষ কক্ষগুলোর ডিজাইন করা হয়েছে এবং প্রতিটিই তার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী বজায় রেখেছে।
শুরুর কথা
চার্চ নির্মাণের প্রথম দিককার ৩০০ বছরে, খ্রিষ্টধর্ম ছিল বিতর্কিত ও নিষিদ্ধ। চার্চ নির্মিত হয়েছে খুব কমসংখ্যক। প্রথম দিকের খ্রিষ্টানরা উপাসনা করত ইহুদিদের সঙ্গে অথবা বাসায়। খ্রিষ্টধর্ম এবং ইহুদিবাদ আলাদা হয়ে যাওয়ার পরপরই খ্রিষ্টানরা হাউস চার্চ নাম দিয়ে মানুষের বাসায় প্রার্থনা শুরু করল। অবশ্যই এটা হতো সম্প্রদায়ের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির বাসায়। সেন্ট পল লিখেছেন, ‘এশিয়ান সমাবেশে তোমায় স্বাগত। অ্যাকুইলা এবং প্রিসিলা তোমায় ঈশ্বরের নামে আরও বেশি স্বাগত জানাবে, তাদের বাড়ির আঙিনায় সমাবেশে সবাই একসঙ্গে।’- করিন্থিয়ান্স (১৬:১৯)
কিছু গেরস্থবাড়িকে চার্চ হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছিল। ডুরা ইউরোপোস চার্চ হলো সবচেয়ে পুরোনো চার্চে পরিণত করা বাড়িগুলোর একটি, ২০০ সালের পরপরই নির্মিত, একটা দেয়াল ভেঙে ফেলে দুই রুমকে এক রুমে পরিণত করে একটা ডায়াস বসানো হয়েছিল। ঢোকার পথে একটা ছোট্ট রুমকে ব্যাপ্টিস্ট্রি বানানো হয়েছিল। কিছু চার্চ বিল্ডিংকে বানানোই হয়েছিল সমাবেশস্থল রূপে, যেমন: নিকোমাডিয়ার প্যালেসের বিপরীত অংশ।
বাসাবাড়ি কিংবা হাউস চার্চ থেকে সত্যিকারের চার্চ
চতুর্থ শতকের প্রথম দিন থেকেই অধিকাংশ খ্রিষ্টান সমাজ প্রার্থনা করত বাসাতেই, বিশেষ করে গোপনে। কিছু রোমান চার্চ (যেমন: রোমের স্যান ক্লিমেন্ট) সরাসরি বাসার ওপরেই নির্মিত, আগে যেখানে সমাবেশ ও প্রার্থনা করা হতো। অন্যান্য প্রথম দিকের রোমান চার্চগুলো বানানো হয়েছিল বধ্যভূমির কাছাকাছি কিংবা খ্রিষ্টান কবরস্থানের প্রবেশমুখে। ৩১২ সালে রোমান সম্রাট কনস্টানটাইনের মিলভিয়ান ব্রিজ যুদ্ধের সময় খ্রিষ্টধর্ম ছিল বেশ গোছানো এবং যুদ্ধজয়ের পরপরই পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছিল রোমান সাম্রাজ্যের প্রধান ধর্ম। ধর্মীয় বিশ্বাসটি ভূমধ্যসাগরে ছড়িয়ে পড়েছিল, যার প্রভাব লাগল বিল্ডিংগুলোতে। খ্রিষ্টীয় স্থাপত্যের নির্মাণরীতি ছিল রোমান ও গ্রিক স্থাপত্যের নাগরিক এবং রাজকীয় উভয়ের প্রভাবেই আর তাই ব্যাসিলিকা (যা মূলত একটি আয়তাকার মিটিং হল ছিল) চারদিকে পরিচিত হলো চার্চের মডেলরূপে। মূল গির্জার অংশের চারপাশে ছিল আইল আর কিছু ক্ষেত্রে গ্যালারি এবং ক্লেরেস্টরিস। নাগরিক ব্যাসিলিকার শেষ মাথায় গম্বুজের মতো চূড়া থাকলেও ক্রিশ্চিয়ান ব্যাসিলিকায় সাধারণত বেদির ওপরে গম্বুজ থাকত, যেখানে পাদ্রীরা ডায়াসের সামনে বক্তব্য দিত। মূর্তিপূজকগোষ্ঠী প্যাগান ব্যাসিলিকায় প্রধান আকর্ষণ তাদের সম্রাটের মূর্তিতে থাকলেও খ্রিষ্টীয় ব্যাসিলিকায় প্রাধান্য থাকত তাঁদের রক্ষাকর্তা, ত্রাতা এক ও অদ্বিতীয় ভালোবাসাময় ক্ষমাশীল ঈশ্বরের প্রতি। প্রথম দিকে নির্মিত অতি বিশালাকার চার্চগুলোর মধ্যে অন্যতম সান্তা মারিয়া ম্যাগিওরি, স্যান গিওভানি এবং সান্তা কষ্টানজা রোমে বানানো হয়েছিল চতুর্থ শতকের প্রথমেই।
প্রথম দিককার চার্চ নির্মাণের বৈশিষ্ট্য
প্রাচীন রোমান সভ্যতায় নির্মিত চার্চগুলোতে যেসব বৈশিষ্ট্য দৃষ্টমান-
আসুন প্রথমে জেনে নিই একটা চার্চে কী কী অংশ থাকে-
- হাউস চার্চ
- অ্যাট্রিয়াম
- ব্যাসিলিকা
- বেমা
- মৌসেলিয়াম বা স্মৃতিস্তম্ভ: কেন্দ্রীয়ভাবে প্ল্যান করা বিল্ডিং
- ক্রুসিফর্ম গ্রাউন্ড প্ল্যান: ল্যাটিন কিংবা গ্রিক ক্রুস।
অ্যাট্রিয়াম
যখন প্রারম্ভিক খ্রিষ্টান সম্প্রদায় চার্চ তৈরি শুরু করল, তারা একটা বিশেষ রীতি স্থাপন করল আর সেটা হলো অ্যাট্রিয়াম বা স্তম্ভ দিয়ে ঘেরা প্রাঙ্গণ। এখন আর অ্যাট্রিয়াম দেখা যায় না। চমৎকার উদাহরণ হতে পারে ইতালির রোমের ব্যাসিলিকা অব সান ক্লেমেন্ট আর আরেকটা হচ্ছে, মিলানে রোমস্কয়ার আমলে নির্মিত স্যান্ট অ্যাম্রোগিও। এ ধরনের অ্যাট্রিয়ার প্রভাব এখনো দেখা যায় অনেক ক্যাথেড্রলের পাশের চতুষ্কোণ প্রাচীরে এবং রোমের সেন্ট পিটার্সের ও ভেনিসের সেন্ট মার্কসের পিয়াজ্জে (বড় চতুষ্কোণ বদ্ধ এলাকা) এবং পিসার ক্যাথেড্রলের ক্যাম্পোস্যান্টোতে বা পবিত্র মাঠে।
ব্যাসিলিকা
প্রারম্ভিক চার্চের গঠন কিন্তু রোমান মন্দির হতে আসেনি। যেহেতু ওগুলোর ভেতর যাজকসভার বসার মতো যথেষ্ট জায়গা ছিল না। তাই আবির্ভাব হলো রোমান ব্যাসিলিকার, সভার আয়োজন করা যেত, বিচারকার্যও চালানো যেত। এটাই পরবর্তীকালে ‘ক্রিশ্চিয়ান ব্যাসিলিকা’ নাম নিয়ে বৃহৎ চার্চের জন্য আদর্শরূপে তৈরি হলো।
যদিও রোমান ব্যাসিলিকা আর রোমান স্নানঘর উভয়েরই কোর ছিল একটা বড় আয়তনের মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় উঁচু ছাদবিশিষ্ট যার নিচু চেম্বার বা প্রশস্ত তোরণযুক্ত প্যাসেজ দিয়ে দুই পাশই থাকত আটকানো। গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, ব্যাসিলিকার দুই পাশের শেষ মাথায় একটি করে প্রজেক্টিং কক্ষ ছিল বা ছিল ‘ধঢ়ংব’; একটি অর্ধবৃত্তাকার ডোমবিশিষ্ট জায়গা। এটাই ছিল বিচারকদের বসার জায়গা। বিচারসভার জায়গা। এটা রোমান চার্চ স্থাপত্যে ঢুকে পড়ল এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্নরূপে ক্যাথেড্রল আর্কিটেকচারে ঠাঁয় করে নিল।
রোমের স্যান গিওভানি ক্যাথেড্রালের মতো অতি পুরোনো বড় চার্চের এক প্রান্তে ছিল একটি ব্যাসিলিকা আর আরেক প্রান্তে একটি আঙিনা কিংবা অ্যাট্রিয়াম। খ্রিষ্টীয় মন্ত্রপাঠ পদ্ধতিতে সম্মিলিত বা সমাবেশ একসময় সভার অংশ হল। ‘জনসমাগমের দরজা’ ছিল ভবনের মূল কেন্দ্রস্থল থেকে সবচেয়ে দূরের প্রবেশপথ, যা কি না ব্যবহৃত হতো ধর্মীয় আইনসভা হিসেবে, এটা বহু ক্যাথেড্রল আর চার্চে এখনো দেখা যায়।
বেমা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন পাদ্রীর সংখ্যা বাড়তে লাগল, টেবিল বা বেদিতে হলি কমিউনের সামনে পবিত্র রুটি-পানীয় পরিবেশন করানোর সময় সবাইকে একসঙ্গে ধরানোর মতো জায়গা ছিল না। তখনই বেমা নামক এই উঁচু ডায়াস বহু ব্যাসিলিকান চার্চে জায়গা করে নিল। রোমের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা আর সান পাওলোর সময় এই বেমাকে মেইন মিটিং হল পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হলো, যাতে দুই বাহু সৃষ্টি হয়ে এপসকে ‘T’ শেপ দিল। এভাবেই শুরু হলো ল্যাতিন ক্রস চার্চ শেপের, যা এখন বহু পশ্চিমা বড় চার্চ এবং ক্যাথেড্রলে অহরহই দেখা যায়। ক্রুসের দুই বাহুকে ট্রান্সেপ্ট নামে অভিহিত করা হয়।
স্মৃতিস্তম্ভ
চার্চ আর্কিটেকচারের আরেকটা ধাঁচ হলো স্মৃতিস্তম্ভ। এটি একটি চারকোনা কিংবা বৃত্তাকার ডোম দিয়ে ঢাকা প্রাচীন পাথরের ওপর কোনো ভাস্কর্য অথবা শিলালিপি দ্বারা অলংকৃত রোমান বীরের সমাধি। সম্রাট কনস্টানটাইন নিজেও তাঁর কন্যা কস্টান্জার সমাধির ওপর বৃত্তাকার ডোম দিয়ে আচ্ছাদিত করেন এবং চারপাশে স্তম্ভঘেরা প্যাসেজওয়ে বানিয়েছিলেন। সম্রাটের মেয়ের সমাধিটি কেবল একটি কবরই ছিল না বরং এটি একটি উপাসনালয়েও পরিণত হয়েছিল। এটাই ছিল সেই ধরনের চার্চগুলোর ভেতর প্রথম যেগুলো কিনা লম্বালম্বিভাবে ডিজাইন না করে কেন্দ্রীয়ভাবে ডিজাইন করা। জেরুজালেমের হলি সেপুলচ্রে চার্চের মতো বৃত্তাকার চার্চ নির্মাণে সম্রাট কনস্টানটাইনই ছিলেন পথিকৃৎ। যেগুলো কি না পরে অনেক চার্চ নির্মাণের আদর্শ মডেলে পরিণত হয়েছে, যার মধ্যে আছে রোমের প্রোটো মার্টায়ার স্টিফেনের ধ্বংসাবশেষ, সান স্টিফানো রটোন্ডো আর রাভেনার সান ভিটাল ব্যাসিলিকা।
প্রাচীন যুগের বৃত্তাকার কিংবা পলিগোনাল বা বহুভুজ আকৃতির চার্চ অবশ্য বেশ কমই দেখা যায়। যেমন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা স্পেনের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন স্থানে হলি সেপুলচ্রে চার্চের অনুকরণে ক্রুসেডের সময় লন্ডনের টেম্পল চার্চ নির্মাণ করা হয়েছে, এগুলো অবশ্য সংখ্যায় অতি নগণ্য। অবশ্য ডেনমার্কে এ রকম রোমানস্কয়ার চার্চের বেশ প্রাধান্য অহরহই চোখে পড়ে। ইস্টার্ন ইউরোপের বিভিন্ন অংশেও গোলাকার টাওয়ার আকৃতির রোমানস্কয়ার পিরিয়ডের চার্চ লক্ষ করা যায়। কিন্তু এগুলোর অধিকাংশই স্থানীয় ঢংয়ে তৈরি। এ ধরনের উদাহরণের মধ্যে আরও রয়েছে ভিসগার্ডের সেন্ট মার্টিন্স রটুন্ডা, যা চেক রিপাবলিকে অবস্থিত।
বৃত্তাকার বা বহুভুজীয় আকারের চার্চ ভবনগুলো আরেকটা কাজ করত, সেটা হলো দর্শনার্থীদের কোনাকুনিভাবে দাঁড়ানো বা বসার থেকে বাদ দিয়ে গোলাকারভাবে দাঁড়ানো বা বসার সুযোগ কওে দেওয়া। ইতালিতে তো ব্যাপ্টিস্ট্রি কর্তৃক এই বৃত্তাকার বা বহুভুজীয় ফর্ম মধ্যযুগ পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু ইংল্যান্ডে এই ফর্মটাকে কেবল চ্যাপেল হাউজের ক্ষেত্রেই আদর্শ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ফ্রান্সে এই আইলড পলিগোনাল রীতি ইস্টার্ন টার্মিনাল হিসেবে আর স্পেনে এটাকে চ্যাপেল হিসেবে ব্যবহার করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল।
সান্টা কস্টান্জা আর সান স্টিফানো বাদে, রোমে অবশ্য আরেকটা উল্লেখ করার মতো বৃত্তাকার শেপের খ্রিষ্টীয় উপাসনালয় ছিল, যার নাম দ্য ভ্যাস্ট এনশিয়েন্ট রোমান প্যানথেওন, যাতে ছিল অনেকগুলো মূর্তি বসানো খাপ। এটাও পরে খ্রিষ্টানদের চার্চ হিসেবে আবিভূত হয় যা পরে ক্যাথেড্রল আর্কিটেকচারের বিকাশে পাথেয় হয়ে ওঠে।
ল্যাটিন ক্রুশ বনাম গ্রিক ক্রুশ
বেশির ভাগ ক্যাথেড্রল আর বড় চার্চেরই হয়ে থাকে ক্রুশাকৃতির গ্রাউন্ড প্ল্যান। পশ্চিমা ইউরোপে চার্চগুলো পশ্চিমমুখী হয়ে থাকে, যেখানে চার্চের মধ্যভাগ একটি ট্রান্সেপ্ট দিয়ে বিভক্ত, এটাকেই ল্যাটিন ক্রস রীতি বলে। ট্রান্সেপ্টগুলো কখনো আইলের দিকে মুখ করানো থাকে। যেমনটা হয়েছে ইয়র্ক মিনিস্টারে, আবার নাও করা থাকতে পারে যেমন অ্যামিনস ক্যাথেড্রলে।
বাইজেন্টিয়ামের প্রথম দিকের চার্চগুলোর অনেকগুলোই পশ্চিমমুখী। ইস্তাম্বুলের হাজিয়া সোফিয়ায়, পুরো প্ল্যানটি দাঁড় করানো হয়েছে একটা চতুষ্কোণ বর্গাকার ভূমির ওপরে, যেখানে একটি বিশাল ডোমের দুই পাশে দুইটি উপ-ডোম বসানো হয়েছে এবং অপর প্রান্তে আছে আয়তাকার ট্রান্সেপ্ট। এমনকি একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই বড় চার্চটি পরবর্তী আরও অনেক চার্চের জন্যে অনুকরণীয় আদর্শ মডেল হয়েছে। প্ল্যানটা অনেকটা এ রকম- এখানে একটা চারকোনা মেঝের ওপর চার্চের মধ্যভাগ, চ্যান্সেল এবং ট্রান্সেপ্ট (যার দুই বাহু সমান) এসবের সমন্বয়ে ক্রুশাকৃতি তৈরি হয়। প্রচলিত চার্চগুলোতে পুরো ফ্লোরের ওপরে একটা ডোম থাকে, এটাই এখন রীতি হয়ে উঠেছে, যা দেখা যায় পূর্ব ইউরোপে এবং রাশিয়ার অনেক চার্চে।
গ্রিক ক্রস ফর্মের অনেক চার্চের সামনে লম্বা করে টেনে আনা narthex বা এক প্রকার ফাঁকা জায়গা দেখা যায়। এই রীতিটি পরে চার্চের স্থাপত্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপে। সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা হলো এমন ধরনের একটা চার্চ, এ ধরনের চার্চের কথা বলতে গেলে সবার আগে এই নামটি মনে আসে।
স্থাপত্যের ভিন্নতা পূর্বীয় এবং পশ্চিমা চার্চে
৪০০ শতকের দিকে রোমান রাজত্বে এক প্রকার বিভেদ পরিলক্ষিত হয়, যার ফলে রাজত্বের পূর্ব এবং পশ্চিম বিভাগের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় আচার-আচরণ পালনে বিভেদ লক্ষ করা যায়। অবশেষে ১০৫৪ সালে চরম বিভেদের মাধ্যমে ঘটে এর অবসান।
ইস্টার্ন অর্থোডক্স আর বাইজেন্টাইন আর্কিটেকচার
(পূর্বীয় মূলধারার এবং বাইজেন্টাইন স্থাপত্য)
প্রথমকার দিক থেকেই পূর্বীয় এবং পশ্চিমা খ্রিষ্ট মতবাদ ভিন্ন ভিন্ন গোত্রে প্রবাহিত হয়। পশ্চিমে যেমন ব্যাসিলিকা সবচেয়ে জনপ্রিয় ধরন অথচ আগে আরেকটু জটিল কেন্দ্রীয়ভাবে নির্মাণ করা একটি স্টাইল জনপ্রিয় হতে থাকে। এই চার্চগুলো মূলত এসেছে বধ্যভূমি থেকে, যেগুলো মূলত নির্মাণ করা হয়েছিল সম্রাট কনস্টাইনের আমলে মৃত সাধুদের কবরের ওপর নির্মিত সমাধিক্ষেত্র হিসেবে। এখনো টিকে থাকা রভেনার গালা প্লাসিডিয়া স্মৃতিস্তম্ভ হলো এমনই গুরুত্বপূর্ণ এক উদাহরণ, যা এর মোজাইক সজ্জাকে ধরে রেখেছিল। পঞ্চম শতাব্দীর এই নিদর্শনটি, স্মৃতিস্তম্ভে রূপান্তরিত করার আগে সম্ভবত ব্যবহৃত হতো একটি পুজোর ঘর হিসেবে।
প্যাগানদের কবর থেকে অনুকরণ করা এই ভবনগুলো হতো চতুষ্কোণ, একটু গভীর করে খোদাই করে এতে ক্রুশাকৃতির মতো করে তৈরি করা হতো বাহু অথবা বহুভুজ। ডোম দিয়ে ছাদ বানানো হতো, যেখানে স্বর্গের বিভিন্ন ছবি আঁকা থাকত। ‘প্রজেক্টিং আর্ম’ বা প্রসারিত বাহু দুটোর ওপরও অনেক সময় ডোম বা সেমি-ডোম দ্বারা ছাদ বানানো হতো। অবশ্য মূল ডোম থেকে নিচু কিন্তু মূল ভবনঘেঁষা করেই এ দুটো নির্মাণ করা হতো। যদিও বাইজেনটাইন চার্চগুলো একটা মূল ডোম নিয়েই বানানোর পরিকল্পনা করা হতো, একটি নির্দিষ্ট কোণ বরাবর চ্যান্সেলের দিকে মুখ করেই রাখা হতো সাধারণত, যা কিনা অ্যাপসেসের চেয়ে একটু সামনে পর্যন্ত প্রলম্বিত করা হতো। একটি iconostasis-কে দাঁড় করানোর জন্য এই প্রজেকশনটি উপযোগী ছিল, যেখানে একটি পর্দায় আইকনগুলোকে ঝোলানো হতো, যা পূজারীদের দৃষ্টিসীমা থেকে বেদিকে গোপন করত, পবিত্র স্তোত্রমালা অনুসারে কেবল যখন দরজা খোলা হতো তখনই।
ষষ্ঠ শতকে কনস্টান্টিনোপল স্থাপত্য (বর্তমানে তুর্কি) এমন কিছু চার্চ নির্মাণ করে যেখানে কেন্দ্রীয়ভাবে এবং ব্যাসিলিকা দুই ধরনের নির্মাণরীতির সুন্দরভাবে প্রয়োগ ঘটেছিল, সেমি-ডোম দ্বারা এক্সিস বানানো হতো এবং অন্য পাশে আর্কেডেড গ্যালারি থাকত। হাজিয়া সোফিয়া (বর্তমানে মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে) হল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যার প্রবল প্রভাব পড়েছে পরবর্তী সময়ে অনেক খ্রিষ্টীয় এবং ইসলামিক স্থাপত্যে। যেমন জেরুজালেমের দোম অব দ্য রক। আরেকটা হচ্ছে, দামেস্কের উমাইয়াদ গ্রেট মস্ক। পরবর্তী সময়ে অনেক বড় বড় মূলধারার চার্চে, বিশেষ করে যেগুলো বেশি বড়, ডিজাইন করা হয়েছে কেন্দ্রীয়ভাবে প্ল্যান করে পূর্ব দিকে ডোম দিয়ে এবং পশ্চিম দিকে আইলসহ চার্চের মূল অংশ রেখে।
১৬০০ শতকের দিকে রাশিয়ায় একধরনের কেন্দ্রীয়ভাবে নির্মাণ করা চার্চ প্রাবল্য পেতে থাকে। এখানে যেটা করা হয় সেটা হলো, ডোম বাদ দিয়ে ডোমের জায়গায় এক প্রকার কৌণিক ছাদ দেওয়া হয়, যেটা ছিল ডোমের চেয়ে অনেক চিকন ও লম্বা। ধারণা করা হচ্ছে, এ রকম করে ডিজাইন করার উদ্দেশ্য ছিল তুষারপাত থেকে চার্চের ছাদকে রক্ষা করা। মস্কোর রেড স্কয়ারের সেন্ট ব্যাসিলস চার্চের কথাই সবার আগে মনে আসে এই ধরনের চার্চের উদাহরণে।
মধ্যযুগের পশ্চিমা রীতি
প্রার্থনা করতে আসা লোকের সংখ্যা বাড়ায় ‘বারান্দা চার্চের’ সংখ্যা বাড়তে লাগল। কেন্দ্রীয়ভাবে বানানো চার্চের সংখ্যাও কমতে লাগল। আবাসিক সুবিধাসম্পন্ন চার্চের গঠনও পরিবর্তিত হতে লাগল। ‘দুই রুমের চার্চ’টাই ইউরোপীয় রীতি হয়ে গেল। প্রথম রুমটা হলো চার্চের মূল অংশ, যেটা কি না পাদ্রীসভা কর্তৃক ব্যবহৃত হতো। আর দ্বিতীয় রুমটি ‘দ্য স্যাংচুয়ারি’ হলো সেই স্থানটি, যেখানে জনসমাগম হলে প্রার্থনা মন্ত্র পাঠ করা হতো। এই ব্যবস্থার সুবিধা হলো, পাদ্রীরা কিছুটা দূর থেকে আইলের ফাঁক দিয়ে জনসমাগমকে দেখতে পেত, (পরবর্তী সময়ে অবশ্য রুড স্ক্রিন নামের এক প্রকার কাঠের পর্দা ব্যবহার করা হয়েছিল)। তখন আগত দর্শনার্থীরা অর্থাৎ জনগণই ছিল সমাবেশে মুখ্য বিষয়, পাদ্রীসভার অংশগ্রহণ এখানে মূল আলোচ্য বিষয় ছিল না।
স্তুতিমন্ত্র অবশ্য ল্যাটিনে পাঠ করা হতো, যদিও প্রার্থনাকারীরা তাঁদের নিজেদের ভাষায় দেবতাদের কাছে শ্রদ্ধা অর্পণ করে তৃপ্তি বোধ করতেন। দেখার সুবিধার্থে কিছু চার্চের স্কুইন্ট নামের কিছু ফুটো ছিল, হিসাব করেই দেয়াল এবং পর্দার মধ্য দিয়ে কাটা হতো, যেখান দিয়ে চার্চের মধ্যভাগ থেকেও সবকিছু দেখা যেত। আরেকটা কথা, একটা দ্বৈতরীতি ছিল যে প্রত্যেক যাজকই তাঁর অনুসারীদের জন্য একবার করে খুতবা/বয়ান/বক্তৃতা/ভাষণ দেবেন/প্রার্থনা করবেন কিন্তু একটা বেদি একবারের বেশি ব্যবহার করা যাবে না (প্রতিদিন)। তাই একাধিক বেদি রাখারও ব্যবস্থা করতে হলো, যেটা পরে বিশেষ করে মোনাস্টিক চার্চের একটা রীতি হয়ে গেল।
স্তুতিমন্ত্রের পরিবর্তন ছাড়াও নিত্যনতুন প্রযুক্তি এবং নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার চার্চ নির্মাণ স্থাপত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে প্রকাশ পেল। উত্তর ইউরোপে প্রায়ই কাঠের তৈরি চার্চের দেখা পাওয়া যেত (প্রথম দিকে) কিন্তু কাঠ দিয়ে বানানোর কারণেই সেই সব চার্চ আর টেকেনি। বেনেডিক্টাইন মংকসমূহে বড় স্থাপনা দাঁড় করিয়ে রাখতে ব্যাপকভাবে পাথরের প্রভাব লক্ষ করা গেল ১০ ও ১১ শতকের দিকে।
দুই কক্ষের চার্চে, বিশেষ করে মঠ টাইপের চার্চে; কখনো ট্রান্সেপ্ট থাকত, যেটা ক্রুশাকৃতি তৈরি করত। এখন অবশ্য গ্রাউন্ড প্ল্যানের সঙ্গেই থাকে। এর ফলে ভবনগুলো দেখেই বোঝা যেত এগুলো আসলে চার্চ। কখনো কখনো ক্রুশটা টাওয়ার দিয়ে ঘেরা থাকত, যেটাই চার্চের মূল ফোকাস; যার নাম ছিল কলাপস অ্যাট এলি। আবাসিক মঠগুলোতে এখন প্রার্থনা সংগীত গাওয়ার জন্য সাধুদের বা ধর্মীয় রীতি অনুসারে জায়গার অনুমোদন দেওয়া আছে, তার ফলে মঠগুলো লম্বাটে হয়ে চ্যান্সেল হয়ে গেছে, যেটা এখন পর্দা দিয়ে চার্চের মূল অংশ থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। চার্চের সিম্বল এবং এর ব্যবহারিক প্রয়োগ, উভয়েরই সমন্বয় ঘটে নির্মাণকাজে।
চার্চ আর্কিটেকচারে প্রভাব বিস্তারকারী উপাদানসমূহ
ইউরোপের সর্বত্রই বিভিন্ন এলাকায় নির্মিতব্য চার্চের স্থাপত্যাকার গঠনে এলাকাভিত্তিক বিভিন্নতা দেখা যায়। আবার এমনও হয়, একই এলাকায় একই সময়কালে নির্মিত একটা চার্চ আরেকটা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যেসব ফ্যাক্টর চার্চের ডিজাইনে ভূমিকা রাখতে পারে, সেগুলো হলো- এলাকার অবস্থা, শহরের অবস্থান, গ্রাম নাকি মফস্বল শহর, অ্যাবে চার্চ নাকি কলেজিয়েট চার্চ, চার্চটি বিশপের অধীনে থাকবে নাকি কোনো স্থানীয় ধনাঢ্য পরিবারের অধীনে থাকবে, চার্চে কি মূর্তি থাকবে নাকি ছবি থাকবে ইত্যাদি।
বিশেষ করে, অ্যাবে চার্চ আর কলেজিয়েট চার্চ, যা কি না খুবই ক্ষুদ্র এক ধর্মীয় উপগোষ্ঠীকে (মাজহাব) সার্ভ করে, সাধারণত অন্যান্য যাজকপল্লী চার্চ থেকে অত্যধিক মাত্রায় ভিন্নতা প্রদর্শন করে, এমনকি একই এলাকায় একই সময়ে নির্মিত হলেও।
বিশপের অধীনে থাকা চার্চটি সাধারণত চার্চ আর্কিটেকচারের ওপর পারদর্শী স্থপতি দ্বারাই ডিজাইন এবং নির্মাণ করা হয়, অন্য সাধারণ যাজকদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত চার্চের মতো করে নয়।
অনেক যাজকপল্লীসমৃদ্ধ চার্চ সাধারণত স্থানীয় ধনী পরিবারের অধীনে নির্মিত এবং রক্ষণাবেক্ষণ হয়ে থাকে। এই ফ্যাক্টরটাই চার্চের গঠন এবং ডিজাইনে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। এটাই স্বাভাবিক যে স্থানীয় অভিভাবকের আর্থিক সামর্থ্যরে ওপর চার্চের ডিজাইনে প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে চার্চের অধিকার যে কারও অধীনে আছে সেটা বোঝা যাবে চার্চে আয়তনে, কবরে, মেমোরিলাল বা স্মৃতিস্তম্ভে, ফিটিংসে, কাচের ডিজাইন প্যাটার্ন এবং আরও অন্য সব সাজসজ্জায়।
যেসব চার্চে উল্লেখযোগ্য দামি মূর্তি, বিগ্রহ কিংবা ধর্মীয়ভাবে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন আছে, যেগুলো একপর্যায়ে তীর্থস্থানের জায়গায় পরিবর্তিত হয়েছে এবং শেষ পর্যায়ে ব্যাসিলিকার মর্যাদা পেয়েছে। আবার, অনেক চার্চে বিভিন্ন ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বা বিখ্যাত সাধুর দেহাবশেষ (বা তার অংশ) রক্ষিত থাকার পরেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তীর্থস্থানের মতো গুরুত্ব বহন করে না, যা থেকে চার্চ পরিচালনার খরচ আসতেও পারে আবার নাও পারে।
সাধু ব্যক্তির জনপ্রিয়তা, নিদর্শনটির ধর্মীয় মূল্য, চার্চের আকার এবং গুরুত্ব, যে ব্যক্তির স্মৃতিতে চার্চটি নির্মাণ করা হয়েছে তার ধর্মীয় গুরুত্ব, এগুলো সবই বিভিন্ন পরিস্থিতিতে চার্চের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে আবার নাও পারে। দুজন আপাত দৃষ্টিতে অপরিচিত সাধু, স্যান গিওভানি এবং সান পাওলোভেনিসে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ চার্চের নামকরণের মাধ্যমে সম্মানিত হয়ে আছেন, যা Dominican Friars কর্তৃক বানানো হয়েছিল সমসাময়িক আরেকটি চার্চ ফ্রারি চার্চের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য। ১৯ শতকের শেষদিকে ভেনিসে রেলস্টেশন নির্মাণের জন্য একটা চার্চ ভেঙে ফেলা হয়েছিল, আকৃতিতে অনেক ছোট ছিল চার্চটি, এখানে সেন্ট লুসির দেহাবশেষ সংরক্ষিত ছিল, যে কিনা ছিল একজন শহীদ। এ রকম অনেক চার্চই আছে, যেগুলো সারা পৃথিবীর ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট কর্তৃক সম্মানিত হয়ে আসছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই নরওয়েতে চার্চ স্থাপত্যে আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর যেমন: কংক্রিট বা ধাতব পাত/প্যানেল ব্যবহার করা শুরু হয়। বদো ক্যাথেড্রাল বানানো হয়েছিল কংক্রিট ব্যবহার করে বিশাল ব্যাসিলিকা বানানোর কথা মাথায় রেখে। ১৯৬০-এ মোটামুটি ঘোষণা দিয়েই ট্র্যাডিশনাল আর্কটিক ক্যাথেড্রল বানানো বন্ধ হয়, সেগুলো বানানো হতো হালকা কংক্রিট এবং অ্যালুমিনিয়ামের পাত দিয়ে।
কাঠের চার্চ
নরওয়েতে একটা সময় কাঠের তৈরি চার্চ জনপ্রিয় ছিল, হয়তো-বা কাঠের সহজলভ্যতার কারণেই। এগুলো সাধারণত জনবিরল বা অতটা ঘনবসতিপূর্ণ না এমন জায়গায়ই নির্মিত হতো। শুধু মধ্যযুগীয় আমলে নির্মিত চার্চগুলো বাদ দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত নির্মিত চার্চের অধিকাংশই (প্রায় ৯০%) ছিল কাঠনির্মিত। মধ্যযুগে নরওয়েতে প্রায় হাজার খানেক কাঠের তৈরি চার্চের বেশির ভাগই ছিল ঠেকনা দিয়ে দাঁড় করানো টেকনিকে বানানো। আর বাকি ২৭১ চার্চ ছিল রাজমিস্ত্রি দিয়ে পাকা করে বানানো। প্রোটেস্ট্যান্টদের পুনর্গঠনের পরে নতুন চার্চের নির্মাণ এবং পুরোনো চার্চের নতুন করে নির্মাণ শুরু হয়। কাঠই ছিল মূল ম্যাটেরিয়াল কিন্তু গাছের গুঁড়িও প্রাধান্য পেতে লাগল। গাছের গুঁড়ি দিয়ে বানানো চার্চগুলো ছিল ঠেকনা দিয়ে লম্বাভাবে দাঁড় করানো চার্চের চেয়ে কম শক্তপোক্ত। গাছের গুঁড়ি দিয়ে বানানো চার্চগুলো ছিল গাঠনিকভাবেই লম্বা দেয়াল নির্মাণের জন্য অনুপযোগী, বিশেষ করে যদি কাঠ কেটে জানালা বানানো লাগত। ট্রান্সেপ্ট জুড়ে দেওয়ার পরে কাঠের গুঁড়ির স্থায়িত্ব খানিকটা বাড়ল, যেটাই ছিল ১৬০০ এবং ১৭০০ সালের সময়কালে এই টেকনিকটি বহুল ব্যবহৃত হওয়ার কারণ। ১৭৫৯ সালে একটি হারিকেনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরে ওল্ড ওল্ডেন চার্চটাকে পুরোটাই একটা বিল্ডিং বানিয়ে ফেলা হলো। পরে চার্চটাকে এমনভাবে ক্রুশাকৃতি দিয়ে বানানো হলো, যাতে এটা সর্বোচ্চ বাতাসেও টিকে থাকতে পারে। গাছের গুঁড়ির দৈর্ঘ্যই চার্চের দেয়ালের দৈর্ঘ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ শ্যামনগর চার্চে কাঠের গুঁড়ির জোড়া লাগানোর অসুবিধা দূর করতে কোনাগুলো কেটে ফেলা হতো। ফলস্বরূপ চার্চটি আয়তাকার না হয়ে অষ্টভুজাকৃতির হতো।
ক্রুশাকৃতি দেওয়ার ফলে চার্চগুলো আরও বেশি দৃঢ় হতো কিন্তু ট্রান্সেপ্টের কোনায় আসনবিন্যাসের কারণে মূল বেদি এবং তাতে উপবিষ্ট/আসনগ্রহণকারী যাজকদের আর দেখতে পাওয়া যেত না, দেখার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করত। অষ্টভুজাকৃতির ফ্লোর লেভেল হওয়ার কারণে বেদি দেখতেও সুবিধা হতো আবার শক্তপোক্ত স্ট্রাকচারও হতো, মোটকথা চার্চের মধ্যভাগ তুলনামূলকভাবে বেশ বড় হতো। Hakon Christie-এর বিশ্বাস অনুসারে, এটাই ছিল ১৭০০ সালের দিকে অষ্টভুজাকৃতির চার্চের জনপ্রিয় হওয়ার কারণ। Vreim বিশ্বাস করতেন যে গাছের গুঁড়ি দিয়ে চার্চ বানানোর কৌশল আবিষ্কৃত/প্রয়োগ হওয়ার পরপরই নরওয়েতে চার্চের ডিজাইনে একপ্রকার নতুন সমাহার আসতে শুরু করে। ইউক্রেনে কাষ্ঠ নির্মিত চার্চের নির্মাণ আসে মূলত ক্রিশ্চিয়ানিটি থেকেই এবং সেটা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে যখন কিনা পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ইটের গাঁথুনি দিয়ে নির্মিত চার্চই শহরে বেশি জনপ্রিয় ছিল।
ইথিওপিয়ান চার্চ আর্কিটেকচার
যদিও এর মূল ছিল পূর্বীয় খ্রিষ্ট মতবাদ, বিশেষ করে সিরিয়ান চার্চগুলোতে, তারপরেও পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ধাঁচের ছোঁয়া লাগায়; ইথিওপিয়ার মূলধারার চার্চগুলো কিন্তু তাদের নিজস্ব রীতি/স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিল। ওখানকার সবচেয়ে প্রাচীন চার্চে ব্যাসিলিকার মতো গঠন পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ ডেব্রে ডেমোকে সজ্জিত করা হয়েছিল পুনর্ব্যবহৃত চারটি মনোলিথিক কলাম দিয়ে চার্চের মধ্যভাগকে আলাদা করে দিয়ে। এটার পশ্চিম দিক ছিল নিচু নার্থেক্সের ছাদ দেওয়া/ নিচু ছাদের নার্থেক্স দেওয়া। কিন্তু পূর্বপাশে এটার ছিল মাকদাস বা হলি অব হলিস, ভবনটির একমাত্র আর্কটি দিয়ে আলাদা করা ছিল (!!!)
পরবর্তী সময়কালে, অর্থাৎ খ্রিষ্ট-পরবর্তী সহস্রাব্দের দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম দিকে শুরু হয়ে ১৬০০ শতক পর্যন্ত ছিল প্রচলিত মাধ্যম এবং পাথের কুঁদে বানানো উভয় মাধ্যমের ব্যবহার। যদিও এখন পর্যন্ত টিকে থাকা উদাহরণের নিদর্শন কেবল গুহাতেই পাওয়া যায়, থমাস পাকেনহ্যাম ওয়ালোতে একটা চার্চ খুঁজে পান, যার বৃত্তাকার দেয়ালের ভেতর দিকে পরবর্তী আমলের প্রযুক্তি দ্বারা বাঁধাই করা হয়েছে। আবার এ রকম বিল্টআপ বা জোড়াতালি দেওয়া চার্চের আরেকটা উদাহরণ হলো Yemrehana Krestos, যার সঙ্গে Debre Damo-এর প্ল্যান এবং নির্মাণকৌশলের অনেক মিল পাওয়া যায়।
আর এই সময়কালের আরেকটা স্টাইল হলো, হতে পারে এটাই ইথিওপিয়ার আর্কিটেকচার ঐতিহ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় দিক; আর সেটা হলো মনোলিথিক বা পাথরের চার্চ। এগুলোর মধ্যে পাহাড়ের পাশ কেটে প্রার্থনার জন্য বানানো ঘরবাড়িও পড়ে। Abreha we Atsbeha, যেটার মধ্যভাগ আনুমানিক বর্গাকার এবং ট্রান্সেপ্ট দিয়ে ক্রুশাকৃতি বানানো হয়েছে, এটাই এক্সপার্টদের প্রলুব্ধ করেছে এই চার্চটাকে ক্রস-ইন-স্কয়ার চার্চের ক্যাটাগরিতে ফেলার জন্য। তারপর আসে চার্চেস অব লালিবেলার কথা, যেগুলো তৈরিই করা হয়েছিল তুলনামূলকভাবে নরম লাল চুনাপাথরের পাহাড়ে কমবেশি খোদাই করে। কিছু কিছু চার্চ তো যেমন, Bete Ammanuel আর ক্রস শেপ Bete Giyorgis দাঁড়িয়ে ছিল চারপাশে থেকে আগ্নেয় চুনাপাথর সরিয়ে ফেলার পরেও, যেখানে কিনা Bete Gabriel-Rufael আর Bete Abba Libanos-এর মতো অন্যান্য চার্চ ছিল কেবল একপাশ বা দুপাশ থেকে পাথর সরানো। আর মজার ব্যাপার হলো এ রকম সব চার্চেই ঢুকতে হয় একপ্রকার গোলকধাঁধার মতো পাথুরে সুড়ঙ্গপথ পেরিয়ে।
ইথিওপিয়ান চার্চ আর্কিটেকচারের শেষ সময়কালে (যেটা এখনো পর্যন্ত চলছে) এর বিশেষত্বই হলো কৌণিক ছাদবিশিষ্ট গোলাকার চার্চ। দেখে মনে হবে ইথিওপিয়ান সাধারণ বসতবাড়িই, যেগুলোতে পাহাড়ি লোকেরা বসবাস করে। সবকিছুতে মিল থাকা সত্ত্বেও ইন্টেরিওর এবং কক্ষের লে-আউট কিন্তু একদমই আলাদা। কক্ষের বিন্যাসকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে: (১) মাসডাক: যেখানে কিনা পবিত্র ধর্মবাণী লিপিবদ্ধ ট্যাবলেটই কেবল থাকে আর সেখানে শুধু দায়িত্ব প্রাপ্ত পুরোহিতরাই প্রবেশ করতে পারে, অন্য সাধারণের জন্য প্রবেশ নিষিদ্ধ। (২) কিদিষ্ট নামের একটি ভ্রাম্যমাণ টেবিল, যেটা লোকজনের মাঝে চলাচল করে থাকে আর (৩) qene mehlet নামক আরেকটা ভ্রাম্যমাণ টেবিল, যেটা বাইরে থাকে, বিশেষ নৃত্যশিল্পী বা dabtaras কর্তৃক ব্যবহৃত হয় আর বাকি সবাইও ব্যবহার করতে পারে…
খ্রিষ্টধর্মের সংস্কার এবং চার্চের গঠনে এর প্রভাব
১৬০০ শতকের শুরুর দিকেই মার্টিন লুথার আর খ্রিষ্টধর্মের সংস্কারায়ণ এই দুইয়ে মিলে চার্চ আর্কিটেকচারের ত্বরিত পরিবর্তন আসতে থাকে। প্রোটেস্ট্যান্টদের সংস্কাররীতি অনুযায়ী, ধর্মীয় বক্তৃতাকে চার্চের অন্যতম বৈশিষ্ট্য করা উচিত। এর ফলে যাজকেরাই চার্চেও ভেতরের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেল আর তাই চার্চের ভেতরের ডিজাইন এমনভাবে করা হলো, যাতে বক্তব্য দেওয়ার সময় সবাই সুস্পষ্টভাবে চার্চের প্রতিনিধিকে দেখতে ও শুনতে পায়। আর পশ্চিমা চার্চের মূল ফিচারের মধ্যে যাজকেরা তো সব সময়ই ছিল। প্রোটেস্ট্যান্টিজমের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই খ্রিষ্টধর্ম চর্চার রীতিনীতি আর চার্চের ডিজাইনেও ব্যাপক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এল।
সংস্কারায়ণের সময়ে, রিচুয়ালে প্রত্যেকের সাবলীল এবং পূর্ণ অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হলো। প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চগুলোর ফোকাসই হলো, যাতে সহজ-সরল ভাষায় মানুষের কাছে ধর্মীয় বাণী পৌঁছানো যায়, আগের দিনের মতো কেবল ভাবগম্ভীরসর্বস্ব যাজকদের বাণীর গুষ্টি কিলানো হলো। হলি কমিউনের টেবিলটি বানানো হলো কাঠ দিয়ে, যাতে সবাই বুঝতে পারে যে যিশুখ্রিষ্টের আত্মোৎসর্গ ছিল সবার মুক্তিরই নিমিত্তে আর ধর্মসভার সঙ্গে সবার যোগাযোগ আরও সাবলীল করা হলো, যাতে সবাই খ্রিষ্টধর্মের সাধনার মাধ্যমে ঈশ্বরের সান্নিধ্য পেতে পারে।
নেদারল্যান্ডের প্রথম প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চগুলোকে চতুর্ভুজাকৃতির শেপ দেওয়া হয়েছিল, যাতে পূর্ববিধানবাদের ধর্মোপদেশের ওপর প্রাধান্য থাকে। এ রকম চার্চগুলোর মধ্য ছিল: Willemstad, North Brabant এবং ১৬০৭ সালে নির্মিত ডোমযুক্ত চার্চ Koepelkerk। ১৭০০ ও ১৮০০ শতাব্দীতে ব্রিটেনে অ্যাংলিকান চার্চগুলোতে রয়্যাল আর্মস বাইরের পরিবর্তে ভেতরে বসানোর নীতি চালু হয়ে গেল। ‘কেবল সম্রাটই সকল চার্চের অভিভাবক’- এই ধারণাটা মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্যই হয়তো এমনটি করা হয়েছিল।
আধুনিক যুগ/ আধুনিক কাল
ঈশ্বরের প্রতি প্রার্থনাও যে একটা করপোরেট অ্যাকটিভিটি এবং মন্ত্রপাঠের সময়ে যাজকদের আগত দর্শনার্থীদের দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকা যাবে না, এটা আধুনিক সময়ে এসে অনুভূত হয়। আধুনিক সময়ে চার্চ আর্কিটেকচারে শৈল্পিকতার ছোঁয়া বলতে কেবল একটা মাত্র বড় হলরুম থাকাই বোঝানো হলো। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে কিছু বেশ বড় পরিবর্তন আসে ফ্রান্স ও জার্মানিতে। প্যারিসের নিকটবর্তী Le Raincy নামক চার্চ, যা কিনা ডিজাইন করা হয়েছিল সুবিখ্যাত ফেঞ্চ আর্কিটেক্ট Auguste Perret দ্বারা, সেটাকেই পরিবর্তনের প্রথম মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেবল এর প্ল্যানের জন্যই না, এটা ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিল এর নির্মাণসামগ্রীর জন্য, যা কিনা ছিল শক্ত কংক্রিটের তৈরি। আর জার্মানির Schloss Rothenfels-am-Main ও আলোচনায় আসে যখন একে ১৯২৮ সালে পুনঃসংস্কার করা হয়। এর আর্কিটেক্ট Rudolf Schwartz পরে কেবল ইউরোপেই না বরং আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে এ রকম চার্চের অনুরূপ চার্চের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। পাথরের মেঝের ওপর স্থাপিত Schloss Rothenfels ছিল আয়তাকার, সাদা দেয়ালে গভীর জানালাসমৃদ্ধ। এতে কোনো সাজসজ্জাই ছিল না। একমাত্র আসবাবপত্র বলতে কেবল ছিল হাজার খানেক চারকোনা আলগা টুল, যেগুলো চাইলেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়া যেত। প্রার্থনার জন্য অবশ্য একটা বেদি বসানো হয়েছিল, যেটার তিন পাশে পাদ্রীরা দাঁড়াতে পারত।
আচেন শহরে কর্পাস ক্রিশ্চি ছিল Schwartz-এর প্রথম আবাসিক চার্চ, যা সেই সব পুরোনো নিয়মই মেনে চলে আর বাহাউসের শিল্প বিপ্লবের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এর বাইরের দিকটা ছিল চতুষ্কার। ইন্টেরিয়র করা হয়েছিল সাদা দেয়ালে স্বচ্ছ কাচ দিয়ে। একটা ল্যাংবাউ ছিল, যেটা ছিল আসলে একটা বেদির বর্ধিত রূপ। একে ক্রিস্টোসেন্টিক না বলে বরং থিওসেন্ট্রিক বলাই মনে হয় ভালো। বেদির সামনে ছিল সাধারণ বেঞ্চ। বেদির পেছনেই ছিল সাদা দেয়াল, যেটা আসলে ‘হলি ফাদার’-এর ধারণাকে সিম্বোলাইজ করত। এই চার্চটির প্রভাব পরে সুইজারল্যান্ডেও পড়ে, যার উদাহরণ হলো Fritz Metzger এবং Dominikus Bohm।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, Metzger তার চার্চ আর্কিটেকচার-সংক্রান্ত ধারণাকে আরও বিকশিত করার চেষ্টা করেন, যার ছায়া আমরা দেখতে পাই ব্যাসেল রিচেনের সেন্ট ফ্রানকাস চার্চে। আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিল্ডিং হলো ১৯৫৪ সালে করবুশ্যিয়ার নির্মিত রনচ্যাম্পের নটর ডেম দ্য হট চার্চ। একই ধাঁচের অতি সরল ডিজাইন আর একই রকম স্টাইলের চার্চ দেখতে পাওয়া যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ১৯৭১ সালে শিকাগোর কাছাকাছি লিসলেতে নির্মিত রোমান ক্যাথলিক অ্যাবে চার্চ অব সেন্ট প্রকোপিয়াসে।
১৯৬৩ সালে দ্বিতীয় ভাটিক্যান কাউন্সিল কর্তৃক অনুমোদিত একটি ধর্মীয় ধারণা Sacrosanctum কাউন্সিলের একটি ঘোষণায় পরিবর্তন আনে। এই নিয়মে চার্চের পবিত্র পাদ্রী এবং ধর্ম রক্ষায় নিয়োজিত অন্যান্য অফিশিয়াল বর্গের সঙ্গে সাধারণ জনগণের স্বাভাবিক ও সাবলীল যোগাযোগ নিশ্চিত করতে পারে এ রকম ডিজাইনে চার্চ তৈরি করতে বলা হয়। আরও বলা হয় যে ধর্মবিধি এবং নির্দেশনা অনুসারে বেদির অবস্থান এমনভাবে করতে হবে, যাতে বেদিতে বসা অবস্থায় পুরোহিত সবার চেহারা দেখতে পারে। এই নীতির প্রভাব দেখা যায় লিভারপুলের রোমান ক্যাথলিক মেট্রোপলিটন ক্যাথেড্রলে এবং ব্রাসিলিয়তেও। দুটো চার্চই ছিল কিছুটা গোলাকার শেপের যাতে উন্মুক্ত বেদি ছিল।
বিভিন্ন নীতির প্রয়োগের ফলেই আরও অন্যান্য পরিবর্তনও আসতে থাকল। যাজকপল্লী সমৃদ্ধ চার্চসমূহও অতি অবশ্যই আরও সুন্দর ও গোছানোভাবে বানানো শুরু হতে লাগল। অর্থনৈতিক কারণে এবং অন্যান্য করপোরেট চাহিদা পূরণের স্বার্থে ‘সেক্যুলার ধর্মীয় মতবাদ’ বা ‘ধর্মনিরপেক্ষ ধর্মীয় আচরণ’ শুরু হতে লাগল। সোজাভাবে বললে, এমনভাবে চার্চের বিল্ডিং বানানো হতে লাগল, প্রার্থনার সময়টুকু বাদে অন্য সময় জায়গাটা যাতে অন্য কাজে লাগানো যায়। আবার ধর্ম প্রচারের মাধ্যম বিভিন্ন রকম ভিন্ন ধারণার দ্বারাও প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে লাগল। তিনটা আলাদা কাজের জন্য তিন রকম আলাদা জায়গা বানানো হলো। একটা হলো ব্যাপ্টিজমের জন্য, একটা হলো ধর্মীয় পবিত্র মন্ত্রাদি পাঠ করার জন্য আর আরেকটা হলো বেদির চারপাশে উপবিষ্ট যাজকদের নৈশভোজের জন্য- এই তিন রকমের কাজই রিচার্ড জাইলস কর্তৃক ইংল্যান্ডে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্টে প্রচলিত হলো। যাজকসভাকে শুধু প্রয়োজনের সময় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলাফেরা করতে হতো। তবে এই বুদ্ধিটা ছোট যাজকসভার জায়গায় একটু বড় হলেই আর ফলপ্রদ হতো না। এমন ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উপযোগী ছিল, সেটা হলো বিশাল অ্যাম্ফিথিয়েটার আর আর্চের মধ্যবর্তী বসার জায়গা যেমনটা করা হয়েছিল শিকাগোর উইলো ক্রিক কমিউনিটি চার্চে, আগের প্ল্যানে যেটা ছিল।
উত্তরাধুনিকতা/উত্তরাধুনিক কাল
অন্যান্য উত্তরাধুনিক নিদর্শনের মতো, চার্চের আর্কিটেকচারেও আধুনিক যুগের আদর্শ অনুকরণে কোমলতা, শত্রুতা এবং ইউটোপিয়ানিজম বা কল্পনাদৃষ্টির প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। চার্চ আর্কিটেকচার ডিজাইনে (যদিও খুব কমই আছে তবুও) কিছু বেশ উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আছে, যেখানে চার্চ নির্মাণে আবারও সেই পুরাণ এবং প্রাচীন স্টাইলকেই আবার নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এসব নিয়ে কাজ করছেন যেসব আর্কিটেক্ট, তাঁদের মধ্যে যাঁদের নাম সবার আগে মনে আসে তাঁরা হলেন ডক্টর স্টিভেন স্ক্লোয়ডার, ডানকান স্ট্রইক এবং থমাস গর্ডন স্মিথ, রিচার্ড মেয়ের, ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট প্রমুখ।
কার্যকরী গ্রহণযোগ্য আধুনিক স্টাইলকে ‘ক্ষমার অযোগ্যভাবে’ বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হলো। পুরোনো স্টাইলটা ভেঙে পড়ল, দরকারমতো ফর্ম/গঠন দেওয়া হলো এবং পরিচিত স্টাইলগুলোকে সম্পূর্ণ নতুন কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবর্তনের জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়া হলো। হয়তো-বা অতি অবশ্যই, আর্কিটেক্টরা নতুন করে দেখা শুরু করল সেই সুপ্রাচীন স্থাপত্যরীতিকে, যা কিনা হাজার বছর সময় নিয়েছিল বিবর্তনের মাধ্যমে বিকশিত হতে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে চার্চ আর্কিটেকচার অন্য কোনো এক ডাইমেনশনে গিয়ে পড়বে। তত দিন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৬