আবুধাবির সুপার টানেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দুর্দান্ত এক সাফল্য

আবুধাবি পৃথিবীর অভিজাত শহরগুলোর মধ্যে একটি। এ দেশে বিশালাকৃতির সমুদ্রের পাশেই রয়েছে বিশালাকার মরু উদ্যান। আর এর মধ্যেই গড়ে উঠেছে ক্রমবর্ধমান এক শহর, যাতে আছে বিশালাকার সব মেগা স্ট্রাকচার। মেগা স্ট্রাকচার নির্মাণে এই শহরের জুড়ি মেলা ভার। পৃথিবীর সর্বোচ্চ টাওয়ার বানানোতে এরা নিজেদের ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, স্লো পয়জনের মতো নির্বিচার স্ট্রাকচার বানানোর মাধ্যমে আবুধাবি খুব দ্রুত নিজের কপালে সর্বনাশ ডেকে আনছে। এর শুরু ১৯৫০ সালে। একটা ছোট্ট জেলে নগরী থেকে হুট করেই তেলের বাণিজ্য শুরু করে শহরটি। তেলপ্রাপ্তি ও বিশ্বের জ্বালানির জোগানদাতা হিসেবে এ শহর অনেক মিলিয়নিয়ার তৈরি করেছে। আর এতেই বাড়তে থাকে বিশালাকার নগরীর পরিসর। এই নগরীতে নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু হয় বিশালাকৃতির মেগা স্ট্রাকচার তৈরির প্রতিযোগিতা। ফলে দ্রুত জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। বিশালাকার মানববসতির সৃষ্ট পানিবর্জ্য নিয়ে বিপাকে পড়ে আবুধাবি। শহরে একটা ছোট্ট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ছিল, যা পুরো আবুধাবির ১৫ লাখ জনগোষ্ঠীর পানিবর্জ্য নিজের মধ্যে টেনে নিতে ব্যর্থ। বিশালাকার সমুদ্রের ভেতর অনেক দূর গিয়ে আবারও নিজেদের শহর বৃদ্ধি করার দরুন যেসব বর্জ্য মাটির নিচ দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেগুলো সামান্য চাপে শহরের ভেতর প্রবেশ করতে শুরু করে। আর এতেই হিমশিম খেতে শুরু হয় পুরো শহরে। বর্জ্যরে বিচ্ছিরি গন্ধে শহরের বিভিন্ন অঞ্চল বাসের অযোগ্য হয়ে ওঠে। পুরো আবুধাবি শহরের নিচেই তখন বিশালাকার এক টক্সিক বোমা। যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনা। এ সময়েই ২০১২ সালে ADSSC বা আবুধাবি সুইয়েজ সার্ভিং কোম্পানি আবুধাবি শহরের সবকটা ওয়েস্ট ওয়াটার লাইন একটা বিশালাকার টানেলের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ শুরু করে।

শুরুতে এটাকে একটা বিশাল ও প্রায় অসম্ভব কাজ বলেই মনে হয়েছিল। ADSSC-র মিশন ছিল শহর থেকে তৈরি হওয়া সব জলজ বর্জ্য শহর থেকে বের করে প্রথমে পরিশোধনাগারে পরিশোধন করা, এরপর আবুধাবি শহরের চারপাশের বিশালাকার মরুভূমিতে গাছ লাগাতে সেই পানি ব্যবহার করা। শুনতে প্রথমে যে কারও রূপকথা বলেই মনে হবে। একটা বিশালাকার শহরের মানুষের জলজ বর্জ্য থেকে নতুন একটা বনাঞ্চল তৈরি চাট্টিখানি কথা নয়। আর সেই কাজটিই করতে শুরু করল কোম্পানিটি।

শুরুতে বানানো হলো বিশালাকার এক মাস্টারপ্ল্যান। প্ল্যান অনুযায়ী সব বিল্ডিংয়ের নালা থেকে সুয়ারেজ পাইপলাইন জোড়া দিয়ে টানেলের শুরুতে আনার কাজ করা হয়। একই সঙ্গে শুরু হয় বিশালাকার টানেল বানানোর কাজ। শহর থেকে ৪১ কিলোমিটার দূরে নিয়ে যাওয়া টানেলটি বানানোর জন্য বেশ কয়েকটি TVM মাটির নিচে বসানো হয়। এই TVM হলো বিশালাকৃতির কাটিং মেশিন। ডিস্ক কাটার দিয়ে এটি সামনের মাটি-পাথর সব কেটে ফেলতে পারে। এর মধ্যে আছে বিশাল এক পাইপ, যা দিয়ে সামনে কাটতে থাকা মাটি বাইরে নিয়ে আসা হয়। আর টিভিএম-এর সঙ্গেই থাকে একটা স্টিলের রিম। এই রিমের কারণে আশপাশ থেকে কাটতে থাকা মাটির লেয়ার ভেঙে পড়ে না। আর এর পেছনেই গোলাকৃতির বিশালাকার কংক্রিটের দেয়াল বানাতে থাকে একটি রোবটিক হাত। আর এটাই সেই টানেলের দেয়াল, যেটা দিয়ে তরল বর্জ্য পরিবাহিত হয়। দেয়ালের একটা অংশ তৈরি হয়ে গেলে হাইড্রোলিক হাত টিভিএমকে সামনে চাপ দেয়। এতে আরেক মিটার মাটি কাটা হয়ে যায়। এভাবে সবকিছু ঠিক থাকলে এক সপ্তাহে ১০০ মিটার পথ এগোতে পারে। পুরো ৪১ কিলোমিটার এলাকা টানেল বানাতে মোট আটটি টিভিএম বসানো শুরু হয়। আর এসব টানেল একের সঙ্গে আরেকটা যুক্ত হয়ে বিশাল লম্বা সুপার টানেল তৈরির প্ল্যানিং শুরু হয়। আর এর জন্য আবুধাবি সময় পাবে মাত্র চার বছর। এর মধ্যে এটি তৈরি করতে না পারলে ভয়াবহ কিছু একটা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল নগর পরিকল্পনাবিদদের। এসব জল্পনা-কল্পনার ভেতর দিয়েই ২০১২ সালে শুরু হয় বিশাল এই কর্মযজ্ঞ।

পুরো কাজটিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। একদল বিশালাকার টানেল বানাবে। আরেক দল সেই টানেলের শেষ অংশে একটি Collossal Pumping Station বানানো শুরু করবে। আরেকটি দল নতুন একটা ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বানাবে। এই মহাযজ্ঞে শামিল হলো শত শত কর্মী। যাদের এক-একজনের কাজ এক-একরকম। কেউ টানেলের ভেতর কংক্রিট বানাচ্ছে। আবার কেউ টনের পর টন স্টিল কেটে কংক্রিটের ছাঁচ বানাচ্ছে। আবার কেউ কলোসাল পাম্পস্টেশনের জন্য বিশালাকার এক গর্ত তৈরি করছে।

পুরো কাজের শেষ অংশটি প্রথম অংশের মতোই বেশ জটিল। আবুধাবির মরু অঞ্চলে পানি সেচ প্রদান, শহরের ভেতর সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যবহার করা বিভিন্ন ফোয়ারায় পানি প্রদানের মূল জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে চাইছিল ওরা ওই পরিশোধিত পানি দিয়ে। কিন্তু ৪১ কিলোমিটার দূর থেকে পানি শোধন করে আবারও শহরে নিয়ে আসা একই রকম কঠিন একটা কাজ। আবার একইভাবে এই পানিকে বিশালাকার আরব মরুভূমিতে সেচের কাজে লাগানোও একটা জটিল প্রক্রিয়া। কিন্তু বিশাল বিশাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার বানানো আবুধাবি তত দিনে নিজেদের প্রখর মেধা ও মনোবল খাটিয়ে শুরু করে দিয়েছে বিশাল এই কর্মযজ্ঞ।

এই কাজের একটি বড় অংশ হলো পানি ও মানববর্জ্য বহনকারী টানেল নির্মাণ। এই টানেলের পানি ৪১ কিলোমিটার দূরে নিয়ে যাওয়ার জন্য একে ধীরে ধীরে নিচের দিকে প্রবাহিত করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। নইলে এই বিশালাকার বর্জ্যগুলোকে মরুভূমিতে কোনো পাম্পের সাহায্য ছাড়া নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। আর এটা সম্ভব করতে গিয়ে টানেলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এর স্লোপ গিয়ে দাঁড়ায় মাটির ১০০ মিটার গভীরে। এখানেই শুরু হয় মূল চ্যালেঞ্জ। পানিকে এত নিচ থেকে ওপরের দিকে আনার জন্য বিশাল পাওয়ারফুল একটা পাম্পস্টেশন বানানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এটি যেন একটা অলিম্পিক মাঠের সমান পুলের পানিকে স্টাচু অব লিবার্টির উচ্চতায় প্রতি মিনিটে বয়ে নিয়ে যেতে পাম্পস্টেশনটির সুপার পাওয়ারফুল হওয়ার প্রয়োজন ছিল, আর এটাকে এভাবেই বানানো হচ্ছিল। আর এত নিচে এত বড় পাম্প বানানো ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এটা করতে পারলেই এই পাম্পিং স্টেশন হবে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতায় মানবসৃষ্ট পাম্পিং স্টেশন।

কিন্তু কর্মী ও প্রকৌশলীরা এই স্টেশন বানানোর প্রথম দিন থেকেই এটার কাজ করা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কারণ যেদিন টানেল খুলে দেওয়া হবে, সেদিন প্রতি মিনিটে লাখ লাখ লিটার মানববর্জ্য এটা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কিছু সময়ের মধ্যে এই স্টেশনে এসে জমা হবে। আর সেই মুহূর্তে যদি এটার কোনো স্ট্রাকচার ভেঙে পড়ে কিংবা আশপাশে বালিয়াড়ির চাপে এর কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে সমগ্র আবুধাবি শহর মুহূর্তে বর্জ্যময় শহরে পরিণত হবে, যা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ইঞ্জিনিয়ারিং ফেইলিওর। তবুও সবাই কাজে লেগে যায়। আর এই কাজের প্রথম ধাপ ছিল বালিয়াড়ির ভেতর একটা ১০০ মিটার ব্যাসের বড় গর্ত তৈরি করা। এই গর্ত যদি তৈরি করতে একটু এদিক-সেদিক হয়, ধরুন এক মিটার বা আধা মিটার, তবে তা হবে আরেক ম্যাসাকার। টানেল তৈরি করতে করতে এসে দেখা যাবে টানেল শেষ হয়েছে কিন্তু সেটা পাম্পিং স্টেশন থেকে অনেক দূরে। ফলে ঘটবে বড়সড় ম্যাসাকার। এ জন্য নিখুঁত ক্যালকুলেশনের প্রয়োজন ছিল। আর এই ক্যালকুলেশনের পরেই শুরু হয় কাজ।

 কিন্তু এই কাজ করতে গিয়েই আবুধাবি পড়ে মহা বিপদে। আর এই বিপদের নাম সূর্য। আরব মরুভূমির খরতাপে এখানকার কর্মীদের শুরু হলো হিটস্ট্রোক হওয়া। আবুধাবির অবস্থান কোস্টাল ডেজার্ট এরিয়ায়। এর আশপাশে সব বালিয়াড়ি। একপাশে বিশাল সমুদ্র। সেই বালিয়াড়িকে আপাতদৃষ্টিতে জলহীন মনে হলেও আসলে সেটি পুরো উল্টো। এই মরুভূমিতে মাটির এক ফুট নিচেই আছে পানি। মাটি একটু খুঁড়লেই পানি জমে যায় যেকোনো গর্তে। আর সেই গর্তের ভেতর সব নোনা সমুদ্রের পানি। সমুদ্রের পানির স্তর মাটির ৩০ কিলোমিটার নিচ থেকে মাটির পানির স্তরকে ধাক্কা দিচ্ছে। আর এই ধাক্কায় সব পানি নোনাপানি রূপে মাটির ওপর চলে আসে। আর ওপরের সূর্যের প্রচণ্ড তাপে সেই পানি উড়ে যায়। পড়ে থাকে সাদা লবণ। যার ফলে এই মাটিতে গাছ জন্মাতে পারে না। লবণের সাদা আস্তরণ মাটির ওপর পড়া সূর্যালোককে কয়েকগুণ বাড়িয়ে বিকিরণ করে। ফলে আশপাশে কেউ থাকলে মুহূর্তেই পানিশূন্য হয়ে হিটস্ট্রোক করে। এসব এলাকায় কোনো মানুষ আধা ঘণ্টার মধ্যে দুর্বল হয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। এমনকি দুই ঘণ্টার মধ্যে মারাও যেতে পারে। এ কারণে এই অঞ্চলে মানুষ বসবাস করে না। কোনো গাছপালাও নেই। আর এই পানিশূন্য নীরব অঞ্চলে কাজ করা রীতিমতো বিপদের কারণ হয়ে ওঠে।

ইঞ্জিনিয়ারদের সামনে দুটো বিপদ। একটা সূর্যালোক, আরেকটি পানি। এই পানি যেন কোনোভাবেই পাম্পের দেয়ালকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে এ জন্য একটা ৪০ মিটার লম্বা ডায়াফ্রাম ওয়াল বানানো শুরু করেন ইঞ্জিনিয়াররা। এই দেয়াল বানানোর মসলা হলো আরসিসি। আর এ জন্য গর্ত করে মাটি সরিয়ে এর ভেতর পাম্প করা যায় এমন মাটি ভরে দেওয়া হতো। আর এই মাটির ভেতর বসানো হয় রেইনফোর্সমেন্ট। এরপর লোহার শাটারিং করতে হয়। প্রতিটা প্যানেলকে বানানোর জন্য ৭২০ টন কংক্রিট প্রয়োজন। আর এই কংক্রিট বানানোও হচ্ছিল এই সাইটের পাশেই। এখানে আরেকটি সমস্যা দেখা দিল। প্রচণ্ড উত্তাপে কংক্রিটের কেমিক্যাল রি-অ্যাকশন ব্যাহত হয়। এতে দ্রুত ক্র্যাক চলে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়। যেকোনো সময় কংক্রিটের দেয়ালগুলোতে ক্র্যাক এসে ভেঙে পড়তে পারে। ফলে পুরো প্রজেক্ট ফেল করতে পারে। আর এ জন্য ইঞ্জিনিয়াররা বুদ্ধি করে কংক্রিটের এগ্রিগেট হিসেবে পানি ব্যবহার না করে বরফ ব্যবহার শুরু করলেন। দেখা গেল বরফ গলে পানি হতে হতে সেই কংক্রিট ঢেলে দেওয়া হয়েছে ডায়াফ্রাম ওয়ালের কেইজে। ফলে কংক্রিটের সম্ভাব্য বিপদ এড়ানো গেল। তত দিনে ছয় মাস হয়ে গেছে। আর এই কাজটাই সুচারুভাবে করার জন্য প্রতি শিফটে লোক পাল্টাতে হয়েছে। কারণ এখানে একজন লোক এক ঘণ্টা কাজ করলে তাকে অবশ্যই ১৫ মিনিট বিশ্রাম নিতে হতো। এটা বাধ্যতামূলক ছিল। নইলে যেকোনো সময় যে কেউ মারা যেতে পারে। আর এ জন্যই কয়েক ধাপে কাজ করতে বেশ দেরিই হয়ে যায়।

টানেলস এন্ড টানেলিং

 ৪০ মিটার দেয়াল বানানোর পর এই গর্তের ভেতরের সব মাটি ও বালি তোলা শুরু করে শ্রমিকেরা। বিশালাকার ক্রেন দিয়ে মাটি তুলতে তুলতে এর একদম নিচে এসে একটা গোলাকার টো বিম বানানো হয়, যা এই বিশাল ডায়াফ্রাম ওয়ালকে ধরে রাখবে। আশপাশের পানি মেশানো বালিয়াড়ির প্রবল চাপ সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা এই ডায়াফ্রাম দেয়ালের চারপাশে টো বিম বানানোর পর দেখা গেল এর নিচের মাটি বেশ শক্ত। এটি আগেকার মাটির মতো ভঙ্গুর নয়। ঝুরঝুরেও নয়। তাই ডায়াফ্রাম ওয়াল ছাড়াই এরপর গর্ত করে পাম্পিং স্টেশন বসানোর কাজ শুরু হলো।

অন্যদিকে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে আবুধাবি শহরের মাটির নিচে টানেল কাটার নিয়ে প্রতি সপ্তাহে ২০০ মিটার পাথুরে মাটি কাটতে শুরু করে। প্রথমে মনে করা হয়েছিল এটি সপ্তাহে ১০০ মিটারের বেশি কাটতে পারবে না। কিন্তু এটি বেশ ভালো কাজ করতে শুরু করে দিয়েছিল, যাতে অনেক দ্রুত কাজ এগোতে থাকে। কিন্তু এই টানেলকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল শহরের বড় বড় স্থাপনার নিচ দিয়ে। আর এটিই ছিল টানেল নির্মাণের মূল বাধা। প্রতিটা সুপার স্ট্রাকচারের নিচে লম্বা লম্বা পাইল। এসব বাড়ির প্ল্যান বিবেচনা করে এই টানেল বিভিন্ন দিকে বাঁকিয়ে একই সঙ্গে নিচু করে বানাতে হচ্ছিল। টানেল কাটার এক ধাপ মাটি কাটার পর সেখানে কংক্রিটের স্ল্যাব বানানো হচ্ছিল। আর এরপর আবারও এক মিটার মাটি কাটছিল। এভাবে ধীরে ধীরে টানেলের দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে। কিন্তু যে ময়লা ও আবর্জনা তৈরি হচ্ছিল, সেসব ময়লাকে আবারও মাটিতে ফিরিয়ে আনাটা বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। অনেক লম্বা দূরত্বে প্রথম কাটিং মেশিন-যন্ত্রপাতি, এরপর মানুষ পৌঁছানো হতো। এরপর এতে করে আবারও ময়লাগুলো ফিরিয়ে আনা হতো মাটির লেভেলে। কোনোভাবে এক দিন কাজ বন্ধ থাকলেই কোটি ডলারের লোকসান, যা ছিল সত্যিই ভয়াবহ। একটি কনভেয়ার বেল্টে কাটিং মেশিন থেকে বের হওয়া মাটি ও ময়লা ফেরত পাঠানো হতো, আর এর মধ্যেই কোনো কোনো দিন ময়লা ও আবর্জনার চাপে এই বেল্ট ছিঁড়েও যেত। এক ঘণ্টার ভেতর এই বেল্ট ঠিক করতে না পারলে পুরো প্রজেক্ট ভেস্তে যাবে। টানেল কাটার প্রতিনিয়ত মাটি জমা করছে। একবার এই মাটি সরিয়ে না নিলে ঘণ্টার ভেতর কাটার মেশিন বন্ধ হয়ে যাবে, আর এটাকে ফিরিয়েও আনা যাবে না। কারণ এই মেশিন শুধু সামনেই এগিয়ে যেতে পারে। পেছনে ফিরে আসার বিদ্যা এর জানা নেই।

ডিসেম্বর, ২০১২। মরুভূমির মাঝখানে ডায়াফ্রাম ওয়ালের ভেতর পানি জমতে শুরু করেছে। এটাকে বানানো হয়েছে যেন এটি ভেদ করে পানি না আসতে পারে। আর এটির একটা দেয়াল দিয়ে পানি আসতে শুরু করেছে, যা এই পুরো প্রজেক্টের সবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইঞ্জিনিয়াররা দেখতে পান যে কংক্রিট ওয়ালের অংশে পানি আসছে, সেখানে ৪০ মিটার গভীরতায় একটু আগেও কংক্রিট আসেনি। সেখানে স্রেফ মাটি দিয়েই দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে। আর এ জন্য দেয়ালে ক্র্যাক আসতে শুরু করেছে। এবং যেকোনো মুহূর্তে এটি কলাপস করবে। ফলে এক বছরের খাটনি পুরো মুখ থুবড়ে পড়বে। দ্রুত এতে কংক্রিট নতুন করে পুশ করা শুরু করে পুরো টিম। কিন্তু দুই দিন কংক্রিট দেওয়ার পর ছয় দিন এটি শুকোতে সময় দেওয়া হয়। কিন্তু এতেও কাজ না হওয়ার ফলে পুরো প্রজেক্ট ১০ দিন পিছিয়ে যায়। এতে প্রতিদিন লাখ লাখ ডলার লোকসানে পড়ে কোম্পানিটি। ইঞ্জিনিয়াররা এটিকে সলভ করার একটা বুদ্ধি বের করলেন। টো বিম বসানোর কথা ছিল একদম ৪০ মিটার নিচে। ওনারা সেটাকে সেই ক্র্যাকের ওপরেই বানিয়ে ফেললেন। এতে পুরো ওয়ালের ভেঙে পড়া রোধ করা গেল। আর সঙ্গে সেই ক্র্যাকও বন্ধ করা গেল। পুরো দুই মিটার চওড়া টো বিম বানানোর পর সেখান থেকেই নতুন করে খোদাই করে নিচে যাওয়ার কাজ শুরু হলো, যেখানে সেই সুপার টানেল এসে শেষ হবে।

ফেব্রুয়ারি, ২০১৩। আরও আট কিলোমিটার টানেল বানানো বাকি। বানিয়ে ফেলা কংক্রিট টানেলের জন্য নতুন একটা দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছিল। আর সেটি হলো কংক্রিটের দেয়ালের সঙ্গে মানববর্জ্যরে বিক্রিয়া। মানুষের তৈরি বর্জ্য এমনিতেই ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রার হয়ে থাকে। আর এই তাপে এই বর্জ্য থেকে নানা রকম গ্যাস ও অ্যাসিড নির্গত হয়। বিশেষ করে আবুধাবি শহরের কোটি কোটি টন ওয়াশিং মেশিনের বর্জ্য, যেটাতে সবটাই কেমিক্যাল। এটার সঙ্গে অন্যান্য হিউম্যান ওয়েস্ট মিশে সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরি হয়। সঙ্গে নানা রকম ক্ষার ও ক্ষারজাতীয় তরল তৈরি হয়, যা কংক্রিটের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এই টানেল বানানোর এক মাসের মাথায় যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে পুরো আবুধাবি শহর আবর্জনায় তলিয়ে যাবে। এ জন্য কংক্রিট দেয়ালের সঙ্গে HDPE শিট লাগানো শুরু করেন ইঞ্জিনিয়াররা। এই শিট হলো পলিইথিলিনের তৈরি। এটা পুরো টানেলকে সালফিউরিক অ্যাসিডের হাত থেকে রক্ষা করবে, সঙ্গে টানেলের গায়ে লেগে থেকে অন্যান্য কেমিক্যাল থেকেও দেয়ালটিকে বাঁচাবে। খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এই টানেলের বিভিন্ন স্থানে সেন্সর বসানো হয়। এই সেন্সর দিয়ে কোথাও HDPE শিট খুলে গেছে কি না বোঝা যাবে। কোথাও সাদা কংক্রিট বেরিয়ে পড়লেই বুঝতে হবে যে এখানে শিট খুলে গেছে। তখন একটা টিম এসে এখানে আবারও শিট লাগানো শুরু করে। আর এই বিশেষ প্রক্রিয়ার জন্য পুরো টানেলের আটটি ভাগে HDPE শিট আট রকমের রঙে ব্যবহার করা হয়। আর এখানে কোথাও সাদা কোনো অংশ দেখা যাওয়া মানেই হলো সেখানকার কংক্রিট বিপদাপন্ন। আর কোন রং এটা দেখে কোন অঞ্চল সেটা নির্ধারণ সহজ হয়ে যায়। এতে দ্রুত কংক্রিটকে রক্ষা করা যাবে। পুরো টানেল খুঁজে খুঁজে ক্ষত বের করার ঝামেলাটাও মিটে গেল।

এদিকে পাম্পিং স্টেশন এলাকায় দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে। সময় শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ করা যাচ্ছিল না। যত দ্রুত খনন চলছিল তত দ্রুত আবর্জনা গর্ত থেকে বের করা যাচ্ছিল না। বিশালাকার ক্রেন নিয়ে যে পরিমাণ মাটি তোলা হচ্ছিল, সেটা পর্যাপ্ত ছিল না। আবার যে পরিমাণ লোকবল আছে তাদেরও বাড়ানো সম্ভব ছিল না। কারণ একবার মাটির নিচের স্তরে লোক পৌঁছানোর পর সেখান থেকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ফিরে আসা সম্ভব ছিল না। খাবার পানি সব নিয়ে নিচে নামতে হচ্ছিল। মাটির ৮০ মিটার বা ২৪০ ফুট নিচে নেমে কাজ করাটাও তখন অনেক বেশি পরিশ্রমের হয়ে যাচ্ছিল। আর এত নিচে বেশি লোক কাজও করতে পারছিল না। বিশালাকার এয়ারকন্ডিশনার দিয়ে পাইপের সাহায্যে গর্তের ভেতর ঠান্ডা বাতাস পাঠাতে হচ্ছিল। মাটির এত নিচে অক্সিজেন লেভেল অনেক কম ছিল। আর এতে কাজ করা আরও দুরূহ হয়ে পড়ছিল। কিন্তু সময় তো শেষ হয়ে আসছে। কাজ তো করতেই হবে।

অক্টোবর, ২০১৩ সালে পুরো টানেল বানানো শেষ হলো। আর ধাপে ধাপে এই টানেলের ভেতর বসানো হলো ইলেকট্রিক্যাল কানেশন, এলইডি লাইটসহ আনুষঙ্গিক সব যন্ত্রাংশ। জাপান থেকে নিয়ে আসা পাম্প মেশিন বসানো হলো পাম্পিং স্টেশনের ভেতর। সেই পাম্পিং স্টেশনে প্রতি মিনিটে একটি স্টেডিয়ামের সমান পুলের পানি ১০০ মিটার ওপরে নিয়ে এসে ছেড়ে দেওয়া হলো নতুন বানানো পানি শোধনাগারে। আর সেই পানি শোধনাগার থেকে পরিশোধিত পানি আবার আবুধাবি শহর ও এর আশপাশে নিয়ে যাওয়া হলো, আর এই কাজ চলতে থাকবে আগামী কয়েক শ বছর ধরে। ধরে নেওয়া যায়, এটাই মানবসৃষ্ট প্রথম সুপার স্ট্রাকচার, যার কারণে মরু অঞ্চল আবারও বনাঞ্চলে রূপ নিতে পারে। হয়তো পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য এটা মানুষের আরেকটি স্টেপ বা পদক্ষেপ। কারণ, ADSSC-র এই প্রজেক্টের নামই ছিল STEP. নিল আর্মস্ট্রং যেমন করে চাঁদে পা রেখেছিলেন, মানবজাতি এভাবেই পৃথিবীকে রক্ষার জন্যও একটি পদক্ষেপ নিয়েছিল, যেটি শুরু করেছিল আবুধাবি, যেটা আজীবন মনে রাখবে মানবজাতি।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩১তম সংখ্যা, জুলাই ২০২১।

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top