বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব এক লীলাভূমি। সবুজে-শ্যামলে যেমন সুন্দর, এ দেশের মাটির পরতে পরতেও লুকিয়ে আছে তেমনই মহামূল্য রতœরাজি। অর্থনীতি আর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ব দরবারে এখন বাংলাদেশের অবস্থান যেমনই থাকুক না কেন, ইতিহাসে এ দেশের অবস্থান ও গুরুত্ব বিশ্ববাসীর কাছে কতটা ছিল, এ দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোই তার সাক্ষ্য বহন করছে। মাটির গভীরে এখনো রয়েছে অনেক অনাবিষ্কৃত ইতিহাস। পাল বংশ ইতিহাস ধরে রেখেছে তাদের রেখে যাওয়া নানা নিদর্শনে। তাদের ঘরবাড়ি, ইমারতসহ সব ভৌত স্থাপনা সে সময়ের মানুষের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানান দেয় আমাদের। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার দুই বিহার-হলুদ বিহার ও জগদ্দল মহাবিহার ।
হলুদ বিহার
নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার প্রাচীন দুই বিহারের একটি হলুদ বিহার। উপজেলার বিলাসবাড়ী ইউনিয়নের হলুদ বিহার গ্রামে এর অবস্থান। ইতিহাস সূত্রে এখানে চারটি ঢিবি থাকার কথা থাকলেও কালক্রমে রয়েছে ১০০ ফুট ব্যাসের একটিমাত্র ঢিবি। স্থানীয়ভাবে এ গ্রামের নাম দ্বীপগঞ্জ বলে পরিচিত। বিক্ষিপ্ত ঢিবিগুলো দেখে ধারণা করা হয়, এ গ্রামের গোড়াপত্তন হয়েছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের হাতে। তাদেরই বসতি ছিল এখানে।
অবস্থানগত দিক থেকে এই বিহার পাহাড়পুর বৌদ্ধমঠ থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে, মহাস্থানগড় থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। নওগাঁ জেলা শহর থেকে হলুদ বিহারের দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। তুলসীগঙ্গা এবং যমুনা নদীর মাঝখানে অনেক ঢিবি নিয়ে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন এই জনপদ।
কালে কালে হলুদ বিহারে আগমন ঘটেছে দেশীয় ও উপমহাদেশের অনেক পন্ডিত, গবেষক, প্রত্নতাত্ত্বিক আর পর্যটকদের। তাঁদের ভ্রমণে নানা সময়ে উঠে এসেছে নানান অজানা তথ্য। ১৯৩০ বা ১৯৩১ সালে ভারতীয় প্রতœতত্ত¡বিদ ড. সি দত্ত ভারতের প্রতœতত্ত¡ জরিপ বিভাগের অধীনে এলাকাটি পরিদর্শন করেন। এক প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, এ অঞ্চলটি পূর্ব-পশ্চিমে ৬৪.৫ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ৪০.৫ মিটার, সমতল ভূমি থেকে যার উচ্চতা ১০.৫ মিটার। তার অনুসন্ধানে হলুদ বিহার (দ্বীপগঞ্জ) গ্রাম থেকে ১ মিটার উঁচু একটি গণেশের ব্রোঞ্জমূর্তি পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এ মূর্তিটি ৮-৯ শতক বা তার সমসাময়িক।
প্রত্নতাত্ত্বিক কাজী মোহাম্মদ মেছের রচিত রাজশাহীর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, ১৯৬৩ সালে হলুদ বিহার থেকে কালো পাথরের বুদ্ধমূর্তিসহ কয়েকটি পোড়ামাটির চিত্রফলক আর কিছু প্রাচীন মুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তর ১৯৭৪ সালে এই এলাকায় অনুসন্ধান চালায়। তৎকালীন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তরের সুপারিনটেনডেন্ট হারুন-অর-রশীদকে তাঁর প্রতিবেদনেও এ অঞ্চলে প্রাচীন সভ্যতার অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেন। পরে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তর হলুদ বিহারকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে নথিভুক্ত করে। দুই দফায় ১৯৮৪ ও ১৯৯৩ সালে সরকারিভাবে খননকার্য চালায় প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তর।
স্থানীয়দের রাক্ষুসে থাবায় অনেক আগেই অস্তিত্ব হারিয়েছে হলুদ বিহার। চারপাশে গড়ে ওঠা জনপদ আর বাড়ন্ত মানুষের ভিড়ে বিলীন হয়ে গেছে বাঙালির ইতিহাসের সাক্ষী প্রাচীন বাংলার স্মৃতিবিজড়িত এই বিহার। স্থানীয়দের দখলে ধ্বংস হয়ে গেছে বিহারের সাত মিটার পুরু দেয়ালের এক-চতুর্থাংশ। এক কৃষকের খননের সময় শক্ত ধরনের মধ্যম আকৃতির ক্রুশাকার বৌদ্ধমন্দির আবিষ্কৃত হয়। রীতিসম্মত খনন করে উদ্ধার করেছিলেন সীমানাপ্রাচীরের সবকটি ইট। জ্যামিতিক ও পুষ্পাকার নকশাখোদিত কয়েকটি পোড়ামাটির ও পাথরের ফলকও পাওয়া যায় এ সময়।
১৯৯৩ সালে খননের পর আবিষ্কৃত হয় একটি মন্দির কমপ্লেক্স। কমপ্লেক্সটি প্রতি পাশে ৫.৮০ মিটারের নিরেট বর্গাকৃতির ভিত্তির ওপর নির্মিত। দুটি অসমান আয়তকার কক্ষ, একটি সিঁড়ি ও কমপ্লেক্সের বেষ্টনী দেয়ালের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। ৫.৫৫ ী ৩.২০ মিটার এবং ২.৬ ী ১.৬ মিটার আয়তনের কক্ষ দুটি কমপ্লেক্সের সবচেয়ে ছোট আকৃতির কক্ষ হিসেবে পাওয়া গেছে। খননকারীদের মতে মন্দিরে একটি বড় পাথরের মূর্তি স্থাপিত ছিল। সবচেয়ে বড় কক্ষটি মÐপ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। কমপ্লেক্সের চারপাশে রয়েছে ১.১ মিটার প্রশস্ত হাঁটাচলার পথ। এ ছাড়া পাওয়া যায় মাটির পাত্র, তাওয়া, খোদাইকৃত পোড়ামাটির সিল, কারুকার্যখচিত ইট, মানুষের মূর্তিসংবলিত বেশ কিছু পোড়ামাটির ফলক, পাথরের মূর্তির বেদি, অলংকারের ঢালাই ছাঁচ ও চূর্ণনযন্ত্র।
এ পর্যন্ত হলুদবিহারে খননের ফলে যেসব নমুনা পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে ঐতিহাসিকদের ধারণা, প্রাথমিক মধ্যযুগের বেশ সমৃদ্ধিশালী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসতি ছিল হলুদ বিহারে। এই জনপদ বরেন্দ্র অঞ্চলের পাহাড়পুর আর সীতাকোটের সমসাময়িক।
জগদ্দল মহাবিহার
জগদ্দল বিহার পাল রাজাদের স্মৃতির অপভ্রংশ। এই বিহার ইতিহাসের সেই সাম্রাজ্যেরই সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জয়পুরহাট-ধামইরহাট (নওগাঁ) মহাসড়কের হাতিটাকিডাঙা বাজারের তিন কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের প্রায় ১.৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং ধামইরহাট উপজেলা কার্যালয়ের ৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে এর অবস্থান। এখান থেকে পাহাড়পুর ও হলুদ বিহার বৌদ্ধমন্দিরের দূরত্ব যথাক্রমে ২০ ও ১৮ কিলোমিটার। উৎখননের ফলে এখানে যে ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, তাতে এর আয়তন পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ ১০৫ ী ৮৫ মি. দেয়াল প্রায় ৫ ী ৫ মি.।
রাজা রামপাল গৌড় রাজ্য পুনরুদ্ধারের পর রাজকার্য পরিচালনার জন্য রামাবতী নগরে রাজধানী স্থাপন করেন। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর গ্রন্থে রামাবতীকে রমৌতি বলে উল্লেখ করেছেন। রাজা রামপালের পুত্র মদনপালের তা¤্র শাসনেও রামাবতী নগরীর অস্তিত্ব রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিকদের অনেক মত থাকলেও জগদ্দল বিহারের অবস্থান দিনাজপুর, এ বিষয়ে সবার ঐক্যমত রয়েছে। নওগাঁ জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে এ এলাকা দিনাজপুর জেলারই অংশ ছিল। রামাবতী নগরে রাজা রামপাল জগদ্দল মহাবিহারের প্রতিষ্ঠা করেন। একাদশ বা দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা রামপাল নির্মিত এই মন্দিরের বর্ণনা নীহাররঞ্জন রায় তাঁর রচিত বাঙালির ইতিহাস গ্রন্থেও উল্লেখ করেছেন।
পাল রাজাদের গৌরবময় রাজত্বকালে তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিভিন্ন রাজারা অসংখ্য বৌদ্ধ মঠ, মন্দির ও স্তূপ (ঢিবি) নির্মাণ করেছিলেন। ধারণা করা হয়, রাজা ধর্মপাল ৫০টি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছিলেন। এগুলো আয়তনে বড় এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মগধের বিশালায়তনের বিক্রমশীলা মহাবিহার, বিক্রমপুরের বিক্রমপুরী বিহার, বরেন্দ্র অঞ্চলের সোমপুর মহাবিহার এবং জগদ্দল মহাবিহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জগদ্দল মহাবিহারের নির্মাণকাল আনুমানিক ১০৭৭-১১২০ সাল। তৎকালীন বিভিন্ন গ্রন্থের সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া যায়। পাল বংশের মদন পালের রাজত্বকালে সন্ধ্যাকরনন্দী রচিত রামচরিতম গ্রন্থে জগদ্দল বিহারের অবস্থান সুনির্দিষ্ট করা আছে। এ গ্রন্থে বলা হয়েছে, বরেন্দ্রীতে অবস্থান (বরেন্দ্র অঞ্চল) জগদ্দল বিহারের। বিহারের অবস্থান নিয়ে অনেকের অনেক ধারণা থাকলেও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক আ ক ম জাকারিয়া কিছুটা সুস্পষ্ট ধারণা দেন। তিনি পাঁচটি স্থানকে সম্ভাব্য এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে চারটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত, আরেকটির অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায়। এগুলো হলো: পঞ্চগড়ের জগদ্দল বিহার, ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার জগদ্দল বিহার, দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার জগদ্দল বিহার, নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার জগদ্দল এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার বামনগোলা থানার জগদ্দল বিহার। কেবল নওগাঁ জেলার জগদ্দল ছাড়া অন্য চারটি স্থান বিবেচনায় আনার মতো প্রাচীন যুগের তেমন কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। তাই ধামইরহাটের জগদ্দলের বিস্তৃত ঢিবিই বিখ্যাত জগদ্দল মহাবিহারের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
জগদ্দল গ্রামের এক বৃহৎ অংশজুড়ে রয়েছে বিক্ষিপ্ত প্রাচীন ঢিবি ও পরিত্যক্ত পুকুর। এ বিহারের ধ্বংসাবশেষের অন্যতম প্রমাণ পাওয়া যায় একজন পর্যটকের গ্রন্থে। ১৯৪০ বাংলা ভাষায় রচিত ‘বাংলায় ভ্রমণ’ শিরোনামে রেলওয়ে গাইড বুক গ্রন্থে তিনি এসব উল্লেখ করেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী গুরব স্তম্ভ থেকে প্রায় ৩ মাইল দূরে চিরি বাশ্রী নদীর কাছে প্রায় ১০০০ ফুট পরিধির বৃত্তাকার একটি স্তূপ (ঢিবি) রয়েছে। এখানে রয়েছে প্রায় ৬৮.৫৮ মি. পরিমাপের আরও একটি স্তূপ এবং এর কাছেই রয়েছে একটি বিশাল দিঘি। এখান থেকে একটি অষ্টকোণী প্রস্তরস্তম্ভও আবিষ্কৃত হয়েছে। এই অষ্টকোণী একশিলা স্তম্ভটি জগদ্দল গ্রাম থেকে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মঙ্গলবাড়িতে অবস্থিত। এটিই রাজা নারায়ণ পালের (৮৫৪-৯০৮ খ্রি.) মন্ত্রী ভট্ট গুরব মিশ্র স্থাপিত ইতিহাসখ্যাত গরুড় স্তম্ভ বা বাদল স্তম্ভলিপি। কাল পরিক্রমায় এ গ্রামের প্রাচীন ঢিবিগুলোর বেশির ভাগই বিধ্বস্ত এবং পুকুরগুলো ভরাট হয়ে গেছে তবে কিছু ঢিবি টিকে আছে এখনো বিচ্ছিন্নভাবে।
জগদ্দল গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে এবং জগৎনগর গ্রামের উত্তর সীমায় রয়েছে কয়েকটি ঢিবি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পূর্ব-পশ্চিমে ১০৫ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ৮৫ মিটার দীর্ঘ একটি মনোরম আয়তাকার ঢিবি। চারপাশের সমতল থেকে এর গড় উচ্চতা প্রায় ৫.৫ মিটার। ঢিবিটির মধ্যস্থলে রয়েছে একটি খাদ। এ প্রতœস্থলটির গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারের প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তর ১৯৯৬ সালে উল্লিখিত ঢিবিটিতে উৎখনন শুরু করে। উৎখননের ফলে এখানে একটি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ আংশিক উন্মোচিত হয়। এখন পর্যন্ত এ বিহারের দক্ষিণ দিকের পার্শ্ব-ইমারতের ৭টি এবং পশ্চিম পার্শ্ব-ইমারতের ৪টি কক্ষই কেবল আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর প্রতিটির পরিমাপ ৩.৫ ী ৩.৩ মি.। সন্ন্যাসীদের এ কক্ষগুলোর কয়েকটির ভেতরে ও বারান্দায় দেবমূর্তির পাথরের তৈরি বেদি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ১১টি নিভৃত কক্ষ ছাড়াও উৎখননে পূর্বদিকে একটি প্রবেশ-তোরণ এবং পশ্চিম দিকের পার্শ্ব-ইমারতে একটি ছোট সমাধিও আবিষ্কৃত হয়েছে। বিহারটির চারকোণে সম্ভবত চারটি অর্ধবৃত্তাকার পার্শ্ববুরুজ ছিল, যা প্রাচীনকালের মন্দিরগুলোতে সাধারণত দেখা যায় না।
এক মৌসুমের উৎখননে ওই ঢিবির একটি ক্ষুদ্র অংশই উন্মোচিত হয়েছে। এর বেশির ভাগ অংশই এখনো চাপা পড়ে রয়েছে মাটির নিচে। এখান থেকে ১৫০টিরও বেশি শিল্প নিদর্শন ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রস্তরমূর্তি, শিলালিপি, পোড়ামাটির ফলক ও পোড়ামাটির তৈরি মানুষের মাথা, অলংকৃত ইট, একটি স্বর্ণপিÐ, মাটির তৈরি বিভিন্ন রকম পাত্র, লোহার পেরেক, মসৃণ ও কর্তিত প্রস্তরখÐ, বেদিমূল ও জপমালার পুঁতি।
উত্তরের এই অঞ্চলের ৯১৭ বছরের প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের ব্যতিক্রমধর্মী কিছু সংযোজন রয়েছে রাজা রামপালের জগদ্দল বৌদ্ধ বিহারে। এ বিহার থেকে উদ্ধারকৃত মূল্যবান প্রতœ সম্পদ পাহাড়পুর জাদুঘরে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা রয়েছে। পরিপূর্ণ খননকাজ শেষে ধামইরহাটবাসীর সোনালি অতীত বিশ্বদরবারে উন্মোচিত হবে। ইউনেসকো ও ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের সম্ভাব্য তালিকায় ইতিমধ্যে জায়গা করে নিয়েছে জগদ্দল মহাবিহার। ২০১৩ সালে বিহারের খননে জগদ্দল বিহারের পশ্চিম বাহুর একটি ভিক্ষু কক্ষ খনন করতে গিয়ে একটি কুলঙ্গিতে পাওয়া গেছে ১৪টি ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা জগদ্দল বিহারই লোটাস বিহার (পদ্ম মহাবিহার)। ২০১৪ সালে বিহারের উত্তর বাহু খননে পাওয়া গেছে পোড়ামাটির টেরাকোটা, যা বিহারের দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে লাগানো রয়েছে। এ বিহার উৎখননে এ পর্যন্ত ৩৩টি ভিক্ষু কক্ষ আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রতিটি কক্ষেই বুদ্ধমূর্তি রাখার জন্য পৃথক পৃথক ব্যবস্থা ছিল। পূর্বমুখী প্রধান প্রবেশদ্বার এবং ৮ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৮ মিটার প্রস্থের হলঘর, যেখানে আগতরা অপেক্ষা করত বিহারে প্রবেশের অনুমতির জন্য। এ হল ঘরে পাওয়া গেছে চারটি গ্রানাইট পাথরের পিলার, যা ইতিপূর্বে বাংলাদেশের কোনো বৌদ্ধ বিহারে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বিহারের ছাদের ভগ্নাংশ, যার পুরুত্ব ৬০ সেমি.। নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, কুমিল্লার শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, দিনাজপুরের সীতাকোট বিহারসহ দেশের কোনো বিহারে ছাদের ভগ্নাংশ পাওয়া যায়নি। এর ফলে প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের ছাদের স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে, যা প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও স্থপতিদের গবেষণার দ্বার উন্মোচন করবে। এ বিহারে ব্যবহৃত ইটগুলো পাথর দিয়ে ঘষে মসৃণ করা হয়েছে। বিহারের বাইরের দেয়াল চুন-বালির মিশ্রণে সাদা রঙের লতা-পাতা, ফুল ও জীবজন্তুর অলংকারখচিত।
জগদ্দল বিহার থেকে উদ্ধারকৃত তিনটি অপূর্ণাঙ্গ প্রস্তরমূর্তির একটি কালো পাথরের বিষ্ণুমূর্তি (৯ ী ৭ ী ২ সে.মি.) বিহারের দক্ষিণ দিকের পার্শ্ব-ইমারত খুঁড়ে পাওয়া গেছে। মূর্তিটির বেদি ও ল²ীমূর্তিটির অংশটুকু পাওয়া যায়নি। নির্মাণরীতি অনুযায়ী মূর্তিটি দশ ও এগারো শতকে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় মূর্তিটি ‘উপাসকদের রক্ষাকর্তা’ বৌদ্ধ দেবতা হেরুকের। শক্তির সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ হেরুকের এ মূর্তি (৯০ ী ৮ ী ৪ সে.মি.) চুনাপাথরে খোদাই করে তৈরি করা। পাহাড়পুর বিহারে পাওয়া অপর একটি মূর্তির সঙ্গে এর সাদৃশ্য রয়েছে এবং এই মূর্তিটিও ল²ীমূর্তির সমসাময়িক।
তৃতীয় অপর মূর্তিটি পরিচয়হীন এক দেবতার মস্তকবিহীন বড় আকারের প্রস্তরমূর্তি। মূর্তিটির (১.৩৩ ী ০.৫০ ী ০.৩৬ সেমি) দুটি হাতই ভাঙা এবং দ্বিপত্রযুক্ত পদ্মাসনে আসীন। মূর্তিটির রয়েছে ধুতি, বাম বাহুতে বাজুবন্ধ, কোমরে বিছা, গলায় কণ্ঠহার এবং গায়ে রয়েছে বাম কাঁধ থেকে ডান দিকে ঝুলন্ত পৈতা। বিহারের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় উদ্ধারকৃত পোড়ামাটির তৈরি মস্তকটি ছাড়াও বিহারের বিভিন্ন অংশ থেকে পাওয়া গেছে মানুষ ও জীবজন্তুর মূর্তিসংবলিত কয়েকটি পোড়ামাটির ফলক।
জগদ্দল বিহার ছিল প্রাচীন বাংলার বিদ্যা অর্জনের অন্যতম পীঠস্থান। দেশ-বিদেশের পন্ডিতগণ এ বিহারে গবেষণা করতেন। এ বিহারের দুজন স্বনামধন্য পন্ডিত হলেন দানশীল ও বিভূতিচন্দ্র। কাশ্মীরের প্রসিদ্ধ সাধু ও পন্ডিত সাক্য শ্রীভদ্র ১২০০ খ্রিষ্টাব্দে বিভিন্ন বিহার দর্শনের ধারাবাহিকতায় জগদ্দল বিহার ভ্রমণ করেছিলেন। প্রাচীন বাংলার জ্ঞানসাধন এই কেন্দ্রটি আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২২তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০২০