যাঁরা সিনেমাপ্রেমী, তাঁদের হয়তো মনে আছে ‘স্টার ট্রেক ফোর’; সিনেমাটির কথা। যদি কেউ দেখে না থাকেন, তবে তাঁরা পরের কয়েকটি লাইনেই কিছুটা ধারণা পাবেন। এই সিনেমায় দেখানো হয় বেশ কয়েকজন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ কিছু তিমি মাছকে উদ্ধারে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে অতীতে চলে যান। তিমি মাছ উদ্ধার করে যখন তাঁরা ভবিষ্যতে অর্থাৎ তেইশ শতকে ফিরতে চান, তখন দেখা দেয় ভয়াবহ সব সমস্যা। উদ্ধারকৃত তিমিটিকে বহনের জন্য প্রয়োজন হয় বিশাল এক পানির ট্যাংক জাহাজে স্থাপনের। কিন্তু তাঁদের কাছে এমন কিছু ছিল না যা দিয়ে এ রকম একটা ট্যাংক কিনতে পারে। কারণ, ফিরে যাওয়া এই সময়ের মানুষ শুধু তাঁদের উন্নয়নেই কাজ করবে। তাই তাঁদের টাকার কোনো প্রয়োজনই হবে না। কিন্তু একজন ফিরিঙ্গিকে এখানে দেখানো হয়, যিনি কি না সব সময় টাকার কাছে পরাস্ত। সৌভাগ্যক্রমে তাঁরা এমনই একজন ইঞ্জিনিয়ারকে পান, যিনি তেইশ শতকের নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করে বিশাল আকারের তিমিকে বহন করতে পারে এ রকম একটা ট্যাংক বানিয়ে দেবেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তেইশ শতকের সেই নির্মাণ উপকরণটি কী হবে? সিনেমায় এর উত্তর হচ্ছে, ‘স্বচ্ছ অ্যালুমিনিয়াম’!
বাস্তবে অ্যালুমিনিয়াম আসলেই স্বচ্ছ হতে পারে কি? নাকি এটা স্টার ট্রেক ফোর সিনেমার কল্পকাহিনির মতোই কেবলই কল্পনা? আপাত দৃষ্টিতে প্রশ্নটা উদ্ভট মনে হতে পারে। কিন্তু উত্তরটা নির্ভার। বিংশ শতাব্দীতেই অ্যালুমিনিয়াম হতে পারে স্বচ্ছ। বিষয়টা নির্ভর করে, আমরা আসলে অ্যালুমিনিয়ামকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চাই; এর ওপর। অথবা আরও নির্দিষ্ট করে বললে অ্যালুমিনিয়াম তৈরির জন্য কী ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করা হবে এর ওপরও এটি নির্ভরশীল।
দৈনন্দিন জীবনে আমরা সাধারণত ধাতু হিসেবে যে অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করে থাকি, তা বিদ্যুৎ-তাপ সুপরিবাহী, নমনীয়, চকচকে, দীর্ঘ ব্যবহারে এটি ক্ষয়প্রাপ্ত। আমরা এটাকে উচ্চ তাপে গলাতে পারি। গলিয়ে আমাদের রান্নাঘরের বিভিন্ন তৈজসপত্র থেকে শুরু করে গৃহস্থালির আরও অনেক নিত্যব্যবহার্য জিনিস তৈরি করতে পারি। এই ধাতুটি দিয়ে যেমন স্যান্ডউইচ মোড়ানোর ফয়েল তৈরি করতে পারি, তেমনি বিভিন্ন ধরনের পানীয়ের ক্যানও তৈরি করা যায়। আর নির্মাণশিল্পে নির্মাণ উপকরণ হিসেবে এটা অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত। স্টার ট্রেক ফোর সিনেমায় এই অ্যালুমিনিয়াকেই ‘স্বচ্ছ’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে আপনি যদি মনে করেন স্বচ্ছ অ্যালুমিনিয়ামে এসব গুণাগুণের সবই উপস্থিত, তবে আপনাকে কিছুটা হলেও হতাশ হতে হবে। কেননা আজ আমরা যেটাকে স্বচ্ছ অ্যালুমিনিয়াম বলছি, তা আসলে কোনো ধাতু নয়, বরং পলিক্রিস্টালাইন সিরামিকধর্মী একধরনের স্বচ্ছ আলোক পরিবাহী পদার্থ। আর একটু পরিষ্কার করে বললে বলা যায়, নির্দিষ্ট পরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেনের সংমিশ্রণে প্রস্তুত একধরনের যৌগিক পদার্থ। রসায়নবিদেরা এর নাম দিয়েছেন অ্যালুমিনিয়াম অক্সিনাইট্রাইড (Aluminium Oxynitride ) বা A1ON। এর কেমিক্যাল ফর্মুলা হচ্ছে MgA12O4। ১৯৮১ সাল নাগাদ এটি আবিষ্কৃৃত হয়। কাকতালীয়ভাবে এ সময়ই ধারণকাজ চলছিল স্টার ট্রেক ফোর সিনেমাটির।
স্বচ্ছ অ্যালুমিনিয়াম নির্মাণশিল্পে বা দৈনন্দিন জীবনে কতটা অবদান রাখবে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে বলতে হয়, অস্বচ্ছ বা প্রচলিত অ্যালুমিনিয়াম ছাড়া আমাদের বর্তমান সভ্যতা কতটুকু সচল? আগেই বলেছি, রান্নাঘর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং সর্বত্রই এর ব্যবহার। আর এটি যখন আলোক পরিবাহী তখন এর ব্যবহারের ক্ষেত্র আরও বেশি হবে, এটাই স্ব^াভাবিক। এর ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ করলে সহজেই বোঝা যায়, এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ পদার্থ। প্রথমত, এটির মধ্য দিয়ে আলট্রাভায়োলেট রশ্মি, ইনফ্রারেড রশ্মি এবং আমরা যে তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে আলো দেখতে পাই, তা ৮৫ শতাংশের বেশি পরিবাহী। এই পদার্থ কাচের চেয়ে শক্ত, সাপায়ারের (Sapphire) চেয়ে ৮৫ শতাংশ এবং ম্যাগনেসিয়াম অ্যালুমিনেটের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি দৃঢ়। এটা ১২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ২১৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা পর্যন্ত তার স্বাভাবিক আকৃতি ধরে রাখতে সক্ষম। স্বচ্ছ অ্যালুমিনিয়ামে মরিচা ধরে না। এটি রেডিয়েশন ও অক্সিডেশন প্রতিরোধী। একই পরিমাণ পুরুত্বের ইস্পাত যে ভার বহন করতে পারে তার চেয়ে তিন গুণ ভার বহনে সক্ষম এই পদার্থ। এর অন্যান্য ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে:
| Properties | Values |
| Compressive strength | 2.68 GPa |
| Flexural strength | 0.38-7GPa |
| Fracture toughness | 2MPa.m1/2 |
| Knoop hardness | 1800 kg/mm2 |
| Poisson ratio | 0.24 |
| Shear modulus | 135 GPa |
| Young modulus | 334 GPa |
স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার জন্য উন্নতমানের যেসব কাচ সচরাচর ব্যবহার করা হয়, এর চেয়ে এটি অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। দীর্ঘ সময় আলট্রাভায়োলেট রশ্মির প্রভাব, বালু প্রবাহ বা শক্ত কোনো কিছুর আঘাত কাচের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা খুব সহজেই বিঘ্নিত করতে সক্ষম। কিন্তু স্বচ্ছ অ্যালুমিনিয়াম এ ধরনের সমস্যা খুব সহজেই প্রতিহত করতে পারে। প্রথমত, এর রক-প্রুফ ক্যাপাসিটি; দ্বিতীয়ত, স্ক্র্যাচ-প্রুফ ক্যাপাসিটি সাধারণ কাচের চেয়ে অনেক বেশি। একই পুরুত্বের কাচ ও স্বচ্ছ অ্যালুমিনিয়ামের মধ্যে স্বচ্ছ অ্যালুমিনিয়াম কাচের চেয়ে চার গুণ বেশি আঘাত সহ্য করতে পারে। অন্যদিকে বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকা ছোট ছোট বালুকণা কাচের ওপর সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম দাগ বা আঁচড় ফেলে। ফলে সময়ের ব্যবধানে তা ধীরে ধীরে ঘোলা হতে থাকে। কিন্তু অ্যালুমিনিয়াম অক্সিনাইট্রাইডের দাগ বা আঁচড় সহ্য করার ক্ষমতা অর্থাৎ স্ক্র্যাচ-প্রুফিং ক্যাপাসিটি অনেক বেশি। তা ছাড়া লোনা পানি বা সমুদ্রে, ক্রায়োজেনিক টেম্পারেচার, ফ্লুরিন প্লাজমা বা চরমভাবাপন্ন তাপমাত্রায় এটি কাচের চেয়ে বহু গুণে কার্যকর।
এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব জায়গায় যান্ত্রিক চাপ যেমন, ভাইব্রেশন, মেকানিক্যাল সক, জি-লোডিং বা দ্রুত পরিবর্তনশীল চাপ এবং বিরূপ পরিবেশ যেমন, প্রচণ্ড রোদ, আর্দ্রতা, বা দ্রুত পরিবর্তনশীল তাপমাত্রায় সমগোত্রীয় অন্যান্য যেকোনো উপাদানের চেয়ে এটি অনেক বেশি সহনশীল। ব্যালাস্টিক বা আগ্নেয়াস্ত্রের মুখেও এর টিকে থাকার ক্ষমতা অসাধারণ। স্কটল্যান্ডের এবারডিনে অবস্থিত আর্মি রিসার্চ ল্যাবের এক পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, অ্যালুমিনিয়াম অক্সিনাইট্রাইড বা A1ON স্পাইনেল আর্মার-এর চেয়ে ১০ শতাংশ, সাপফায়ার আর্মার-এর চেয়ে ২০ শতাংশ এবং বুলেট-প্রুফ কাচের তৈরি সাধারণ যেসব আর্মার মিলিটারিরা ব্যবহার করে, এর চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
এত গুণে গুণান্বিত না-ধাতু না-কাচ সিরামিক গোত্রভুক্ত এই পদার্থটি আমাদের কী কাজেই বা লাগতে পারে? উত্তরে আপাতত বলা যেতে পারে, এটি কাচের বিকল্প। যদিও কাচের বিকল্প হিসেবে এর অবস্থানটা এখনো বিভিন্ন কারণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি, এরপরও বলা যায়, ALON হচ্ছে এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত সবচেয়ে শক্ত স্বচ্ছ সিরামিক গোত্রীয় পদার্থ। এটি দিয়ে থালা, বাটি, গ্লাসসহ বিভিন্ন ধরনের নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র; বিভিন্ন স্থাপনার জানালা, গম্বুজ বিশেষত যেসব স্থাপনায় অতিরিক্ত নিরাপত্তার প্রয়োজন, বিভিন্ন ধরনের টিউব, রডসহ অনেক কিছু। তদুপরি সিরামিক পাউডার হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার লক্ষণীয়। এ ছাড়া এর অপটিক্যাল ও মেকানিক্যাল বৈশিষ্ট্য এবং তুলনামুলকভাবে হালকা ওজন হওয়ার কারণে নিরাপত্তার কাজে ব্যবহৃত বুলেট-প্রুফ ও বিস্ফোরকরোধী আর্মার বা জানালা তৈরির কাজে লাগতে পারে। এ ছাড়া অপ্টোইলেকট্রনিকসের মতো বিষয়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন টেকনোলজি তথা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
প্রস্তুতকারীরা এখন পর্যন্ত জানালায় ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ১৮ ইঞ্চি বাই ৩৫ ইঞ্চি বা ৪৬০ মিলিমিটার বাই ৮৯০ মিলিমিটার আকারের ALON বা স্বচ্ছ অ্যালুমিনিয়াম বাজারে ছেড়েছে। তবে এর দাম লেমিনেটেড বা বুলেট-প্রুফ কাচের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। তবে দাম যাই হোক, প্রয়োজন হলে মানুষ তা ব্যবহার করবেই। যখন গরিলা গ্লাসের জায়গায় স্মার্ট ফোনের স্ক্রিনে অথবা নতুন নতুন স্থাপনায় ব্যাপকভাবে এই অ্যালুমিনিয়াম অক্সিনাইট্রাইড ব্যবহার শুরু হবে, তখন অবশ্যই এর উৎপাদন বাড়াতে হবে। আর উৎপাদন বাড়লে তো দাম কমবেই!
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৫তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৯।