সফটওয়্যারে আধুনিক অফিস ব্যবস্থাপনা

ড্রোন, রোবটসহ অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, উন্নত কম্পিউটারাইজড মেশিনসহ বিআইএম (BIM- Building Information MOdeling)-এর মতো ডিজাইন বা মডেলিং সফটওয়্যার ব্যবহার, প্রি ফ্যাব্রিকেটেড বিল্ডিং, থ্রি-ডি প্রিন্টেড বিল্ডিংয়ে সবকিছু দেখলে কোনোভাবেই মনে হয় না যে নির্মাণশিল্প উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণ বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। এই এগিয়ে চলা প্রযুক্তির সঙ্গে অফিস ব্যবস্থাপনা কতটা উন্নত হলো তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ, ভবন যতই নান্দনিক, পরিবেশবান্ধব, এনার্জি ও ব্যয়সাশ্রয়ী হোক না কেন, ব্যবস্থাপনা আধুনিক না হলে টেকসই উন্নয়ন ব্যাহত হয়। 

যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অফিস ও সাইট এ দুইয়ের মধ্যে বেশ বড় একটা দূরত্ব থাকে, তাই অন্যান্য বাণিজ্যিক অফিসের মতো ব্যবস্থাপনা হবে না এটাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া নির্মাণশিল্পে যত পদের লোকজন বা স্টেকহোল্ডার জড়িত, তাতে গৎবাঁধা কোনো ব্যবস্থাপনা কতটুকু কার্যকর হবে তা ভাবার বিষয়। তবে আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে ক্লাউড কম্পিউটিং অন্যান্য অফিসে যেভাবে ব্যবহার করছে, নির্মাণশিল্পের অফিসগুলোও সেভাবে ব্যবহার করতে পারে। অবশ্য ইতিমধ্যে অনেক অফিসই ক্লাউড বেজড ইআরপি (ERP- Enterprise Resource Planning) সফটওয়্যারের সার্থক ব্যবহার শুরু করেছে। অনেক শীর্ষস্থানীয় নির্মাণ কোম্পানি এ ধরনের আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করছে, তাদের অফিস পরিচালনার কাজে। উন্নত ডেটা শেয়ারিং ব্যবস্থা আর রিয়াল টাইম ওয়ার্ক-ফ্লো তাদের কাজের গতি দক্ষতা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।

ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ফলে এক অফিসের সঙ্গে আরেক অফিসের বা এক টিমের সঙ্গে আরেক টিমের যোগাযোগ ও সহযোগিতা আগের চেয়ে আরও বেশি দ্রুত তার সঙ্গে করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানের উন্নত ক্লাউড বেজড ইআরপি সফটওয়্যারগুলো এমনভাবে তৈরি যে একটি ডেটা বা তথ্য এক জায়গায় এন্ট্রি করলে প্রয়োজন অনুযায়ী তা অন্যান্য জায়গাতেও প্রদর্শিত হবে। শুধু তা-ই নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তাঁর ইউজার ড্যাশ বোর্ডে বা ই-মেইলে অথবা মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে সঙ্গে সঙ্গে অবহিত করবে যেন সে দ্রুত তম সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা কার্যকর করতে পারে। এর ফলে দেখা যায়, একটি কাজের সিদ্ধান্ত নিতেই যেখানে বেশ কয়েকটা দিন পার হয়ে যেত, এখন ওই কাজটি কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ করা যাচ্ছে। 

বড় বড় নির্মাণকাজে অনেক সময়ই কারও একক সিদ্ধান্তে একটি কাজ সম্পন্ন করা যায় না। আবার এমনও হয় যে যিনি সিদ্ধান্ত দেবেন, তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত নেই; এ রকম অবস্থায় আধুনিক অফিস ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারগুলো কোনো প্রজেক্টের একটি রিয়েল টাইম ইন্টেগ্রেটেড ওভার ভিউ দিতে পারে যেন একটা সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি সময় ব্যয় করতে না হয়। এসব বিষয় যেমন অফিস বা সাইটের কাজে দ্রুত তা আনে, তেমনি উৎপাদনশীলতাও বাড়ায়। অন্যদিকে অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমিয়ে কোম্পানিকে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় অনেকটাই।

একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের অটোমেটেড ওয়ার্ক-ফ্লো ও এর উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে একটি কনস্ট্রাকশন ইআরপি সফটওয়্যার সল্যুশনের ওপর। যেখানে পুরোনো ব্যবস্থাপনার একটি অফিসে বিভিন্ন নথি বা ডকুমেন্ট-সংক্রান্ত কাজ যেমন, কোনো ক্রয় আদেশ, মালামাল পরিবর্তন, বিল তৈরি কিংবা অন্যান্য অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ এসব কাজের জন্য যথেষ্ট সময় ও শ্রমের প্রয়োজন হয়। কিন্তু যখন একটা সফটওয়্যারের মাধ্যমে সম্পাদন করা হয় তখন তার জন্য হয়তো মাত্র কয়েক মিনিট সময় প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা পরবর্তী ব্যক্তির কাছে চলে যায়, ফলে কোনো ব্যক্তির কাছে বা টেবিলে কোনো কাজ আটকে থাকলে তা সহজেই মনিটর করা যায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সহযোগিতা বা নির্দেশনা প্রদান করা সম্ভব হয়। স্বয়ংক্রিয়ভাবে অগ্রসর হওয়ার কারণে কর্তাব্যক্তি বা ব্যবস্থাপক যেকোনো সময় দেখতে পারেন কোথায় বা কার কাছে গিয়ে কাজটি থেমে আছে। এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, একই কাজ একাধিকবার করার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। তা ছাড়া যখন যে ধরনের তথ্য-প্রমাণ বা নথি প্রয়োজন হয় তা প্রস্তুত হওয়া সাপেক্ষে যেকোনো সময় যেকোনো জায়গা থেকে দেখা সম্ভব। ফলে অনেক ভুলভ্রান্তি এড়িয়ে চলা সম্ভব হয়।

কোনো নির্মাতা সংস্থার অন্যতম সমস্যা হচ্ছে দক্ষ কর্মী ধরে রাখা। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানব সম্পদ বিভাগ তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, সাক্ষাৎকার শেষে নিয়োগ দেওয়া বেশ সময়ের ব্যাপার। যেখানে অনেক সময় শূন্যস্থান পূরণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে দু-এক দিনের মধ্যেই, সেখানে এত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সময় দেওয়া মানে কাজে পিছিয়ে পড়া। এ রকম পরিস্থিতিতে এইচ আর ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন খুব ভালো একটা সমাধান হতে পারে। এ ধরনের অ্যাপ্লিকেশন সাধারণত ইআরপি সফটওয়্যারের সঙ্গেই সংযুক্ত। যে কারনে আগে থেকেই সম্ভাব্য কর্মীদের একটা লিস্ট তৈরি করে রাখা বা নতুন কর্মীদের অগ্রীম আবেদন সংগ্রহ করার ব্যবস্থাসংবলিত এ ধরনের অ্যাপ্লিকেশন প্রতিষ্ঠানের অনেক সময় বাঁচিয়ে দেয়। যখন কোনো নতুন কর্মী নিয়োগ করা হয় তখন তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সফটওয়্যারই নির্দেশনা দিতে পারে। তাঁদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া, ইলেকট্রনিক ডকুমেন্ট ডেলিভারি, ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর যাচাইকরণÑ এসব কাজের জন্য সফটওয়্যার নির্ভরশীলতা সময় ও শ্রম উভয়ই বাঁচিয়ে দেয়। 

মানব সম্পদ বিভাগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ কর্মীদের মূল্যায়ন। পুরো অফিসটি একটি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা সুপারভাইজাররা খুব সহজেই তাঁদের টিম মেম্বারদের কর্মদক্ষতা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। একটি কাজের নোটিফিকেশন কখন কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর ড্যাশবোর্ডে গেছে এবং তিনি সেটা সম্পন্ন করতে কতটুকু সময় নিয়েছেন, তিনি সেটা যৌক্তিক সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত সময় নিয়েছেন কি না অথবা সম্ভাব্য সময়ের আগেই শেষ করে ফেলেছেন কি না এসব বিষয় যদি সফটওয়্যার বিশ্লেষণ করে দেয় তাহলে কর্মীদের মূল্যায়ন যেমন দ্রুত তার সঙ্গে করা সম্ভব, একই সঙ্গে অবমূল্যায়ন বা অতিমূল্যায়নের সম্ভাবনা থাকে না। এতে কর্তৃপক্ষের বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মীদের সুসম্পর্ক বজায় থাকে, যেটা একটা প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 

কর্মীদের সময় নিয়ন্ত্রণ, পেশাদারি উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ বা সার্টিফিকেশনের ব্যবস্থা ও সার্টিফিকেশন ট্র্যাকিংও এ ধরনের সফটওয়্যার করতে সক্ষম। অনেক সময় কনস্ট্রাকশন কাজে কিছু নির্দিষ্ট পদের লোকদের বিভিন্ন সাইটে একই সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয় বা দেখভাল করার প্রয়োজন হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাদের সুপারভাইজার বা কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান ও কাজের অগ্রগতির ওপর নজর রাখতে পারে এবং প্রয়োজনে দ্রুত তম সময়ে তাদের পরামর্শ দিয়ে অথবা লোকবল দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে।

আমাদের দেশের অধিকাংশ অফিসেই এখন আর আগের মতো বেতন নেওয়ার জন্য লাইন দিতে হয় না। মাসের নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যেই যাঁর যাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতনের টাকা জমা হয়ে যায়। তবে বছরান্তে বেতন বৃদ্ধির জন্য একটা জটিলতার সৃষ্টি হয়। অনেক সময় কর্মীদের মনে হয়, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হলো না বা তাঁরা তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রোষের শিকার। কিন্তু যখন সফটওয়্যার তাঁদের কাজের মূল্যায়ন করে তখন কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা সম্পূর্ণরূপে এড়ানো সম্ভব। তা ছাড়া একজন কর্মী তাঁর কর্মদক্ষতার মূল্যায়নের বিষয়ে সব সময় সফটওয়্যার থেকে পরিস্কার ধারণা পেতে পারেন।

আগেই বলা হয়েছে যে এ ধরনের অটোমেটেড ওয়ার্ক-ফ্লো শুধু আফিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং একই সঙ্গে অফিস এবং প্রজেক্ট সাইট পরস্পর যুক্ত থাকতে পারে। প্রজেক্ট সাইটের কাজ মনিটর করার জন্য এটা হতে পারে কার্যকর এক ব্যবস্থা। প্রজেক্ট সাইটের মেশিনারিজ, যানবাহন, মালামাল পরিবহনসংক্রান্ত তথ্য, কাঁচামাল  স্টকসহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও উপাত্ত আলাদাভাবে অফিসে পাঠানোর প্রয়োজন হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যখন কোনো মেশিন বা গাড়ি প্রজেক্ট সাইটে ঢুকছে বা বের হচ্ছে, তখন দায়িত্বরত ব্যক্তি তা নথিভুক্ত করেন। এই নথিভুক্তির কাজটি কাগজ-কলমে না করে সরাসরি সফটওয়্যারে করে ফেললে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাও তাঁদের ড্যাশবোর্ডে দেখতে পাবেন। ঠিক একইভাবে স্টোর ইনফরমেশনসহ প্রজেক্ট সাইটের অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যেমন, মালামাল, ইনভেনটরি, মোবাইল মেশিনারিজ, কাজের অগ্রগতি, প্রকল্প ব্যয় ইত্যাদিসহ সবকিছু একই সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হলে যেমন একটি প্রকল্প সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাই অবহিত থাকবেন এবং কম সময়ে, কম খরচে সুষ্ঠুুভাবে কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব। এ ধরনের সফটওয়্যার ক্লাউড বা ওয়েব বেইজ হওয়ার কারণে ক্লায়েন্ট বা গ্রাহকও যথাযথভাবে তাঁদের প্রজেক্ট সম্পর্কে যেকোনো সময় সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০২তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৮

আবু সুফিয়ান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top