মোগল আমলে এ দেশে গড়ে ওঠে বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। এর মধ্যে মসজিদের সংখ্যাই বেশি। এমনই একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হোসেনি দালান বা ইমামবাড়া। এটি একটি শিয়া উপাসনালয়। পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকার হোসেনি দালান সড়কেই এই স্থাপনাটির অবস্থান। স্থানীয়ভাবে এটি হুসনি দালান নামেও পরিচিত। মজজিদের গায়ে শিলালিপিতে ফারসি ভাষায় লিখিত পঙ্ক্তি অনুসারে উচ্চারিত হয় হোসায়নি দালান। আসলে এটি একটি স্মৃতিস্তম্ভ। কারবালা প্রান্তরের শোকাবহ ঘটনার স্মরণে; হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর শাহাদাতের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতেই স্থাপনাটি নির্মিত হয়। এই দালানটিই উপমহাদেশের প্রাচীনতম ইমামবাড়া বলে স্বীকৃত।
ঐতিহ্যবাহী এ স্থাপনাটি প্রায় সাড়ে ৩০০ বছরের পুরোনো। মোগল শাসনামলে অর্থাৎ ১৭শ শতকে সম্রাট শাহজাহানের আমলে এটি নির্মিত হয়। স্থাপনাটির সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। তবে স্থাপনাটির নির্মাণশৈলী প্রমাণ দেয়, এটা মোগল আমলেরই নির্মাণকীর্তি। এ ছাড়া দেয়ালের শিলালিপি থেকে পাওয়া তথ্য বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পরীক্ষার পর এটি সুবেদার শাহ সুজার সুবেদারি আমলে তৈরি বলে প্রমাণিত হয়। শাহ সুজার এক নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ হিজরি ১০৫২ সালে (১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দ) এটি নির্মাণ করেন। কথিত আছে, কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মরণে এবং হজরত ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখার ব্যাপারে তিনি স্বপ্নদ্রষ্টা হন। তারপরই এটি নির্মাণ করেন। প্রমাণও মেলে। কারণ, তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ শিয়া মুসলমান। প্রথমে তিনি তাজিয়া কোনা অর্থাৎ ছোট আকারের একটি ইমামবাড়া নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে তা আরও বর্ধিত হলে বর্তমান হোসেনি দালানের রূপ লাভ করে। উন্নয়নের এ কাজটি করেন সম্রাটের নায়েব-নাজিমরা। ইতিহাসবিদ জেমস টেলরের মতে, ১৮৩২ সালেও আদি ইমামবাড়া টিকে ছিল। পরবর্তী সময়ে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে দুই দফায় স্থাপনাটির সংস্কার হয়। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভবনটি প্রায় বিধ্বস্ত হয়। পরে খাজা আহসানউল্লাহ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে তা পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করেন। ১৯৯৫ সালেও একবার সংস্কার হয়। তবে সর্বশেষ ২০১১ সালে দালানের সংস্কারসাধন ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়। তখন দালানসংলগ্ন পুকুরটিও সংস্কার করা হয়।
হোসেনি দালানটি নির্মিত হয় প্রায় ছয় বিঘা জমির ওপর। এখানে রয়েছে মনোরম একটি দ্বিতল ভবন। উত্তরে প্রশস্ত চত্বর, দক্ষিণে বর্গাকৃতির পুকুর। পশ্চিমে রয়েছে তাজিয়া ঘর, সামনে দেউড়ি ও দ্বিতল নহবতখানা ইত্যাদি। আরও আছে হুক্কাখানা, নিশিত খাঁ আর বালাখানা। ভবনের চারদিকে ঘেরা দেয়াল। আছে সুন্দর দুটি মিনার। প্রতিটি প্রবেশপথই মেহরাবের মতো করে নির্মিত। পুরো হোসেনি দালানটি সাদা রঙের এক নান্দনিক ভবন। আধুনিক সংস্কারের ফলে সাদা রঙের পাশাপাশি নীল রঙের টাইলস ও ক্যালিগ্রাফির সৌন্দর্য মিশে হয়েছে একাকার। দেয়ালে বিভিন্ন লিপিচিত্রের কারুকাজও লক্ষণীয়। মূল ভবনের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে মাতম ঘর, যেখানে মহররমের সময় মাতম করা হয়। পাশেই রয়েছে জরিঘর। দ্বিতীয় তলার প্রতিটি অংশই অত্যন্ত কারুকার্জখচিত, যা সবারই নজর কাড়ে। এর সিলিং করা হয়েছে সবুজ বাঁশ দিয়ে। পায়ের নিচে লাল গালিচা প্রতিটি ঘরের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। দালানের দক্ষিণাংশে রয়েছে একটি বর্গাকৃতির পুকুর। এর উত্তরাংশে শিয়া বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের কবরস্থান। মহররম মাসে এখানে বিভিন্ন দেয়ালের তাকের ওপর প্রদীপ জ্বালানো হয়। এতে দালানের ধর্মীয় মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং দেখতে লাগে খুবই সুন্দর।
ইরান সরকারের উদ্যোগে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ২০১১ সালে দালানের সংস্কার করা হয়। স্থাপনার অভ্যন্তরে ও বাইরে সাজসজ্জায় আনা হয় ব্যাপক পরিবর্তন। ইরানের স্থপতিবিদ ও শিল্পীরা এতে অংশ নেন। ফলে ইরানের ধর্মীয় স্থাপনার বাহ্যিক রূপ ও নান্দনিকতা এ সংস্কারকাজে প্রতিফলিত হয়েছে, যা ফুটে উঠেছে এই দালানটিতে। সংস্কারের আগে ভেতরে রং-বেরঙের নকশা করা কাচের যে সৌন্দর্য ছিল, তা পরিবর্তন করে বিভিন্ন আয়াত ও মুদ্রা লিখিত নীল রঙের টাইলস লাগানো হয়েছে। একইভাবে এর পূর্বদিকের ফটকে এবং উত্তর দিকের চৌকোনা থামগুলোয় আয়াত ও সূরা লিখিত নীল রঙের টাইলস লাগানো হয়েছে। টাইলসগুলোও আনা হয় ইরান থেকে। এ ছাড়া দেশটির ধর্মীয় শিল্পকলা ক্যালিগ্রাফি, যা ইরানের কতিপয় ধর্মীয় স্থাপনায় এ ধরনের কারুকাজ দেখা যায়। ফলে পরিবর্তন এসেছে ঐতিহাসিক হোসেনি দালানের আদি চেহারায়। স্থাপনাটিতে মিশেছে ইরানি বা পারস্য সংস্কৃতি। স্থাপনাটির এই পরিবর্তন অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। তাঁদের মতে, এটা পুরোনো বা আদি ঐতিহ্যে কুঠারাঘাত। হেরিটেজ রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ কেউ মনে করেন, স্থাপনাটির সংস্কার প্রয়োজন থাকলেও তার আদি রূপ পরিবর্তন করা ঠিক হয়নি, বরং অতীত সৌন্দর্য বজায় রেখেই এর সংস্কার করা উচিত ছিল। তবে সংস্কারের ফলে কিছুটা পরিবর্তন হলেও হোসেনি দালান হয়ে উঠেছে অতীতের তুলনায় আরও ঝলমলে ও দৃষ্টিনন্দন।
প্রতিবছর মহররম মাসে হোসেনি দালানকে সাজানো হয় অপরূপ সাজে। মাসের শুরুতেই স্থাপনাটির গুরুত্ব বেড়ে যায় কয়েক গুণ। আসা-যাওয়া শুরু হয় প্রচুর বিভিন্ন ধর্মের মানুষের। বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। ১০ মহররম বর্ণাঢ্য তাজিয়া মিছিল বের হয় এই হোসেনি দালান থেকে। চারদিকে তখন চলে শোকের মাতম। ঐতিহাসিক এই দালান ঘিরে হাজারো শোকার্ত নর-নারী বিলাপ করে সুর করে বলে চলে হায় হোসেন! হায় হোসেন!
হোসেনি দালানে রয়েছে কোরআনভিত্তিক গবেষণা ও প্রচারকেন্দ্র দারুল কোরআন ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া এখানে মাদ্রাসা-ই-আব্বাসিয়া নামে একটি মাদ্রাসাও রয়েছে। আছে ধর্মীয় বই বিক্রয়কেন্দ্র। শিয়া সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট কিছু কবরস্থানের মধ্যে ইমামবাড়া হোসেনি দালান কবরস্থান অন্যতম। সবাই এখানে আসেন কবর জিয়ারত করতে। বর্তমানেও এখানে নতুনভাবে কবর দেওয়া হয়। অবশ্য সেটা ইমামবাড়া শিয়া আঞ্জুমানে হোসাইনিদের জন্য। ঐতিহ্যবাহী এ স্থাপনাটি সবার জন্য উন্মুক্ত। দালানে প্রবেশ করতে কোনো ফি দিতে হয় না। অনেকেই এখানে আসেন মনের কোনো বাসনা পূরণে মানত করতে। বর্তমানে দালানটি ঢাকা সিটি করপোরেশন, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, হোসেনি দালান পঞ্চায়েত কমিটি, ইমামবাড়া ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং শিয়া আঞ্জুমানে হোসাইনি এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
মারুফ আহমেদ
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ- আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া
উইকিপিডিয়া
প্রকাশকাল: বন্ধন ৪১ তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৩