কেউ বলেন সৌর মসজিদ। কেউ কেউ সুরা মসজিদ। কেউ আবার সুজা মসজিদ। ঠিক কোত্থেকে এই মসজিদের নামকরণ হয়েছে জানে না কেউই। অনেকেই সুরা মসজিদ হিসেবেই চেনে। প্রত্নতত্ত অধিদপ্তরেও একই নামেই এটি উল্লেখিত। সুর শব্দের অর্থ জিন। স্থানীয়দের মধ্যে জনশ্রুতি রয়েছে, এক রাতের মাঝেই জিনেরা এই মসজিদ নির্মাণ করেছিল। তাই এই মসজিদের নাম ‘সুরা মসজিদ’।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা থেকে আট কিলোমিটার পশ্চিমে এবং হিলি থেকে উনিশ কিলোমিটার পূর্বে হিলি-ঘোড়াঘাট সড়কের পাশেই অবস্থান সুরা মসজিদের। এই মসজিদের পাশেই রয়েছে প্রাচীন এক দিঘি। এই দিঘির দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত মসজিদটি। এর ভেতরের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান। ৪.৮৮ মিটার করে। মসজিদটি সুলতানি আমলের অনন্য নিদর্শন। অনেকেই মনে করেন, এটি ইট নির্মিত মসজিদ। এর ওপর পাথরের কারুকাজ বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, মসজিদ চত্বরে বেশ কিছু পাথর পড়ে থাকতে দেখা যায়। ধারণা করা হয়, এগুলো মসজিদের গায়েই ছিল একসময়। এগুলোতেও ছিল কারুকাজ করা। পরে এগুলো ইটের গা থেকে খুলে যায়। এখন মসজিদের গায়ে কোনো বিশেষ পাথরের অবস্থান দেখা যায় না। নানা কারুকাজ আছে মসজিদের শরীরজুড়ে। মসজিদের পূর্ব দিকের বারান্দার আয়তন ৪.৮৮x২.১৩ মিটার। পশ্চিম ও পূর্ব দিকের দেয়াল ১.৮৩ মিটার করে প্রশস্ত।

মসজিদের প্রধানকক্ষের চার দিকের কোণে ও বারান্দায় আছে ষড়ভূজাকৃতির কলাম। পূর্ব দিকের দেয়ালে তিনটি প্রবেশপথ আছে। প্রধান নামাজ কক্ষের ওপর আছে একটি মাত্র মিহরাব। বারান্দায় আছে ছোট ছোট তিনটি গম্বুজ। এই গম্বুজগুলো পেন্ডেন্টিভ পদ্ধতিতে স্থাপিত। ছোট সোনা মসজিদের সঙ্গে এই গম্বুজগুলোর ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি দৃষ্টিনন্দন মিহরাব আছে। এগুলো পাথরের নানা রকম টুকরো দিয়ে নকশা করা। মসজিদের প্ল্যাটফর্মের পূর্ব কোণে তোরণের ওপর আছে বেশ প্রশস্ত সিঁড়ি। মসজিদের চারপাশের বাইরের এলিভেশনে উন্নতমানের পোড়ামাটির ফলকচিত্র অঙ্কিত। মসজিদে কোনো নামফলক নেই।
গৌড়ের খনিয়াদিঘির মসজিদের সঙ্গে এই মসজিদের গঠনগত মিল আছে অনেক। অনেকে একারণেই মনে করেন এটি সুলতান হোসেন শাহের আমলে নির্মিত। অনেক বছর এই মসজিদের কোনো রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে অধিগ্রহণের পরপর আংশিক সংস্কারকাজ হয়েছিল। কিন্তু আসল কাজ তখনো অনেক বাকি। মসজিদের আঁকাবাঁকা কর্নার টরেটগুলো নতুন করে সংস্কার করা, চারপাশের ক্ষতিগ্রস্ত উচ্চমানের অলংকরণের কাজগুলো পুনরায় শুরু করা, ছাদের লাইমট্রেসিং অপসারণ করে নতুন করে লাইমট্রেসিং করা ইত্যাদি কাজ বাকিই রয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া মসজিদের প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিগ্রস্ত অংশটিও পুনঃসংস্কার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেষমেশ ২০০৫-০৬ সালে সরকারিভাবে এতে সংস্কারকাজ শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে মসজিদটি আবারও তার জৌলুশ ফিরে পেতে শুরু করে। দক্ষ মজুরের হাতে পড়ে পুরো মসজিদের চেহারাটাই পাল্টে যায়।

মসজিদের উত্তর পাশের দেয়ালের ক্ষতিগ্রস্ত ও মিসিং অলংকরণের গাঁথুনির কাজ আগের মতো করেই আবারও তৈরি করা হয়। মসজিদের প্ল্যাটফর্মের উত্তর দেয়ালের পূর্বাংশ ও পূর্ব পাশের তোরণের সিঁড়ির বাহু ও দেয়ালের ক্ষতিগ্রস্ত ইটের গাঁথুনি ভেঙ্গে নতুন করে ফেসওয়ার্ক ও ফোরকিলিং এর কাজ আবারও মেরামত করা হয় চুন-সুরকির মসলা দিয়ে। মসজিদের বারান্দায় মোট ৭টি খিলান ভেঙ্গে নতুনভাবে তৈরি করা হয়। প্রবেশপথে নতুন করে গ্রিল স্থাপন করা হয়েছে। পূর্বপাশে একটি শৌচাগার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে যেন মুসল্লিদের কোনো সমস্যা না হয়। কোনো এক ছুটির দিনে যেতে পারেন এই মসজিদে। শান্ত স্নিগ্ধ এই মসজিদে জড়িয়ে রয়েছে কয়েক শ বছরের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের বাঁকবদলের গান শোনার অনুভূতি পেতে চাইলে যেতে হবে ঘোড়াঘাট, দিনাজপুরে। সুরা মসজিদ নামের এই গায়েবী মসজিদ (স্থানীয়দের ভাষ্যমতে) হাতছানি দিয়ে ডাকছে ইতিহাসের ঝাঁপি হাতে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৮তম সংখ্যা, জুন ২০১৮।