মানুষের বাসস্থান নির্মাণ ও নগরায়ণের ফলে আশঙ্কাজনক হারে কমছে কৃষিজমি। সে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে গাছপালা, লতাগুল্ম। অথচ পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণ, ভূমির ক্ষয়রোধ, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় উদ্ভিজ্জ সম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম।
অন্যদিকে বিশ^ব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত কারণে চাহিদার ঘাটতি, পরিবহন খরচ ও কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্রমেই বাড়ছে ফল ও শাকসবজির দাম। এমন পরিস্থিতিতে বিশ^জুড়ে আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও উন্নত জাতের ফল-ফসল উৎপাদনে শুরু হয়েছে এক বিপ্লব। কৌশলী ব্যবস্থাপনায়, স্বল্প ব্যয় ও পরিসরে এ ধরনের চাষ ও বৃক্ষায়নের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছেন অনেকেই।
বাংলাদেশও অনুসরণ করছে বিজ্ঞানসম্মত এমন সব পদ্ধতি। তবে তা খুবই সীমিত পরিসরে। দ্রুততার সঙ্গে শহর-গ্রামে আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর ও বিজ্ঞানসম্মত কৃষির মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে সমৃদ্ধি অর্জন এখন সময়ের দাবি। কিন্তু কীভাবে এমন সুবিধাভোগী হতে পারেন, তারই বিস্তারিত এবারে।
উদ্ভিদ জগৎকেন্দ্রিক অর্থনীতি
উদ্ভিদের সম্পূর্ণটাই কোনো না কোনো কাজে লাগে, যেগুলোর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক। কাঠ থেকে তৈরি হয় নানা সামগ্রী। পাতা, শিকড় ও মূলের বাকল থেকে তৈরি হয় ওষুধ ও রং। গাছ থেকে একধরনের আঠা পাওয়া যায়, যা ধুনো-ধূপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সুগন্ধি তৈরিতেও ব্যবহৃত হয় উদ্ভিদ। এ ছাড়া উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত সম্পদের মধ্যে রয়েছে-
ওষুধ, পার্টিকেল বোর্ড, রং, খেলনাসহ নানা শিল্পে উদ্ভিদের ব্যবহার প্রচুর। পৃথিবীজুড়ে ৫০ হাজারেরও বেশি উদ্ভিদ রয়েছে, যা মানুষ নানা কাজে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে। বাংলাদেশেও এ রকম প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রজাতির উদ্ভিদের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৮০০ প্রজাতির গাছ ও উদ্ভিদের ঔষধি ক্ষমতার প্রমাণ মিলেছে। ক্যানসার নিরাময়ের জাদুকরী গুণ আছে পৃথিবীর অন্তত ১ হাজার ৪০০ বৃক্ষ প্রজাতির।
এ ছাড়া বহুমূত্ররোগ, কিডনি রোগ, পেটের পীড়া, রক্ত-আমাশয়, সর্দি-কাশি, ঘা-পাঁচড়া, ফুসফুসের সমস্যা, কৃমিনাশক ও অন্যান্য রোগের পথ্য হিসেবে অর্জুন, জবা, মেন্দা, ভাট, নিম, তুলসী, চিরতা, বাসক প্রভৃতি গাছের মূল, ছাল, কাণ্ড, পাতা, ফল ও ফুল ঔষধি হিসেবে হাজার হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে দারুণ কার্যকর ঔষধি গাছপালা। বনের নির্মল বাতাসের সংস্পর্শে অনেক রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। ফলে প্রাণিকুল থাকে অনেকাংশেই সুরক্ষিত।
বৃক্ষের বৈশ্বিক বাণিজ্য
বিশ^ বাণিজ্যের বড় এক অংশ দখলে উদ্ভিদ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বর্তমান পৃথিবীতে ৬২ বিলিয়ন ডলারের ভেষজ বৃক্ষের বাজার রয়েছে। এ বিশাল বাজারের অধিকাংশই ভারত ও চীনের দখলে। সংস্থাটির তথ্য থেকে আরও জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় ২৫ শতাংশ আধুনিক ওষুধ পাওয়া যায়, যেগুলো উৎপাদিত হয় উদ্ভিদ থেকে।
কমপক্ষে ৭ হাজার ওষুধের উপাদান নেওয়া হয় উদ্ভিদ থেকে। বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই ফার্মাসিউটিক্যাল ওষুধ খুবই দামি। পক্ষান্তরে, উদ্ভিদজাত ওষুধকে বীজ থেকে উৎপাদন করা ও পরিবেশ থেকেই বিনা মূল্যে বা অল্প খরচে সংগ্রহ করা যায়। উদ্ভিজ্জাত চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০০০ সালে ভারত সরকার জাতীয় চিকিৎসা উদ্ভিদ বোর্ড গঠন করে।
পদেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভেষজ উদ্ভিদ ও তার প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ৩০০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আর প্রক্রিয়াজাত ভেষজের রপ্তানি হয়েছে ৪৫৬ দশমিক ১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চীন, ভারত, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান পর্যায়ক্রমে শীর্ষ ভেষজ রপ্তানিকারী দেশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ভেষজসামগ্রী আমদানি করে। অথচ এর প্রায় ৭০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন সম্ভব। এ ছাড়া বন ও উদ্ভিজ্জ সম্পদকে ঘিরেও চলমান রয়েছে বিশাল বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। ওষুধের পাশাপাশি কাঠ, ফুল, ফল, সবজি, হারবাল চা, তেল রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করছে রপ্তানিকারণ দেশসমূহ। বিশে^ শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ ও রপ্তানিকৃত অর্থের পরিমাণ-
কাঠ রপ্তানিকারক শীর্ষ দেশ ও রপ্তানিকৃত অর্থের পরিমাণ
ক্রমিক রপ্তানিকারক দেশ রপ্তানিকৃত অর্থের পরিমাণ (মার্কিন ডলার)
ফল ও বাদাম জাতীয় ফসল রপ্তানিকারক শীর্ষ দেশ ও রপ্তানিকৃত অর্থের পরিমাণ
ক্রমিক রপ্তানিকারক দেশ রপ্তানিকৃত অর্থের পরিমাণ (মার্কিন ডলার)
মসলা জাতীয় ফসল রপ্তানিকারক শীর্ষ দেশ ও রপ্তানিকৃত অর্থের পরিমাণ
ক্রমিক রপ্তানিকারক দেশ রপ্তানিকৃত অর্থের পরিমাণ (মার্কিন ডলার)
বাংলাদেশের বন ও উদ্ভিজ্জ অর্থনীতি
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণার তথ্যমতে, মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। কৃষি ও বনায়ন খাত থেকে জিডিপির ১০ শতাংশের বেশি অর্থ আসে, টাকার অঙ্কে যা ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। ফসল ফলিয়ে কৃষকেরা জিডিপিতে ৭৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অবদান রাখছেন।
বনায়ন করে অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বিগত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ কোটি ৪৮ লাখ মার্কিন ডলারের আসবাব রপ্তানি করে বাংলাদেশ। শাকসবজি রপ্তানির বাজার প্রায় ১৭০ মিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশের ফল ও সবজি রপ্তানিকৃত দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষি অর্থনীতি ও রপ্তানির চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। সরকারের ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক দশক আগেও জিডিপিতে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল অনেক। কিন্তু তা ক্রমান্বয়ে কমছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে কৃষি খাতের অবদান ছিল ১৮ দশমিক ০১ শতাংশ।
কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৪৪ শতাংশে। ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাতের অবদান ছিল ১৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। একইভাবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ছিল ১৬ দশমিক ৭৮, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৬ দশমিক ৫, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৬, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৫ দশমিক ৩৫, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৭৪, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ২৩, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। প্রতিবছরেই কমছে এই হার।
কৃষির এমন বেহাল দশার জন্য দায়ী প্রতিবছর ১ শতাংশ হারে চাষযোগ্য জমি হারানো, নিম্নমান, মনিটরিংয়ের অভাব এবং পুরোনো চাষপদ্ধতি।
উদ্ভিদের পরোক্ষ ভূমিকা
উদ্ভিদের কাঠ, ফল, ফুল ও অন্যান্য উপাদান যে অবদান রাখছে তার সঠিক অর্থনৈতিক উপযোগিতা তথা টাকার অঙ্কে পরিমাপ সম্ভব নয়। গাছ অক্সিজেন প্রদান ও কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ছাড়াও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন তথা জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় সহায়ক। ইন্ডিয়ান ফরেস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা ৫০ বছর বেঁচে থাকা একটি গাছের আর্থিক সুবিধা বের করেছেন।
যেখানে প্রকাশ পেয়েছে, গাছ বায়ুদূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে ১০ লাখ, জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন দেয় ৫ লাখ, বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে বাঁচায় ৫ লাখ, মাটির ক্ষয়রোধ ও উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে বাঁচায় ৫ লাখ, বৃক্ষে বসবাসকারী প্রাণীদের খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে বাঁচায় ৫ লাখ, আসবাবপত্র, জ্বালানি কাঠ ও ফল সরবরাহ করে ৫ লাখ, বিভিন্ন জীবজন্তুর খাদ্য জোগান দিয়ে বাঁচায় আরও ৪০ হাজার টাকা। আর্থিক মূল্যে এর মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এ ছাড়া উদ্ভিদ যেসব অবদান রাখছে, সেগুলো হচ্ছে-
- গাছ তাপমাত্রা দুই থেকে আট ডিগ্রি পর্যন্ত কমায় বিধায় এসির ব্যবহার কমে, ফলে ব্যাপক বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় ও কমে বৈশি^ক উষ্ণতা
- গাছ গ্রিনহাউস গ্যাস; বাতাসের ধূলিকণা ধরে শুষে নিয়ে নির্মল রাখে পরিবেশ। ফলে রোগ-ব্যাধির চিকিৎসাব্যয় কমে
- নগরের ব্যাপক শব্দদূষণের প্রতিরোধ করে গাছপালা
- গাছ বৃষ্টির পানি ধরে রাখে ও শিকড়ের মাধ্যমে তা মাটির তলায় পাঠিয়ে পানির পরিমাণ স্বাভাবিক রাখে
- গাছ মাটির ক্ষয় রোধ ঠেকায় বিধায় নদীভাঙন রোধ হয়; বাঁধ নির্মাণব্যয় কমে
- জৈবপদার্থ যোগ করে মাটির উর্বরতা বাড়ায়
- মেঘ ও বৃষ্টির সৃষ্টিতে সহায়তা করে।
কৃষি ও উদ্ভিজ্জ অর্থনীতির সম্ভাবনা
বৃক্ষরোপণকে ব্যাংকের স্থায়ী আমানতের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যা আপৎকালে বিমা তুল্য কাজ করে। আজ একটি সেগুন, মেহগনি, কাঁঠাল, কড়ইগাছ রোপণ করলে ২০ বছর পর এর কাঠের দাম হবে কমপক্ষে দু-তিন লাখ টাকা। বিশ^ব্যাপী আসবাবপত্র তৈরি ছাড়াও বাড়ির দরজা-জানালা, রেললাইনের সিøপার, বাদ্যযন্ত্র, নৌকা ইত্যাদি তৈরিতে কাঠের ব্যাপক চাহিদা।
বনজ বৃক্ষের পাশাপাশি ফল ও কৃষিপণ্যের বিশাল বাজার ও চাহিদা রয়েছে দেশে-বিদেশে। দাম ও চাহিদা ভালো থাকায় দেশে ফল উৎপাদন ক্রমেই বাড়ছে। আলু ও আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম; পেয়ারায় অষ্টম। বাংলাদেশে এখন চাষ হচ্ছে জাপানের অত্যন্ত মূল্যবান আম সূর্যডিম (এগ অব সান), যা দেশটিতে ‘মিয়াজাকি’ নামে পরিচিত। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, সাতক্ষীরাসহ দেশব্যাপী আম চাষে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
সাভার, গাজীপুর, মানিকগঞ্জসহ সারা দেশে চাষ হচ্ছে ড্রাগন, কমলা, ডুমুর, স্ট্রবেরিসহ বিদেশি নানা ফল। এ ছাড়া দেশের পাহাড়ে শুরু হয়েছে বাদাম, মালটা, কমলা, আনারস, আমসহ নানা ফল চাষ। এমনকি মরুভূমির খেজুরও চাষ হচ্ছে ময়মনসিংহে। আবার ঔষধিগাছের বাগানও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
এতে যেমন পারিবারিক অর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত হচ্ছে, তেমনি দেশের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ হচ্ছে। তা ছাড়া বিভিন্ন বিনোদন পার্কের সৌন্দর্য বাড়াতে লাগানো হচ্ছে বিচিত্র সব গাছ। ফলে রপ্তানিক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য না মিললেও দেশের চাহিদা পূরণ হয়ে কমছে আমদানি-নির্ভরতা।
বাড়ছে নগর কৃষি
কৃষি মানেই যে গ্রাম সে ধারণা বদলে যাচ্ছে বিশ^ব্যাপী খাদ্য চাহিদা ও মূল্য বাড়ায়। নগরেও বাড়ছে কৃষিকাজ, যাকে শৌখিন চাষ বলাই শ্রেয়। তবে গ্রামের মতো নগরে চাষযোগ্য ভূমি না থাকায় বিকল্প পদ্ধতিতে করা হচ্ছে চাষের ব্যবস্থা। রাস্তার পাশে, ভবনের ছাদে, বারান্দায়, আঙিনায়, সরকারি-বেসরকারি ভবনের আশপাশের উন্মুক্ত পরিসরে ফলানো হচ্ছে ফল, ফুল ও সবজি।
সরকারও ছাদবাগান করার জন্য কর ছাড়সহ নানা প্রণোদনা দিচ্ছে। এতে যেমন মিটছে পারিবারিক চাহিদা, তেমনি অর্থনীতিতেও রাখছে ভূমিকা। নগরের এমন বৃক্ষায়ন বাড়ায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও রাখছে সবিশেষ ভূমিকা।
সম্ভাবনাময় ছাদ কৃষি
সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে ছাদ কৃষি করার প্রবণতা লক্ষণীয়। শখের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবেও অনেকেই ছাদে বাগান করছেন। যাঁদের ছাদ নেই তাঁরাও বসে নেই! বারান্দায়, বাসার ভেতরে, সিঁড়িতেও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগাচ্ছেন। আগে মানুষ শখের বশে ফুল চাষ করলেও এখন ফলাচ্ছেন নানা ধরনের সবজি ও ফল।
এর অন্যতম কারণ, তাজা ও বিষমুক্ত শাকসবজির প্রত্যাশা; বাজারের শাকসবজি, ফলের প্রতি তাঁদের আস্থা কম। বাণিজ্যিক চাষের ক্ষেত্রে আড়াই কাঠার বাড়ির ছাদে সবজি চাষ করে পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অনায়াসে বছরে ৫০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।
তবে ছাদবাগানের বিজ্ঞানসম্মত মডেল এ দেশে এখনো গড়ে ওঠেনি। ফুল, ফল, সবজির বাগান গড়ে তোলাকে ছাদবাগান মনে করছেন সবাই। তবে এলোমেলো ও অপরিকল্পিত ছাদবাগান কেবল সময়, অর্থ অপচয়ই বাড়ায় না, সেই সঙ্গে ভবনেরও নানা ক্ষতি করে। তাই কিছু মৌলিক বিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখে ছাদবাগান গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগের ছাদে ‘নিবিড় ছাদবাগান’ নামে একটি মডেল তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বাগানের মোট ক্ষেত্রফলের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ রাস্তা, ১০ শতাংশ বসার জায়গা, ৪০ শতাংশ শাকসবজি, ১০ শতাংশ ফুল ও শোভাবর্ধক গাছ, ২০ শতাংশ ফল, মসলা ও ঔষধি এবং ৫ শতাংশ অন্যান্য গাছের জন্য বিবেচনায় রেখে বাগানের মডেল প্রস্তুত করা হয়েছে।
এ মডেলের বৈশিষ্ট্য অধিক জীববৈচিত্র্য, দৃশ্যত খুবই আকর্ষণীয়, বিনোদন ও খাদ্য উৎপাদনের জায়গা হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। ১৫ ফুট উচ্চতার গাছগুলো সেখানে লাগানো যায়। যাঁরা এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে চান, তাঁরা যোগাযোগ করতে পারেন। প্রতি শুক্রবার একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক এ বিষয়ে ধারণা দেন।
বৃক্ষভেদে স্থান নির্বাচন
গাছ থেকে সঠিক উপযোগিতা পেতে স্থান নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোন গাছ কোথায় লাগাতে হবে সে ব্যাপারে বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো ধারণা না থাকায় গাছগাছালি থেকে আমরা পূর্ণ সুবিধা নিতে পারছি না। কারণ, প্রতিটি উদ্ভিদের বাস্তুতন্ত্র আলাদা। এ জন্য কোথায় কোন গাছ লাগাতে হবে, সেটা জানা জরুরি। কোন জায়গায় কী গাছ লাগানো উচিত; আসুন, তা জেনে নিই-
বসতবাড়ির দক্ষিণে: দক্ষিণ পাশে বড় আকারের গাছ লাগালে বাড়িতে সূর্যের আলো ও বাতাস প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে বাড়ি হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন ও স্যাঁতসেঁতে। তাই ছোট আকারের কম ঝোপঝাড়বিশিষ্ট গাছ লাগানো ভালো। যেমন- সুপারি, নারিকেল, নিম, দেবদারু, পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, জাম্বুরা, ডালিম, মেহেদি প্রভৃতি।
বাড়ির উত্তর পাশে: উত্তরে বড় গাছপালা থাকলে ঝোড়ো বাতাস থেকে বাড়িকে রক্ষা করে। তাই বড় এবং শক্ত কাণ্ডবিশিষ্ট গাছ লাগানো উচিত। যেমন- আম, কাঁঠাল, জাম, মেহগনি, শিশু, সেগুন, বাঁশ, তেঁতুল, পিতরাজ ইত্যাদি।
বাড়ির পূর্ব-পশ্চিম পাশে: মাঝারি আকারের ও মধ্যম ঝোপালো গাছ লাগানো ভালো। এতে বাড়ির সৌন্দর্য বাড়ে এবং আলো-বাতাস চলাচল বৃদ্ধি পায়। উপযুক্ত গাছ হলো কুল, সফেদা, আম, লিচু, খেজুর, ডালিম, কলা, আতা, বেল, শরিফা, গাব, কামরাঙ্গা, পেয়ারা ইত্যাদি।
পতিত জমিতে: সব ধরনের গাছ যেমন- আম, কাঁঠাল, জাম, কামরাঙ্গা, সেগুন, হরীতকী, দেবদারু, নারিকেল, সুপারি, খেজুর, নিম, পাম, ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, বাঁশ ইত্যাদি।
রাস্তার পাশে: রাস্তা দুই পাশে উঁচু ও শক্ত কাণ্ডবিশিষ্ট গাছ লাগানো ভালো। রাস্তার ধারের গাছগুলোকে প্রায়ই ডালপালা ছাঁটাই করা হয় বিধায় ছাঁটাই সহ্য করতে পারে এমন গাছই নির্বাচন করতে হবে। যেমন- সেগুন, হরীতকী, দেবদারু, নারিকেল, সুপারি, খেজুর, তাল, নিম, কৃষ্ণচূড়া, বাবলা, শিমুল, মান্দার, রাজকড়ই, শিলকড়ই, অর্জুন, সোনালু ইত্যাদি। গ্রামের কাঁচা রাস্তার দুই পাশে লাগানো যেতে পারে নিম, দেবদারু, চম্পা, খেজুর, তাল প্রভৃতি গাছ।
রেল লাইনের দুই পাশে: পিতরাজ, সেগুন, হরীতকী, দেবদারু, নারিকেল, সুপারি, খেজুর, নিম, বাবলা, শিমুল, খেজুর, সুপারি, নারিকেল গাছ লাগানো যেতে পারে।
বাঁধের ধারে: সাধারণত গাছ লাগানো হয় বাঁধ মজবুত এবং দৃষ্টিনন্দন করতে। তাই যেসব গাছের শিকড় বিস্তৃত এবং দেখতে সুন্দর, সেসব গাছ লাগানোই ভালো। বট, পাকুড়, অশ্বথ, দেবদারু, মেহগনি, শিশু, নারিকেল, বিভিন্ন প্রজাতির পাম, খেজুর ইত্যাদি।
পুকুড় পাড়ে: পুকুরের পাড়ে খুব বড় গাছ না লাগানো ভালো। কারণ বড় গাছ সূর্যের আলোর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। গাছের পচা পাতা পানি নষ্ট করে। সুপারি, তাল, নারিকেল, নিম, দেবদারু, পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, ডালিম ইত্যাদি গাছ পুকুরের পাড়ের জন্য উপযুক্ত।
জমির চারপাশে: যেসব গাছের ডালপালা ও শিকড় কম ছড়ায় জমির আইলে সে ধরনের গাছ লাগাতে হয়। বাবলা, তাল, খেজুর, সুপারি, জিগা, কড়ই, দেবদারু ইত্যাদি গাছ উপযুক্ত। বর্তমানে একই জমিতে ফসলের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ লাগানো হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন আয় বাড়ছে, তেমনি ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমছে।
নিচু জমিতে: সাধারণত পানির উপস্থিতি সহ্য করতে পারে নিচু জমিতে এমন গাছ লাগানো উচিত। যেমন- বেত, মূর্তা, বাঁশ, মান্দার, জারুল, হিজল, কদম ইত্যাদি।
বিলে: বিলে বছরে প্রায় চার মাস পানি থাকে। তাই যেসব গাছ পানিতে বেঁচে থাকতে পারে, বিলে সেসব লাগাতে হবে। যেমন- হিজল, করচ, বিয়াস, পিটালী, জারুল, মান্দার, বরুণ, পলাশ, কদম, চালতা, পুতিজাম, ঢেপাজাম, পিতরাজ, অর্জুন ইত্যাদি।
চরে লাগানোর গাছ: উপকূলীয় চরে কেওড়া, বাইন, কাঁকড়া, গরান, গোলপাতা গাছ লাগানো যায়। যেসব উপকূলীয় চরে পানি ওঠে না সেখানে বাবলা, ঝাউ, সাদা কড়ই, কালো কড়ই, জারুল ইত্যাদি লাগানো যায়। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে ঝাউ, লোনাঝাউ, পিটালী, করচ, পানিবিয়াস লাগানোর উপযোগী।
উপকূলীয় অঞ্চলে: লবণাক্ততা সহিষ্ণু গাছ যেমন- সুন্দরী, ছৈলা, গরান, গেওয়া, গোলপাতা, মান্দার, কড়াই, বাবলা, নারিকেল ইত্যাদি গাছ রোপণ করা উচিত।
পাহাড়: পাহাড়ি জমিতে কাজুবাদাম, কমলালেবু, মালটা, লেবু, লিচু, পেয়ারা, আদা, আনারস ইত্যাদি ফলদ উদ্ভিদ ছাড়াও তেলসুর, চাপালিশ, চিকরাশি, শিলকড়ই, গর্জন, গামার, সেগুন, বাঁশ, বেত প্রভৃতি গাছ লাগানো যায়।
ফলের বাগান পরিকল্পনায় করণীয়
- দ্রুত ফলদানকারী উন্নত জাত নির্বাচন। প্রয়োজনে প্রসিদ্ধ হর্টিকালচার সেন্টার ও নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ
- আকার ও আয়তনে ছোট ও রোগমুক্ত গাছ বাছাই করাই উত্তম
- গাছ লাগানোর আগে উপযুক্ত স্থান তথা পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায়, বৃষ্টির পানি জমে থাকে না এবং উর্বর এমন জায়গা নির্বাচন
- ফল চাষের ক্ষেত্রে অধিক লাভজনক যেমন, পেঁপে, ড্রাগন, তরমুজ, আম, পেয়ারা, কমলা, মালটা, লিচু ইত্যাদি নির্বাচন
- মানুষ ও গরু-ছাগলের হাত থেকে রক্ষার জন্য উপযুক্ত বেড়া প্রদান
- নিয়মিত পরিচর্যা তথা সার প্রয়োগ, রোগ-পোকা দমন, আগাছা দমন ও সেচ প্রদান
- মাটিতে বাতাস চলাচলে গাছের চারদিকের হালকাভাবে কুপিয়ে মাটি আলগা রাখা ও মাঝে মাঝে অতিরিক্ত ডালসহ রুগ্্ণ অংশ কেটে দেওয়া
- গাছ যেন বাতাসে হেলে না পড়ে এ জন্য গাছে খুঁটি দিয়ে সোজা রাখা
- বাণিজ্যিক বাগান থেকে কাক্সিক্ষত মুনাফা পেতে বছরে অন্তত একবার হর্টিকালচার সেন্টারের বিশেষজ্ঞ দিয়ে গাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা।
বৃক্ষরোপণে পরিবেশ বিবেচনা
প্রতিবছর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে প্রচুর গাছ লাগানো হয় একাশিয়া, আকাশমনি, ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, রেইনট্রি, শিলকড়ই প্রভৃতি যার বিশালসংখ্যক আমাদের দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জলবায়ুর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বনভূমি বাড়ানো, কাঠের বাড়তি চাহিদা পূরণ, দ্রুত বর্ধনশীল, লাভজনক, অল্প আয়াস ও অল্প জায়গায় বেশি রোপণযোগ্য ইত্যাদি বিবিধ বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং প্ররোচনায় এসব বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে অজান্তেই পরিবেশ ধ্বংস করে চলেছি।
সামাজিক বনায়নের নামে ধ্বংস হচ্ছে মাটি, পানি, বাতাস, পাহাড়, পরিবেশ। এগুলোর কাঠও নিম্নমানের। দেশের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় সব সময় দেশীয় গাছ লাগানো উচিত। বিদেশি গাছ হলে তা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খায় কি না তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
উদ্ভিদের অর্থনৈতিক গুরুত্ব জেনেও আমরা প্রতিনিয়ত বন ধ্বংস করে চলেছি। কিন্তু জনগণকে যদি লাভের অঙ্কটা বোঝানো যায়, তাহলে উৎসাহী হবে দেশবাসী। কৃষির উন্নতি না হলে উন্নত হবে না দেশ। পুরোনো আমলের চাষপদ্ধতি পরিবর্তন করে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে রপ্তানি থেকে আমরাও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে সক্ষম হব। এ জন্য প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা, রপ্তানির সুযোগ তৈরি, প্রতিটি পর্যায়ে কৃষিপণ্য মনিটর, আধুনিক গবেষণাগার ও সংরক্ষণের সুবিধা নিশ্চিতকরণ।
বিশেষজ্ঞ মত
‘ওপেন ইকোনমিতে আমাদের প্রতিযোগিতা করেই টিকতে হবে। ’
এস এম জাহাঙ্গীর আলম
প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিষমুক্ত সবজি, ফল এখন রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। বিগত অর্থবছরে প্রায় আড়াই হাজার মেট্রিক টন বাঁধাকপি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের বাজারে রপ্তানি হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ফল রপ্তানি হয়েছে বহির্বিশ্বে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্য নিচ্ছে পৃথিবীর ১৪০টি দেশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে।
বিশ্ববাজারের তুলনায় রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম হওয়ায় প্রকৃত সুফল পাচ্ছেন না এ দেশের কৃষকেরা। অন্যদিকে রপ্তানির পরিধি বাড়লেও কার্গো স্পেসের অভাব, মাত্রাতিরিক্ত উড়োজাহাজ ভাড়াসহ নানা কারণে রপ্তানির বাইরে এখনো অনেক কৃষিপণ্য। সমস্যাগুলোর সমাধান হলে রপ্তানি বাড়বে এখনকার চেয়ে চারগুণ।
দেশের কৃষিপণ্যের রপ্তানি ও বিকাশ নিয়ে কাজ করে রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট এস এম জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে আছেন অ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিতে।
কৃষিপণ্য রপ্তানির খুঁটিনাটি তাঁর নখদর্পণে। গত মেয়াদে ছিলেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক। পেশায় ব্যবসায়ী, মননে কৃষক এই মানুষটি ‘বন্ধন’-কে জানালেন দেশের কৃষিপণ্যের রপ্তানির বর্তমান হালহকিকত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফুলহকমিঠু
বন্ধন: বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের রপ্তানির বাজার সৃষ্টি ও বাণিজ্য উন্নয়নে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন কী ধরনের ভূমিকা পালন করছে? সংগঠনের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাই?
এস এম জাহাঙ্গীর আলম: যেকোনো বাণিজ্য সংগঠনের কাজ হলো তাদের যে মেম্বার আছে, তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজগুলো করা। সংগঠিত হয়ে তাদের সমস্যা সমাধান করা। আমরা যেমন কৃষিপণ্য নিয়ে কাজ করি। এই কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিতে যেকোনো সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সংস্থা, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা একযোগে কাজ করি। ১৯৮৪ সালে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বন্ধন: বাংলাদেশের ফল, ফুল, সবজি ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাণিজ্যের আকার কেমন? রপ্তানি ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগামী বাংলাদেশ?
এস এম জাহাঙ্গীর আলম: প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও রপ্তানির এই আকার কম। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমাদের কৃষিপণ্যের রপ্তানি এগিয়ে চলছে।
বন্ধন: বিশ্বের কোন কোন দেশে রপ্তানি হচ্ছে কৃষিজাত এসব পণ্য?
এস এম জাহাঙ্গীর আলম: আমাদের বাজার মূলত মিডল ইস্ট ও ইউরোপ। ইউরোপের বাজারের মধ্যে রয়েছে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, গ্রিস। মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, দুবাই। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরেও রপ্তানি হয়ে থাকে। কানাডায় যায় আমাদের ফল, সবজি।
বন্ধন: রপ্তানিকৃত দেশগুলোতে বাংলাদেশের কী কী কৃষিজাত পণ্যের চাহিদা বেশি? আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের মানই–বা কেমন?
এস এম জাহাঙ্গীর আলম: আমাদের দৈনন্দিন শাকসবজির চাহিদা বিদেশে বেশি। শিম, লাউ, জালি, পেঁপে, করলা, কাঁকরোল, বরবটি, চিচিঙ্গা, লালশাক, ডাঁটাশাক, ঝিঙ্গা, ধুন্দল এগুলোর চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, লটকন, লিচুর চাহিদা বেশ। কোয়ালিটির কথা যদি বলি, ইউরোপের জন্য একধরনের কোয়ালিটির দরকার পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একধররের কোয়ালিটির দরকার। আমরা কৃষিপণ্যে সব ধরনের কোয়ালিটি পরীক্ষায় পাস করতে সক্ষম। কোয়ালিটি এখন আর সমস্যা না। আর অন্য দেশের শাকসবজি-ফল তো ভিন্ন ধরনের। আমাদের পণ্যের আলাদা চাহিদা রয়েছে বিশ্ববাজারে।
বন্ধন: বাংলাদেশের বেশ কিছু কৃষিপণ্য বিশ্ব বাজারে ভারতীয় বলে বাজারজাত করা হয়। এর সত্যতা কতটুকু? সত্য হলে এর কারণই–বা কী?
এস এম জাহাঙ্গীর আলম: না, এমনটা হয় না। কারণ ভারতের আগে বিশ্ববাজারে আমাদের শাকসবজি গেছে। বরং ভারতের পণ্য বাংলাদেশি পণ্য বলে বিবেচিত হয় কিছু দেশে। ইউরোপের বাজারে ভারতের সবজি ঢুকছে ২০০৬-২০০৭ সাল থেকে। অন্যদিকে স্বাধীনতার আগে থেকে লন্ডনে বাংলাদেশের শাকসবজি যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের শাকসবজির দাম কম। এ জন্য এখন তারা বাজারে ডমেনেটিং। বাজারের বড় অংশই তাদের দখলে।
বন্ধন: বিশ্ব বাজারে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের গুণগত মান নির্ধারণ ও তা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনারা মান নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কতটা গুরুত্ব দেন?
এস এম জাহাঙ্গীর আলম: ইউরোপের জন্য সরকারিভাবে সেন্ট্রাল হাউস করা হয়েছে শ্যামপুরে। সেখান থেকে প্যাকিং, গ্রেডিং ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল করা হচ্ছে। এটা কৃষি মন্ত্রণালয়ের আন্ডারে একটা কোয়ারেন্টিন সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়। সেখানে থেকে কোয়ালিটি মেইনটেইন করেই বিদেশে পণ্য যায়।
বন্ধন: সম্প্রতি দেশের পার্বত্য অঞ্চলে কাঠবাদাম, কাজুবাদামসহ দেশব্যাপী উন্নত জাতের বিভিন্ন দেশি–বিদেশি ফল চাষ হচ্ছে। এগুলোর কোনো রপ্তানি পরিকল্পনা আছে কি?
এস এম জাহাঙ্গীর আলম: কাঠবাদাম, কাজুবাদাম রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদা মেটাতে আমাদের বিভিন্ন দেশ থেকে এগুলো আমদানি করতে হয়। কাঁচা কাঠবাদাম কিছু রপ্তানি হচ্ছে। চায়না, ভিয়েতনামে রপ্তানি হচ্ছে। খুব বেশি কোয়ানটিটি না হলেও রপ্তানি শুরু হয়েছে। এই আইটেমের ভবিষ্যৎ ভালো। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাজু, কাঠবাদাম আমদানি করতে হয়। এর চাহিদা যদি দেশেই পূরণ করা যায়, তাহলে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের সাশ্রয় হবে।
বন্ধন: কয়েক বছর আগে বিশ্ব বাজারে প্রচুর পরিমাণে আম রপ্তানি করা হলেও কেন বিদেশি বাজার ধরা গেল না? রপ্তানির ধারা স্বাভাবিক রাখতে আসলে করণীয় কী?
এসএমজাহাঙ্গীরআলম: ইউরোপের বাজারে এখন আমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকছে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম। আমাদের আম মৌসুমভিত্তিক। বছরের একটা সময় রপ্তানি হয়। পাকিস্তানের আম সারা বছরই যায়। ভারতের আম ৬-৭ মাস পর্যন্ত পাওয়া যায়। এর কারণে আমাদের মার্কেটটা কন্টিনিউ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের প্রাইসিংয়ের সঙ্গে অন্য দেশের প্রাইসিংয়ের পার্থক্য আছে।
আবার আমাদের আমে কালার আসে না বা কালার একটু কম আসে। অন্যান্য দেশের আমের কালারটা আসে বেশি। ইন্ডিয়ান চোষা আম বিশ্ববিখ্যাত। এটাকে বলে আলফানজো ম্যাংগো। এটা যত দিন থাকবে, তত দিন চোষাটাকেই খাবে। আমাদের আম খাবে না। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর আমাদের আম রপ্তানি বেশি।
অন্য দেশে কস্টিং কম থাকায় প্রাইসও কম। কাস্টমার তো দাম কম যেটা, সেটাই খাবে। এসব কারণে আমাদের আম কম জনপ্রিয়। এখন সারা বছর পাওয়া যায় এমন ভ্যারাইটি হচ্ছে। বারি-৪ ও অন্যান্য ভ্যারাইটি হচ্ছে, যেগুলো সারা বছর পাওয়া যাবে। সারা বছর যদি আমরা আম চাষাবাদ করতে পারি ও বিদেশের মার্কেটে দিতে পারি, তাহলে আমের বাজার ফিরবে আমাদের।
বিদেশে আমাদের চাহিদা আছে। কিন্তু যে সিজনে আমাদের আম যায়, অন্য দেশের আমও যায়। দাম কম থাকায় অন্য দেশের আম তখন মার্কেট দখল করে। ইউরোপের বাজারে প্রায় ৫০০ টনের মতো এই বছর রপ্তানি হয়েছে, আরও হবে।
বন্ধন: প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এবং আধিপত্য বিস্তারে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন।
এস এম জাহাঙ্গীর আলম: ওপেন ইকোনমিতে আমাদের প্রতিযোগিতা করেই টিকতে হবে। সেই ক্ষেত্রে নতুন সবজি ও ফলজ জাতের উদ্ভাবন করতে না পারলে আমরা অন্য দেশের তুলনায় রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ব। সারা বছর রপ্তানি করা যায় এমন জাতের উদ্ভাবন জরুরি। পাশাপাশি পণ্যের দাম কমাতে হবে। এই ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের পদক্ষেপ জরুরি।
প্রাইস যদি অন্য দেশের তুলনায় বেশি হয় তাহলে আমাদের সবজি মার খাবে। এ ছাড়া পণ্য পরিবহনে বিমান ভাড়াটা অন্য দেশের তুলনায় বেশি, সেটাও কমাতে হবে। কার্গো স্পেসের জন্য বিদেশি এয়ারলাইনসের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে। অনেক সময় তারা ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে আমাদের সবজি, ফল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই ফরেন এয়ারলাইনসে কার্গো স্পেস পাওয়া যায় না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে।
বন্ধন: রপ্তানি প্রসারে প্রতিবন্ধকতাসমূহ কী কী? কীভাবে দূর করা যায় প্রতিবন্ধকতাগুলো?
এস এম জাহাঙ্গীর আলম: আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কার্গো স্পেস। পচনশীল পণ্য বাই এয়ারে শিপমেন্ট হয়। অনেক সময়ই আমরা বিমানে জায়গা পাই না। কার্গো স্পেস অনেক সময় অ্যাভেইলঅ্যাবল নয়। দেখা যায় আমদানিকারকের চাহিদা আছে কিন্তু কার্গো স্পেস না পেলে তো রপ্তানি করা সম্ভব নয়।
এ ছাড়া প্রতি কেজি পণ্যে যে বিমান ভাড়া, সেটা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণে আমাদের পণ্যের কস্টিং পড়ে বেশি। এর প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারে। যত প্রতিবন্ধকতা আছে, সেগুলো দূর করতে প্রধানরমন্ত্রীর নির্দেশে কৃষি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে আলাদা বিমান কেনার কথা বলেছেন। সরকার আমাদের সমস্যা সমাধানে আন্তরিক। আমাদের সঙ্গে প্রতিনিয়তই সরকারের প্রতিনিধিদের আলাপ-আলোচনা চলছে।
বন্ধন: কৃষিপণ্য রপ্তানিতে সরকার কতটা আন্তরিক। রপ্তানি বাড়াতে সরকারের কাছে আপনারা কী ধরনের নীতিগত সহায়তা চান, বিষয়টা বুঝিয়ে বলবেন।
এসএমজাহাঙ্গীরআলম: সরকার যথেষ্ট আন্তরিক। দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে কৃষিপণ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ব্যবসায় কৃষিপণ্যের নির্ভরশীলতাও বাড়ছে। কেননা এই পণ্য সহজে রপ্তানি করা যায়। চামড়া, গার্মেন্টসে যেখানে ফ্যাক্টরি করা লাগে, নানা ধরনের সমস্যা থাকে, সেখানে কৃষিপণ্য এক্সপোর্ট ফ্যাক্টরি বা মেশিনারিজ লাগে না।
এটা অন্য অনেক কিছু এক্সপোর্টের তুলনায় সহজ। এ কারণে বাজার সম্প্রসারণে সবার এগিয়ে আসতে হবে। আর যে পলিসি আছে, সেটা মেনে যদি কাজ করি তাহলে আমাদের আর সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সরকার চাচ্ছে যত স্মুথলি কৃষিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করতে। যত বেশি রপ্তানি হবে তত কৃষকের দোরগোড়ায় তার মূল্যটা পৌঁছাবে। সবজি ও ফল রপ্তানি করে শুধু যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে তা-ই নয়, এখানে সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানও।
বন্ধন: কৃষিপণ্য রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বিশ্বের বুকে রোল মডেল হওয়ার জন্য আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
এসএমজাহাঙ্গীরআলম: আমরা রপ্তানিমুখী ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করতে সেমিনার করছি, ট্রেনিং দিচ্ছি। ভবিষ্যতে আমরা আরও অনেক কাজ করব। এ ছাড়া কৃষকের পণ্য বিদেশে পাঠাতে সব ধরনের সাহায্য আমরা করব।
পান ও অন্যান্য সবজি থেকে ব্যাকটেরিয়া দূর করতে কৃষকদের নানা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বিষমুক্ত অর্গানিক কেমিক্যাল দেওয়া হচ্ছে। এসব কাজ তো আছেই। ভবিষ্যতে আধুনিক কৃষিব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিয়ে এ ধরনের ট্রেনিং আরও দেওয়া হবে, যাতে মাঠপর্যায় থেকেই রপ্তানিযোগ্য শাকসবজি আমরা সহজেই পেতে পারি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০২১।