ঝকঝকে-তকতকে দেয়াল-মেঝে; ভেতর-বাহির সবখানেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন; নেই কোনো ময়লা-আবর্জনা, অনেকটা যেন নিজ ঘরেরই টয়লেট। নগরে এ ধরনের পাবলিক টয়লেট দেখলে কিছুটা বিষ্ময় জাগে বৈকি! অথচ বছর কয়েক আগেও এ ছিল স্বপ্নের মতো। টাইলস বসানো মেঝে ও দেয়াল। রাতে ঝলমলে আলো। আধুনিক ফিটিংস, মিরর ও উন্নতমানের কমোডসংবলিত প্রতিটি টয়লেটই যেন অভিজাত্যের ছোঁয়া। শুধু তা-ই নয়, এসব টয়লেটে দুর্গন্ধ দূর করতে নিয়মিত স্প্রে করা হয় এয়ার ফ্রেশনার। উটকো গরম থেকে প্রশান্তি দিতে রয়েছে সিলিং ফ্যান। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা। মূল্য পরিশোধ করে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এ ধরনের টয়লেট ব্যবহারে কারও যেমন কার্পণ্য নেই, তেমনি আবার নান্দনিক পাবলিক টয়লেট গড়ে তুলে উপার্জন করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন স্থানে নানা সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন টয়লেট নির্মাণ করে, অর্থের বিনিময়ে পরিচ্ছন্ন টয়লেটসহ নাগরিক সেবা প্রদান করছে তারা। আর সাধারণ মানুষ তা ব্যবহারও করছে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই। রাজধানীর আধুনিক পাবলিক টয়লেটের চিত্র এখন এমনই।
বিশ্বের অন্যতম জনবহুল নগরী ঢাকায় গড়ে প্রতিদিন রাস্তায় বের হয় প্রায় ৫৫ লাখ মানুষ, যাদের প্রয়োজন হয় পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য ঢাকায় পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। আর যেগুলো রয়েছে, সেগুলো ব্যবহারের উপযোগী নয়। জনবান্ধব স্থাপত্য নকশা না হওয়ার পাশাপাশি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পাবলিক টয়লেটগুলোর দশা শ্রীহীন। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, দুর্গন্ধ, নোংরা, সিটকিনিবিহীন ভাঙা দরজা, নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা অসংগতিতে পরিপূর্ণ নগরের অধিকাংশ পাবলিক টয়লেট। নিতান্ত অপারগ না হলে কেউই এ ধরনের টয়লেট ব্যবহার করতে চান না।
নগরের অধিকাংশ পথচারী বাধ্য হয়েই যেখানে-সেখানে প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন করে। পুরুষেরা কোনোভাবে বিষয়টিকে সামলে নিলেও মহিলাদের জন্য নেই তেমন কোনো সুব্যবস্থা। তবে সম্প্রতি বদলাতে শুরু করেছে চলমান প্রেক্ষাপট। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং বেসরকারি এনজিও সংস্থা ওয়াটার এইড-এর উদ্যোগে রাজধানীতে নির্মিত হয়েছে প্রায় ৩৩টি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত টয়লেট। নির্মিত হচ্ছে আরও কতগুলো। এসব টয়লেটে নানা ধরনের সুবিধা পাচ্ছে নগরের নাগরিকেরা। এ ছাড়া বিভিন্ন শহরের ডিসি অফিস, মিউনিসিপালিটি, ব্র্যাক, আইপিডিসি, ইউনিলিভারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এনজিও আধুনিক টয়লেট নির্মাণে কাজ করছে একযোগে।
আধুনিক টয়লেটের যত সুবিধা
আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন এ টয়লেটগুলোতে প্রাকৃতিক কর্ম সম্পন্নের ব্যবস্থা ছাড়াও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে রয়েছে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা। এসব সুবিধার মধ্যে রয়েছে-
- হাত ধোয়ার জন্য পৃথক স্থানসহ লিকুইড হ্যান্ডওয়াশ
- হ্যান্ড ড্রায়ার
- বিশুদ্ধ খাবার পানি
- সাবানসহ গোসলের ব্যবস্থা
- প্রতিবন্ধীদের জন্য রয়েছে উন্নতমানের কমোড
- ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার
- মেয়েদের স্যানেটারি ন্যাপকিন চেঞ্জিং কর্নার
- বাচ্চাদের ডায়পার চেঞ্জ কর্নার
- মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা
- ব্যাগ ও অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিস নিরাপদে রাখতে নারী-পুরুষের জন্য রয়েছে আলাদা লকার চেম্বার
- নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা প্রভৃতি।
আধুনিক ও উন্নত এসব সুবিধা এবং নিরাপত্তার কারণে পাবলিক টয়লেট ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন অনেকেই। অত্যাধুনিক এ ধরনের পাবলিক টয়লেট স্থাপিত হওয়ায় নগরের সব ধরনের নাগরিক, মহিলা ও প্রতিবন্ধীরা নির্বিঘ্নে তা ব্যবহার করতে পারছে। ঢাকা শহরে বর্তমানে চাকরি, বাচ্চাদের স্কুলে আনা-নেওয়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে মহিলাদের রাস্তায় বের হতে হয়। পাবলিক টয়লেটের স্বল্পতা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পুরুষদের অবাধ প্রবেশ থাকায় আগে টয়লেট ব্যবহারে তারা অসহায় হলেও বর্তমানে নির্বিঘ্নে তা ব্যবহার করতে পারছে। এ ছাড়া প্রচুরসংখ্যক ডায়াবেটিস রোগীও এ থেকে সুফল পাচ্ছে। অথচ আগে টয়লেটের কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় পুরুষ-মহিলাদের ছুটতে হতো বিভিন্ন মার্কেট, মসজিদ ও রেস্টুরেন্টে। অনেকে টয়লেট না পেয়ে দীর্ঘসময় তা চেপে রাখত। এতে ইউরিনারি ইনফেকশন, কিডনি রোগসহ মূত্রনালির নানা ধরনের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতো।
আধুনিক টয়লেট থেকে নগরবাসী সুবিধা পেলেও প্রতিবার টয়লেট ব্যবহারে মূল্য পরিশোধ করতে হয় বলে ছিন্নমূল, ভিক্ষুক, টোকাই, রিকশাচালক, হকার, দিনমজুর ও শ্রমিক শ্রেণির জন্য এটা বেশ কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুলও বটে। কোথাও কোথাও বিনা মূল্যে এ সেবা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা দেওয়া হচ্ছে না; এমনকি তারা এটি জানেও না। আর তাই এখনো ফুটপাত, সড়কের পাশে, পার্কসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে মল-মূত্র ত্যাগ করছে। এতে একদিকে যেমন দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে নগরের সৌন্দর্যেরও।
আশার কথা, রাজধানীতে প্রতিটি জনবহুল এলাকায় অত্যাধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজ চলছে। এরই মধ্যে নগরের গাবতলী বাস টার্মিনাল, ফার্মগেটের ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালসংলগ্ন পার্কের পাশে, আনন্দ সিনেমা হলের পাশে, মহাখালীর ওয়াসা পাম্পসংলগ্ন, শ্যামলীর শিশুপার্কসংলগ্ন, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড, নাবিস্কো হাজি মরণ আলী রোড, ওসমানী উদ্যানে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব ও গেটসংলগ্ন, মিয়াজান গলি, পল্টন, পান্থকুঞ্জ পার্ক, মুক্তাঙ্গন পার্ক, বাহাদুর শাহ পার্কসহ বেশ কিছু টয়লেটের কাজ শেষ হয়েছে, যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকাসহ দেশব্যাপী আধুনিক টয়লেট নির্মাণের কাজ অব্যাহত রয়েছে।
রাজধানীসহ দেশব্যাপী আধুনিক পাবলিক টয়লেট স্থাপিত হলেও এখনো অধিকাংশ পথচারী তা ব্যবহার করছে না। আবার ব্যবহারের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকে জানেই না এসব টয়লেটের অবস্থান কোথায়। এ সমস্যাটির সমাধানে ‘পাবলিক টয়লেট’ নিয়ে তৈরি হয়েছে অ্যাপ। ঢাকার পাবলিক টয়লেট খুঁজে দিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠান প্রেনিউর ল্যাব ও ওয়াটার এইডের উদ্ভাবন ‘ঢাকা পাবলিক টয়লেটস’ (Dhaka Public Toilets) অ্যাপস। অ্যাপসটি প্লে স্টোর থেকে ডাউনলোড করে এর সাহায্যে যেকোনো ব্যক্তি তার আশপাশে থাকা টয়লেটের খোঁজখবর পাবেন। জানতে পারবেন টয়লেটের সুবিধা সম্পর্কে বিস্তারিত। সেখানে পরিচ্ছন্নতার অবস্থা, নারীদের উপযোগী কি না, কয়টি রুম আছে, লাগেজ রাখার ব্যবস্থা আছে কিনা, খাবার পানি ব্যবস্থা, ব্যবহারের চার্জসহ প্রতিটি টয়লেটের প্রায় ১৯ ধরনের তথ্য জানতে পারবেন। টয়লেটে পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে কি না, সেটি প্রতিবন্ধীবান্ধব কি না, ব্যবহারের ফি রয়েছে কি না এসব বিষয় অ্যাপসটির মাধ্যমে জানা যাবে।
টয়লেটের ছবি ও পূর্বে ব্যবহারকারীদের রিভিউয়ের অবস্থা বুঝতে সাহায্য করবে। ব্যবহারকারীদের দেওয়া রিভিউ রেটিং অন্যদের উন্নত টয়লেট খুঁজতে সাহায্য করবে, যা একই সঙ্গে টয়লেটের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে সহায়তা করবে। কাজ শুরুর আগেই ২০১৬ সালে আইডিয়া দিয়ে প্রেনিউর ল্যাব দেশে ‘ব্র্যাক মন্থন ডিজিটাল ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড’ পায়। একই বছর জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড সামিট অ্যাওয়ার্ডে ‘স্মার্ট সেটেলমেন্ট অ্যান্ড আরবানাইজেশন’ বিভাগে সেরা অ্যাপস নির্বাচিত হয় এটি। এ ছাড়া অ্যাপসটি সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত একটি প্রতিযোগিতায় অ্যাওয়ার্ড জিতেছে। অ্যাপসটির ডাউনলোড লিংক- https://play. google. com/store/apps/details? id=softworks. com. toilettracker.এ ছাড়া ‘পাবলিক টয়লেট বাংলাদেশ’ নামে আরও একটি অ্যাপ গুগল প্লে স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে।
আধুনিক এসব টয়লেট নিঃসন্দেহে নগরবাসীর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। তবে প্রতিটি শহরের ব্যস্ত এলাকায় অভিজাত টয়লেটের পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারের উপযোগী পর্যাপ্ত টয়লেট স্থাপন এখন সময়ের দাবি। ভারতের বিভিন্ন শহরে বাসস্ট্যান্ড, স্টপিজ, রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে রয়েছে মূত্র ত্যাগের স্থান যেখানে পথচারীরা বিনামূল্যে মূত্রত্যাগ করতে পারে। রাজধানীর জায়গাস্বল্পতার কারণে অনেক স্থানে বিশেষ করে প্রধান সড়কসংলগ্ন পাবলিক টয়লেট স্থাপন সহজ কাজ নয়। অথচ পথচারীদের জন্য সড়ক কিংবা ফুটপাতসংলগ্ন টয়লেট সবচেয়ে জরুরি। পথচারীদের জন্য সহজ ব্যবহার্য পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা না গেলে নগরে এসব পাবলিক টয়লেটের প্রকৃত সুফল মিলবে না।
বিশেষজ্ঞ মত
‘সবার কাছে পাবলিক টয়লেট গ্রহণযোগ্য করতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ’
দীর্ঘদিন ধরে নগরীর পাবলিক টয়লেট সমস্যা নিয়ে কাজ করছে ‘ভূমিজ’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ২০১৭ সালে কীভাবে ঢাকার নারীদের স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে ‘ব্র্যাক ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ কম্পিটিশন’-এ এমন আইডিয়া দিয়েছিল ভূমিজ। আইডিয়াটি পছন্দ হয় আয়োজকদের। ‘ব্র্যাক ইনোভেশন চ্যালেঞ্জে অ্যাওয়ার্ড’ জয় করে ভূমিজ। বর্তমানে সারা দেশে ১০টি পাবলিক টয়লেট স্থাপন করেছে তারা, যার মধ্যে ঢাকায় আছে ৬টি। ভবিষ্যতে সারা দেশে কয়েক হাজার পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা করার পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানটির। এসব নিয়ে ‘বন্ধন’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির কো-ফাউন্ডার ও চিফ ডিজাইনার স্থপতি মাসুদুল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফুল হক মিঠু।
পাবলিক টয়লেট নিয়ে কাজ করার চিন্তা কীভাবে এল? ভূমিজই–বা কীভাবে বিষয়টার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলো?
পাবলিক টয়লেট নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি ২০১৬ সালে। আমি এবং আরেক কো-ফাউন্ডার ফারহানা রশীদ মিলে শুরু করি ভূমিজ। আমরা দুজনই স্থপতি। আমি হংকং থেকে আরবান ডিজাইনে ও ফারহানা সুইডেন থেকে আরবান প্ল্যানিং বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করি। পড়াশোনা শেষে ২০১৬ সালে আমরা দেশে ফিরে আসি। আমাদের শহরে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকলেও পাবলিক টয়লেটের সমস্যা আমরা নিজেরাই প্রকটভাবে অনুধাবন করতাম। মেয়ে বিধায় ফারহানা বেশি সমস্যায় পড়ত। তা ছাড়া ঢাকায় খুব বেশি পাবলিক টয়লেট ছিল না, যা ছিল সেগুলোর অবস্থাও করুণ। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ছেলেরা মসজিদ বা শপিংমলে যেতে পারলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে কিছু রেস্টুরেন্ট ছাড়া নেই তেমন উপায়।
আমরা উপলব্ধি করি, রাজধানীতে যেসব টয়লেট আছে, সেগুলো পাবলিক নয়। কিছু পাবলিক টয়লেট থাকলেও সেগুলোর অবস্থান সম্পর্কেও আমদের তেমন ধারণা নেই। পাবলিক টয়লেটগুলো অপরিচ্ছন্ন; পানি ও টিস্যুর ব্যবস্থা নেই। এক কথায় ব্যবহারের অনুপযোগী। সেখান থেকেই আমাদের নগর স্যানিটেশন-বিষয়ক ভাবনা খেলে যায়। ঠিক সে সময়টাতেই ‘ব্র্যাক ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’ নামের একটি ডিজাইন কম্পিটিশন আয়োজন করে। সেখানে আমরা আধুনিক পাবলিক টয়লেটের আইডিয়া সাবমিট করি। আর তা আয়োজকদের পছন্দ হয়; আমরা জয়ী হই। সেখান থেকে আমরা কিছু অনুদানও পাই। এভাবেই শুরু হয় ভূমিজ-এর নগর স্যানিটেশন-বিষয়ক কার্যক্রম।
আমরা অনুদানের অর্থ দিয়ে ২০১৭ সালে নিউমার্কেট এলাকার ব্যস্তমুখর গাউসিয়ার নূর ম্যানশন মার্কেটে আধুনিক পাবলিক টয়লেট করার চিন্তা করি। কারণ, গাউসিয়া মার্কেটে মেয়েরাই বেশি কেনাকাটা করতে এলেও সেখানে টয়লেটের কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই। মার্কেট কমিটিকে আমরা বুঝিয়ে রাজি করাই। তাঁদের সঙ্গে পার্টনারশিপে সেখানকার একটি টয়লেটকে একান্তই মেয়েদের জন্য গড়ে তুলি। কাজটির বিশেষত্ব ছিল, নতুন করে কোনো টয়লেট না বানিয়ে আগেরটাকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ও কিছুটা রিনোভেট করেই রূপ দিই একটি আধুনিক ব্যবহারোপযোগী টয়লেটের।
অন্যান্য স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান যেখানে বাণিজ্যিক ও আবাসিক স্থাপত্যচর্চায় অধিক আগ্রহী, সে ক্ষেত্রে ভূমিজ কেন এমন জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ বেছে নিলো?
পাবলিক স্যানিটেশন ও টয়লেট সমস্যাটা নিয়ে কাউকে না কাউকে তো কাজ করতেই হতো। স্থপতির কাজ কেবল উচ্চবিত্তের জন্যই নয়, প্রতিনিয়ত নিজেরা যেই সমস্যার মুখোমুখি হই, তা সমাধান করাও দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। আমরা বিশ্বাস করি সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত চেষ্টার মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করে জনমানুষের কাছে এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
টয়লেট নান্দনিক হবে এটা নিয়ে এ দেশে আগে কেউ ভাবেনি? নান্দনিক টয়লেট নির্মাণের চিন্তাটা কীভাবে এল?
টয়লেট নান্দনিকই হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের অন্যতম একটা বড় উপাদান হাইজেনিক স্যানিটেশন। অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের কারণে অনেক রোগ-ব্যাধি হয়। সবদিক ভেবেই নান্দনিক ও কার্যকর পাবলিক টয়লেট করার চিন্তা করি আমরা। আমরা এটার সঙ্গে যুক্ত করি অ্যাপ্রোপিয়েটনেস ইন ডিজাইন অর্থাৎ আমাদের সামাজিক পরিস্থিতি, ব্যবহারকারীদের অভ্যাস প্রভৃতি বিষয়।
টয়লেট ডিজাইনে আপনারা কোন কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেন। নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য তা ব্যবহারের উপযোগী কি না?
আমরা যে সমাজে; যে পরিবেশে বাস করি, তার উপযোগী করে টয়লেট তৈরি করি। নারী, শিশু কিংবা প্রতিবন্ধীদের কথা বিশেষভাবে বিবেচনায় রেখেই করা হয়। টয়লেটগুলোতে নারীদের জন্য প্যাড চেঞ্জিং, বাচ্চাদের জন্য ডায়পার চেঞ্জিং ফ্যাসিলিটি (সুবিধা) রাখি। ডিজাইনে আমরা নিশ্চিত করি যাতে নারীরা প্রোপার প্রাইভেসি পায়। টয়লেটকে আমরা নান্দনিক ও সর্বোচ্চ ব্যবহারের উপযোগী করার চেষ্টা করি। টয়লেটের ইনফ্রাসট্রাকচার যেন প্রোপার প্ল্যানিং মতো হয় সেদিকে আমরা বিশেষভাবে সচেতন।
আপনাদের ডিজাইনকৃত টয়লেটগুলোতে বাচ্চাদের ডায়পার চেঞ্জ কর্নার থেকে মোবাইলে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে খরচ কেমন হয়? মেইনটেইন কীভাবে করেন?
এই বিষয়টা টয়লেটের অবস্থান, নির্মাণ ও পরিচালন খরচ প্রভৃতির ওপর নির্ভর করে। তা ছাড়া টয়লেটের কী কী সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সেগুলোর ওপরেও। ধরুন, বাসস্টেশনে যে টয়লেট, সেটার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেশি। কারণ, সেটা প্রতিদিন হাজারো মানুষ ব্যবহার করে। যে টয়লেট ১ হাজার জন ব্যবহার করে সেটার মাসিক খরচ, ২০০ জন ব্যবহার করা টয়লেটের থেকে অবশ্যই বেশি হবে।
বসবাসযোগ্য মানবিক নগরী গড়তে পাবলিক টয়লেটের গুরুত্ব কতটুকু বলে আপনি মনে করেন?
পাবলিক টয়লেটকে আমরা মৌলিক চাহিদা বলতে পারি। খাদ্য গ্রহণ ও ত্যাগ প্রাণীদেহের নিত্য একটা কার্যক্রম, যেটা ছাড়া কেউ বাঁচতে পারবে না। দিনের একটা লম্বা সময় কাজ বা ভ্রমণে আমাদের বাইরে থাকতে হয়। এ সময়ে প্রাকৃতিক কাজ সারতেই হবে। আমরা দেখেছি, পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেটের অভাবে বাংলাদেশের মেয়েরা বাইরে এলে অনেক সময় পানি পর্যন্ত খান না। এতে মেয়েদের প্রচুর ইউটিআই, কিডনি ডিজিসের মতো রোগ হচ্ছে। যেগুলো পরবর্তী সময়ে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এসব দিক বিবেচনায় স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেটের গুরুত্ব অর্থের অঙ্কে পরিমাপ করা যাবে না।
নগরের ভ্রাম্যমাণ মানুষের সামর্থ্য নেই, অর্থ ব্যয় করে পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করার। বিনামূল্যে ব্যবহারের কোনো সুযোগ আছে কি? না থাকলে তাদের জন্য কোনো বিকল্প ভাবনা কি আপনাদের প্রস্তাবনায় রয়েছে?
আমাদের প্রতিটা টয়লেটে নির্দেশনা রয়েছে, যাদের টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তারা বিনা মূল্যে ব্যবহার করতে পারবে। প্রতি মাসেই অনেক মানুষ আমাদের টয়লেট ফ্রি ইউজ করে। আমরা এমনভাবে টয়লেট ডিজাইন করে পরিচালনা করি যেন ধনী-গরিব সবাই ব্যবহার করতে পারে। কেউ যেন মনে না করে সেগুলো ধনীদের জন্য। আমাদের অনেক সাবস্ক্রাইব ইউজার আছে। যেমন, নূর ম্যানশন মার্কেটের কর্মজীবী মেয়েরা মাসে স্বল্পমূল্যে পরিশোধ করে যত খুশি ততবার টয়লেট ব্যবহার করতে পারে। যেহেতু তাঁদের বেতন কম অথচ প্রয়োজনটা বেশি। এটা আসলে সম্ভব হয়েছে প্রোপার বিজনেস মডেলের মাধ্যমে।
কল্যাণপুরে একটা কমিউনিটি টয়লেট আছে আমাদের, যেখানে ক্লিনার ও অ্যাটেন্ডেন্স নিয়োজিত রয়েছে। সেখানে ওই এলাকার মানুষও নাম মাত্র অর্থ ব্যায়ে যতবার ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারে। সেখানে আমরা বিশুদ্ধ খাবার পানি বিক্রি করি, ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ওয়াশের ব্যবস্থা আছে। এসব আয় থেকেই মূলত কমিউনিটি টয়লেটটা চলে। সবার কাছে পাবলিক টয়লেট গ্রহণযোগ্য করা অসম্ভব কিছু নয়। ভবিষ্যতে আমরা কম আয়ের মানুষের জন্য কাজ করব, আয় নিশ্চিত করেই।
জনগুরুত্বপূর্ণ এ সমস্যাটি শুধু রাজধানীতে নয় বরং সারা দেশে, ঢাকার বাইরে আপনারা কোনো কাজ করেছেন কি?
ঢাকার বাইরে আমরা কাজ শুরু করেছি। ২০১৮ সালে রংপুরে একটা টয়লেট চালু করেছি। খুলনা, যশোর, বেনাপোল, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া এলাকাতেও কাজ করছি। নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া ও রেলগেটে টয়লেট নির্মিত হচ্ছে। পরে আরও দুইটার কাজ শুরু করব। চট্টগ্রামেও দ্রুতই কার্যক্রম শুরু হবে। এ ছাড়া পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থাপনাটা কীভাবে উন্নতি করা যায় তা নিয়েও আমরা গবেষণা করছি।
দেশের প্রায় অধিকাংশ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টয়লেট অপরিষ্কার, প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন–ব্যবস্থায় মনোযোগী হয় না কেন?
স্কুল স্যানিটেশন অনেক বড় সেক্টর। আমার মনে হয়, স্কুল স্যানিটেশন আগে যা ছিল এখন সেটা আরও অবনতি হয়েছে। পাবলিক ও প্রাইভেট দুই রকম স্কুল আমাদের আছে। প্রাইভেটে যেহেতু খরচ বেশি, তাই ওখানকার অবস্থা ভালো। সরকারি স্কুলগুলোতে সঠিকভাবে তদারকি করা হয় না। এটা আসলে প্রতিষ্ঠানের মাইন্ড সেটগত (মানসিকতা) সমস্যা। যাঁরা প্রতিষ্ঠান চালান, তাঁরা টয়লেটকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনাও তাঁরা করেন না। তবে সম্প্রতি স্কুল স্যানিটেশনের ব্যাপারে সরকার তৎপর হচ্ছে। কাজ করছে অনেক এনজিও ও প্রতিষ্ঠান। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারের উপযোগী টয়লেট নিয়েও কাজ করছি।
গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আপনারা সরকার, সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য সংগঠনের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
আমরা ইতিমধ্যে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করছি। উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কিছু কাজ করছি। ভালো সাড়াও পাচ্ছি। ২০১৭ সালে আমরা একটা টয়লেট চালু করেছিলাম। এখন আমরা ছয়টা চালাচ্ছি। এই বছরের মধ্যে হয়তো-বা আরও ২০টি টয়লেট চালু করতে পারব। আমরা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, রংপুর ডিসি অফিস, কুষ্টিয়া মিউনিসিপালিটির সঙ্গে কাজ করেছি। বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গেও কাজ করছি। ভবিষ্যতে আরও করব। এনজিওর মধ্যে ব্র্যাক আমাদের বিজনেস পার্টনার। ওয়াটার এইডের কিছু টয়লেট আমরা দেখাশোনা করছি। এ ছাড়া আইপিডিসি, ইউনিলিভারসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা কাজ করছি।
আপনাদের প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলুন?
আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে অন্তত এক হাজার পাবলিক টয়লেট বানানোর চিন্তা আছে আমাদের। এ বছরই ঢাকায় আরও ছয় থেকে সাতটা টয়লেট করব। এ ছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ে, সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে পাবলিক টয়লেট করব। আমরা চাই, পাবলিক টয়লেটগুলো যেন সঠিক স্থানে স্থাপনের মাধ্যমে প্রোপারলি মেইনটেইন করা হয়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২০।