অন্দরের সৌন্দর্যে বৈচিত্র্যময় ফিটিংস ও ফিক্সারস

সকালে  ঘুম থেকে জেগে উঠেই নিতে হয় কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি। প্রাকৃতিক কর্ম সেরে গোসল বা মুখ-হাত ধুয়ে শুরু হয় নতুন একটি দিনের। আবার কর্মজীবনের ব্যস্ততা শেষে ঘরে ফিরে সব ক্লান্তি দূর করতে ওই একই কাজের পুনরাবৃত্তি। তবে ছোট ছোট এসব কাজের মধ্যেও রয়েছে সৌন্দর্য। এই যেমন বেসিনে দাঁড়িয়ে ফসেটটি ছেড়ে মুখ-হাতে পানি দেওয়া, শাওয়ারের অবিরাম জলধারার নিচে দাঁড়িয়ে স্নানে মেতে ওঠা, ঝকঝকে কমোডে প্রাকৃতিক কাজ সারা ইত্যাদি। তবে বাথরুম ফিটিংস ও ফিক্সারস থেকে এমন চনমনে অনুভূতি পেতে দরকার উন্নতমানের শাওয়ার সেট, ফসেট, বেসিন ও কমোড। শুধু তা-ই নয়, আধুনিক ডিজাইন ও প্রযুক্তিসম্পন্ন এসব ফিটিংস ও ফিক্সারস অন্দরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে বহুগুণ। এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে দেশি-বিদেশি মডেল, ফিচার ও দামভেদে চমৎকার সব ফিটিংস। 

ডিজাইন বৈচিত্র্য

বৈচিত্র্যময় ডিজাইন, রং ও আকারের বাহারি সব শাওয়ার সেটের বিশেষত্ব হলো এগুলোর পানির প্রবাহ অত্যন্ত মসৃণ ও সাবলীল। ফিটিংসে সাধারণত মরিচা ও দাগ পড়ে না। শাওয়ার মিক্সার সুবিধাও মিলবে এসব ফিটিংসে। তা ছাড়া প্রতিনিয়তই যোগ হচ্ছে নিত্যনতুন প্রযুক্তি। যেমন, অটোমেটেড শাওয়ার সেটে যুক্ত হচ্ছে সেন্সর প্রযুক্তি, যা শরীরের নাগালে এলেই পানি বের হতে শুরু করে। এগুলোর কয়েকটিতে ইলেকট্রনিক থার্মাল সিস্টেমজুড়ে দেওয়া আছে, যাতে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে পানির তাপমাত্রা। 

  • শাওয়ার ফিটিংসের রকমফের
  • ওয়াল বারস
  • হ্যান্ডশাওয়ার/হ্যান্ডস্প্রে
  • হ্যান্ডশাওয়ার প্লাস ওয়াল বারস
  • স্ট্যান্ডিং শাওয়ার সেট।

ওয়াল বারস শাওয়ার সেট সরাসরি স্নানঘরের দেয়ালে স্থাপন করা যায়। হ্যান্ডশাওয়ার সেট স্নানঘরের দেয়ালে স্থাপন করলেও তা হাতে নিয়ে সুবিধাজনক স্থানে ব্যবহার করা যায়। এর লম্বা হোজ পাইপের জন্য কিছুটা দূরে অথবা বাথটাবে স্নান হয় উপভোগ্য। এর বিশেষ সুবিধা হচ্ছে হাতলে সুইস থাকায় পানির অপচয় রোধ করা যায় সহজেই। হ্যান্ডশাওয়ার প্লাস ওয়ালবারস শাওয়ার সেট স্নানঘরের দেয়ালে স্থাপন করা থাকলেও বৈশিষ্ট্যে এটি কিছুটা ভিন্ন। এই ধরনের সেট ওয়ালবারসের মতো নির্দিষ্ট শাওয়ার হেড যেমন থাকে, একই সঙ্গে মূল শাওয়ার বারের বা বডির সঙ্গে হ্যান্ডশাওয়ার ফিটিংসও থাকে। ফলে উভয়ভাবেই শাওয়ার উপভোগ করা যায়। স্টান্ডিং শাওয়ার সেট স্থানঘরের মেঝেতে প্রয়োজনীয় স্থানে রাখা যায়। এই শাওয়ার ফিটিংস শাওয়ার স্ট্যান্ড হোল্ডারের সঙ্গে হোসযুক্ত হ্যান্ডশাওয়ারসংবলিত। স্বাভাবিক স্থান ছাড়াও বাথটাবে ব্যবহারের জন্য এই সেট বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। ভাড়া বাসার জন্য এই ধরনের শাওয়ার সেট দারুণ উপযোগী। বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের এসব শাওয়ার হেড সাধারণত স্কয়ার, রাউন্ড, ওভাল, রাউন্ডেড স্কয়ার, রেক্টেঙ্গুলার এবং ডিশেপ আকৃতির হয়ে থাকে।

দরদাম

ব্র্যান্ড, মান ও ডিজাইনভেদে হ্যান্ডশাওয়ার সেটের দাম পড়বে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে। ইকো স্মার্ট প্রযুক্তিসম্পন্ন এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় শাওয়ার ফিটিংস ২৫-৬০ শতাংশ পর্যন্ত পানি সাশ্রয়ে সক্ষম। ব্র্যান্ড ও মানভেদে এগুলোর দাম পড়বে ৭ হাজার টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। 

ফসেট

বেসিন ও বাথটাব মিক্সারের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ফসেট। মূলত বেসিনে ব্যবহৃত পানির কল বা ট্যাপকেই বলা হয় ফসেট। ক্রেতার রুচি, চাহিদা মেটাতে ও অন্দরের আভিজাত্য ফুটিয়ে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বাহারি ডিজাইন, রং, ফিচার ও প্রযুক্তিসম্পন্ন দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের দারুণ সব ফসেট। স্টিল, গোল্ডেন, কপার, ক্রোম (ম্যাট, ব্রাশড বা পলিশড), প্লাটিনামসহ বিভিন্ন রঙের ফসেট এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। 

  • রকমফের
  • বল ফসেট
  • ডিস্ক ফসেট
  • কার্টিজ ফসেট
  • ওয়াইড স্প্রেড ফসেট
  • পুশ-বাটন ফসেট
  • কম্প্রেশন ওয়াশার ফসেট
  • অটোমেটেড ফসেট।

সিঙ্গেল ও ডাবল উভয় ধরনের ফসেট বাজারে পাওয়া গেলেও এ সময়ের ফসেট বেশ স্লিম ও বাহারি ডিজাইনের। তা ছাড়া পানির ধারাও সাবলীল যা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে না। এসব ফসেটে সিরামিক ডিস্ক, কার্টিজ, গরম ও ঠান্ডা পানির ভিন্ন ভিন্ন চেম্বার যুক্ত থাকে। বৈদ্যুতিক বা সেন্সরযুক্ত ফসেটে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং কলের নিচে হাত রাখলেই পাওয়া যায় পানির ধারা। একে ইনফ্রারেড ফসেটও বলা হয়। রান্নাঘর, বেসিন, পাবলিক ওয়াশরুম, এয়ারপোর্ট, হোটেলে পানির অপচয় রোধে খুবই কার্যকর। 

দরদাম

আমাদের দেশে চীন, মালয়েশিয়া, ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উৎপাদিত ফসেট পাওয়া যায়। ব্র্যান্ড, মান, ডিজাইন ও বিক্রয়োত্তর সেবাভেদে ফসেটের দাম পড়বে ৭ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। 

সিরামিক বেসিন

আমাদের দিনের শুরুটাই হয় বেসিনে মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হওবার মধ্য দিয়ে। চনমনে ভাবটা তখনই ফিরে আসে, যখন মুখ-হাত ধোয়ার বেসিনটা হয় নান্দনিক। ঝকঝকে-তকতকে বেসিন যেমন চোখের প্রশান্তি তেমনি আনন্দের খোরাকও বটে। অত্যাধুনিক ডিজাইনের সুদৃশ্য বেসিন প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ঘরের সৌন্দর্যবর্ধনে যোগ করে নতুন মাত্রা। বেসিনের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সিরামিকস বেসিনের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি।

ডিজাইন, রং ও ধরন

বাজারে বিভিন্ন ডিজাইন, রং ও আকারের বেসিন পাওয়া যায়। এসব বেসিন যেমন আধুনিক ডিজাইনের সম্পূর্ণ নতুন লুকে পাওয়া যায়, একই সঙ্গে পুরোনো ডিজাইনের সঙ্গে নতুনের মিশেলেও বিক্রি হয়। বাজারে আকার বৈচিত্র্যে যেসব বেসিন পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম-

  • চারকোনা বা স্কয়ার
  • গোলাকার বোল আকৃতির 
  • ওভাল বা ডিম্বাকৃতির।

রঙের মধ্যে সাদা, অফহোয়াইট, পার্পেল, গাঢ় ও হালকা নীল বেশি জনপ্রিয়। সম্প্রতি প্রিন্টেড পেডিস্টাল বেসিনও পাওয়া যায়। এসব বেসিনের ডিজাইন ও আকারভেদে সাধারণত ওজন ৫ কেজি থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাজারে প্রচলিত বেসিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

  • ইন্টিগ্রেটেড পেডিস্টাল বেসিন
  • হাফ পেডিস্টাল বেসিন 
  • ওয়াল হ্যাং বেসিন
  • কর্নার বেসিন
  • কাউন্টার বেসিন
  • কেবিনেট বেসিন
  • আন্ডার কাউন্টার বেসিন
  • ওভার কাউন্টার বেসিন ইত্যাদি।

বাজারে প্রচলিত ব্র্যান্ডসমূহ

বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বেসিন পাওয়া যায়। এর মধ্যে রোসা, মারকুইস, আরএকে, টোটোসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বেসিন রয়েছে ক্রেতা চাহিদার শীর্ষে।

আকারভেদে দরদাম

চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশের বেসিন ছাড়াও দেশে তৈরি বেসিন বাজারে পাওয়া যায়। সাধারণত ডিজাইন, মান ও সাইজ অনুযায়ী এর দাম নির্ধারিত হয়। ছোট আকারের বেসিন ১ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা, মাঝারি বেসিন ২ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, বড় বেসিনের দাম ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। কাউন্টারসহ উন্নতমানের ও আমদানি করা বেসিনের দাম পড়বে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে। 

সিরামিকস কমোড

আধুনিক টয়লেট-ব্যবস্থা মানেই রুচিবান বাসিন্দা। এ জন্য ঝকঝকে সুন্দর ইন্টেরিয়রে বাথরুম ডেকোরেশনও ক্রমেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাথরুম বা টয়লেটের শোভা বাড়াতে জুড়ি নেই বৈচিত্র্যময় সিরামিকস কমোডের। দৃষ্টিনন্দন এসব কমোড অন্দরের সৌন্দর্যবর্ধক অনুষঙ্গ হিসেবে বেছে নিচ্ছে শৌখিন ও সৌন্দর্যপ্রিয় অনেকেই। সিরামিকস কমোডের কদর যে দিন দিন বাড়ছে তা কিন্তু নয় বরং আজকাল এটি পরিণত হয়েছে ফ্যাশনেও। 

আগে লো-কমোডের চল থাকলেও এখন হাই-কমোডও সমান জনপ্রিয়। প্রতিনিয়তই কমোডে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক সব ফিচার। ধরনেও থাকছে বৈচিত্র্য। সাধারণত কমোড দুই ধরনের-

  • ক্ল্যাসিক্যাল 
  • মডার্ন।

মডার্ন কমোডের মধ্যে রয়েছে- 

  • ইউরোপিয়ান বা ওয়েস্টার্ন ক্লোসেট
  • ফ্লোর মাউন্টস
  • ওয়াল হ্যাংগ
  • রিমলেস
  • টর্নেডো।

কমোডের দরদাম

আধুনিক কমোডগুলো যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি কেনার খরচটাও নেহাত কম নয়। কয়েক লাখ টাকার কমোডও রয়েছে বাজারে। দেশি বাজারে আমদানি করা কমোডের দাম ৩০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে। তবে ২ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে দেশি-বিদেশি কমোড কিনতে পাওয়া যায়। 

যত্নআত্তি ও দরকারি টিপস

  • ফিটিংস ও ফিচারস কেনার আগে পণ্যের গুণগতমান ও বিক্রয়োত্তর সেবার বিষয়টি ভালোমতো জেনে নেওয়া ভালো।
  • দাম বেশি হলেও উন্নতমানের পণ্য কেনা উচিত, এতে দীর্ঘস্থায়িত্বের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। সস্তা ও নন-ব্র্যান্ডের পণ্য কিছুদিনের মধ্যেই রং ও মান নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
  • শুধু দাম দিয়ে ভালো পণ্যটি কিনলেই হবে না, লক্ষ রাখতে হবে তা যেন ঘরের সঙ্গে খাপ খায়। সঠিক পণ্যটি বেছে নিতে একজন অভিজ্ঞ ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের পরামর্শ নিতে পারেন।  
  • ফিটিংস ও ফিক্সারস লাগাতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ স্যানিটারি মিস্ত্রির সাহায্য নেওয়া উচিত। এতে ফিটিংসগুলো মাপমতো বসানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। 
  • পানি জীবাণুর উপস্থিতির কারণে কিছুদিন পরপর শাওয়ার হেড ও ফসেট পরিষ্কার করা উচিত। শাওয়ার নেওয়ার আগে কিছু সময় শাওয়ার ছেড়ে রাখা দরকার।
  • স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বেসিন ও কমোড সব সময় পরিষ্কার রাখা উচিত। কারণ, এসব স্থানে প্রচুর ব্যাকটেরিয়া জন্মে।
  • বেসিনে কোনো কিছু লাগলে দ্রুত তুলে ফেলতে হবে, তা না হলে তা ওঠাতে বেগ পেতে হতে পারে। 
  • কমোড শুষ্ক রাখা উচিত, যাতে ময়লা বা গাদ জমতে না পারে। ফলে কমোড থাকে চকচকে।

যেখানে পাবেন

রাজধানীতে বাথরুম ফিটিংস ও ফিক্সারস পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার হাতিরপুল, বাংলামোটর ও গ্রিন রোড। এ ছাড়া নবাবপুর, বনানী, মিরপুর, উত্তরা, কুড়িল, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা ছাড়াও দেশব্যাপী স্যানিটারিসামগ্রী বিক্রির দোকানে মিলবে শাওয়ার সেট, ফসেট, বেসিন ও কমোড। আমদানি করা সিরামিকস বেসিনের একটি বড় বাজার রাজধানীর গ্রিন রোডের গ্রিন সুপার মার্কেট। বিভিন্ন সিরামিকস কোম্পানির আউটলেটেও পাবেন বেসিন ও কমোড। এ ছাড়া অথবা ডট কম, দারাজ ডট কমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনলাইনেও এসব ফিটিংস ও ফিচারস বিক্রয় ও সরবরাহ করে থাকে। চাইলে সেখান থেকেও অর্ডার দিয়ে বুঝে নিতে পারেন আপনার পছন্দের পণ্যটি।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৬তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৯

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top