এসির হাওয়ায় শীতল ঘর

প্রচন্ড গরমে শীতল পরশ পেতে চান, তাহলে ঘরে এসি লাগান! বৈষ্ণিক তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে তাতে এসি ছাড়া টেকাই দুষ্কর। আবহাওয়া খুব বেশি উত্তপ্ত না হলে সিলিং বা টেবিল ফ্যানে কাজ চলে কিন্তু গরম বেশি পড়লে কোনোভাবেই প্রশান্তি মেলে না। কারণ, গরম বাতাস ঠান্ডা করার ক্ষমতা ফ্যানের নেই। অথচ সেই কাজটিই দারুণভাবে করতে পারে এসি তথা এয়ার কন্ডিশনার। আগে এই শীতাতপ যন্ত্রটি শুধু উচ্চবিত্তের ঘরেই দেখা মিললেও এখন তা চলে এসেছে মধ্যবিত্তের হাতের নাগালে। তা ছাড়া বিভিন্ন কোম্পানি হ্রাসকৃত মূল্যে ও কিস্তি সুবিধা দিচ্ছে এসি কেনার ক্ষেত্রে। এতসব সুবিধা থাকা সত্তে¡ও হুট করেই তো আর এসি কেনা যায় না। এ জন্য জানতে হবে ঘরের সঙ্গে কত ক্ষমতাসম্পন্ন এসি মানায়, কোন এসিতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। এ ছাড়া এসি কিনতে কী কী মাথায় রাখতে হয়; পাঠকের এই কৌতূহল মেটাতে এসির আদ্যোপান্ত নিয়ে এ আয়োজন। 

যেভাবে কাজ করে

এসি বাইরের গরম বাতাসকে শীতল করে অন্দরের তাপমাত্রা রাখে ঠান্ডা কিন্তু কীভাবে? একটি সাধারণ সূত্র হচ্ছে, কোনো কিছু থেকে তাপ (তাপশক্তি) সরিয়ে বা বের করে দিলেই তা ঠান্ডায় পরিণত হয়। তবে এসিতে এ প্রক্রিয়াটি কীভাবে ঘটে তা বুঝতে হলে গ্যাসের কিছু সাধারণ ধর্ম বুঝতে হবে। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুসারে, যখন কোনো তরলকে গ্যাসে পরিণত করা হবে তখন তাপের শোষণ ঘটবে। যদি ঘনীভূত (তরল) অবস্থা থেকে প্রসারিত হয়ে গ্যাসীয় অবস্থায় যায়, তাহলে কিছু শক্তির প্রয়োজন হয়। এই বিষয়টাই কাজ করে এসিতে। এসির প্রক্রিয়া ঠিকঠাক চলার জন্য থাকে একটি কমপ্র্রেসর, যেটি গ্যাসকে চাপের মধ্যে ফেলে বা কমপ্রেস করতে আরম্ভ করে। এই প্রক্রিয়ার ফলে অপ্রয়োজনীয় তাপের সৃষ্টি হয়। এসির কপার কয়েলের মধ্যে এক বিশেষ ধরনের কেমিকেল থাকে, যেখানে তরল থেকে গ্যাস এই প্রক্রিয়াকে ফোর্স করে বারবার করানো হয়, আর এভাবেই চারপাশের আবহাওয়া থেকে গরম শোষণ করে নেওয়া হয়। 

বিস্তারিত বলতে গেলে, বিশেষ প্রক্রিয়ায় এসির কমপ্রেসর হিমায়ক গ্যাস বা বাম্পকে প্রচন্ড চাপে পাঠিয়ে দেয় ঘনীভবকে। সেখানে এই চাপের বাম্প উচ্চচাপের তরলে পরিণত হয়। এই তরলকে এরপর প্রসারণ ভালভের ভেতর দিয়ে পাঠানো হয়। এর ফলে চাপ কমে তরল ভিজে বাষ্পে পরিণত হয় অনেক কম উঞ্চতায়। এই বাষ্প বাষ্পীভবকের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করে। এই সময় ভিজে বাষ্পসংলগ্ন নলের গা থেকে তাপ শোষণ করে শুষ্ক সম্পৃক্ত বাষ্পে পরিণত হয়। নল এই তাপ চারপাশের বাতাস থেকে সংগ্রহ করে বাতাসকে ঠান্ডা রাখে। তা ছাড়া এসির মধ্যে ফ্যান থাকে, যেটি ভেতরের গরম বাতাসকে ঠান্ডা পাইপের ভেতর দিয়ে পরিচালিত করে। এই ঠান্ডা বাতাসই তখন ফ্যানের সাহায্যে রুমজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেই বাতাসের থেকে ধুলোবালি পরিষ্কার (ফিল্কটারের মাধ্যমে) বা যদি বাতাসে বেশি জলীয় বাষ্প থাকে তা বের করে (ঘনভূত করে পানি আকারে বের করে) সঠিক মাত্রার শুষ্ক নির্মল বাতাস বের করার কাজটাই করে এসি।

রকমফের

বাজারে বিভিন্ন ধরনের এসি পাওয়া যায়। তবে সেগুলোর ব্যবহারক্ষেত্রও ভিন্ন। আবাসিক, অফিস, শপিংমল, শিল্পকারখানা, রেস্টুরেন্ট, সেমিনার কক্ষ, দোকান প্রভৃতি স্থানের জন্য এসির ধরনও ভিন্ন। বাজারে প্রাপ্ত এসির মধ্যে রয়েছে-

  • উইন্ডো এসি
  • স্প্লিট এসি
  • সেন্ট্রাল এসি
  • পোর্টেবল এসি
  • সিলিং ও
  • ক্যাসেট টাইপ এসি। 
  • এসব এসির মধ্যে বাসাবাড়ি, রেস্টুরেন্ট ও অফিসে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় উইন্ডো ও স্প্লিট এসি। 

উইন্ডো এসি

দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বে উইন্ডো এসি ব্যবহৃত হচ্ছে। এই এসি বসানো হয় ঘরের জানালায় অথবা দেয়াল কেটে সুবিধাজনক স্থানে। অনেক ভবনে এই এসি লাগানোর জন্য ভবন নির্মাণের সময়ই স্থান রাখা হয়। এই এসিতে বেশ কিছু সুবিধা থাকলেও অসুবিধাও কম নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা জানালায় এসি বসালে পুরো জানালাটাই বন্ধ হয়ে যায়। তা ছাড়া এর কমপ্রেসার থেকে মৃদু শব্দ আসে এবং এসি পুরোনো হলে এই মাত্রা বেড়ে যায়। তবে দামের দিক থেকে উইন্ডো এসির দাম স্প্লিট এসির থেকে বেশ কম। 

স্প্লিট এসি 

স্লিম লুকের কারণে জনপ্রিয়তার শীর্ষে স্প্লিট এসি। এই এসির কম্প্রেসার রাখা হয় ঘরের বাইরে। তাই ঘরের দেয়ালে যেকোনো সুবিধাজনক জায়গায় স্থাপন করা যায় এই এসি। তবে কম্প্রেসারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য দেয়াল ফুটো করতে হয়। কম্প্রেসরটি ঘরের বাইরে থাকায় আওয়াজ অনেক কম হয়। যদিও দামের দিক থেকে উইন্ডো এসির থেকে এর দাম বেশি।

এসির ধরন

ঘরের অন্যান্য বৈদ্যুতিক ডিভাইসের থেকে এসি একটু বেশিই বিদ্যুৎ খরচ করে। বিদ্যুৎ খরচের ভিত্তিতে এসি দুই ধরনের। সেগুলো হচ্ছে-

ইনভার্টার এসি

নন-ইনভার্টার এসি।

ইনভার্টার এসি

এ ধরনের এসি সব সময় চলে বিদ্যুতে। এই এসি কম্প্রেসারের স্পিড বা পাওয়ার কম-বেশি করতে পারে। ধরা যাক, ঘরের তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় এসি অন করা হলে তা ধীরে ধীরে ১০০% স্পিডে কাজ করবে। যদি তাতে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রিতে সেট করা হয়, তাহলে ১০-১৫ মিনিট পর তাপমাত্রা ২৫-এ এলে এসি কম্প্রেসরের পাওয়ার আস্তে আস্তে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেবে। অর্থাৎ এসি একদম বন্ধ না হয়ে যে তাপমাত্রায় সেট করা হয়েছে তা ধরে রাখবে। নন-ইনভার্টার এসির মতো কম্প্রেসর বারবার অন-অফ করতে হয় না।

বর্তমানে বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় করার জন্য ইনভার্টার এসি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই এসিতে ঘর প্রয়োজনমতো ঠান্ডা হয়ে গেলে কম্প্রেসর পাওয়ার কমিয়ে দেয়। ঘর আবার গরম হতে শুরু করলে আবার ফুল ক্যাপাসিটিতে চালু হয়। তাই ইনভার্টার এসির কম্প্রেসর সব সময় প্রয়োজনমতো ক্যাপাসিটিতে কমে গিয়ে চলতে থাকে ও ঘরকে ঠান্ডা রাখে। যেহেতু এই এসির কম্প্রেসর কম ক্যাপাসিটিতেও চলতে পারে তাই সাধারণ এসির থেকে এই এসিতে বিদ্যুৎ খরচ হয় কম। কোম্পানিগুলো দাবি করে ইনভার্টার এসি ব্যবহার করলে সাধারণ এসির থেকে প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। এসিতে শব্দও হয় কম।  তবে  দ্রুত ঘর ঠান্ডা করতে এই এসি খুব একটা কার্যকর নয়। কারণ, ইনভার্টার এসি ধীরে ধীরে ঘর ঠান্ডা করে। যেখানে নন-ইনভার্টার এসি চালানোর ২-৫ মিনিটের মধ্যে ঘর ঠান্ডা হয় সেখানে ইনভার্টার এসির সময় লাগে প্রায় ৮-১০ মিনিট।

নন-ইনভার্টার এসি

এ ধরনের এসি অনেক বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ফলে অনেক সময় এসি অন করলে ঘরের লাইটের আলো একটু কমে যায়। এর কারণ, এই ধরনের এসিতে যে কম্প্রেসর থাকে, তা শুরুতেই ফুল স্পিডে চলা শুরু করে। ফলে শুরু থেকেই অনেক বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। এতে সুবিধা হচ্ছে ২ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে ঘর ঠান্ডা হয়ে যায়। মাঝে মাঝেই এই এসি বন্ধ হয়ে যায়, আবার নিজে নিজেই চলতে শুরু করে। একে বলা হয় থার্মস্টাট। এসিতে নির্ধারণ করা কাক্সিক্ষত তাপমাত্রা বিরাজ করলে এসি বন্ধ থাকে কিন্তু তাপমাত্রা বেড়ে গেলে আবার চলতে শুরু করে। অর্থাৎ নন-ইনভার্টার এসি, হয় ফুল স্পিডে চলবে না, হয় একদম বন্ধ হয়ে যাবে। এরা কম্প্রেসারের পাওয়ার কন্ট্রোল করতে পারে না। যদি এসিতে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রিতে রাখা হয় তাহলে তা প্রথমে ২৩ ডিগ্রিতে তাপমাত্রা নেবে এবং কম্প্রেসর বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি হলে কম্প্রেসর অন হয়। ফলে মাঝে মাঝে বেশি গরম বা বেশি ঠান্ডা লাগে। এসি খুব কম চালালে নন-ইনভার্টার এসি কার্যকর। কারণ, এটি খুব তাড়াতাড়ি পরিবেশকে ঠান্ডা করে, যা ইনভার্টার এসিতে সময় লাগে। 

এসির কার্যক্ষমতা

বাজারে সাধারণত ১ টন থেকে ৩ টন পর্যন্ত এসি কিনতে পাওয়া যায়। টনের এই হিসাব কিন্তু এসির ওজনকে বোঝায় না। বরং কোন এসি এক ঘণ্টায় কতটা তাপ ঘর থেকে বের করতে পারে। ঘরের আয়তনের ওপরও নির্ভর করে এসির ক্ষমতা। এসি কেনার আগে অবশ্যই জানতে হবে কত স্কয়ার ফুট ঘরে কত টনের এসি লাগবে। আসুন জেনে নিই-

এক টনের এসি ঘরকে ততটাই ঠান্ডা করবে যে রকম একটা এক টন ওজনের বরফ ঘরকে ঠান্ডা করবে বা তা গলাতে যেটুকু তাপ লাগবে তা শোষণ করে নেবে।

১ Ton A/C = ১২০০০ BTU/Hour

অর্থাৎ এক টনের এসি প্রতি ঘন্টায় ঘর থেকে ১২০০০ BTU তাপ শোষণ করতে পারে। এখনে ইঞট মানে ১ পাউন্ড পানিকে ১ ডিগ্রি ফারেনহাইটে গরম করতে প্রয়োজনীয় তাপ।

সেক্ষেত্রে, 

১ টন = ১২০০০ BTU/H

১.৫ টন = ১৮০০০ BTU/H

২ টন = ২৪০০০BTU/H

এ ছাড়া সূত্র অনুয়ায়ী বের করা সম্ভব এসি কতটা বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। ১০০০ ওয়াটের এসি ৮ ঘণ্টা ব্যবহার করা হলে ১০০০ X ৮ = ৮০০০/ ১০০০ = ৮। অর্থাৎ ৮ ঘণ্টায় ৮ ইউনিট খরচ হবে।

আয়তন অনুযায়ী এসির হিসাব

ঘরের মাপজোক অনুযায়ী কত ক্ষমতার এসি লাগবে তা অনেকেই বুঝতে পারে না। এই হিসাবটি বের করারও রয়েছে ফর্মুলা। সূত্রটি হচ্ছে-

ঘরের (দৈর্ঘ্য X প্রস্থ) স্ট উচ্চতা = টন (ফুট) 

সেক্ষেত্রে, একটি ঘরের দৈর্ঘ্য ১৫ ফুট, প্রস্থ ১২ ফুট এবং উচ্চতা যদি হয় ১০ ফুট তাহলে আয়তন অনুযায়ী এসি লাগবে, 

(১৫ X ১২) স্ট ১০ = ১.৩৪ টন।

এই হিসাব অনুযায়ী বুঝতে হবে ঘরটির জন্য ১ টনের বেশি একটা এসি লাগবে। সেটা হতে পারে ১.৫ টন। এভাবে যে আয়তনেরই ঘর হোক না কেন সূত্র অনুযায়ী হিসাব করলে আমরা সহজেই পেয়ে যাব এসির টনের হিসাব। স্কয়ার ফিট বা বর্গফুট অনুযায়ী এসির টনের কিছু সাধারণ হিসাব রয়েছে। তা হচ্ছে- 

তবে আরও কিছু বিষয়ের ওপর এসির হিসাব নির্ভরশীল। যেমন, ভবনের টপ ফ্লোর, ঘরে মানুষের সংখ্যা বেশি ও বাইরের তাপমাত্রার তারতম্য অন্যতম।

এসি কেনার আগে 

অসম্ভব ভ্যাপসা গরম থেকে মুক্তি পেতে বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার লাগাতে চান অনেকেই। কিন্তু অধিকাংশ মানুষেরই এসি সম্পর্কে নেই প্রয়োজনীয় ধারণা। পত্রিকা কিংবা অনলাইনের লোভনীয় বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত না হয়ে জেনে-বুঝেই এসি কেনাই শ্রেয়। এসি কেনার আগে খেয়াল রাখতে হয় জরুরি কিছু বিষয়ের ওপর। যেমন: ঘরের আকার, ঘরের জানালা, এসির প্রকার। নয়তো শখের এসি হতে পারে আপনার ভোগান্তির কারণ। তাই যে যে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে কিনুন আপনার পছন্দের এসি-

  • শুধু ব্র্যান্ড দেখেই এসি কিনবেন না। তাতে বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী সুবিধা আছে কি না জেনে নিন। 
  • ঘরের আয়তন অনুযায়ী এসি কিনুন।
  • বর্তমানে প্রায় সব বাড়িতেই স্প্লিট এসি লাগানো হয়। এই এসি উইন্ডো এসির চেয়ে স্লিম। তা ছাড়া এটি জানালাজুড়ে বসে না। কিন্তু যারা ঘন ঘন বাড়ি পাল্টান তাদের জন্য উইন্ডো এসিই ভালো, কারণ, স্প্লিট এসির ইনস্টলেশন উইন্ডো এসির থেকে সহজ হলেও এর রি-ইনস্টলেশন চার্জ অপেক্ষাকৃত বেশি। 
  • ঘর বড় হলে উইন্ডো এসি না কেনাই ভালো।
  • এসি কেনার সময় ভালোভাবে খেয়াল করবেন, কোনো আওয়াজ হচ্ছে কি না। স্প্লিট এসিগুলোতে আওয়াজ অনেক কম হয়। শান্তিতে ঘুমোনো বা কাজ করার পক্ষে ভালো।
  • বাজেটের মধ্যে হলে রিভার্স সাইকল এসি কিনুন, যাতে গরমকালে ঠান্ডা হাওয়া আর শীতকালে গরম হাওয়ার সুবিধা পাবেন। এগুলোর দাম সাধারণ এসির তুলনায় অনেকটাই বেশি।
  • বাড়ির সব ঘরে এসি লাগানো বেশ খরচসাপেক্ষ। সেক্ষেত্রে মাস্টার বেডরুমের জন্য একটি উইন্ডো বা স্প্লিট এসি কিনে সঙ্গে আর একটি পোর্টেবল এসি কিনে নিন, যা এক ঘর থেকে আর এক ঘরে সহজেই তুলে নিয়ে যাওয়া যায়। পোর্টেবল এসির দাম তুলনামূলক কম।
  • ঘরের ভেতরের বাতাসের গুণাগুণের ওপর এসির আয়ু নির্ভর করে। দূষিত বাতাস জমে থাকলে ঘর ঠিকঠাক ঠান্ডা হয় না। ভালো ব্র্যান্ডের এসিতে কার্যকর এয়ার ফিল্টার থাকায় তা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
  • বেশি ব্যবহার করলে ইনভার্টার এসি কিনুন কম ব্যবহার এবং তাৎক্ষণিক ঠান্ডা করতে নন-ইনভার্টার এসি ভালো হবে।
  • কম শব্দের জন্য ইনভার্টার এসি ভালো হবে। নন-ইনভার্টার শব্দ বেশি করে।
  • বিদ্যুৎ কম খরচের জন্য ইনভার্টার এসি ভালো।
  • ওয়ারেন্টি, গ্যারান্টি বা বিক্রয়োত্তর সেবা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তবেই এসি কিনুন।
  • সম্প্রতি প্রায় সব ব্র্যান্ডের এসির ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীদের অনেকেই গুণগতমান বিষয়ে রিভিউ প্রদান করে থাকে। কেনার আগে সেসব রিভিউ দেখে নিলে ভালো পণ্যটি কিনতে সুবিধা হবে। 

প্রযুক্তি

অন্যান্য বৈদ্যুতিক ডিভাইসের মতো এসিতেও যোগ হচ্ছে নিত্যনতুন প্রযুক্তি। উন্নত দেশের মতো বিশ্বায়নের কল্যাণে বাংলাদেশেও মিলছে আধুনিক প্রযুক্তির হরেক রকম এসি। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আইওটি বেইজড স্মার্ট এসি, যা ভয়েস কমান্ড ও মুঠোফোনে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। অর্থাৎ ‘ভয়েস কন্ট্রোল’ বা ‘অ্যামাজন ইকো’র মাধ্যমে রিমোট কন্ট্রোল ছাড়াই স্মার্ট এসির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বাড়ানো, কমানো, চালু বা বন্ধ করা যাবে। কিছু এসিতে সংযোজন করা হয়েছে আয়োনাইজার প্রযুক্তি, যা ঘরকে ঠান্ডা করার পাশাপাশি বাতাসকে করে ধুলা-ময়লা ও ব্যাকটেরিয়ামুক্ত। বর্তমানে কিছু মডেলের এসিতে মিলছে ওয়াই-ফাই ও মশারোধক ব্যবস্থা।

ব্যবহারবিধি

গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ বিলের বড় অংশ চলে যায় এয়ার কন্ডিশনারের পেছনে। অথচ ব্যবহারবিধি জানলে ও কিছুটা কৌশলী হলে বাড়তি বিদ্যুৎ অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। এতে এসি যেমন থাকে ভালো, তেমনি টিকেও বেশি দিন। এসির ব্যবহারবিধিতে লক্ষণীয়- 

  • এসি চালিয়ে দ্রুত নিজেকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করা অনুচিত।
  • এসির তাপমাত্রা সব সময় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখা উচিত। 
  • ঘর ঠান্ডা হয়ে গেলে এসি বন্ধ করে ফ্যান চালাতে পারেন।
  • রাতে টাইমার দিয়ে রাখা ভালো, তাতে নির্দিষ্ট মাত্রায় ঠান্ডা হওয়ার পর এসি আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। 
  • এসির কমপ্রেসরটিকে খোলা জায়গায়, ছায়ার মধ্যে রাখুন।
  • এসির ফিল্টারটি মাসে অন্তত একবার পরিষ্কার করুন।
  • এসি পুরোনো হলে আধুনিক এসি কিনুন। নতুন মডেলের এসি পুরোনোগুলোর তুলনায় প্রায় ৫০% বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে।

এসির যত্ন

এসির ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হলো ‘কুলিং’ বা ঠান্ডা করার ক্ষমতা কমে যাওয়া। এ ক্ষেত্রে- 

  • এসির ভেতরের নেট খুলে ধুলা-ময়লা পরিষ্কার করতে হবে। আপনি নিজেই এসির ইনডোর খুলে নেট ওয়াশ করে নিতে পারেন।
  • এ ছাড়া কুলিং একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে বুঝতে হবে এসির ভেতরে গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক সেবা প্রদানকারী প্রতিনিধিদের মাধ্যমে গ্যাস রিফিল করতে পারেন। বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদানের সময় পার হয়ে গেলে সার্ভিস চার্জ দিতে হবে। 

পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর এসির প্রভাব

এয়ার কন্ডিশনারের ঠান্ডা বাতাসের সতেজ অনুভূতি দেয় সত্য তবে তা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এসি ঘরকে শীতল করে ঠিকই কিন্তু উৎপন্ন গরম বাতাস বাইরে ছেড়ে দেয়। ফলে আবহাওয়ার উষ্ণতা বাড়ে। সারা বিশ্বের কোটি কোটি এসি থেকে যে পরিমাণ তাপ নির্গত হয়, তা গেøাবাল ওয়ার্মিংয়ের অন্যতম কারণ। তা ছাড়া এসিতে প্রচুর পরিমাণে এনার্জি খরচ হয়। আরও মারাত্মক বিষয় এসিতে ব্যবহৃত ক্লোরোফ্লুরোকার্বন বা সিএফসি নামক রাসায়নিক বায়ুমন্ডলের ওজোনস্তরের অনেক ক্ষতি সাধন করে। এতে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীতে। তা ছাড়া এসি স্বাস্থ্যের জন্যও অউপযোগী। অধিক সময় এসির মধ্যে থাকলে শরীর তার স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে প্রাণান্ত চেষ্টা করে। এতে শরীরের অনেক ক্ষতি হয়।     

এসির ব্র্যান্ড ও দাম

বাংলাদেশের বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও মডেলের এয়ার কন্ডিশনার পাওয়া যায়। এসব ব্র্যান্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রি, প্যানাসনিক, এলজি, র‌্যাংগস, জেনারেল, শার্প, ওয়ারলপুল ও ওয়ালটন এসির চাহিদা বেশি। দেশব্যাপী এসব ব্র্যান্ডের রয়েছে নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র। এ ছাড়া ইলেকট্রনিকস শো রুমেও পাওয়া যায় ভিন্ন ভিন্ন মডেলের এসি। বর্তমানে বহুল প্রচলিত স্প্লিট এয়ার কন্ডিশনারের বাজারমূল্য-

উল্লেখিত এসির মডেল ও প্রযুক্তিসম্পন্ন ফিচারের কারণে দামে বেশ তারতম্য লক্ষণীয়। এ ছাড়া গ্যারান্টি, ওয়ারেন্টি ও তৈরিকারক দেশের ক্ষেত্রেও এই দাম নির্ভর করে। অন্যান্য নন-ব্র্যান্ড ও চীন থেকে আমদানি করা এসির দাম তুলনামূলক কম। ব্র্যান্ডভেদে বিভিন্ন শোরুমে বিশেষ ছাড় চলাকালীন এসির দাম কিছুটা কম পাবেন। স্প্লিট এসির দাম উইন্ডো এসির থেকে কিছুটা কম। প্রতিষ্ঠানগুলো নানা মডেলের এসি বিক্রির ক্ষেত্রে কিস্তি সুবিধা, শর্তসাপেক্ষে রিপ্লেসমেন্ট গ্যারান্টি, সার্ভিস ওয়ারেন্টি, ফ্রি ইনস্টলেশনের সুবিধা, এক্সচেঞ্জ সুবিধাসহ নানা রকম অফার দিচ্ছে। 
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১১০তম সংখ্যা, জুন ২০১৯

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top