চিনি মসজিদ, নীলফামারী, সৈয়দপুর

চোখ ধাঁধানো চিনি মসজিদ

অনেক আগ থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ নীলফামারীর সৈয়দপুর। এলাকাটিকে ঘিরে গড়ে ওঠেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের নানা অবকাঠামো আর ওয়ার্কশপ। তাই তো শহরটির পরিচিতি রেলের শহর নামে। ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত লাল ইটের রেল ভবনের স্থাপত্যশৈলী নয়নাভিরাম ও দৃষ্টিনন্দন। তবে এমন সব স্থাপনাকে ছাপিয়ে নিজস্ব সৌন্দর্য জানান দেয় অপূর্ব কারুকার্যখচিত ধর্মীয় স্থাপনা চিনি মসজিদ। উপমহাদেশে সুফি-সাধকেরা ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি নির্মাণ করেছিলেন নান্দনিক স্থাপত্যকলাবিশিষ্ট অসংখ্য মসজিদ। এদের মধ্যে স্বমহিমায় উজ্জ্বল সৈয়দপুরের ইসলামবাগের ঐতিহাসিক চিনি মসজিদ। কেননা, স্থানীয় অধিবাসীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় স্বহস্তে নির্মিত শৈল্পিক এ মসজিদটি। 

মসজিদের অনন্য কারুকার্য সহজেই ছড়ায় মুগ্ধতা। এর স্থাপত্য নিদর্শনে মোগল শাসনামলের মধ্যযুগের দারুন মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সাদা চীনামাটির পাত্রের অসংখ্য টুকরো দিয়ে এই মসজিদটি অলংকৃত, আর তাই তো এর নাম চিনি মসজিদ। মসজিদের গোটা অবয়ব ঢেলে সাজানো হয়েছে রঙিন চকচকে পাথরে। বারান্দা বাঁধানো হয়েছে সাদা মোজাইকে। দেয়ালজুড়ে চীনামাটির টুকরো দিয়ে অংকিত নানামাত্রিক সুদৃশ্য নকশা। ফুলদানি, ফুলের ঝাড়, গোলাপ, একটি বৃন্তে একটি ফুল, চাঁদ-তারা খচিত রয়েছে স্থাপনাটির দেয়ালজুড়ে। এ সব নকশা করেছেন মো. মোখতুল ও নবী বখ্স। চীনামাটি দিয়ে মোড়ানো মসজিদের মিনার ও গম্বুজগুলো। পুরো মসজিদের কারুকার্যে ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ২৫ টন চীনামাটির টুকরো। এ ছাড়া মসজিদের গায়ে লাগানো আছে ২৪৩টি শংকর মর্মর পাথর। স্থাপনাটিতে মোট মিনার রয়েছে ২৭টি, যার পাঁচটি অসম্পূর্ণ। স্থানীয় শতাধিক দক্ষ কারিগর ও শিল্পীর একনিষ্ঠ পরিশ্রমে ১৮৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সুরম্য এ মসজিদটি। অনেকেই একে চেনে চীনা মসজিদ নামে।

মসজিদের অভ্যন্তর

তবে শুরুতে এখনকার রূপ ছিল না মসজিদটির। স্থাপনাটির রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। সময়টা ১৮৬৩ সাল। সৈয়দপুর তখন ছিল কামরূপ রাজ্যের অধীন। তৎকালীন সময়ে এ এলাকায় ছিল না কোনো মসজিদ। ফলে মুসল্লিদের নামাজের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট স্থান ছিল না। এলাকার সম্মানিত দুই ধার্মিক হাজি বকর আলী ও হাজি মোখ্খু কয়েকজন লোক নিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকার বড় মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। এলাকাবাসীর কাছে তখন মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব রাখেন তারাই। তাতেই রাজি সবাই। অবশেষে ইসলামবাগে নির্মিত হল মসজিদটি। তবে শুরুতে যা ছিল ছন ও বাঁশের তৈরি। পরবর্তীতে এলাকাবাসীর সহায়তায় এতে টিনের চালার ছাদ দেওয়া হয়। দুজন হাজি মহল্লাবাসীর মধ্য থেকে সরদার নির্বাচন করেন ছয়জনকে। তাঁদের অধীনে ৪০ জন লোক ছিল। এই সরদাররা প্রতি বাড়ি থেকে সংগ্রহ করতেন এক মুষ্টি চাল। প্রতি বৃহস্পতিবার এই চাল বিক্রি করে সংগ্রহ করা হতো টাকা। এভাবে কিছু টাকা জমলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মসজিদটি পাকা করার। পরবর্তীতে স্থানীয় জনগণ তাদের মাসিক আয়ের একটি অংশ দিয়ে মসজিদের উন্নয়নে ফান্ড গঠন করেন। এক মাসের পুরো বেতনের অর্থও দান করেন তাঁরা। উল্লেখ্য, তখন তাঁদের বেতন ছিল সর্বসাকুল্যে পদভেদে ১৩-১৫ টাকা।

মসজিদটির নির্মাণের দায়িত্বে ছিল শঙ্খু নাম্নী এক হিন্দু মিস্ত্রি। তাঁর মজুরি ধরা হয় দৈনিক ১০ আনা। মসজিদ নির্মাণকাজে তাঁর কোনো সহকারী মিস্ত্রির প্রয়োজন হয়নি। এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে তাঁকে নির্মাণকাজে সাহায্য করে। স্থাপনাটির দেয়ালের গাঁথুনির নির্মাণকৌশল ছিল প্রথমে ৩০ ইঞ্চি এরপর ২০ ইঞ্চি আর ওপরে ১৫ ইঞ্চি। এ সময় সিমেন্ট না থাকায় চুন ও সুরকি দিয়ে গাঁথুনি দেওয়া হয়। পুরুষের পাশাপাশি মহিলারাও মসজিদ নির্মাণে অবদান রাখেন। তাঁরা ঢেকিতে ইট-পাথর কুটে সুরকি বানাতেন। মহল্লার কিছু মানুষ সে সময় কলকাতায় গিয়ে সেখানে একটি সিরামিক্স উৎপাদন কারখানার পাশে চীনামাটির তৈজসপত্রের ভাঙা টুকরো পান। কারখানা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এসব ভাঙা তৈজসপত্র দেশে নিয়ে আসেন। পরে এই টুকরোগুলো জুড়ে দেওয়া হয় মসজিদটির গায়ে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় চিনি করা বা চিনি দানার কাজ। এ থেকেই মসজিদটির নাম চিনি মসজিদ বা চীনা মসজিদ। কলকাতা থেকে এ সময় ২৪৩টি শংকর মর্মর পাথর এনে মসজিদে লাগানো হয়। 

দেয়ালে অলংকৃত নকশা

চিনি মসজিদের নির্মাণকাজ হয়েছে দুই ভাগে। প্রথম ভাগ ব্রিটিশ আমলে আর দ্বিতীয় ভাগ পাকিস্তান আমলে। প্রথম ভাগে মেঝেতে মর্মর পাথর বিছানো হয়। এলাকাবাসী প্রতি টুকরো পাথর ছয় টাকা দরে কলকাতা থেকে কিনে আনে। পাথর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পাথরগুলো এখানে স্থাপনে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা অংশের মোট নির্মাণব্যয় ছিল নয় হাজার ৯৯৯ রুপি ১০ আনা। দ্বিতীয় অংশের মেঝেতে এ ধরনের কোনো পাথর নেই। একই সময় উত্তর ও দক্ষিণে দুটি ফটক নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৫ সালে এর দ্বিতীয় অংশের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। সম্প্রতি মসজিদের ডান পাশে কিছুটা অংশের সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সম্প্রসারণে যথাসম্ভব চেষ্টা করা হয়েছে আগেকার আদল বজায় রাখার। বর্ধিত অংশের দেয়ালেও ব্যবহৃত হয়েছে চীনামাটির টুকরো। তবে এর পশ্চিমে গা ঘেঁষে খ্রিষ্টান স¤প্রদায়ের সমাধিক্ষেত্র থাকায় খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়নি।  মসজিদটির বাঁ দিকে রয়েছে একটি ইমামবাড়া, ডানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আর পূর্বে রাস্তা।  

নয়নাভিরাম স্থাপত্যশৈলীর এই চিনি মসজিদটি দেখতে প্রতিদিনই আসছে প্রচুর দেশি-বিদেশি পর্যটক। ধর্মানুরাগী মুসলমানদের কাছে স্থাপনাটির রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ আধ্যাত্মিকতা। নামাজে আগের মতো প্রচুর মুসল্লির সমাগমন না হওয়ায় দ্বিতীয় তলাটি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে শুক্রবার জুম্মার ওয়াক্তে আর ধর্মীয় বিশেষ দিনে মসজিদটি ভরে যায় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের আগমনে।

হাফিজ মানিক
আলোকচিত্র : হিমেল মাহবুব

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫১ তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৪

Related Posts

কংক্রিটের নগরীতে চারশ বছরের মোঘল স্থাপত্য ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহ

ব্যস্ত ট্রাফিক, আধুনিক ক্যাফে, আর বহুতল ভবনের ভিড়ে ঠাসা আজকের ধানমন্ডি। ঢাকার অন্যতম অভিজাত ও কোলাহলপূর্ণ এই এলাকার…

ইট-পাথরে গাঁথা ইতিহাসের পাতা: বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ঈদগাহের গল্প

‘ঈদ’ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। আত্মত্যাগের মহিমা নিয়ে হাজির হয় ঈদুল আজহা। ঈদের দিন সকালে ঘুম…

বাংলার বাঘা মসজিদ সুলতানী ঐতিহ্যের এক সাক্ষী

বাংলার ইতিহাস কত সমৃদ্ধ তা শুধু ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখলেই বুঝা যায়। দেশে দেশে ইতিহসে রয়েছে বৈচিত্রতা। কোন দেশে…

মুঘলদের এক ক্ষতচিহ্ন যেন ‘তেরোশ্রী মসজিদ’

মসজিদটি কবে নির্মাণ হয়েছিল, কে-ইবা নির্মাণ করেছিলেন তার কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না কোথাও। নেই কোন শিলালিপি।…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Zabun Nesa Mosq.
BRAC
Oberio Palace
Soil
“যত মানুষ ফুটবলের ভক্ত, তত মানুষ স্থাপত্য নিয়েও আগ্রহী হোক”
হাতে তৈরি পাঁচটি আইকনিক চারু ও কারি শিল্পের বাড়ি
RIAS ২০২৬ সালের বার্ষিক পুরস্কারের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা
গাছকে জড়িয়ে গড়া আমার ঠিকানা
শহরের শরীরে খোদাই করা এক গৃহকাব্য