সমকালীন স্থাপত্যচর্চায় প্যারামেট্রিকিজম (Parametricism) একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত রূপান্তর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছ। এখানে ডিজাইন প্রক্রিয়া ক্রমশ কম্পিউটেশনাল লজিক, অ্যালগরিদমিক কাঠামো এবং প্যারামিটার-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে এই প্রবণতাকে একটি সার্বজনীন নান্দনিক “স্টাইল” হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সম্পর্কে তুর্কি স্থপতি মেলিকে আলতিনিসিক একটি সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, এই পদ্ধতি স্থাপত্যের চিন্তাগত কাঠামোকে পরিবর্তন করলেও, এটি কখনোই একইরকমের বৈশ্বিক ভিজ্যুয়াল ভাষায় পরিণত হওয়া উচিত নয়।

প্যারামেট্রিকিজম: চিন্তাগত কাঠামোর রূপান্তর
প্যারামেট্রিকিজম হলো স্থাপত্যের একটি স্টাইল, যা প্যারামেট্রিক ডিজাইন টুলস ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি হয়। এটি ২০০৮ সালে একটি ম্যানিফেস্টোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা লিখেছিলেন Zaha Hadid Architects-এর প্রধান স্থপতি প্যাট্রিক শুমাখার।
তার সেই ম্যানিফেস্টোতে শুমাখার ঘোষণা দেন যে, এই আন্দোলনটি আন্তর্জাতিক হওয়া উচিত এবং এটি আধুনিকতার পরবর্তী “নতুন মহান স্টাইল” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।
আলতিনিসিকের বিশ্লেষণে প্যারামেট্রিকিজম মূলত একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবর্তন (epistemological shift)। এর মাধ্যমে স্থাপত্যচর্চা অবজেক্ট-ভিত্তিক জ্যামিতিক ফর্ম নির্মাণ থেকে সিস্টেম-ভিত্তিক চিন্তায় রূপান্তরিত হয়েছে।
পূর্বে যেখানে স্থপতির ভূমিকা ছিল নির্দিষ্ট ফর্ম তৈরি করা, সেখানে এখন ডিজাইন একটি ধাপে ধাপে নিজে থেকে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া (emergent process) হিসেবে কাজ করে। এটি নির্দিষ্ট নিয়ম, সম্পর্ক এবং শর্তের মাধ্যমে বিকশিত হয়। এই পরিবর্তনের ফলে স্থাপত্য একটি রিলেশনাল ও সিস্টেমিক প্র্যাকটিসে পরিণত হয়েছে।

ZHA অভিজ্ঞতা ও প্যারামেট্রিক চিন্তার ভিত্তি
মেলিকে আলতিনিসিক জানান যে Zaha Hadid Architects-এ কাজ করার অভিজ্ঞতা তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেখানে তিনি শিখেছিলেন কীভাবে স্থাপত্যকে শুধু ফর্ম তৈরি হিসেবে না দেখে একটি জটিল সিস্টেম হিসেবে চিন্তা করা যায়। ZHA-তে ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করা হতো মূলত ডিজাইনের ভেতরের লজিক, স্পেশাল সম্পর্ক এবং স্ট্রাকচারাল সম্ভাবনা বোঝার জন্য।
এই অভিজ্ঞতা তাকে কম্পিউটেশনাল ডিজাইনের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করে এবং পরবর্তীতে তার নিজের কাজেও সিস্টেম-ভিত্তিক ও সম্পর্কনির্ভর ডিজাইন পদ্ধতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

ডিজিটাল টুলস ও হোমোজেনাইজেশনের ঝুঁকি
তিনি স্বীকার করেন যে, কম্পিউটেশনাল টুলস স্থাপত্যচর্চাকে উল্লেখযোগ্যভাবে সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে জটিল জ্যামিতি নির্মাণ, পারফরম্যান্স-ভিত্তিক ডিজাইন এবং মাল্টি-ডেটা অ্যানালাইসিসের ক্ষেত্রে।
তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন যে, এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যদি একই ধরনের ডিজাইন আউটকাম উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা ধীরে ধীরে একটি হোমোজেনাস আর্কিটেকচারাল ভাষা তৈরি করতে পারে। এতে স্থানিক বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ইউনিভার্সাল স্টাইল বনাম কনটেক্সট
আলতিনিসিক স্পষ্টভাবে মত দেন যে, যদিও কম্পিউটেশনাল টুলস বৈশ্বিকভাবে সার্বজনীন হতে পারে কিন্তু, স্থাপত্য কখনোই একটি ইউনিভার্সাল স্টাইল হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়। তিনি মনে করেন, প্রতিটি স্থাপত্য প্রকল্পকে তার স্থানিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত থাকতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে স্থাপত্য কেবল প্রযুক্তিগত উৎপাদন নয়। স্থাপত্য সম্পুর্ণভাবেই সুনির্দিষ্ট কনটেক্সট-এর একটি সুনির্দিষ্ট জবাব।

স্টুডিও প্র্যাকটিস ও সিস্টেমিক ডিজাইন
তার স্টুডিও প্র্যাকটিসে প্যারামেট্রিকিজমকে শুধুমাত্র ফর্ম জেনারেশনের টুল হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। এটি একটি বৃহত্তর সিস্টেমিক ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে। এখানে পরিবেশগত ডেটা, প্রযুক্তিগত ইনপুট এবং মানব অভিজ্ঞতা একত্রে একটি সমন্বিত ডিজাইন লজিক তৈরি করে। ফলে তার স্থাপত্য বাইরে থেকে দেখতে জটিল হলেও, তাদের অন্তর্নিহিত কাঠামো সবসময় কনটেক্সট-নির্ভর।
ভবিষ্যৎ স্থপতি ও দ্বৈত জ্ঞান কাঠামো
তিনি ভবিষ্যতের স্থপতিদের জন্য একটি দ্বৈত জ্ঞান কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। একদিকে তিনি মনে করেন তাদের কম্পিউটেশনাল ডিজাইন, কোডিং এবং ডিজিটাল ফ্যাব্রিকেশনে দক্ষ হতে হবে। অন্যদিকে স্থাপত্য ইতিহাস, ম্যাটেরিয়াল সংস্কৃতি এবং নির্মাণ বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর ধারণা থাকা অপরিহার্য বলেও মনে করেন। এই ভারসাম্য ব্যতীত স্থাপত্যচর্চা হয় অতিরিক্ত ডিজিটাল বিমূর্ততায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে, নয়তো প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হবে।

প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি স্থাপত্যের ইতিহাস, উপকরণ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে। ছবি: ডিজাইনবুম
সামগ্রিকভাবে, মেলিকে আলতিনিসিক প্যারামেট্রিকিজমকে প্রত্যাখ্যান না করে একে আরও শক্তিশালী কিন্তু টুল হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করেন। তার তাত্ত্বিক অবস্থান অনুযায়ী, সমকালীন স্থাপত্যের মূল দায়িত্ব হলো প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থান, সংস্কৃতি এবং মানব অভিজ্ঞতার মধ্যে অর্থবহ সম্পর্ক তৈরি করা যেখানে প্রযুক্তি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, কিন্তু নির্ধারক নয়।
তথ্যসূত্র
ডিজেইন ম্যাগাজিন; মে ১৩, ২০২৬।























