বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও নাট্যকারের সাহিত্য ও কাব্যবিষয়ক পাÐিত্য ছড়িয়ে পড়ে ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে। কেশবপুর, যশোরের বিখ্যাত কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে তাঁর জন্ম। এই গ্রামটি বাংলার আর দশটা গ্রামের মতো হলেও প্রকৃতি যেন সাজিয়েছে কিছুটা ভিন্নতায়; তার সুনিপুণ হাতে! এমন নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক নৈসর্গিকের মধ্যেই জন্মেছিলেন কবি, বড় হয়েছেন, লিখেছেন কবিতা। কবির স্মৃতি চির ভাস্বর করে রাখতে সাগরদাঁড়ির মধুসূদন দত্তের পরিবারিক আবাসস্থল, স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থানকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে সুবিস্তৃত পর্যটন পরিসর মধুপল্লি। কবির জীবন ও কর্ম সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানতে এই মধুপল্লিতে প্রতিদিন ছুটে আসে হাজারো দর্শনার্থী, শিক্ষার্থী, কবিতাপ্রেমী ও সাহিত্য গবেষক।
তৎকালে যশোর জেলার অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত কায়স্থ বংশে জন্ম নেওয়া কবি পরিবারের বসতবাড়িটি জমিদারবাড়ির আদলেই নির্মিত। কালের বিবর্তনে এসব স্থাপনাগুলো জৌলুশ হারিয়ে বিবর্ণ হয়ে পড়েছে; হুমকির মুখে পড়েছে এর স্থায়িত্ব। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহ্যবাহী এসব স্থাপনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে ১৯৬৫ সালে ২৬ অক্টোবর তদানীন্তন সরকার বাড়িটি পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৬৮ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বাড়িটি সংস্কার করে। ১৯৯৬-২০০০ সালে এলাকাটি দেয়ালবেষ্টিত করে কুটিরের আদলে একটি গেট, একটি মঞ্চ, দুটি অভ্যর্থনা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এ সময় বাড়ির সমুদয় স্থাপনাকে পুনঃসংস্কার করে বর্তমান রূপ দেওয়া হয়। ২০০১ সালে নামকরণ করা হয় মধুপল্লি। তবে মধুপল্লি পর্যটন এলাকাটি শুধু কবির পারিবারিক বাড়ি ঘিরেই নয়, বরং সাগড়দাঁড়ি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। এই পল্লিতে রয়েছে কবির বংশধরদের বাড়ি, পাঠাগার, জাদুঘর, ভাস্কর্য, মাইকেল মধুসূদন ইনস্টিটিউশন, কালচারাল একাডেমি ও মধুমঞ্চ, নৌকাঘাটসহ পিকনিক কেন্দ্র।
ইটের দেয়ালের সীমানাঘেরা বিশাল বাড়ি কবি পরিবারের। বাড়ি প্রাঙ্গণে ঢুকতে হয় আবহমান বাংলার কুটিরের আদলে নির্মিত কংক্রিটের গেট দিয়ে। কয়েক পা এগোলেই মূল ভবনে প্রবেশের ফটক। তবে অন্দরমহলে প্রবেশের আগেই চোখে পড়বে শিল্পী বিমানেশ চন্দ্র বিশ্বাসের তৈরি মধুসূদনের আবক্ষ ভাস্কর্য। অন্দরে প্রবেশ করলেই ছোট্ট উঠান। এক প্রান্তে পারিবারিক পূজা মন্দির বা ঠাকুরঘর। ভবনের অধিকাংশই এক তলাবিশিষ্ট ভবন, দ্বিতল অংশে রয়েছে মাত্র কয়েকটি ঘর।
একতলা অংশে প্রবেশপথের ডান পাশের অভ্যর্থনা কক্ষে কবি সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য ও ছবির প্রদর্শনী রাখা হয়েছে। বাম পাশের প্রতিটি ঘরে মধুসূদনের পরিবারের ব্যবহার্য কিছু আসবাবসহ অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বলা চলে, এটা অনেকটা জাদুঘরের মতোই। এসব সংগ্রহশালার মধ্যে রয়েছে কারুকার্যখচিত কাঠের সিন্দুক, কলের গান, খাট, চেয়ার, টেবিল, স্টিলের লোহার বাক্স, টিফিন ক্যারিয়ার, দা ও বিভিন্ন তৈজসপত্র। এ ছাড়া বঙ্গ ভাষা, কপোতাক্ষ নদসহ বিভিন্ন কবিতা, ছন্দ, বাণী, চিঠির কপি, ডিগ্রি ও সম্মাননার বাঁধানো কপি সাঁটানো রয়েছে দেয়ালে। বাইরে তুলসীগাছসংলগ্ন গাছটিই ছিল কবির আঁতুড়ঘর।
কবির বাড়ি থেকে বের হলে বাম পাশে চোখে পড়বে গ্রন্থাগার। সেখানে ঢুঁ মেরে সোজা উন্মুক্ত ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকলে ছোট্ট উঠান; উঠানসংলগ্ন কিছু থাকার ঘর। এটা কবির কাকার বাড়ি। বাড়িটির একাংশ ব্যবহৃত হয় পোস্ট অফিস হিসেবে। বাড়ির ঠিক পেছনেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অদূরে রয়েছে ডরমেটরি। মূল বাড়ির পূর্ব-পশ্চিমে কবির বংশের অন্যদের বাড়ি আর কাছারিবাড়ি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিম পাশের বাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন মধুসূদনের ভ্রাতুষ্পুত্রী কবি মানকুমারী বসু।
মধুপল্লির কবিবাড়ির মতো এমন সুদৃশ্য স্থাপনা সমগ্র এলাকায় বিরল। স্থাপনাগুলোর নির্মাণশৈলীতে রয়েছে রোমান স্থাপত্যের ছোঁয়া। উঁচু প্লিন্থের লম্বা সুপ্রশস্ত বারান্দা এবং কলামগুলোর মধ্যে আর্চের আদল তেমনটাই প্রকাশ করে। এ ছাড়া মন্দিরের গোলাকার জোড়া কলাম ও এর দ্বিতল ভবনের সমান দ্বিগুণ উচ্চতা তুলে ধরে তৎকালীন স্থাপত্যের আদল। বিশাল বারান্দার সঙ্গে রয়েছে সারি সারি ঘর। প্রতিটি ঘরের আকার প্রায় সমান। স্থাপনার কিছু অংশ দ্বিতল, কিছুটা একতলা। ভবনের উঁচু প্লিন্থ বর্ষায় অতি বৃষ্টির বন্যা থেকে সুরক্ষা দেয়। দরজা ও জানালায় ব্যবহার করা হয়েছে কাঠ ও লোহার গ্রিল। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এ স্থাপনার স্থাপত্যকৌশল ভিন্ন হলেও নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে তৎকালীন ইট, চুন-সুড়কি। যদিও সংস্কারকাজের ফলে মূল ভবনের ইটের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না, তবে ইটের গাঁথুনির ওপর প্লাস্টার করা হয়েছে আদি নকশা ঠিক রেখেই। পুরো স্থাপনায় হলুদ রঙের আবরণে ঢাকা। এখানকার প্রতিটি ভবনই ছাদবিশিষ্ট। জলছাদের নিচে বিম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কাঠ।
কবির এ পারিবারিক আবাসনটির পুরোটাই বাগানঘেরা। বাড়ি প্রাঙ্গণে রয়েছে হরেক রকম ফুল, ফলগাছসহ নানা ধরনের দেশি গাছের সমাহার। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কিছু শতাব্দী পুরোনো গাছপালাও নজর কাড়বে যে কারও। তবে এ বাড়িটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি বিরাট পুকুর। পুকুরের শান বাঁধানো ঘাট, হরেক প্রজাতির মাছ আর ফুটে থাকা শাপলা দর্শনার্থীদের দেবে প্রশান্তির অনুভূতি। পুকুরঘাটে পা ডুবিয়ে বসে থাকার মজাই আলাদা। দর্শনার্থীদের বসার জন্য রয়েছে বেশ কিছু কংক্রিটের বেঞ্চ, যেখানে দুদণ্ড বসে উপভোগ করা যাবে পাখিদের অবিরাম ডাকাডাকি। মধুপল্লিতে আগত পর্যটকেরা এসব প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকনে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়বে কিছুক্ষণের জন্য।
মূল মধুপল্লি সীমানার বাইরেও রয়েছে কবির স্মৃতি রক্ষার্থে কতিপয় স্থাপনা। মূল বাড়ির সামনেই গড়ে তোলা হয়েছে একটি জাদুঘর। জাদুঘরসংলগ্ন একটি দ্বিতল ভবনে মাইকেল মধুসূদন কালচারাল একাডেমি ও মধুমঞ্চ। উভয় স্থানেই দেয়ালে স্থাপিত হয়েছে কবি ও পরিবারের ছবি, দলিল-দস্তাবেজ, কবির লেখা কবিতা। এখানে কবির সাহিত্যকর্ম, জীবনীসহ নানা বিষয়ে জানানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। বাজারের মধ্য দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে গেলেই মাইকেল মধুসূদন ইনস্টিটিউশন।
এসব পরিদর্শন শেষে কপোতাক্ষ নদের দিকে এগোলে দক্ষিণে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো আর উত্তরে কবির স্মৃতিময় ঐতিহাসিক কাঠবাদামতলা। যেখানে বসে কবিকে ভাবিয়ে তোলে তাঁর ভবিষ্যতের সোনালি স্বপ্ন। এর পেছনে রয়েছে বিদায় ঘাট, যেখানে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৬২ সালে শেষবারের মতো বজরায় চেপে কলকাতা থেকে স্ত্রী, সন্তান মেঘনাদ মিল্টন ও মেয়ে শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। কিন্তু ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে বাবা তাঁকে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে দেননি। এই কাঠবাদামগাছতলায় তাঁবু খাটিয়ে ১৪ দিন থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। বজরা ভেড়ানো ঘাটটিই বিদায় ঘাট নামে পরিচিত। এই বিদায় ঘাটের এখানে একটি ফলকে খুদিত রয়েছে মহাকবির বিখ্যাত ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতাটি। কবিতার প্রথম লাইন দুটি-
‘সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে!
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;’
সাগরদাঁড়িতে কপোতাক্ষ নদকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে পিকনিক কেন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন পাঠাগার ও ভাস্কর সুরেশ পান্ডের তৈরি বিলেতি পোশাক পরিহিত কবির সম্পূর্ণ ভাস্কর্য। এই নদটি পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। নদীর পাশে দৃশ্য অবলোকনের জন্য স্থাপন করা হয়েছে কংক্রিটের ছাউনি ও বেঞ্চ। এ ছাড়া নৌকায় চড়ে নৌভ্রমণের সুযোগও রয়েছে। এই নদের উৎপত্তি যশোরের চৌগাছা উপজেলার ভৈরব নদী থেকে, যা খুলনা কয়রায় খোলপটুয়া নদীতে গিয়ে পড়েছে। এই নদের দৈর্ঘ্য ১৮০ কিলোমিটার (১১০ মাইল), গড় প্রস্থ ১৫০ মিটার (৪৯০ ফুট), গভীরতা ৩.৫ থেকে ৫ মিটার (১১.৫ থেকে ১৬.৪ ফুট)। ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত নদটি। দ্রাবিড় পূর্ব জনগোষ্ঠীর ‘কবদাক’ শব্দটি সংস্কৃত ভাষায় ‘কপোতাক্ষ’-তে রূপান্তরিত হয়েছে। নদের পানি কপোত বা পাখির অক্ষির (চোখ) মতো স্বচ্ছ-টলটলে ছিল বলে এর নামকরণ হয় কপোতাক্ষ। মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মবার্ষিক উপলক্ষে প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে সাগরদাঁড়িতে উদ্্যাপন করা হয় ‘মধুমেলা’। এই সময় পর্যটকেরা এলে মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান ও মধুমেলা দুটোই উপভোগ করতে পারবেন।
যেভাবে যাবেন
মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িতে যেতে হলে দেশের যেকোনো স্থান থেকে আপনাকে আসতে হবে যশোর জেলা শহরে। সেখান থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে কেশবপুর উপজেলা। সেখান থেকে আরও প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে সাগরদাঁড়ি গ্রাম। কেশবপুর পর্যন্ত বাসযোগে আসা যাবে। এরপর মোটরসাইকেল, রিকশা ও ভ্যানে চড়েই আসতে হবে সাগরদাঁড়ি। সরাসরি প্রাইভেট কার নিয়েও আসতে পারেন। সাগরদাঁড়ি আসার পথের দুপাশের দৃশ্যাবলি এতটাই চমৎকার, আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে। সাগরদাঁড়িতে থাকার জন্য পর্যটনের জন্য রয়েছে একটি হোটেল। এ ছাড়া কেশবপুর উপজেলা শহরে কয়েকটি আবাসিক হোটেলও আছে। মধুপল্লি পরিদর্শন শেষে যশোর শহরে রাত্রিযাপন করতে পারবেন। সেখানে রয়েছে অনেক উন্নতমানের আবাসিক হোটেল।
কবি সম্পর্কিত তথ্য
মাইকেল মধুসূদন বাংলা ভাষায় সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক। তাঁর জন্ম ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি। প্রপিতামহ রামকিশোর দত্ত খুলনা জেলার তালা উপজেলার গোপালপুর গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। পিতামহ রামনিধি দত্ত ছোট ভাইদের নিয়ে মামার বাড়ি সাগরদাঁড়িতে চলে আসেন। তাঁর চার ছেলের মধ্যে রাধামোহন রাজনারায়ণ উকিল ছিলেন। তিনি কলকাতায় উকালতি করে প্রচুর অর্থশালী হয়েছিলেন। তিনি সাগরদাঁড়িতে জমিদারি কিনে বাড়িতে কিছু অট্টালিকা ও দেবালয় স্থাপন করেন। মাতা জাহ্নবী দেবী ছিলেন তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত কাঠিপাড়ার বিখ্যাত জমিদার গৌরীচরণ ঘোষের কন্যা।
শিশুকালে মধুসূদনের হাতেখড়ি হয়েছিল বাড়ির চন্ডীমন্ডপে। এরপর তিনি গ্রামের নিকটবর্তী শেখপুরা গ্রামের এক মৌলভী শিক্ষকের কাছে ফারসি শিখতেন। এই চন্ডীমন্ডপে শিক্ষা ও মৌলভী শিক্ষকের শিক্ষায় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্ত রচিত হয়। ১৮৩৭ সালে মধুসূদন হিন্দু কলেজে ভর্তি হন এবং ১৮৪১ সাল পর্যন্ত সেখানে ইংরেজি ও ফারসি অধ্যয়ন করেন। এই সময় খিদিরপুরে তাঁদের নিজের বাড়িতেই তিনি বসবাস করতেন। মধুসূদন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আশৈশব কবির বিলেত যাওয়ার বাসনা ছিল। ১৮৬২ সালের ৯ জুন কবি ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য আবার বিলেত পাড়ি জমান। ১৮৬৬ সালে লন্ডনের গ্রেজিন ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যরিস্টারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৩-১৪টি ভাষা তাঁর আয়ত্তে ছিল, যার মধ্যে ছিল গ্রিক, ল্যাটিন, ইতালীয়, হিব্রু, ফরাসি, জার্মান প্রভৃতি।
পাশ্চাত্য সাহিত্যের দুনির্বার আকর্ষণবশত ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। পাশ্চাত্য জীবনের প্রতি প্রবল আকর্ষণের ফলেই হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। ১৮৪৮ সালে মাদ্রাজ গমন করেন। সেখানকার সাত বছর প্রবাসকালে শিক্ষক, সাংবাদিক ও কবি হিসেবে সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। মধুসূদন রেবেকা ম্যাকটিভিস নাম্নী এক ইংরেজ যুবতীকে বিবাহ করেন। উভয়ের দাম্পত্যজীবন সাত বছর স্থায়ী হয়। রেবেকার গর্ভে মধুসূদনের দুই পুত্র ও দুই কন্যার জন্ম হয়। মাদ্রাজ-জীবনের শেষ পর্বে রেবেকার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার অল্পকাল পরে মধুসূদন এমিলিয়া আঁরিয়েতা সোফিয়া নামের এক ফরাসি তরুণীকে বিবাহ করেন। আঁরিয়েতা মধুসূদনের আমৃত্যু সঙ্গিনী ছিলেন।
মহাকবির কর্মজীবন কুসুমশোভিত ছিল না। উপার্জনের তুলনায় ব্যয়ের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হওয়ার কারণে তাঁর সংসারজীবনে আর্থিক দৈন্য কোনো দিনই কাটেনি। তা ছাড়া অমিতব্যয়ী স্বভাবের জন্য তিনি ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়েন। তাঁর জীবনের ইতিহাসে আমরা দেখি যে তিনি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, শিক্ষকতা করেছেন, পুলিশ কোর্টের কেরানি ছিলেন, সাংবাদিকতা করেছেন, আইন ব্যবসা করেছেন, অনুবাদকের কাজও করেছেন কিন্তু কোনোভাবেই কবির সংসারজীবনে আর্থিক অসচ্ছলতা কাটেনি। কপর্দকশূন্য অবস্থায় তিনি পরলোকগমন করেন। যে কবি জন্মে ছিলেন সোনার চামচ মুখে দিয়ে, কিন্তু জীবন কাটল কবির দীনতার চরম কষ্টে। ১৮৭৩ সালে কলকাতার আলিপুর দাতব্য চিকিৎসালয়ে রোগশয্যায় অনাহারে ও চিকিৎসাহীনতায় ভুগে ২৯ জুন পৃথিবীর চিরনিদ্রায় শায়িত হন যশোর জেলার প্রথম ব্যারিস্টার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
কবি জীবনের শেষ দিনগুলোতে এসে জন্মভূমির প্রতি তাঁর ভালোবাসার চিহ্ন রেখে গেছেন। তাঁর সমাধিস্থলে কবিতার পক্তিমালা লেখা রয়েছে:
‘দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল!
এ সমাধি স্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি বিরাম)
মহীর পদে মহা নিদ্রাবৃত
দত্ত কুলোদ্ভব কবি শ্রী মধুসূদন!’
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৪তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৮