বিভ্রমের মায়াজালে স্থাপত্যের নান্দনিকতায় বিশ্বসেরা স্থাপত্য

স্যঁতে দি ভ্যু-ল্য-ভিকোন্ত (Chateau de Vaux-le-Vicomte) প্রাসাদটি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের দক্ষিণে প্রায় ৩৪ মাইল (৫৫ কিলোমিটার) দূরে ম্যু’ল্যা শহরের কাছে মেইন্সিতে অবস্থিত। এই প্রাসাদটি ম্যু’ল্যা ও ভ্য-এর ভাইকাউন্ট, বিলি ল্য-এর মারকুইস আর ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের অর্থ ও শিল্পমন্ত্রী নিকোলাস ফু্যঁকের জন্য নির্মিত। ১৬৫৮-১৬৬১ এই সময়ের নির্মাণ করা প্রাসাদটি মূলত মধ্য সপ্তদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় ঘরানার চমৎকার শিল্পনিদর্শন। আর্কিটেক্ট লুই ল্য ভু, ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্ট আঁদ্রে ল্য নত্র এবং রংসজ্জাকারী চার্লস ল্য ব্রান এই তিনজন ভ্যু-ল্য-ভিকোন্তের মতো এত বৃহৎ প্রজেক্টে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে কাজ করেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ আর ইন্টেরিয়র ডিজাইনের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য ও নতুন রীতি লক্ষ করা যায় বিশেষভাবে। নতুন রীতিটি আসলে কেমন তা অনুধাবন করার জন্য প্রাসাদটির বাগানই হতে পারে সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ।

স্যঁতে দি ভ্যু-ল্য-ভিকোন্তের গড়ে ওঠার পেছনের ইতিহাসটি সত্যিই বিষাদময়। ১৬৪১ সালে ভ্যু-ল্য-ভিকোন্ত এস্টেটটি নিকোলাস ফু্যঁকে যখন কেনেন, তখন তিনি ২৬ বছরের টগবগে তরুণ। তরুণ নিকোলাস ফু্যঁকের শিল্প আর শিল্পী উভয়ের প্রতিই ছিল বিশেষ অনুরাগ। ১৬৫৭ সালে নিকোলাস ফু্যঁকে যখন রাজা চতুর্দশ লুইয়ের অর্থ ও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন, তখন তিনি তাঁর কেনা নতুন এস্টেট আর এর বাগানের পুনর্নির্মাণের জন্য লুই ল্য ভু, আঁদ্রে ল্য নত্র এবং চার্লস ল্য ব্রানকে একত্রে নিয়োগ দেন। ভ্যু ল্য ভিকোন্ত নিয়ে নিকোলাস ফু্যঁকের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। তিনি ভ্যু ল্য ভিকোন্তকে বাগানের মাঝে অনিন্দ্যসুন্দর এক প্রাসাদ হিসেবে তৈরি করতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন তাঁর স্বপ্নের প্রাসাদটি হবে আভিজাত্য আর শিল্পের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ভ্যু ল্য ভিকোন্তর পার্শ¦বর্তী তিনটি গ্রাম কিনে নেন এবং এর বাসিন্দাদের ওখান থেকে সরিয়ে দেন। পরে এই গ্রাম তিনটির অধিবাসীদের তিনি তাঁর বাগানে কাজের সুব্যবস্থা করে দেন। ধারণা করা হয়, এই বাগানে প্রায় ১৮ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়, যাতে ব্যয় হয় প্রায় ১৬ মিলিয়ন লিভর (ফ্রান্সের তৎকালীন মুদ্রা, ১ লিভর = ১ পাউন্ড রৌপ্য), যা আনুমানিক ২০২ কোটি ৬০ লাখ টাকার সমান। স্যঁতে বা প্রাসাদটির পাশাপাশি এর নির্মাতা উভয়েই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ফ্রান্সের রাজকীয় ভোজানুষ্ঠান, সাহিত্য আর শিল্পকলার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। বিশেষত কবি লা ফন্টেয়েন এবং নাট্যকার ম্যুলিয়ের দুজনেই ছিলেন ফু্যঁকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। স্যঁতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফু্যঁকের অনুষ্ঠান সহকারী ফ্রঁসা ভ্যাতেল রাজা চতুর্দশ লুইয়ের সম্মানে বিশাল রাজকীয় ভোজ আর আলোকসজ্জার আয়োজন করে। এ উপলক্ষে নাট্যকার ম্যুলিয়েরের নাটক ‘লে ফ্যচে’-এরও উদ্বোধনী প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ফু্যঁকের প্রিয় স্যঁতে যেমন মনোমুগ্ধকর ছিল, এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও ছিল তেমনই জাঁকজমকপূর্ণ। এত সুবিশাল আয়োজনের সবটুকুই ছিল রাজা চতুর্দশ লুইকে মুগ্ধ করার জন্য। কিন্তু ১৭ আগস্ট, ১৬৬১ সন্ধ্যায় শুরু হওয়া ফু্যঁকের এই আয়োজন উল্টো আয়োজকের জন্য বয়ে আনে দুর্ভাগ্য। রাজা মুগ্ধ হন ঠিকই কিন্তু এই সুবিশাল আয়োজনের পেছনে অপরিমিত অর্থেরও ছড়াছড়ি দেখে রাজার বিস্ময় তার মুগ্ধতাকেও ছাপিয়ে যায়। উপরন্তু জ্যঁ বাতিস্ত কোল্বার রাজাকে ফু্যঁকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় তহবিল তছরুপের অভিযোগ আনতে প্ররোচিত করেন। রাজাও ফু্যঁকের এই বিপুল অর্থের জোগান তাঁর রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে এসেছে বলেই মনে করেন। অনুষ্ঠান চলাকালীন সেদিনের মধ্যরাতেই রাজা নিকোলাস ফু্যঁকেকে তহবিল তছরুপের দায়ে গ্রেপ্তার করে জ্যঁ বাতিস্ত কোল্বারকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন। পরে ফু্যঁকেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্ত্রী-সন্তানকে ফ্রান্স থেকে নির্বাসিত করা হয়। রাজা স্যঁতেটিকে (প্রাসাদ) দখল  করে এর ১২০টি মূল্যবান ট্যাপেস্ট্রি বাজেয়াপ্ত করে এর কিছু কিছু নিজেই কিনে নেন। স্যঁতের সৌন্দর্যবর্ধনের মূর্তি, কমলাগাছগুলোকে তিনি সরিয়ে নেন এবং লুই ল্য ভু, আঁদ্রে ল্য নত্র এবং চার্লস ল্য ব্রানকে নিয়োগ দেন ভ্যু ল্য ভিকোন্তের থেকেও বড় প্রোজেক্ট ভার্সাইয়ের প্রাসাদ ও বাগান গড়ে তুলতে। এর প্রায় ১০ বছর পর মাদাম ফু্যঁকে বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর এই সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করেন, যদিও তত দিনে ফু্যঁকে ইহলোক ছেড়ে পরকালে পাড়ি জমিয়েছেন। ছেলের মৃত্যুর পর মাদাম ফু্যঁকে স্যঁতে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। নিকোলাস ফু্যঁকের এই রাজকীয় ভোজ ও গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে মহাকবি ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘সন্ধ্যা ছয়টায় যে ফু্যঁকে ছিলেন ফ্রান্সের রাজা, রাত দুইটা বাজার আগেই তিনি হয়ে গিয়েছিল ভিখারি।’

স্থাপত্যশৈলীতে স্যঁতে ভ্যু ল্য ভিকোন্ত

স্যঁতেটি অবস্থান প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা উত্তর-দক্ষিণ অক্ষের একদম উত্তর প্রান্তে। এর প্রবেশপথ উত্তর দিকে মুখ করা। গম্বুজটি বিশেষ কোনো একদিকে হেলানো নয় বরং এর অবস্থান উত্তর-দক্ষিণে সমানভাবে প্রতিসম। শুধু তা-ই নয়, এর অন্দরসজ্জাও পূর্ব অর্ধ ও পশ্চিম অর্ধে সামান্য পার্থক্য ছাড়া প্রায় প্রতিসম। কেন্দ্রের দুটি কক্ষ। উত্তরের প্রবেশপথ এবং দক্ষিণের ডিম্বাকৃতির অভ্যর্থনা কক্ষটি প্রাথমিকভাবে উন্মুক্ত করেই তৈরি করা হয়েছিল, যেটি মূল স্যঁতেকে আলাদা দুটি ভাগে বিভক্ত করেছে। সে কারণেই কেন্দ্রের কক্ষ দুটির সাজসজ্জা বাইরের ঘরের মতো। প্রবেশপথের ওপরে তিনটে খিলান, প্রবেশপথ ও অভ্যর্থনা কক্ষের মাঝে অন্য তিনটি খিলান, এমনকি অভ্যর্থনা কক্ষের সামনের তিনটি খিলান থাকায় যেকোনো দর্শনার্থী চাইলেই মূল স্যঁতেতে প্রবেশ না করেই প্রাসাদকেন্দ্র থেকে বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে। বাইরের দিকে অবস্থিত খিলানগুলো লোহার গেট দিয়ে আটকে রাখা যায়, যদিও এর পরেই কাচের দরজা রাখা হয়েছে। ভেতরের দিকের খিলানগুলোর দরজায় আর্শি দেওয়া। স্যঁতেটি যেহেতু সমান দুইভাগে বিভক্ত, এখানে একটি মূল সিঁড়ির বদলে দুই পাশেই আলাদা আলাদা সিঁড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পূর্বদিকের ঘরগুলো তখনকার প্রথানুযায়ী অন্যান্য অভিজাত ভবনের মতোই রাজার ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি ও সাজানো হয়েছে। আর পশ্চিম দিকের ঘরগুলো সাজানো হয়েছে নিকোলাস ফু্যঁকের নিজের জন্য। 

এই ভবনটির ক্ষেত্রে আরেকটি বিস্ময় হচ্ছে এর মূল আবাসিক ভবন ‘কব দ্য লজি’তে (ভবনের প্রধান ব্লক) পূর্ব-পশ্চিম দুই দিকেই দুই সারির কক্ষ ব্যবহার করা হয়েছে। তখনকার প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ‘কব দ্য লজি’ হতো এক কক্ষের সারি। অর্থাৎ মূল ভবনে পাশাপাশি থাকবে একটি কক্ষ। ভ্যু ল্য ভিকোন্ত হচ্ছে প্রথম স্যঁতে যেখানে দুই সারির ‘কব দ্য লজি’ ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও পরবর্তী সময়ে ফ্রান্সে আরও কয়েকটি স্যঁতে বা হোটেলে ‘স্যঁতে ভ্যু ল্য ভিকোন্ত’-এর এই অনন্য দুই সারির ‘কব দ্য লজি’ অনুসরণ করা হয়েছে। দুই সারির ‘কব দ্য লজি’ ছাড়াও ভ্যু ল্য ভিকোন্ত এ অন্যান্য অভিজাত প্রাসাদ বা স্যঁতের সঙ্গে আরও কিছু বৈসাদৃশ্য রয়েছে। যেমন অন্যান্য স্যঁতে বা প্রাসাদে আবাসিকদের জন্য ব্যবস্থা মূলত ভবনের দ্বিতীয় তলায় হয়ে থাকে। ভ্যু ল্য ভিকোন্তের ব্যতিক্রম। এখানে আবাসিকের ব্যবস্থা নিচতলাতেই রাখা হয়েছে। এ জন্যই সমসাময়িক অন্যান্য স্যঁতের মতো ভ্যলে ভিক্যটে প্রধান সিঁড়ি বা কোনো গ্যালারি নেই। নিচতলা বা ওপরের তলার কক্ষগুলোর গোপনীয়তা বজায় রাখতে মাঝের লম্বা সারির বারান্দা বা দরদালানও ভ্যু ল্য ভিকোন্তর নতুন সংযোজন, মধ্য সপ্তদশ শতাব্দীতে স্যঁতে ভ্যু ল্য ভিকোন্ত তৈরির আগে যা কেউ কল্পনাও করেনি। এই প্রাসাদের চার কোনার প্রতিটিতে অবস্থিত একটি করে প্যাভেলিয়ন বরং প্রচলিত  বৈশিষ্ট্যের।

ভ্যু ল্য ভিকোন্ত প্রথমে ইট আর পাথরের সমন্বয়ে তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু তখনকার সময়ে মধ্যবিত্তরাও বাড়ি করতে ইট-পাথরের ব্যবহার শুরু করলে উচ্চবিত্তরা ইটের ব্যবহার বাদ দিয়ে দেয়। ফু্যঁকেও তাই স্যঁতে নির্মাণের সময় ইটের ব্যবহার করেননি। স্যঁতের মূল ভবন মর্মর পাথর আর প্ল্যাস্টারের তৈরি হলেও উত্তর দিকের সার্ভিস বিল্ডিংটি ইট আর পাথরে তৈরি। সম্ভবত শ্রেণি সচেতনতা এর পেছনে কাজ করেছে।  

স্যঁতেটির মূল ভবন তৈরি করা হয়েছে পরিখার মাঝখানে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দুটি সংযোগ সেতু দিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করা যায়। ভবনের চারপাশে জলাশয়ের পরিখার এই ধারণাটি লুই ল্য ভু সম্ভবত ম্যাসন থেকে ধার করেছিলেন। স্যঁতে ভ্যু ল্য ভিকোন্ত নির্মাণের আগেও এখানে যে ভবনটি ছিল তার চারপাশে ছিল এমন পরিখা। সেটিও লুই ল্য ভুকে অনুপ্রাণিত করে থাকতে পারে।

উত্তর দিকের পরিখা সেতুটি প্রাসাদের সামনের প্রশস্ত চত্বরের সঙ্গে মিলে এর প্রবেশমুখের যে নকশা ফুটিয়ে তুলেছে, তা দেখতে অনেকটা আগেকার দিনের রাজপ্রাসাদের কোর্ট অব অনারের মতো। যদিও এখানে কোর্ট অব অনারের মতো বহির্মুখে লাগোয়া বিশাল চত্বরে রসুইখানা কিংবা গৃহস্থালির কিছু রাখা হয়নি। ভ্যু ল্যতে বরং আধুনিক ভবনের মতো এসব সুবিধা বেসমেন্টে রাখার ফলে বাড়তি চত্বরের প্রয়োজনই পড়েনি। প্রবেশমুখ ফ্রান্সের স্থাপত্যের নিদর্শন হলেও এখানে ফ্র্যাঁনস ম্যঁস্যার তৈরি ম্যাসনেরও আভাস মেলে। ভ্যু ল্যতে এই দুই নিদর্শনকে মেলানোর জন্য প্যাভেলিয়ন আর প্রধান ভবনের মাঝে অতিরিক্ত দুটি খিলানের ব্যবহার করা হয়েছে। এর প্রতিটির ওপরে পিরামিড আকৃতির ছাদ দেওয়া হয়েছে। এ রকম খাঁড়া ছাদ আসলে মধ্যযুগীয় রীতি। ভ্যু ল্য ভিকোন্তের স্থাপত্য প্রচলিত অভিজাত ভবনের বৈশিষ্ট্য কখনোই পুরোপুরি অনুসরণ করেনি আবার তা একেবারে অনুসরণ করেনি আধুনিক নির্মাণকৌশলকেও। বরং এই স্যঁতেকে আমরা এই দুইয়ের মাঝামাঝি ভিন্ন এক ধরনের স্থাপত্য বলতে পারি। এর মূল নকশাকারী লুই ল্য ভুও হয়তো এই রীতি তাঁর অন্য কোনো ভবনের নকশায়ও আর কখনো অনুকরণ করেননি।

প্রাসাদ উদ্যান

প্রায় তিন কিলোমিটার প্রশস্ত স্যঁতের উদ্যানের নকশাকারী আঁদ্রে ল্য নত্র। ভ্যু ল্য ভিকোন্তে প্রাকৃতিকভাবেই ছিল জলাশয়। উদ্যানের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে দুটি ছোট নদী। ল্য নত্র কৃষি আর জলাভূমিকে পানির অববাহিকা, নুড়ি বিছানো পথ, পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির নহর, ভাস্কর্য আর গাছগাছালির উদ্যানে রূপ দিয়েছিলেন, যার সৌন্দর্য সব ঋতুতেই থাকবে একই রকম।

ল্য নত্র ল অব পারস্পেক্টিভ ব্যবহার করে প্রাসাদ থেকে বাগান দেখার চমৎকার এক দৃশ্য তৈরি করেছেন। ল্য নত্রের জন্য ভ্যু ল্য ভিকোন্তের প্রাকৃতিক বিস্তীর্ণ ভূমি ছিল বেশ সুবিধাজনক। নত্র বাগানে পানি প্রবাহের নালাগুলোকে শেষের দিকের অংশে রেখেছেন যেন তা প্রাসাদ থেকে বাগান দেখার সময় নজরে না পড়ে। নালার পরেই বাগানে অনেকখানি খোলা জায়গা রাখা হয়েছে। এরপরেই হারকিউলিস কলাম স্থাপন করে এর সীমান্তরেখা টানা হয়েছে। এ কারণেই বাগানের গুল্ম আচ্ছাদন একে ভোজানুষ্ঠান আয়োজনের জন্য দারুণ একটা পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে।  

আঁদ্রে ল্য নত্র এই উদ্যানটিতে একধরনের দৃষ্টিবিভ্রমের সৃষ্টি করেছেন। তাঁর ব্যবহৃত এই দৃষ্টিবিভ্রমের কৌশলকে বলা হয় অ্যানামরফসিস অ্যাবস্কন্ডিটা (Anamorphosis abscondita). এই শব্দটির কাছাকাছি বাংলা দাঁড়ায় ‘বিকৃতি গোপন’। এটি সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় বাগানের পুকুরগুলো দেখে। পুকুরগুলো কাছ থেকে দেখলে অনেক ছোট মনে হয় (যেমন প্রাসাদের পেছন দিকে দাঁড়িয়ে) আর দূর থেকে দেখলে তুলনামূলক বড়। বাগানের এই দৃষ্টিবিভ্রম নকশার কারণে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে দর্শনার্থীর কাছে সবকিছুই বাস্তবের থেকে অনেক নিকটে মনে হয়। স্যঁতে দ্য ভ্যু-ল্য-ভিকোন্তের ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট জায়গাটা হচ্ছে স্যঁতের পেছনের দিকের সিঁড়ির সবচেয়ে উঁচু ধাপটি। এখানে দাঁড়িয়ে বাগানের দিকে দেখলে একজন মানুষের যে অভিজ্ঞতা হবে তা সত্যিই অতুলনীয়। কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে এই অনুভব পাওয়া অসম্ভব। এটি একই সঙ্গে একেবারে প্রাকৃতিক এবং অতিপ্রাকৃত ভিন্ন এক অনুভূতির সৃষ্টি করে। ক্যামেরায় তোলা ছবিতে এর সৌন্দর্য তুলে আনা সম্ভব নয়। কেবল নিজ চর্মচক্ষে দেখলেই এর সৌন্দর্য অনুভব করা সম্ভব। এখানে দাঁড়ালে এক নজরেই পুরো বাগানটি চোখের সামনে উন্মোচিত হয়। বাগানে প্রতিসমভাবে সাজানো গুল্ম আচ্ছাদন, ভাস্কর্য, ঝরনা, ফুলের ঝোপ, জংলা গাছের সারি, পুষ্করিণী সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতিকে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে আরও বেশি প্রাকৃতিক করে তুলেছে। উদ্যানের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে একটি বড় পুকুর, যার পাশেই তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম গুহা, এর আশপাশের ছোট-বড় নানা আকৃতির ভাস্কর্য আর পরিষ্কার আকাশ এর পানিতে প্রতিবিম্ব ফেলে সৃষ্টি করে আরেক মনোরম দৃশ্যের। বাগানের ঢালু জমির কারণে এর প্রকৃত আকার বোঝা দায়। বাগানের মধ্য দিয়ে হেঁটে এলে যেন বাগানটি চোখের সামনে আরও বড় হয়ে ওঠে। কিছুদূর হাঁটার পরেই দেখা যায় পুকুরটিকে ওপর থেকে গোলাকৃতি মনে হলেও আসলে তা ডিম্বাকৃতির। এর পরেই রয়েছে একটি নালা। নালার পরে গুল্মভূমি পেরিয়ে এলে দ্বিতীয় পুকুর আর এর পাশের দৃশ্যমান গুহা ও ভাস্কর্য। কিন্তু দ্বিতীয় পুকুরটি দর্শনার্থীদের চমকে দেবে। এটি মোটেও গোল নয় বরং চারকোনা। পুকুর দেখে চমকে গিয়ে থামলেই হবে না। এর থেকে আরও বেশি চমক রয়েছে। যে গুহা আর ভাস্কর্যকে ওপর থেকে দেখে একদম পুকুরের পাড়ঘেঁষা মনে হয়েছিল, ওগুলোর অবস্থান আসলে পুকুরপাড় থেকে আরও অনেক নিচে। পুকুরপাড় আর গুহার মাঝে রয়েছে একটা চওড়া খাল (প্রায় এক কিলোমিটার)। ওপর থেকে দেখার সময় এই খালটি একদমই নজরে পড়ে না। এই দৃষ্টিবিভ্রমকে ইলুসিডের দশম থিওরিতে ব্যাখ্যা করা যায়। এলেন ওয়েসিস মিরর ইনফিনিটিতে এ সম্পর্কে বলেছেন, প্লেন থেকে দেখলে দৃষ্টিসীমার নিচে থাকা সবচেয়ে দূরবর্তী বস্তুটিকে সবচেয়ে নিকটবর্তী বলেই ভ্রম হয়।

ফু্যঁকের সময়ে উৎসাহীরা খালটিকে নৌকার সাহায্যে পার হতেন কিন্তু খালপাড় দিয়ে হেঁটে গেলে বনবৃক্ষের সারি আর গুহার প্রকৃত বিকৃতি চোখে পড়ে, যেটা এর আগে ভাস্কর্য বলে ভুল হয়েছিল। গুহা আর খালের পরেই বাগানের বিস্তৃত ভূমি অনেকটা ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। এটাই ল্য নত্র ভ্যানিশিং পয়েন্ট। এবার নিচ থেকে ওপরের দিকে দেখলে বাগানটিকে অনেক বেশি বড় দেখাবে। ওপর থেকে দেখলে যেমন প্রকৃত আকার থেকে বাগানকে আরও অনেক ছোট দেখায়, নিচ থেকে দেখলে ঠিক তার বিপরীত। আর এখানেই আঁদ্রে ল্য নত্র তৈরি বাগান তার ‘গোপন বিকৃতি’র পূর্ণতা পায়।

মাদাম ফু্যঁকের পর স্যঁতে দ্য ভ্যু ল্য ভিকোন্তের মালিকানা মার্শাল ভিলারস পরিবারের কাছে ছিল ১০০ বছরেরও বেশি সময় (১৭৬৪-১৮৭৫)। এরপর প্রায় ৩০ বছর অবহেলায় পড়ে থাকার পর নিলামে আলফ্রেড সমিয়ের এটি কিনে নেন। এত দিন খালি পড়ে থাকা স্যঁতেটির বাইরের অংশ প্রায় ধসে গিয়েছিল। এত সুন্দর বাগান ভরে গিয়েছিল আগাছায়। আর্কিটেক্ট গ্যাব্রিয়েল হিপোলিট ডেসটেইলার, ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্ট ইলি লেইনের সহযোগিতায় স্যঁতে ও এর বাগানের প্রাথমিকরূপ পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। আলফ্রেড সমিয়েরের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে এবং নাতনি বাকি কাজ সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তাঁদের বংশধরেরাই স্যঁতেটির তত্ত্বাবধান করছে। ফ্রান্সে জাতীয়ভাবে ঐতিহাসিক স্থানের মর্যাদা পাওয়া স্যঁতে দি ভ্যু-ল্য-ভিকোন্ত এখানে আগত দর্শনার্থীদের এখন নিয়মিতই স্বাগত জানায়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৬

মহুয়া ফেরদৌসী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top