দুনিয়া বড়ই বিত্রিময়। বিত্রি মানুষ আর বাড়ি ঘর। এরই ধারায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম অদ্ভূত বাড়ি ও স্থাপনা দেখা যায়। এতে দেখা মিলবে দারুণ বৈচিত্রতা এবং স্থান-কাল ভেদে শিল্পী, স্থপতি ও সাধারণ মানুষের রুচির বিভিন্নতা।
এসব স্থাপনাগুলোর কোনটি আবাসিক, কোনটি আবার দাপ্তরিক। এমনই কিছু ব্যতিক্রম এবং অদ্ভূত স্থাপনার তালিকা নিচে দেয়া হলো।
আল্পস পর্বতমালার এক অদ্ভুত বাড়ি
আল্পস পর্বতমালার এই অদ্ভুত বাড়িটি দেখতে অনেকটা হাসপাতালের বেডপ্যানের মতো। অদ্ভুত ভবনের সেরা দশের তালিকায় সবসময় থাকা ফরাসি আল্পসের এই পাথরের বাড়িটি পর্যটকদের জন্য প্রস্তুত ছিলো। তবে এর ভেতরে কারা বাস করেন সেই রহস্য কখনো প্রকাশ পায়নি।

ইনটেল হোটেল আমস্টারডাম-জানডাম
ইনটেল হোটেল নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের কাছে অবস্থিত একটি আবাসিক হোটেল। এর নকশার মূল ভাবনা ছিল জান অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলোকে হোটেলের সম্মুখভাগে অন্তর্ভুক্ত করা। পর্যটকরা বাস্তবিক অর্থেই যেন বলতে পারেন হোটেলটি বাড়ির মতোই। কাস্টমারদের হোটেলেও বাড়ির স্বাচ্ছন্দ্য দিতে এমনভাবে নকশা ডিজাইন করা হয় ভবনটির।

ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর ওয়ান্ডারওয়ার্কস মিউজিয়াম
আপনি ভাবছেন ভবনটি ভূমিকম্পে দেবে গেছে? ভূমিকম্পই হয়নি দেবে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। এটি হলো ওয়ান্ডারওয়ার্কস মিউজিয়াম। এই ভবনটি মোটেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার নয়। উল্টো এই ভবনটি ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভে অবস্থিত একটি আকর্ষণীয় জাদুঘর।
ওয়ান্ডারওয়ার্কস বাস্তবিক অর্থেই ধ্রুপদী স্থাপত্যকে উল্টে দিয়েছে। তিনতলা এই ভবনটি ৮২ ফুট উঁচু। ভবনটিকে এমনভাবে উল্টে দেওয়া হয়েছে দেখলে যেন মনে হবে এর ত্রিভুজাকার ভিত্তিটি ফুটপাতের সাথে চেপে বসেছে। ভবনটির এক কোণ দেখে মনে হয় যেন এটি বিংশ শতাব্দীর একটি ইটের গুদাম যা কোন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।
ওয়ান্ডারওয়ার্কস জাদুঘরে ঘণ্টায় ৬৫ মাইল বেগের বাতাসের একটি হ্যারিকেন রাইড, ৫.২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রাইড এবং একটি টাইটানিক প্রদর্শনী রয়েছে। এসব অদ্ভূত কর্মকান্ডেরই বহি:প্রকাশ এই ভবনটি।

লঙ্গাবারগার বাস্কেট বিল্ডিং
হস্তনির্মিত এই ঝুড়িটি কোন র্যাপলিকা নয়। এটিও একটি ভবন। ওহাইও-ভিত্তিক প্রস্তুতকারক লঙ্গাবারগার কোম্পানি তাদের অন্যতম জনপ্রিয় একটি পণ্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছে এই ভবনে। এই ভবনটি নির্মাণের মধ্য দিয়ে একটি কর্পোরেট সদর দপ্তর তৈরি করতে চেয়েছিলেন কর্তৃপক্ষ।
এটিকে দেখতে কাঠের ঝুড়ির মতো মনে হলেও, এটি আসলে একটি ৭ তলা ইস্পাতের ভবন। নকশাটি একদম সঠিক, কিন্তু এই পিকনিক বাস্কেট আকৃতির ভবনটি লঙ্গাবারগারের ট্রেডমার্ক, মিডিয়াম মার্কেট বাস্কেটের চেয়ে ১৬০ গুণ বড়।
এটি কোন স্থাপত্য শৈলীর? এই ধরনের অভিনব, উত্তর-আধুনিক স্থাপত্যকে আধুনিক স্থপতিদের জন্য অনুসরণ ও অনুকরণমূলক।

স্মিথ ম্যানশন
অদ্ভুত এই স্থাপনাটি হলো ওয়াইওমিং-এর ওয়াপিটি ভ্যালিতে অবস্থিত স্মিথ ম্যানশন। ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের পূর্ব গেটের কাছে বাফেলো বিল কোডি সিনিক বাইওয়ের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এটি সহজে চোখে পড়ে। স্বনামধন্য প্রকৌশলী ও নির্মাতা ফ্রান্সিস লি স্মিথ ১৯৭৩ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং ১৯৯২ সালে ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করার আগ পর্যন্ত তিনি ক্রমাগত নতুন নতুন উদ্ভাবন করে গেছেন। তিনি প্রায় দুই দশক ধরে কোনো নকশা ছাড়াই নান্দনিক সব ভবন ডিজাইন করে গেছেন।

মহাকাশ যুগে বিমান ভ্রমণ
১৯৯২ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস এই ভবনটিকে একটি নগর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করে—নাকি এটি মহাকাশ যুগের ঊষালগ্নে নির্মিত একটি অদ্ভুত ভবন?
পল উইলিয়ামস, পেরেইরা অ্যান্ড লাকম্যান, এবং রবার্ট হেরিক কার্টার সকলেই ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (LAX) থিম বিল্ডিং নামে পরিচিত। ভবনটি মহাকাশ যুগের নকশায় অবদান রেখেছিলেন। ২.২ মিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক ব্যয়ে নির্মিত, গুগি-শৈলীর এই অদ্ভুত ভবনটি ১৯৬১ সালে চালু হয়।
২০১০ সালের জুন মাসে ১২.৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এটি সংস্কার করা হয়, যার মধ্যে ভূমিকম্প-প্রতিরোধী আধুনিক প্রযুক্তিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

নিউ জার্সির লুসি নামের হাতি
জার্সি উপকূলে অবস্থিত ছয়তলা কাঠের ও টিনের তৈরি এই হাতিটির নিজস্ব ওয়েবসাইট রয়েছে। নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটির কাছে অবস্থিত এই জাতীয় ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সেই ১৮৮১ সালে জেমস ভি. ল্যাফার্টি নকশা ও নির্মাণ করেছিলেন। এটি অফিস এবং বাণিজ্যিক স্থান হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, কিন্তু এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিলো পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

ফ্রি স্পিরিট হাউস
কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ফ্রি স্পিরিট হাউসগুলো হলো কাঠের তৈরি গোলক। এগুলো গাছ, পাহাড়ের চূড়া বা অন্য কোনো পৃষ্ঠ থেকে ঝুলে থাকে। ফ্রি স্পিরিট হাউস হলো প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একটি ট্রি হাউস। এ ধরণের স্থাপনার উদ্ভাবন করেন টম চ্যাডলি।
এই স্থাপনার প্রতিটি বাড়ি হাতে গড়া একটি কাঠের গোলক, যা দড়ির জাল দিয়ে ঝোলানো থাকে। বাড়িটিকে দেখতে গাছের ডাল থেকে বাদাম বা ফলের মতো ঝুলতে দেখা যায়। একটি ফ্রি স্পিরিট হাউসে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে একটি সর্পিল সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে অথবা একটি ঝুলন্ত সেতু পার হতে হবে। গোলকটি বাতাসে আলতোভাবে দোলে এবং ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা নড়াচড়া করলে দুলে ওঠে।

নিউ ইয়র্ক স্টেটের পড হাউস
স্থপতি জেমস এইচ. জনসন নিউ ইয়র্কের রচেস্টারের কাছে পাউডার মিলস পার্কে এই অসাধারণ বাড়িটির নকশা করেন। স্থপতি ব্রুস গফের কাজ এবং স্থানীয় বুনো ফুল ‘কুইন অ্যান’স লেস’থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি হাউসের এমন ডিজাইন করেছেন।
মাশরুম মতো দেখতে হাউসটি আসলে সংযোগকারী হাঁটার পথসহ (Walkway) কয়েকটি পডের একটি জটিল কাঠামো। সরু কাণ্ড আকৃতির পিলারের উপরে স্থাপিত এই পডগুলো অর্গানিক আর্কিটেকচারের এক মজাদার এবং রহস্যময় উদাহরণ।

মন্ত্রীর ট্রি হাউস
ওয়াইওমিং-এর ফ্রান্সিস লি স্মিথের মতো, টেনেসির হোরেস বার্জেসেরও একটি স্থাপত্য-স্বপ্ন ছিলো। বার্জেস বিশ্বের বৃহত্তম ট্রি হাউস তৈরি করতে চেয়েছিলেন এবং দৃশ্যত ঈশ্বরের কৃপায় তিনি তা সম্পন্নও করেছিলেন। ১৯৯৩ সাল থেকে শুরু করে প্রায় এক যুগ ধরে, কোনো নকশা ছাড়াই বার্জেস নির্মাণকাজ চালিয়ে যান। প্রায় ছয়টি গাছ জুড়ে বিস্তৃত হোরেস বার্জেসের ট্রি হাউসটি একটি পর্যটন আকর্ষণ ছিলো। তবে এক সময় স্থাপনাটি অগ্নিবিধি লঙ্ঘনের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। এর আগে পর্যন্ত এটি একটি পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুই ছিলো।

বিয়ার ক্যানের বাড়ি
সাউদার্ন প্যাসিফিক রেলরোডের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী জন মিলকোভিচ। প্রায় ৩৯,০০০ বিয়ার ক্যানের আকারে আসল অ্যালুমিনিয়ামের সাইডিং দিয়ে তার বাড়িটি সাজিয়েছেন। এ বাড়িটি নির্মাণ করতে তিনি প্রায় ১৮ বছর সময় ব্যয় করেছিলেন।
সাউদার্ন প্যাসিফিক রেলরোড থেকে অবসর নেওয়ার পর, মিলকোভিচ তার বিয়ার পানের অভ্যাস বদলে ফেলেন। দিনে তার ছয় ক্যান বিয়ার লাগতো। দীর্ঘ ১৮ বছরের অভ্যাসকে তিনি তার বাড়ি নির্মাণ প্রকল্পে পরিণত করেন। তিনি কূর্স, টেক্সাস প্রাইড এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লাইট বিয়ার ব্যবহার করতেন।
মিলকোভিচ তার হিউস্টন, টেক্সাসের বাড়িটি চ্যাপ্টা ক্যান থেকে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের সাইডিং এর বিভিন্ন অদ্ভুত ভাস্কর্য দিয়ে সাজিয়েছিলেন। মিলকোভিচ ১৯৮৮ সালে মারা গেছেন। তার মৃত্যুরর পর বাড়িটি সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে বাড়িটি অলাভজনক সংস্থা ‘অরেঞ্জ’ এর শো সেন্টার ফর ভিশনারি আর্ট-এর মালিকানাধীন।
তথ্যসূত্র: thoughtco.com

















