প্রকৌশলী ম. ইনামুল হকের জন্ম ২৩ জুলাই ১৯৫১ সালে, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা থানার ধান্যঘরা গ্রামে। পিতা মো. ইব্রাহিম, মাতা সকিনা খাতুন। ১৯৫৯ সালে পিতার কর্মস্থল করাচি যাবার পর সেখানেই কেটেছে শিক্ষাজীবন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় প্রবাসে থেকে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। এ জন্য পিতাসহ পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে জেল খাটেন। ১৯৭৪ সালে পুরকৌশল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৮ জুন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওয়াটার রিসোর্সেস সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স অব সায়েন্স ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৪ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী হন। সরকারি দপ্তরসমূহে নানা পদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে তিনি সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে জনসেবক হিসেবে সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। তিনি নিজ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত অন্য মন্ত্রণালয়গুলোর মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডও আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য করে তাদের করণীয় বিষয়ে নানাভাবে পরামর্শ দিয়েছেন। জানুয়ারি ২০০৫ থেকে তিনি পর্যায়ক্রমে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করে ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে আবসর গ্রহণ করেন।
প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক একজন কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংগঠক। বাংলায় ও ইংরেজিতে লেখা তাঁর ১১টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও ত্রৈমাসিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। তাঁর লেখা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক সেমিনারে পঠিত ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৌশলী মো. ইনামুল হক বর্তমানে ‘জল পরিবেশ ইনস্টিটিউট’-এর চেয়ারম্যানের পাশাপাশি জনমানুষের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাশেদুল হাসান।
বাংলাদেশে রয়েছে নানা রকম সম্পদ। প্রাণিসম্পদের পাশাপাশি আমাদের বিশাল যে জলজ সম্পদ রয়েছে, আপনার কি মনে হয়, এটার সদ্ব্যবহার আমরা নিশ্চিত করতে পারছি?
নিশ্চিত করতে পারছি না। নিশ্চিত করতে না পারার চেয়ে বড় কথা হলো, আমরা একে দূষিত করছি। এটা যদি ব্যবহার না করেও যেমন ছিল তেমনি রাখতাম, তাতেও আমরা পরোক্ষভাবে উপকৃত হতাম। কেননা নদী এখন দূষিত। মাছটাও আসে না নদীতে। আর তাই আমি বলব, নদীকে আমরা ব্যবহার করতে পারছি না। উল্টো দূষিত করছি। খাল কেটে একেবারে বিলের তলা পর্যন্ত শুকিয়ে নদীকে ক্রমেই নিঃশেষ করে দিচ্ছি।
আমাদের জলজ সম্পদটাকে যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে চাই, তবে কী করা যেতে পারে?
সুপেয় পানি বা মিঠা পানির প্রধান উৎস বৃষ্টির পানি। এর ওপর রয়েছে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব। নদীতে একটা তলানি প্রবাহ থাকে। বিভিন্ন পাহাড় থেকে, হিমালয় পর্বত থেকে ঝরনা ধারার মাধ্যমে এই তলানি প্রবাহ আসে। এই আসাটা বন্ধ হয়ে গেছে। কীভাবে বন্ধ হলো? ভারত তাদের অংশে ব্যারাজ দিয়েছে, সেচকাজ করছে আর আমরা আমাদের এখানে ছোট ছোট যে বিল ছিল, সেগুলো নিঃশেষ করেছি। আমাদের দক্ষিণাঞ্চলে তথা বরগুনা, পটুয়াখালীÑ এসব জেলায় বাড়ির সামনে অনেক পুকুর ছিল, এখন নেই। এই ঢাকায় অনেক পুকুর ছিল, এখন নেই। বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের পানি আটকে রাখার ব্যবস্থাপনা যদি সারা বছর থাকত, আমরা এর সুফলটা পেতাম। কিন্তু আমরা যদি কাল থেকে মনে করি যে পানিকে আমরা দূষিত করব না, নদীকে দূষিত করব না। পানি যেটা আছে, সেটা আমরা জলাশয়ে রেখে দেব এবং সারা বছর ব্যবহারের ব্যবস্থা করব, কাল থেকেই তা সম্ভব। সারা দেশে যত বিল-ডোবা আছে, তার মধ্যে জলাভূমির জায়গাটা খাসজমি ছিল, এখনো আছে। কিন্তু ওই খাসজমিটাও এখন লিজ নিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে।
ঢাকার আয়তন অনুযায়ী এখানে অনেক বেশি মানুষ বাস করছে। ঢাকা শহরের যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, আপনার মতে এটি কেমন হওয়া উচিত?
ঢাকাতে পানি সরবরাহের ব্যবস্থার শতকরা ৮০-৮৫ ভাগ ডিপটিউবওয়েলের। গভীর স্তর থেকে পানি ওঠানো হয়। ওপরের স্বল্প গভীর স্তর দূষিত হয়ে ইতিমধ্যে কালো হয়ে গেছে। একেবারে গভীরে গেলে ভালো পানি পাওয়া যায়। সারা বিশ্বে সাধারণত শহর অঞ্চলে যে পানি সরবরাহ হয়, সেটা ভূউপরিস্থ পানি, তথা নদীর পানি। এই পানি একটা প্লান্টে বিশুদ্ধ করা হয়। আমাদের এখানে সায়েদাবাদে যেমনটা আছে। কিন্তু এর পানি সরবরাহের ক্ষমতা মোট চাহিদার শতকরা ১০ থেকে ১৫ ভাগ, এর বেশি না। আর বাকিটা আসে ডিপটিউবওয়েল থেকে। নদীর পানি প্লান্টে এনে বিশুদ্ধ করা হয়। প্রথমে ময়লা পানি পরিষ্কার করে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত করা হয়। এরপর সরবরাহ করা হয়। কিন্তু আমাদের এখানে দূষিত পানির পরিমাণ এত বেশি যে প্লান্টগুলোই অকার্যকর হয়ে পড়ে। সায়েদাবাদ প্লান্টে পানি আনা হয় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে। শীতলক্ষ্যা নদীর পানি কালো। কিন্তু কালো হওয়ার কথা ছিল না। দেশে পরিবেশ অধিদপ্তর আছে, আছে আইনও। মানুষকে সচেতন করার আগে সরকার যদি সচেতন হয়, তবে এই পানি রক্ষা করা সম্ভব। প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস ঢাকায়। এখানে কোনো পয়ঃশোধন কারখানা নেই। ময়লা-আবর্জনা শোধনের কোনো ব্যবস্থা নেই। কাজটা ওয়াসার। ওয়াসা শুধু পানি সরবরাহ করে কিন্তু পয়ঃশোধন করে না। এটা কোনো নগর হলো? শহর হলো? আমরা রীতিমতো এক বস্তিতে বাস করছি। এ অবস্থায় ঢাকায় নগর সরকার ছাড়া কোনো উপায় নেই। এখন বৃষ্টির পানি যে খাল দিয়ে নেমে যাবে, সেই খালটা যদি ১০০ ফুট হয়ে থাকে, সেটাকে ১০০ ফুটই রাখতে হবে, ৩০ ফুট করা যাবে না। মানুষ এটাকে দখল করে নিয়েছে। দখল করে এটাকে ৩০ ফুট করে দিয়েছে, ২০ ফুট করে দিয়েছে। বেদখল এই খালকে উদ্ধার করার দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। কিন্তু তারা সেখানে যাচ্ছে না। যাচ্ছে ওয়াসা। এই খালগুলো মাটি দিয়ে ভরাট করে বন্ধ করা। একে খনন করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এর দায়িত্ব নিতে হবে। খালগুলো পুনর্খনন করে বড় করতে হবে। বক্স কালভার্ট যেগুলো আছে, সেগুলোকে ভেঙে আবার ওপেন করে দিতে হবে।
এখন তো জলবায়ুর বিষয় নিয়ে নানা কথা বলা হচ্ছে। এর মধ্যে একটা বড় বিষয় হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং বলা হচ্ছে যে এই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সাগরের যে লোনা পানি, এটা ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি কেমন?
বাংলাদেশের মানুষ যেটা বলা দরকার, সেটা বলে না। যেটা করা দরকার, সেটা করে না। যেমন- দেশীয় নদী রক্ষা। বৈশ্বিক উষ্ণতার ব্যাপারে বাংলাদেশে প্রচুর ফান্ড আসছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসকরণের পেছনে যে টাকাটা এসেছে, তার শতকরা ৯০ ভাগ দুর্নীতিতে ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশে যে দুটো বড় নদী গঙ্গা আর ব্রহ্মপুত্র, তাতে প্রতিবছর ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন টন পলি আসে। এই পলি এসে সাগরের তলদেশ তথা ভূমিকে উঁচু করছে। সাগরে পানি যে হারে বাড়ছে, সমুদ্রে বাংলাদেশে ভূমি বাড়ছে তার চেয়েও দ্রুতগতিতে। আর তাই বৈশ্বিক উষ্ণতার কোনো রকম ঝুঁকিতেই নেই বাংলাদেশ।
পরিবেশবাদী নানা আন্দোলন এখন দেখা যাচ্ছে। আপনারা যে ধরনের আন্দোলন করছেন, যেমন নদী বাঁচাও আন্দোলন, এগুলো আমাদের রাজনীতিতে বা মানসিকতায় কি কোনো গুণগত পরিবর্তন আনতে পারবে বলে মনে করেন?
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো যে আন্দোলন করছে, এই আন্দোলনটার প্রয়োজন আছে। এই আন্দোলনের ফলে পরিবেশবিদ যাঁরা, তাঁদের ভেতর একধরনের রাজনৈতিক-সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। তাঁরা এটা বুঝছেন যে ভবিষ্যৎ রাজনীতি করতে হবে পরিবেশকে মাথায় রেখে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে রাখতে হবে পরিবেশকে রক্ষা করার কথা।
এখন নানা রকম উন্নয়ন নিয়ে কথা হয়। যেমন টেকসই উন্নয়ন, আবার আমাদের জাতীয় বাজেটে নানা রকম উন্নয়ন পরিকল্পনা, উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ থাকে। তো এ ক্ষেত্রে পরিবেশকে বাদ দিয়ে আদৌ কি কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব?
টেকসই উন্নয়নের নামে কনসালট্যান্সি হয়। কিছু প্রজেক্ট হয়, কিছু লোক দেখানো কথা হয়। পরে এটাকে আবার নতুন করে শুরু করা হয়। আমি এটাকে ভুল মনে করি। নতুন করে শুরু না করে আগের কাজে ত্র“টিটা কী, সেটা বের করা উচিত। প্রতিটা পরিকল্পনার পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। ত্রুটিগুলোকে সংশোধন করা উচিত। আমরা ওগুলোকে আবর্জনা হিসেবে রেখে নতুন পরিকল্পনার নামে নতুন আর একটা আবর্জনা তৈরি করি। টেকসই উন্নয়ন এভাবে হবে না। এটাকে পুনর্বাসন করতে হবে।
আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি থেকে শুরু করে রয়েছে নানা রকম বাণিজ্যিক চুক্তি। এসব নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। ভারত তো ট্রানজিট-সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের তিস্তা পানি চুক্তি বা ফারাক্কা বাঁধসংক্রান্ত বা গঙ্গার পানি প্রবাহÑ এগুলো নিয়ে তো এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। এটাকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
এর গোড়ায় নিহিত আছে ১৯৪৭-এর দেশভাগ। তখনই এটা ভাবা হয়েছিল, যেভাবে বাংলাকে ভাগ করা হয়েছে। এটা একটা অপ্রাকৃতিক বিন্যস, যা কোনো উপকারে আসবে না। সেই ছক অনুযায়ী আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। ভারতকে আমরা ট্রানজিট দিলাম, আমাদের পানি দাও। ট্রানজিট আর পানি ভিন্ন বিষয়। পানি ব্যাপারটা হবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী। ট্রানজিট যাবে দ্বিপক্ষীয়ভাবে। ট্রানজিট কিন্তু সারা বিশ্বে অনেক দেশেই আছে। পানির ব্যাপারটা কিন্তু ঐতিহাসিক অধিকার, মৌলিক অধিকারও বটে। সম্প্রতি পানি প্রবাহের যে আইন হয়েছে, যা সনদ-১৯৯৭, সেখানে খুব স্পষ্টভাবে সব দেশের রাজনৈতিক নদীগুলোর ব্যাপারে বলা হয়েছে, কীভাবে এটি বাস্তবায়িত হবে। এ আইনের প্রয়োগ করলে ভারত আমাদের পানি আটকাতে পারে না। ভারতের ওখানে পানি আটকালে সেই পানির জন্য আমাদের যে ক্ষতি হবে, সেই ক্ষতিপূরণ দিতে ভারত বাধ্য। একটা নদীর বন্যা যে এলাকা ধরে যায়, সেটাই তো নদীর অববাহিকা। তিস্তার যে পানি, সেটা দিয়ে সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির যে স্তর, সেখানে পানি দেওয়া হয়। সেটাই তার অববাহিকা। এখানে ভারতের চিন্তাভাবনা একদম পশ্চাদপদ, দুর্বল, অবৈজ্ঞানিক, সংকীর্ণ। এ কারণেই আমরা মার খাচ্ছি। আমি বলব, ভারতের জন্য না, আমরা মার খাচ্ছি আমাদের জন্য। তবে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে আমাদের সরকার কিন্তু ভালো ভূমিকা রেখেছে।
ভারতের যে আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প এবং তাদের ওখানে যে সরকারই আসুক, তারা তাদের এজেন্ডা থেকে কিন্তু সরছে না। তারা মনে করছে, এটা ভারতের জাতীয় স্বার্থ। ভারতে যদি এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এর কতটুকু প্রভাব পড়বে?
ভারত যে আন্তনদী সংযোগগুলো করবে, সেটা ওরা ওদের ওখানে করবে, আমরা যেটা করছি তা আমাদের ক্ষতি তো করবেই, ভারতের যে রাষ্ট্রগুলোর ওপর দিয়ে এটা যাবে, তাদেরও ক্ষতি হবে। তাদের যে ক্ষতি হবে, সেটা তারা জানে। জানে বলেই ওসব এলাকার মানুষ প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ করছে। প্রতিরোধ করছে বলেই আন্তনদী সংযোগ পরিকল্পনা এ অঞ্চলে করাটা সহজ হবে না।
প্রাসঙ্গিকভাবেই আসে টিপাইমুখ প্রসঙ্গ। বাংলাদেশে তো এর প্রতিবাদ হচ্ছে, আপনারাই করছেন। একই সঙ্গে ভারতেরও কিছু জায়গায় এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আপনার কী মনে হয়? এখন কী অবস্থায় আছে এই টিপাইমুখ বাঁধের প্রসঙ্গটি?
যখন এটা করা হলো, এটার স্বার্থটা ছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের। বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে সে বিদ্যুৎটা তারা সহজেই নিতে পারবে। আর ক্ষতিটা হবে স্থানীয় বাসিন্দাদের। অনেক এলাকাই ডুবে যাবে। যেমন- আমাদের এখানে কাপ্তাই ড্যাম করাতে চাকমা-অধ্যুষিত অনেক এলাকার ক্ষতি হয়েছে। আসলে প্রতিবাদটা স্থানীয়ভাবে হওয়া উচিত। ড্যাম করলে ক্ষতিটা হবে আমাদের; বোরো ধানের উৎপাদন একেবারে শেষ হয়ে যাবে। ড্যাম করার ফলে সারা বছর পানি এসে আটকে থাকবে। আর ড্যাম না করলে বর্ষার পানিটা হেমন্তের প্রথম দিকে নেমে যাবে। নেমে যাওয়ায় হাওরাঞ্চলটা জেগে উঠবে। হাওর জাগলে তখন সেখানে বোরো ধান হবে। সারা বছর পানি থাকলে হাওরাঞ্চলটা জাগবে না। ডুবে থাকলে সেখানে আর বোরো ধান হবে না। ফলে বছরে আমরা এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেরো ধান পাব না। হাওর এলাকার ধান-নির্ভর অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্থানীয় মানুষ ও তাদের জীবন-জীবিকা। স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধে ভারত পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে। আমার মনে হয়, একবার এটা আটকে গেলে পরে করা কঠিন।
ভারতের সঙ্গে যে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা হলো, সে ক্ষেত্রে আমরা দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ, যেটার অধিকার হারিয়েছি, তো কখনো যদি আবার জেগে ওঠে, আপনি বলছিলেন আমাদের যেহেতু পলি যায়, সে ক্ষেত্রে যদি এই দ্বীপ আবার জেগে ওঠে, তাহলে কি বাংলাদেশ আবার কোনো অংশ পাবে? এ রকম কোনো সম্ভাবনা আছে বা ভারতের সঙ্গে আমাদের সার্বিক সমুদ্রসীমার বিশ্লেষণটা আপনি কীভাবে করবেন?
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যতটুকু পরিমাণ আমরা পেতে পারতাম তার তুলনায় আমাদের সমুদ্রসীমা কিছুটা ছোট। ভারতের সঙ্গে আমরা যে সমঝোতা করেছি, তাতে আমরা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হইনি। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের জায়গা নিয়ে বিরোধ ছিল। সেখানে বাংলাদেশ প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার পেয়ে গেছে। আর ভারত পেয়েছে পাঁচ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর পেছনের কারণ হলো দক্ষিণ তালপট্টি। যদি দক্ষিণ তালপট্টির অস্তিত্ব থাকত, তবে আমরা পেতাম ২০ হাজারের মধ্যে মাত্র পাঁচ হাজার বর্গকিলোমিটার। ভারত পেত ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার। বলতে পারেন, এটা একধরনের কূটনৈতিক বিজয়। এই বিজয় সম্ভব হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণায়ের দূরদর্শিতায়। আন্তর্জাতিক নদী আইনে নিয়ম হলো, কোনো একটা দ্বীপ যে দেশের খুব কাছাকাছি হবে, সেটা তার। দক্ষিণ তালপট্টির বেশির ভাগ অবস্থান ভারতের কাছাকাছি। দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটি ভাটার সময় কিছুটা জাগে। আবার জোয়ারের সময় ডুবে যায়। এখন যদি দক্ষিণ তালপট্টি জেগে ওঠে, তাহলে পুরোটা ভারত পাবে না। এর এক-চতুর্থাংশ হলেও বাংলাদেশ পাবে। এর পুরো অংশ একটা দেশ পুরোপুরি পাবে না। এটাকে আমাদের একটা সফল কূটনৈতিক বিজয় বলা যায়।
একইভাবে মিয়ানমারের সঙ্গেও আমাদের সমুদ্রসীমানা নির্ধারণে বিরোধ চলছিল। সেটারও আন্তর্জাতিক আদালতে সমাধান হয়েছে এবং রায়ে আমরা যে বাড়তি অংশটা পেলাম, এই বাড়তি পাওয়া বা যা পেয়েছি তা থেকে সুবিধা নেওয়ার জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত?
সুবিধা নেওয়ার ব্যাপারটা সমুদ্রসীমার একেক দূরত্বে একেক রকম। ভূমি যেমন পুরোপুরি একটা দেশের থাকে। সমুদ্র কিন্তু আবার একটা দেশের থাকে না। সমুদ্র মাপা হয় সমুদ্রের তট থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল ও ২৪ নটিক্যাল মাইল। একটা দেশের সমুদ্রপথে কোনো জাহাজ যেতে হলে তাকে অবশ্যই অনুমতি নিতে হয়। এর পরে সে ২০০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে সমুদ্রসম্পদ ব্যবহার করতে পারে। যেমন- মাছ বা খনিজ সম্পদ। এর পরে আরও ১৫০ নটিক্যাল মাইল আছে, যেটা সবার জন্য উন্মুক্ত। এর মধ্যে আবার কেউ যদি কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে চায়; যেমন- সাবমেরিন কেব্ল বা পাইপলাইন বসাতে চায়, তাহলে ২০০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে তাকে তা করতে হবে। প্রতিটাই এভাবে ভাগে ভাগে বিভক্ত। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই তা করতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে মূলত একটা জায়গা নিয়ে আমাদের বিরোধ ছিল। সেটা সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণাংশ। এটা যে আমাদের ছিল তা আমরা জানতাম না। সেটা কিন্তু মিয়ানমার পেয়েছে। আগে আমাদের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কথা বিবেচনা করেই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এবার আর তা করা হয়নি। এবার করা হয়েছে নাফ নদীর মুখ থেকে। এর মুখ থেকে সেন্ট মার্টিন প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিজেই ১২ কিলোমিটার। এর পরে আরও ১২ কিলোমিটার। প্রায় ৩৬ কিলোমিটার এলাকার পুরোটাই আমাদের হতে পারত। কিন্তু হয়েছে উজান থেকে, যার ফলে আমাদের বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে। ক্ষতি হলেও যেভাবে ভাগাভাগি হয়েছে, তাতে লাভবান বাংলাদেশই। সমুদ্রসীমার ২০০ নটিক্যাল মাইল সবচেয়ে দামি এলাকা। এর মধ্যে যেমন মাছ ও খনিজ সম্পদ আছে, তেমনি মাটির তলায় আছে প্রাকৃতিক সম্পদ তেল ও গ্যাস।
সমুদ্রসীমায় আমাদের যে জলজ সম্পদ বা নবায়নযোগ্য সম্পদ, তা আহরণ বা কাজে লাগানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বা কারিগরি সক্ষমতা আমাদের আছে কি?
সক্ষমতা গড়ে তুলতে কাজ করতে হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেরিন ফিশারিজ ইনস্টিটিউট আছে। আছে মেরিন একাডেমি। সমুদ্র উপকূলের লোনা পানি ও মোহনা আমাদের জন্য বিরাট সম্পদ। মহীসোপান যেখানে পানি পুরোপুরি লবণাক্ত। জলজ জীবের একটা নিয়ম আছে। তারা গভীর জলে বাস করে। কিন্তু প্রজননের সময় উপরিভাগে চলে আসে। যারা উপরিভাগে চলে আসে, তারা মহীসোপানে আসে। এবং এখানে এসে মোহনায় ডিম ছড়ায়। মোহনায় যারা থাকে, তারা নদীতে এসে ডিম ছড়ায়। নদীতে যারা আছে, তারা শাখা নদীতে এসে ডিম ছড়ায়। শাখানদীতে যারা থাকে, তারা খালে এসে ডিম ছড়ায়। খালে যারা থাকে, তারা বিলে ডিম ছড়ায়। বিলে যারা থাকে, তারা বিলের মাঝডাঙায় ডিম ছড়ায়। এই মৎস্যসম্পদ কাজে লাগাতে আমাদের সচেতনতার পাশাপাশি সময়জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। মাটির নিচে যে সম্পদ আছে, তার জন্য আমাদের অন্যের সহায়তা দরকার।
বাংলাদেশের প্রধান যে নদীগুলো, সেগুলোরই তো দুরবস্থা, শাখানদীগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলোকে বাঁচানোর উপায় কী বলে আপনার মনে হয়?
ছোট নদীগুলো বর্ষা গেলেই শুকিয়ে যায়। এগুলোকে বাঁচাতে হলে এসব নদীতে যেসব বিল থেকে পানি আসত, তা অব্যাহত রাখতে হবে। এগুলোর মাঝে যেসব খাসজমি আছে, তা লিজ দিতে হবে। বিলটা যাতে শুকিয়ে না যায়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। যদি বর্ষায় না শুকায়, তবে পানির স্তর থেকে পানি চুইয়ে চুইয়ে খালে আসবে। পানি এলে ছোট নদীগুলো বেঁচে যাবে। সব বিলকে ইজারা দেওয়া হয়। ইজারা দিয়ে যে টাকা পাওয়া যায় তা খুবই সামান্য। বিলগুলো থেকে আমরা অনেক বেশি টাকা তুলতে পারতাম, যদি তা জেলেদের মধ্যে লাইসেন্স করে দেওয়া হতো। যার লাইসেন্স থাকবে, সে সারা বছর নিয়ম মেনে মাছ ধরতে পারবে। এতে অনেক টাকা আমরা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে পারব। সব নিয়ম মানা হলে নদী থাকবে, জেলে বাঁচবে, সরকারের রাজস্বও বাড়বে। কোনো কিছু উজাড় হবে না। এখন যেটা চলছে তা হলো উজাড় হওয়া সংস্কৃতি।
নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে কী করা যেতে পারে?
নাব্যতার কিন্তু পথ বা রোড আছে। জাহাজগুলো কোন পথে যাবে। যেমন, রাস্তায় যেমন রোড থাকে। নৌ-রোডও আছে। ওই নৌ-রোডগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিআইডব্লিউটিএ মাঝেমাঝে ড্রেনেজ বা খননকাজ করে। বর্ষাকালে ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথ বহমান। যেখানে বর্তমানে ৪ হাজার কিলোমিটারও পাওয়া যাবে না। যখন বিলগুলো চালু থাকবে। এর মাধ্যমে চালু থাকবে খালগুলো। খালগুলোর মাধ্যমে ছোট নদীগুলো চালু থাকলে ২৪ হাজারের জায়গায় ১০-১৪ হাজার নদীপথ জীবিত থাকবে। পরিমাণটা আবার এর বেশিও হতে পারে। আমাদের নদীর মূল উৎস যেটা, সেটাকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে।
বন্ধনকে সময় দেওয়ায় আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ।
পরিচিতি
প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক
প্রকৌশলী ম. ইনামুল হকের জন্ম ২৩ জুলাই ১৯৫১ সালে, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা থানার ধান্যঘরা গ্রামে। পিতা মো. ইব্রাহিম, মাতা সকিনা খাতুন। ১৯৫৯ সালে পিতার নতুন কর্মস্থল করাচি আসার পর এখানেই কেটেছে শিক্ষাজীবন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় প্রবাসে থেকেও অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। এ জন্য পিতাসহ পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে জেল খাটেন। ১৯৭৪ সালে পুরকৌশল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৮ জুন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওয়াটার রিসোর্সেস সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স অব সায়েন্স ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৪ সালে হন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী। সরকারি দপ্তরসমূহে নানা পদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে তিনি সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে জনসেবক হিসেবে সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। তিনি নিজ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত অন্য মন্ত্রণালয়গুলোর মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডও আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করে তাদের করণীয় বিষয়ে নানাভাবে পরামর্শ দিয়েছেন। জানুয়ারি ২০০৫ থেকে তিনি পর্যায়ক্রমে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক একজন কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংগঠক। বাংলায় ও ইংরেজিতে লেখা তাঁর ১১টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও ত্রৈমাসিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। তাঁর লেখা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক সেমিনারে পঠিত ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৌশলী মো. ইনামুল হক বর্তমানে ‘জল পরিবেশ ইনস্টিটিউট’-এর চেয়ারম্যানের পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৭তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৫