বারো আউলিয়ার ভূমি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। ইতিহাসের শুরু থেকে চট্টগ্রামে আরাকানি মগদের প্রভাব লক্ষণীয়। এখানকার তৎকালীন রাজারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হওয়ায় সুলতানি, আফগান ও মোগল আমলে আরাকানিদের সঙ্গে ওদের প্রায়ই যুদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকত। শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের বিজয়ের ফলে এখানে গড়ে ওঠে ইসলামি সংস্কৃতির আবহ। চট্টগ্রামের এখনকার সংস্কৃতির উন্মেষ হয় ১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কো¤পানি কর্তৃক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা প্রবর্তনের পর। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে সামাজিক ধান উৎপাদন ও বণ্টনে ঘটে পদ্ধতিগত আমূল পরিবর্তন। ধনী মুসলমানরা সমাজ সংস্কারে রাখেন অভূতপূর্ব ভূমিকা। ফলে বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠে অসংখ্য মসজিদ। চৌধুরীপাড়ার অবস্থান চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শিল্প এলাকা থেকে পুরোনো বড় পুল হয়ে আরও পশ্চিমে উত্তর হালিশহরে। এই চৌধুরীপাড়া আগে থেকেই ইতিহাসসমৃদ্ধ। সেই চৌধুরীপাড়ায় ঢুকতেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়ে নেয় ইট রঙে রাঙানো মোগল আমলের সাদৃশ্যপূর্ণ এক স্থাপত্যকর্ম, যা দেখলেই শালীনতা আর মার্জিত রুচিবোধ মনকে শীতল করে তোলে; এ আর অন্য কিছু নয়, একটি মসজিদ মাত্র। যার চারপাশ বিস্তৃত সবুজের অপূর্ব এক লীলাভূমিতে, যা মনকে মাতিয়ে রাখে অনুক্ষণ। স্থানীয় বাসিন্দারা এই স্থাপত্যশৈলীকে চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদ বলেই চেনে।
মসজিদের সামনের দিকে স্তম্ভের খোদাইকৃত লেখা থেকেই জানা যায়, ১৭৯৫ সালের কোনো একসময় এই চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদটি নির্মিত। যত দূর জানা যায়, এই মসজিদটিকে বিভিন্নভাবে সংস্কার ও বর্ধিত আকৃতি দিয়ে বর্তমান রূপ দেওয়া হয়েছে। মূল নকশাটি মোগল স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ তিন গম্বুজবিশিষ্ট। এর অভ্যন্তরীণ আয়তন লম্বায় ২১ দশমিক ৭৫ ফুট। প্রস্থে ১৩ দশমিক ৭৫ ফুট। মূল আয়তক্ষেত্রকার নামাজের স্থানটির জন্য রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় প্রবেশপথ। গম্বুজ আকৃতির দেয়ালের সঙ্গে রয়েছে একটি মিহরাব, যা কেন্দ্রীয় প্রবেশপথ বরাবর। মূল গম্বুজটি পাশের গম্বুজটি থেকে আয়তনে বেশ বড়। এটি বড় হওয়ার কারণে একটি বিশেষ আবহ তৈরি করে, যার কারণে স্থাপত্যশৈলীটি দেখতে লাগে দারুণ। পাশে গিয়ে দাঁড়ালেই মনে হয়, কোনো অভিজাত এলাকায় পা পড়েছে। আগে কাঠামোটি থাকলেও চুনকাম না করার ফলে এর বহিরাবরণ দেখতে অতটা চমৎকার ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি এর সংস্কারের ফলে এটি যেমন দেখতে সুন্দর হয়েছে, তেমনি স্থানীয় ও দূরের দর্শনার্থীদের কাছে লোভনীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরা এখানে একবার নামাজ আদায়ের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। মসজিদের মূল বহির্ভাগ চুনাপাথরের পলেস্তারাকৃত অলংকারসমৃদ্ধ।

দক্ষিণ ও উত্তর দিকের দেয়াল মোগল স্থাপত্যশৈলীর অভিজাত সৌন্দর্যই প্রকাশ করে। ফলে একটি চোখ ধাঁধানো স্থাপত্য হিসেবে সহজেই এটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। ১৯৬৫ সালে মসজিদটির সামনের আরসিসি বারান্দাটি সোজা করা হয়। যাতে অধিকসংখ্যক মুসল্লির নামাজের জায়গার সংকুলান করা যায়। সম্প্রতি পুরো মসজিদটি নতুন করে সিমেন্টে প্লাস্টার করা হয়েছে। সব ধরনের প্রবেশদ্বার অষ্টকোণী পিলারের ওপর নির্মিত, যার একেবারে অগ্রভাগে তিরের মতো সম্মুখ সংযুক্ত। এই বাড়তি কাজের জন্য এখানে অধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। প্রতি কোনায় রয়েছে অষ্টকোণী মিনার, যা ছাদের ওপর সমানভাবে স্থাপিত। মসজিদের মূল গম্বুজ অর্থাৎ কেন্দ্রীয়ভাবে যে গম্বুজটি বিদ্যমান তা ধাতুর তৈরি। মসজিদটি মূলত মোগল স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব সংমিশ্রণ, যার চারপাশের ফুটে উঠেছে সেই সময়ের স্থাপত্যকর্ম। গম্বুজটির ওপরের শৃঙ্গগুলো মিনার আকৃতির, দেখলে যেন মনে হয় আকাশচুম্বী। যেদিকেই তাকানো যাক না কেন মসজিদটি সমানভাবে সৌর্কষমণ্ডিত।
মসজিদটি সংস্করণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১২ সালের জানুয়ারিতে। পূর্ণ সংস্করণের কাজ করেন চৌধুরীবাড়ি ওয়াকফ এস্টেট। কাজটির মূল উদ্দেশ্য ছিল মসজিদের মূল আকার ও আকৃতিসহ পরিবেশ সংস্করণের পাশাপাশি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক রূপ তুলে ধরা। সেই সঙ্গে মোগল ঐতিহ্যকে ধারণ করা। এই মসজিদটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনাই নয়, বরং এটি ব্যবহার করা হয় সাধারণের নামাজের স্থান হিসেবে। মসজিদ নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর এখানে গ্রামের মানুষেরা নামাজ আদায় করছেন। চৌধুরীবাড়ি ওয়াকফ এস্টেটের পরিচালক ওবাইদুল কাদের চৌধুরী (ওকে চৌধুরী) জানান, এই মসজিদটি আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য, আমাদের পূর্বপুরুষেরা এটিকে আমাদের আমানত হিসেবে দিয়ে গেছেন। তাই মসজিদটি সংরক্ষণ করা আমাদের মহান দায়িত্ব।
প্রাচীন এই মসজিদটি পুনর্নির্মাণে পরামর্শক ছিলেন ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশের বর্তমান সভাপতি স্থপতি আবু সাইদ এম আহমেদ ও প্রকৌশলী ফিরোজ। পুনর্নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে আবু সাইদ এম আহমেদ বলেন, আমরা কাঠামোটি ঠিক রেখে মসজিদটিকে নতুনভাবে পলিস করেছি। অর্থাৎ আগে যেমন ছিল এখনো ঠিক তেমনই আছে। কিন্তু এখন তো ভবনে প্লাস্টার করতে বালু-সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়, ব্যবহার করা হয় রংও। যদি পুনর্নির্মাণে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তবে কি প্রাচীন আবহ ধরে রাখা সম্ভব? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রাচীন আবহ তুলে ধরতে চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদে চুন-সুরকি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এবং রঙের জন্য পান-সুপারির কষ ব্যবহার করা হয়েছে। আবু সাইদ এম আহমেদ আরও বলেন, আমরা সারা দেশে এমন ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণের চেষ্টা করছি। আর সবারই চাওয়া এমন ধরনের স্থাপত্যকর্ম সমৃদ্ধ একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা টিকে থাকুক অনন্তকাল।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৬০তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৫




















