বড় প্রকল্প যেখানে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে, তা নিয়ে ভাবনার যেন অন্ত নেই স্থপতি, প্রকৌশলী, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্ট সবার। প্রকল্প শুরুর আগেই চলে গবেষণা, ব্যয় নির্ধারণ ও অন্যান্য জল্পনা-কল্পনা। কারণ, একটি বড় প্রকল্প মানেই প্রচুর অর্থ, সময় ও সম্মানের প্রশ্ন। এ জন্য প্রকল্পের শুরুতে যেমন ডিজাইনটি গুরুত্ব বহন করে, তেমনি ডিজাইন অনুযায়ী যেন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয় এ নিয়ে স্থপতিসহ সবার থাকে সতর্ক দৃষ্টি। কিন্তু অনেক সময় অভিজ্ঞ ও দক্ষ স্থপতি, প্রকৌশলী ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও ভুল করেন। ধরা যাক, একজন নামকরা স্থপতি একটি ডিজাইন করলেন তাঁর সর্বোচ্চ দক্ষতা দিয়ে। কিন্তু তা বাস্তবায়নে কোথাও ছোট্ট ভুল রয়ে গেল। অথবা কর্তৃপক্ষ বাজেট কমানোয় অপ্রত্যাশিত কোনো পরিবর্তন করতে হলো কিংবা উপযুক্ত দেখভালের অভাবে পুরো কাজটিই বিফলে গেল। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ভুল শুধরানো হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ত্রুটিযুক্ত স্থাপনা ভেঙে আবার নতুন করে শুরু করা হয়। কিন্তু এমন অনেক স্থাপনা আছে, যেগুলোর ভুল সংশোধন করা হয়নি অথবা সেটাকে ভেঙে ফেলা হয়নি এমনকি এসব স্থাপনা কোনো কাজেও লাগেনি মানুষের। সম্ভবত এসব ব্যর্থ প্রকল্পগুলোকে ধ্বংস বা ব্যবহারোপযোগী না করে রেখে দেওয়া হয়েছে এখান থেকে শিক্ষা নিতে। চলুন দেখা যাক শিক্ষাটা কী রকম!
২০ ফেনচার্চ স্ট্রিট, লন্ডন, যুক্তরাজ্য
২০১৪ সালে এ ভবনটি উন্মুক্ত করা হয়। অনেকে এটাকে ‘ওয়াকিটকি’ ভবন বলে। স্থপতি রাফায়েল ভিনোলির ডিজাইন করা এ ভবনটি দেখতে অনেকটা কন্দের (bulbous) মতো। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটার নিচের তলার চেয়ে ওপরের তলার প্রশস্ততা বেশি। হয়তো বেশি ভাড়া পাওয়ার আশায় এ ধরনের ডিজাইন করা। এর মূল পরিকল্পনায় ওপরের দিকটা আরও বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লন্ডনের পুরোনো ভবনগুলোর সৌন্দর্য যাতে ব্যাহত না হয় সে জন্য এর ওপরের তলাগুলোকে মিটারখানেক ছোট করে তৈরি করা হয়েছে। এর সামনের দিকটা কাচে ঢাকা। আর বিপত্তির শুরু এখান থেকেই। ভবনের ওপরের দিক বেশি প্রশস্ত হওয়ার কারণে সামনের দিকটা দেখতে উপ-বৃত্তাকার। ফলে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে এমনভাবে কেন্দ্রীভূত আলোর বিম তৈরি করে, যা অনেকটা অতসী কাচের মধ্য দিয়ে আসা আলোর মতো। এতটাই শক্তিশালী আলোক রশ্মি এটি তৈরি করে যে একটা গাড়ির এতে মারাত্মক ক্ষতি হয়। এমনকি একটি গাড়ির প্লাস্টিক (PVC) অংশ গলে গিয়ে আগুন লেগে যেতে পারে। এটা অনেকটা সোলার ফার্নেসের মতো। ৩৭ তলা ভবনের এই প্রতিফলিত রশ্মি যেখানে পড়ে, সেখানে তাপমাত্রা প্রায় ১০০ ডিগ্রি সে. পর্যন্ত পৌঁছায়। এ তাপমাত্রায় আপনি উনুন বা চুলা ছাড়াই একটা ডিম সহজেই সেদ্ধ বা ভেজে নিতে পারবেন। যদিও এখন ভবনের কিছু অংশ ঢেকে রাখা হয়েছে, যাতে সূর্যের আলো না পড়ে। কিন্তু তারপরও এ ভবনের কারণে রাস্তা বরাবর ওপর থেকে এমন ঝোড়ো হাওয়া নেমে আসে যে মানুষের চলাচল কষ্টকর হয়ে পড়ে।
পন্টে সিটি, জোহানেসবার্গ, দক্ষিণ আফ্রিকা
ম্যানফ্রেড হার্মারের ডিজাইনে তৈরি দক্ষিণ আফ্রিকার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উঁচু এই ৫৫তলা আবাসিক ভবনটি নির্মিত হয় ১৯৭৫ সালে। এটা ছিল সেই সময়ের যখন জোহানেসবার্গ শহরে বর্ণবৈষম্য ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে। সে সময় এটি ছিল বিলাসবহুল এক ভবন এবং এখানে সাদা চামড়ার মানুষ ছাড়া আর কারও প্রবেশাধিকারের সুযোগ ছিল না। যদিও তাদের সেবা ও গৃহকাজ করত কালো চামড়ার মানুষেরা। কিন্ত এসব কালো মানুষদের কাজ শেষ হওয়ামাত্র ভবন ছাড়তে হতো। এই বিরাট সিলিন্ডার আকৃতির ভবনটির নিচে ছিল বিশাল এক খোলা জায়গা আর প্রতিটি তলায় ছিল বেশ কয়েকটা অ্যাপার্টমেন্ট। কিন্তু আশি ও নব্বইয়ের দশকে যখন বর্ণবিদ্বেষ আর অরাজকতা চরমে, তখন এটি কালোদের দখলে চলে যায়। এরা প্রায় সবাই ছিল নানা ধরনের অপরাধ কর্মে জড়িত ও দুষ্কৃতকারী। এখানকার বাসিন্দারা সবাই যার যার মতো নিরাপদ স্থানে চলে যায়, আর এটি হয়ে ওঠে কালোদের অপরাধের অভয়ারণ্য। বিশেষত নাইজেরিয়ানরা তাদের সব অপকর্ম এখান থেকে চালাতে থাকে। একসময় জায়গাটি ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যাকারীদের জন্য আদর্শ স্থানে পরিণত হয়। পরে অবশ্য আত্মহত্যা ঠেকানোর জন্য অ্যাপার্টমেন্টের জানালাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিচের খোলা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমতে জমতে তা পঞ্চম তলা পর্যন্ত পৌঁছায়।
পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে ২০০১ সালে নতুন মালিকানায় চলে যায় ভবনটি। বর্তমানে কয়েক দশকের ক্ষত সারিয়ে ভবনটিতে উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হলেও এর পুরোনো বর্ণবৈষম্য ক্ষতের খুব একটা উপশম হয়নি। এখনো ওপরের ইউনিটগুলো সাদাদের জন্য নির্ধারিত। আর কালোদের অবস্থান নিচের ইউনিটে।
প্রুট-ইগো, সেন্ট লুইস, মিসৌরি, যুক্তরাষ্ট্র
১৯৫০ সালের পরিসংখ্যান বলছে, তখন সেন্ট লুইস শহরের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে আট লাখের কাছাকাছি। পরে সেন্ট লুইস শহরের ঘনবসতি চরম আকার ধারণ করায় স্থপতি মিনোরু ইয়ামাসাকি ৫৭ একর জমির ওপর ৩৩টি ১১ তলা ভবন, রাস্তা, সবুজ খোলা স্থান, খেলার মাঠসহ সব নাগরিক সুবিধার সমন্বয়ে প্রুট-ইগোর ডিজাইন করেন। এর নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৫৪ সালে। ভবনগুলো ছিল সেই সময়ের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধাসংবলিত। ভেতরের সাজসজ্জা আর ফার্নিচারের পরিকল্পনা ছিল চোখ আটকে যাওয়ার মতো। এসব আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল তুলনামূলক নিম্ন আয়ের নাগরিকদের এখানে বসবাসের জন্য উদ্বুদ্ধ করা। এটা ‘মর্ডানিস্ট প্রিন্সিপল’কে সামনে রেখে অনেকটা ‘দ্য রেডিয়্যান্ট সিটি’র আদলে ডিজাইন করা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এমন দাঁড়াল যে কর্তৃপক্ষ ইয়ামাসাকির ডিজাইন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জটিল এক অবস্থার মধ্যে পড়ে। ফলে তারা এর নির্মাণ খরচ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। খরচ কমানোর ফলে অবকাঠামোগত যে পরিবর্তন হয় তা প্রকল্পটিকে বিরাট এক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২ হাজার ৮৭০টি অ্যাপার্টমেন্টবিশিষ্ট ৩৬ মিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্পটি ১৯৫৪ সাল নাগাদ মোটামুটি একটা পর্যায়ে আসে। কিন্তু আবার সমস্যা দেখা দেয় বাসিন্দাদের স্থানান্তর নিয়ে। কিসের ভিত্তিতে এখানে তাদের স্থানান্তর করা হবে। অর্থাৎ যাদের গাড়ি আছে তারা যাবে, নাকি যারা শহরে নতুন আসছে তারা যাবে, এ নিয়ে কর্তৃপক্ষ ও বাসিন্দারা মহা জটিলতার মধ্যে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের উৎপাত আর বিভিন্ন ধরনের অপরাধীদের তৎপরতা। সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে সরকার একসময় এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। ১৯৭২ সালে এর দুটি ভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলা হয়।
কমটার টাওয়ার, জর্জ টাউন, মালয়েশিয়া
১৯৬০ সালে মালয়েশিয়ার জর্জ টাউনের জন্য মাস্টারপ্ল্যান করা হয়। এই প্ল্যানের উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যমান নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো আর এর সঙ্গে জায়গাটিকে আরও বেশি কর্মমুখর করে তোলা। এই প্ল্যানের অংশ হিসেবে শহরের মাঝে নির্মাণ পরিকল্পনা করা হয় কমটার টাওয়ারের। এটির মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেন লিম চং কিটের নেতৃত্বে স্থপতি টিম থ্রি নামের একটি দল। জর্জ টাউনের মাস্টারপ্ল্যানে ১১ হেক্টর জায়গার ওপর একটি চার তলা মঞ্চ, তিনটি ১৭ তলা ও ২৩২ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট ৬৫ তলা কমটার ভবনের (২০১৫ সালে আরও তিনটি তলা যোগ করা হলে উচ্চতা দাঁড়ায় ২৪৯ মিটার) জায়গা রাখা হয়। কমটার টাওয়ারকে একটি মাল্টিপারপাস বিল্ডিং হিসেবে তৈরি করা হয়। রেস্টুরেন্ট, দোকান ও পেনাং সরকারের অফিসারদের অফিসও স্থান পায় এখানে। মানুষ যেন এখানে সহজেই আসা-যাওয়া করতে পারে সে জন্য পরিকল্পনায় রাখা হয় দীর্ঘ এলিভেটেড ওয়াক-ওয়ে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর উদ্দেশ্য সফল হয়নি। সে সময় আশানুরূপ কর্মমুখর করে তোলা সম্ভব হয়নি জর্জ টাউনকে। এই টাওয়ারের নির্মাণকাজের সময় জর্জ টাউনের বাসিন্দাদের স্থানান্তর করা হয়। ভাঙা হয় সব দোকান, হোটেল-রেস্টুরেন্ট। নির্মিত হয়নি পরিকল্পিত ফুটপাত। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কমটার টাওয়ারের অনেক ব্যবসায়ী বা বাসিন্দা এখান থেকে চলে যায়। ফলে কর্তৃপক্ষ এর মেরামতের দিকে আর নজর দেয়নি। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে এটি কর্তৃপক্ষের কাছে শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়। অবশ্য ২০০০ সালের পর থেকে এটি আবার ঘুরে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু একটা ব্যর্থ পরিকল্পনার উদাহরণ হিসেবে এটি ইতিহাসে ইতিমধ্যে স্থান পেয়েছে।
দ্য ফার্নসওয়র্থ হাউস, ইলিনয়, যুক্তরাষ্ট্র
ফার্নসওয়র্থ হাউস কেন একটা ব্যর্থ প্রজেক্ট তা জানতে আমাদের এর ইতিহাসটার দিকে একটু নজর দিতে হবে। ফার্নসওয়র্থ হাউসের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৪৫ সালে আর তা শেষ হয় ১৯৫১ সাল নাগাদ। ড. এডিথ ফার্নসওয়র্থ তাঁর অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে ইলিনয় রাজ্যের ফক্স নদীর তীরে এটি নির্মাণ করান। ড. ফার্নসওয়র্থ ছিলেন শিকাগো শহরের বিশিষ্ট কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ। আর যে স্থপতির তত্ত্বাবধানে এটি নির্মিত হয় তিনি মর্ডানিস্ট আর্কিটেক্ট ‘মিইজ ভেন ডের রোহ’। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে এটি ছিল অসাধারণ এক স্থাপনা। প্রকৃতি আর শিল্পের অদ্ভুত এক সম্মিলন এটি। ড. ফার্নসওয়র্থের ৬৪ একর জায়গা স্থপতি মিইজ এমনভাবে সাজান, যা হয়ে ওঠে উন্নতমানের এক শিল্পকর্ম। এর উদ্দেশ্য ছিল সব রকম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে মানুষ আর প্রকৃতির মাঝের দূরত্বকে কমিয়ে আনা।
নির্মাণকালীন বা নির্মাণের পরে অর্থনৈতিক বা প্রাকৃতিক এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যা এটিকে ব্যর্থ বলতে পারে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপারটি ঘটল এটিকে মালিকের কাছে হস্তান্তরের পর। দামি নির্মাণসমগ্রী আর সুন্দর ইন্টেরিয়রে সাজানো একতলা এ বাড়িতে যখন ড. ফার্নসওয়র্থ থাকতে এলেন তখন তাঁর কাছে মনে হলো দিন-রাত পাহারাদার বেষ্টিত কোনো এক সেনা ছাউনিতে বাস করছেন তিনি। ব্যস, সরাসরি বলে বসলেন ‘এটা কিস্সু হয়নি’। শুধু বলেই ক্ষান্ত হলেন না তিনি স্থপতি মিইজের পাওনা টাকাও দিতে অস্বীকৃতি জানান। মিইজও ছাড়ার পাত্র নন, তিনি আদালতে মামলা ঠুকে দিলেন। কারণ, তাঁর কাছে এটা যে শুধু টাকাপয়সার ব্যাপার তা কিন্তু নয়। এটা তাঁর প্রথম বড় ধরনের কাজ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার আগামীর ভবিষ্যৎ। শেষ পর্যন্ত আদালত মিইজের পক্ষে রায় দেন এবং ড. ফার্নসওয়র্থ তাঁর পাওনা টাকাও পরিশোধ করেন। তবে তিনি ওই বাড়িতে আর কখনো অবকাশ যাপনে যাননি। অযত্ন-অবহেলায় ধীরে ধীরে এটি নষ্ট হতে থাকে। নদী থেকে ১০০ মিটার দূরে অবস্থিত স্থাপনাটি বন্যায় কয়েকবার ডুবেও যায়। অবশ্য ডুবে যাওয়ার জন্য এর ডিজাইনারকে দোষ দেওয়া যায় না। কারণ, মেইজ বন্যার বিষয়টি বিবেচনা করেই এটি একটু উঁচু করে ডিজাইন করেছিলেন। কিন্ত ফক্স নদীর পানি বন্যার সময় যে ছয় ফিট পর্যন্ত উঁচু হবে তা কখনো কেউ ভাবেনি। পরে মেরামত না করার কারণে এটি দিন দিন জীর্ণ-শীর্ণ হতে থাকে। একসময় এটি একটি ব্যর্থ প্রজেক্ট হিসেবে পরিচিতি পায়।
স্পোর্টস সিটি, রোম, ইতালি
স্থপতি কালাট্রাভা তাঁর অসাধারণ কর্ম ‘সিটি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স’-এর কাজ শেষ করে নকশা প্রণয়ন করেন রোমের স্পোর্টস সিটির। মূলত স্পোর্টস সিটির উদ্দেশ্য ছিল ‘ইউনিভার্সিটি অব রোম টর ভার্টাগা’-র জন্য প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলা আর প্রশিক্ষণের উপযুক্ত স্থান তৈরি করা। ২০০৭ সালের দিকে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০০৯ সালের বিশ্ব সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতাকে সামনে রেখে এর প্রথম ভবনটির নির্মাণ শুরু হয়। এ ভবনটি ছিল একটা সুইমিং স্টেডিয়াম। কিন্তু খরচ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় একেবারে শেষের দিকে এটার নির্মাণকাজ থমকে যায়। যে সময় এটি পরিকল্পনা করা হয় সে সময়ের চেয়ে পরে চার গুণ খরচ বেড়ে যায়। ফলে ২০০ মিলিয়ন ইউরো বাজেটের এই স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। সুইমিংপুল, গ্যালারি আর লোহার স্ট্রাকচার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্টেডিয়ামটি শেষ পর্যন্ত ভূতের স্টেডিয়াম খেতাব নিয়ে পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়। মজার ব্যাপার হলো, ২০২৪ সালের অলিম্পিকের জন্য রোম যখন বিড করে তখন এই ভূতের স্টেডিয়ামকেও অন্যতম ভেন্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গার্ডেন সিটি, যুক্তরাজ্য
এতক্ষণ যতগুলো ব্যর্থতার নমুনার আলোচনা করা হলো তার সব কটিই ব্যর্থ হয়েছে হয় কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পর অথবা কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর। আর এগুলো এখনো কোনো না কোনোভাবে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। তাই বলে হারিয়ে যেতে বসেছে এ রকম নমুনা যে নেই তা বলা যাবে না। যেমন স্যার এবেনজার হাওয়ার্ডের গার্ডেন সিটির পরিকল্পনা। উনিশ শতকের শেষ দিকে তিনি ‘বস্তি ও ধোঁয়াবিহীন’ একটা নগরের পরিকল্পনা প্রকাশ করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘গার্ডেন সিটিজ অব দ্য টুমরো’। একে আমরা আগামীর সবুজ শহরও বলতে পারি। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ রকম কয়েকটি শহর একটি কেন্দ্রীয় শহরকে ঘিরে তৈরি হবে। এটি হবে শুধু আবাসিক এলাকা; শিক্ষা, সংস্কৃতির জন্য কেন্দ্রীয় শহরের সঙ্গে এটি যুক্ত থাকবে। কৃষি ও শিল্প-কারখানা থাকবে এখান থেকে একটু দূরে আলাদা কোনো জায়গায়, যেন শহরবাসী তাদের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস সেখান থেকে সংগ্রহ করতে পারে। তবে শহরে প্রচুর গাছপালা থাকবে, থাকবে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। কিন্তু শহরের জনসংখ্যা কোনোক্রমেই ৩২ হাজারের বেশি হতে পারবে না। যখনই এ সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে তখনই এ রকম আরেকটি শহর তৈরি করতে হবে।
এ সময় গার্ডেন সিটির মডেল বিশ্বব্যাপী দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। এমনকি আমেরিকাসহ সমসাময়িক এশিয়ার ব্রিটিশ কলোনিগুলোতেও এটি বেশ আলোড়ন তোলে। একই সঙ্গে বিভিন্ন নাগরিক অসুবিধার কারণে যথেষ্ট সমালোচিতও হয় এটি। মূল শহর, শিল্প-কারখানা, বাণিজ্য কেন্দ্রসহ মানুষের অন্যান্য কর্মক্ষেত্র এসব সবুজ শহর থেকে দূরে হওয়ার কারণে হাওয়ার্ডের এই পরিকল্পনা ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। তবে অনেকেই এখনো এ রকম শহরের স্বপ্ন দেখে। যদিও সেখানে হাওয়ার্ডের ধারণার কোনো প্রতিফলন নেই।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৬তম সংখ্যা, জুন ২০১৭।