আগে লোকেরা হাটবাজারে যেতে চট, কাপড়ের ব্যাগ কিংবা বাঁশ-বেতের ডোলা নিয়ে। আর দোকানিরা তাঁদের পণ্য ক্রেতার ব্যাগে পুরে দিতেন কাগজের ঠোঙায় ভরে। প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি একটি ব্যাগ বা ডোলা চলতো বছরের পর বছর। এসব জিনিস একদিকে যেমন ছিল সাশ্রয়ী, তেমনি এতে স্বাস্থ্য, অর্থ ও পরিবেশ সবকিছুই থাকত সুরক্ষিত। কিন্তু ব্যবহারের সুবিধার কারণে ক্রমেই এ স্থানটি দখলে নেয় পলিথিন ব্যাগ। ওজনে হালকা, সহজে বহনযোগ্য ও দামে সস্তা হওয়ায় ক্রমেই বাড়ে এর জনপ্রিয়তা। চাহিদার জোগান দিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে শত শত পলিথিন কারখানা। অল্প বিনিয়োগে বেশি লাভ হওয়ায় একশ্রেণির উদ্যোক্তা পলিথিন উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করে রীতিমতো একে শিল্পে পরিনত করেন। এখন নতুন প্রজন্ম জানেই না যে বাজার করতে ব্যাগ নিয়ে বেরুতে হয়। এই পলিথিন আসলে প্লাস্টিকেরই নব্য সংস্করণ, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এটা সহজে নষ্ট হয় না তাই এটি একবারেই পরিবেশবান্ধব নয়।
প্লাস্টিকের বর্জ্যরে বিষয়ে আর একটু ভালো ধারনা পাওয়া যায় ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ নামক সাময়িকীতে। গত বছর প্রকাশিত এই সাময়িকীর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০-এর দশক থেকে উৎপাদিত অথচ পুড়িয়ে ফেলা বা রিসাইকেল করা হয়নি এমন কঠিন প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ ৪৯০ কোটি টন। এ বর্জ্য মাটিতে পুঁতে চাপা দিতে গেলে ৭০ মিটার গভীর ও ৫৭ বর্গকিলোমিটার জায়গা অর্থাৎ আমেরিকার ম্যানহাটান শহরের সমান এলাকার প্রয়োজন। কিন্তু এর চেয়ে বড় পরিবেশগত ভাবনার ব্যাপার হলো, এই প্লাস্টিকের বেশির ভাগই শেষ হয়েছে সাগরে গিয়ে। সেখানে স্রোতের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় প্লাস্টিক পুনরুদ্ধার করা কার্যত অসম্ভব। কারণ, এসব বর্জ্য যখন ভাঙতে ভাঙতে মাইক্রো প্লাস্টিকে (ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাইক্রোস্কোপিক কণা, যা কমবেশি ১১ মাইক্রোমিটার প্রস্থের হয়ে থকে। এটা প্রায় চুলের ব্যাসের ছয় ভাগের এক ভাগ) পরিণত হয় তখন তা সংগ্রহ করে তা পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা বা ধ্বংস করা এখন অবধি অসম্ভব। একটি কম্পিউটার মডেলে দেখা যায়, বিভিন্ন সাগরে প্রায় ৫১ ট্রিলিয়ন মাইক্রো প্লাস্টিক কণা ভাসমান অবস্থায় আছে। এখন আমরা যে হারে প্লাস্টিকের বর্জ্য উৎপন্ন করছি, সেই হারে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জলরাশিতে ওজনের হিসাবে যে পরিমাণ মাছ থাকবে তার চেয়ে বেশি ওজনের প্লাস্টিক থাকবে।
পলিথিন বা প্লাস্টিকের ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে এর বর্জ্য। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পরিবেশ ও জলবায়ুদূষণ। এই দূষণ রোধ করার জন্য বিজ্ঞানীরা তাঁদের বিভিন্ন রকমের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কখনো কৃত্রিম পদ্ধতি ব্যবহার করে, কখনো-বা প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে। প্রাকৃতিকভাবে যদিও সাগরের লবণ ও সূর্যালোকে প্লাস্টিক ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় তবুও প্লাস্টিক যে পলিমার চেন দিয়ে গঠিত, সেই পলিমার চেনগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে অন্য কোনো যৌগে পরিণত হয় না। এসব পলিমার যদি অধিক তাপমাত্রায় পোড়ানো হয় তা হলেই কেবল প্রধানত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানিতে পরিণত হয়। কিন্তু পানি পরিবেশের সঙ্গে মিশে গেলেও কার্বন ডাই-অক্সাইড জমা হয় বাতাসে। আর এটাও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আসলে কৃত্রিমভাবে কিছু বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের যোগ্য করা গেলেও বাকি বর্জ্য ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার প্রাকৃতিকভাবে প্লাস্টিক ধ্বংস হতে সময় লাগে শত বছরেরও বেশি। তত দিনে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়েই যায়। তাহলে কি বলতে হবে প্লাস্টিক অবিনশ্বর? এর থেকে পরিত্রাণের কি কোনোই উপায় নেই?
কিন্তু তা কী করে হয়! যে গ্রহে ছত্রাকের বাস, সেখানে এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন প্লাস্টিককে খেয়ে ফেলতে সক্ষম এমন বিশেষ ধরনের এক ছত্রাকের। লন্ডনের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন কিউ -এর বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এ রকম একটি আশার বাণী শুনিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, এ ধরনের ছত্রাক প্লাস্টিকের বর্জ্যকে ধ্বংস করে টেকসই নির্মাণ উপাদান তৈরিতে সক্ষম।
কিউ গার্ডেন থেকে প্রকাশিত স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস ফাঙ্গি ২০১৮ রিপোর্টে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের ছত্রাকের কথা উল্লেখ করা হয়। ২০১৭ সালে বিজ্ঞানীরা খেয়াল করেন, পাকিস্তানের কিছু আবর্জনার মধ্যে অ্যাসপারগিলাস টিউবিনজেনসিস নামক ফাঙ্গাস বা ছত্রাক-জাতীয় উদ্ভিদ সপ্তাহখানেকের মধ্যেই প্লাস্টিককে খেয়ে ফেলে। আর তখনই এটাকে শনাক্ত করে নথিভুক্ত করা হয়। গবেষকদের ধারণা, প্লাস্টিকের বর্জ্য আমাদের বর্তমানে যেভাবে নাজেহাল করছে আর ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে অ্যাসপারগিলাস টিউবিনজেনসিস হয়তো এর একটা সমাধান হতে পারে। এ ধরনের ছত্রাক প্লাস্টিকের ওপর বা গায়ে জন্মায় এবং এর মধ্যে থাকা একধরনের এনজাইম প্লাস্টিকের রাসায়নিক বন্ধনের অণুগুলো ভেঙে ফেলে। ফলে তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। ছত্রাকটির এই গুণাবলির জন্যই প্লাস্টিকের বর্জ্যরে পরিবেশগত সমস্যার সমাধানে একে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের রিপোর্টে ২০১৭ সালে আবিষ্কৃত প্রায় দুই হাজার প্রজাতির ছত্রাকের উল্লেখ করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশের ওপর যে প্রভাব পড়ছে তার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এসব নতুন ছত্রাক কীভাবে ব্যবহার করা হবে তার ওপর গবেষণা করা হচ্ছে বলে এই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। কিউ গার্ডেনের সিনিয়র রিসার্চার টম পিটারসন বলেন, ‘দি স্টেট অব দি ওয়ার্ল্ড ফাঙ্গি’-এর রিপোর্ট হচ্ছে ছত্রাক রাজ্যের একটা খণ্ডচিত্র মাত্র। এ রিপোর্টে আমরা দেখতে পাই, ছত্রাক সম্পর্কে আসলে আমরা কত কম জানি। এসব ছত্রাককে আমরা কতভাবে আমাদের কাজে লাগাতে পারি তার সম্ভাব্য একটি ধারণা এখান থেকে পাওয়া যেতে পারে। জৈব জ্বালানি, ওষুধসহ আরও কত রকমভাবে এর ব্যবহার হতে পারে তা সময়ে বোঝা যাবে। টেকসই নির্মাণসামগ্রীর উৎস হিসেবেও এর অনেক বড় সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে আমেরিকার কিছু প্রতিষ্ঠান এর সম্ভাব্য বাজার যাচাই শুরু করেছে।
নতুন আবিষ্কৃত ছত্রাক যেমন প্লাস্টিক পচিয়ে ফেলতে পারে, তেমনি মাটির দূষণও রোধ করতে পারে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। এ ছত্রাকেরই সাদা রঙের আরও দুই প্রজাতি প্লিউরোটাস অসট্রিটাস এবং ট্রেমেটেস ভারসিকালার মাটির দূষণ রোধ করতে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। বিশেষ করে কৃষিকাজে বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহৃত কীটনাশক ও রঙের বর্জ্য কিংবা মাটির সঙ্গে মিশে থাকা বিস্ফোরকের মতো মারাত্মক জিনিসও এই ছত্রাক খেয়ে ফেলতে পারে। আসলে এসব বর্জ্যরে মধ্যে থাকা পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল বা পিসিবি -এর মতো বিষাক্ত রাসায়নিককে নিস্ক্রিয় করে বা ভেঙে ফেলে মাটির দূষণ কমাতে এ ধরনের ছত্রাক সাহায্য করে। ট্রাইকোডার্মা প্রজাতির একধরনের ছত্রাক, যেটা বিভিন্ন কৃষিবর্জ্য ব্যবহার করে জৈবজ্বালানি তৈরি করতে পারে। এই ছত্রাক কৃষিবর্জ্যরে সঙ্গে বিক্রিয়া করে ইথানলের মতো উপাদান তৈরি করে। ছত্রাকের সম্ভাব্য ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম ফোম, চামড়াসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনে। এই রিপোর্টে বলা হয়, কিছু ছত্রাকের গঠন ও বিভিন্ন বর্জে্যর সঙ্গে বিক্রিয়া এমন কিছু উপাদান তৈরি করে, যা দিয়ে পলিস্টাইরিন ফোম, চামড়াসহ এ ধরনের বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর বিকল্প উপাদান উৎপাদন করা সম্ভব। এ বিষয়ে বেশ কিছু ডিজাইনার ও স্থপতি অনুসন্ধানমূলক কাজ শুরু করেছেন। স্থপতি ডির্ক হেবেল ও ফিলিপ ব্লক গত বছরের শেষের দিকে এক পরীক্ষায় দেখান কীভাবে ছত্রাক ব্যবহার করে সেলফ-সাপোর্টিং স্ট্রাকচার তৈরি করা যায়। এখান থেকে ছত্রাক ইট তৈরিরও সম্ভাবনা তাঁরা দেখান। অন্যদিকে সেবাস্টিয়ান কক্স ও নিনেলা ইভানোভা নামক দুজন ব্যক্তি দেখানোর চেষ্টা করেন কেমন করে ছত্রাক থেকে তৈরি চামড়া-জাতীয় উপাদান দিয়ে বিভিন্ন ধরনের আসবাব তৈরি করা যায়।
কিউ গার্ডেন জানায়, তাদের সংগ্রহে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ প্রজাতির ছত্রাক রয়েছে। তা ছাড়া প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রজাতির ছত্রাক তৈরি হচ্ছে, যদিও কিছু কিছু প্রজাতি হারিয়েও যাচ্ছে, তারপরও বলা যায় এর পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। ১৮টি দেশের প্রায় ১০০ বিজ্ঞানী তাঁদের সঙ্গে কাজ করছেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ছত্রাকের সম্ভাব্য বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার নিয়ে। প্লাস্টিক বা পলিথিনের মতো যতক্ষণ পর্যন্ত এদের ক্ষতিকর দিকগুলো চিহ্নিত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ছত্রাককে এদের বিকল্প হিসেবে ভাবতে অসুবিধা কোথায়?
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৩তম সংখ্যা, নভেম্বর, ২০১৮