প্লাস্টিক বোতল নিয়ে বেতাল সারা বিশ্ব। প্রতিদিন বিশ^জুড়ে কয়েক কোটি প্লাস্টিক বোতল ব্যবহারের পর ফেলা হয় যেখানে সেখানে। এক সমীক্ষা বলছে, বিশ্বে একজন মানুষ প্রতি মাসে গড়ে ১৫টি প্লাস্টিক বোতল ব্যবহার করে। আর কোনো ব্যক্তি যদি ৮০ বছর ভূ-পৃষ্ঠে জীবিত থাকে, তবে সে ১৪ হাজার ৪০০ বোতল ব্যবহার করার পর ফেলে দেয়। এসব পরিত্যক্ত বোতল নষ্ট হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষদ্র কণায় পরিণত হতে সময় লাগে ১০০ বছরেরও বেশি। তবে তা কোনো দিনই মাটির সঙ্গে মেশে না। ১২ লাখ টনের বেশি প্লাস্টিক ফেলা হয় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাসাবাড়িতে। একই সঙ্গে তারা ১৫০ লাখ প্লাস্টিক বোতল ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে। অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫ সালে ৯১ লাখ মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা হয়েছে শুধু সমুদ্রে। আর ভূ-পৃষ্ঠসহ পুরো হিসাবটা চিন্তা করলে চোখের সামনে যে পরিমাণটা ভেসে ওঠে, তা চিন্তা করে শুধু পরিবেশবাদীরাই নন, যে কেউ আঁতকে উঠবেন।
রবার্ট বেজেউ ২০০৯ সালে যখন মন্ট্রিল থেকে পানামা যান তখন একটি দ্বীপের বিচের বেহাল অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। চারদিকে শুধু বোতলের ছড়াছড়ি। এসব বোতল যে শুধু বিচের সৌন্দর্য নষ্ট করছে তা কিন্তু নয়, একই সঙ্গে পরিবেশদূষণও করছে। তিনি এই বোতলগুলোর একটি সুষ্ঠু ও ব্যতিক্রমী ব্যবস্থাপনার কাজে নেমে পড়েন। কিছু ভলান্টিয়ারকে সঙ্গে নিয়ে নেমে যান ফেলে দেওয়া বোতল সংগ্রহে। উদ্দেশ্য হলো এসব পবিত্যক্ত বোতল পুনরায় ব্যবহার করা। তিনি প্রায় দেড় বছর ধরে ১০ লাখেরও বেশি বোতল সংগ্রহ করেন। কিন্তু ফ্যাক্টরিতে নিয়ে বিশাল বিশাল মেশিনের মধ্যে ঢুকিয়ে সেখান থেকে আবার পিলেট বানিয়ে সেটা দিয়ে নতুন বোতল তৈরি করে তা আবার বাজারে বিক্রি করাটা তাঁর বিশেষ পছন্দ হয়নি। এ বিশাল বোতলের স্তূপ নিয়ে তিনি ভাবতে লাগলেন কীভাবে এটাকে ব্যবহার করা যায়? অবশেষে তিনি সিদ্ধান্ত নেন পানামার আশপাশে একটি গ্রাম বানানোর। যে গ্রামের সব বাড়ি হবে বিচ থেকে কুড়িয়ে আনা বোতল দিয়ে তৈরি। এখানে মূল নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হবে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতল। তাঁর এই ধারণা বাস্তবায়নের জন্য তিনি পানামার জঙ্গলে প্রায় ৮৩ একর জমি খুঁজে বের করলেন। যেখানে তিনি তৈরি করবেন পরিবেশবান্ধব এক গ্রাম।
পরিত্যক্ত বোতল ব্যবহার করে ঘরবাড়ি তৈরির ধারণাটা একেবারে নতুন নয়। আগেও তৈরি হয়েছে বোতলের বাড়ি। তবে বেজেউ যেভাবে বানানোর চিন্তা করেছেন, সেভাবে নয়। পুরাতন পদ্ধতিতে বোতলের মধ্যে বালু ভরে সেটাকে ইটের মতো করে একটির সঙ্গে আরেকটি গেঁথে দেয়াল তৈরি করা হয়েছে। তার ওপর ছাদ দিয়ে তৈরি হয়েছে বাড়ি। এসব বাড়ি তৈরির সময় বোতলগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে ইটের বিকল্প হিসেবে। আফ্রিকা, ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে এ পদ্ধতিতে বাড়ি তৈরি করে সেখানে বাসও করছে মানুষ।
কিন্তু রবার্ট বেজেউ বিষয়টিকে আরেকটু সহজভাবে ভাবলেন। লোহার খাঁচা বা জালি তৈরি করে এর মধ্যে খালি বোতলগুলো ভরে দিলেই একটি বাড়ির মূল অংশ দেয়াল তৈরি হয়ে যাবে। তারপর বাকি কাজ। তিনি হিসাব করে দেখলেন, এ পদ্ধতিতে প্রতি তলায় ১০০ বর্গমিটার বা এক হাজার বর্গফুটের একটি দোতলা বাড়ি তৈরি করতে প্রয়োজন ১৪ হাজার ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বোতল। যেটা গড়ে একজন মানুষের ৮০ বছরের জীবদ্দশায় ব্যবহৃত বোতলের চেয়েও কম। এ রকম একটা বাড়ি তৈরি করতে গতানুগতিক নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে যে পরিমাণ সময় ব্যয় হয় তার চেয়ে সময় লাগে অনেক কম। আর খরচ? তাও অবিশ্বাস্য রকমের কম!
বেজেউর ডিজাইনে প্রথমে একটা তারের জালির মধ্যে বোতলগুলো সাজিয়ে রাখা হয়। এরপর সেটাকে আরেকটি খাঁচার মধ্যে ঢোকানো হয়। এ খাঁচাটি সাধারণত স্টিলের পাত বা বার দিয়ে তৈরি। এবার বোতলভর্তি খাঁচাগুলো এক-একটি দেয়াল হিসেবে কাজ করে। তবে দেয়াল তৈরির কাজটা যে এখানে শেষ তা কিন্তু নয়। এটাকে আবার কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। ফলে এটি হয়ে ওঠে অনেক মজবুত ও দৃঢ়। তাঁর মতে, এ পদ্ধতিতে নির্মিত একটি বাড়ি ফেলে দেওয়া বোতলের পুনর্ব্যবহারের সর্বোত্তম ব্যবস্থা না হলেও এটা বেশ ভালো কাজে লাগানোর জায়গা। এটা যদিও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করে না, তারপরও এর ইতিবাচক দিক হচ্ছে রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহারের জন্য যে বিদ্যুৎ খরচ হয়, সেটা অন্তÍত বাঁচানো যায়।
তাপ অপরিবাহী হিসেবে প্লাস্টিক বোতলের দেয়াল চমৎকার কাজ করে। পানামার চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার জন্য এটা অনেক ভালো তাপ অপরিবাহী। অবশ্য এর গ্রহণযোগ্য কিন্তু বেশ ভালো একটা ব্যাখ্যা রয়েছে। আর তা হলো, কংক্রিটের ব্লক সাধারণত নিশ্চিদ্র হয়, কোনো ফাঁকা জায়গা থাকে না। ফলে তাপ খুব সহজেই চলাচল করতে পারে। এতে ঘরের ভেতর সহজেই গরম হয়ে ওঠে। অন্য দিকে বোতলের দেয়ালে বোতলের ভেতরে যে বাতাস থাকে তা তাপ পরিবহনে বাধা দেয়। যে কারণে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি একটি বাড়িতে বাইরের চেয়ে ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় ৩৫ ডিগ্রি পর্যন্ত কম থাকে। এর ফলে এয়ারকন্ডিশনের ব্যবহার অনেক কমে যায়। ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়।
এ ধরনের বাড়ি ভূমিকম্পেও বেশ নিরাপদ। কেননা ভূমিকম্প থেকে নিরাপদ থাকার জন্য একটি বাড়ি বা স্থাপনার যে গুণটি থাকা দরকার, তা হলো তার দোলন ক্ষমতা (Flexibility)। দেখা গেছে যে বাড়ি ভূমিকম্পে তালে তালে যত দুলতে পারে তার স্থায়িত্বের সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়। আর বেজেউর ডিজাইনের বোতলবাড়ির দেয়াল তৈরি হয় স্টিলের তারের জালি আর ফ্রেমের ভেতর খালি বোতল সাজিয়ে। ফলে সাধারণ কংক্রিটের বাড়ির চেয়ে অনেক হালকা ও দোলন ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় ভূমিকম্পে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক কম।
আবার জলোচ্ছ্বাস বা বন্যায় এর দেয়ালগুলো ভেসে থাকতেও সক্ষম। বিশেষ করে পানামার মতো দ্বীপ বা সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল যেখানে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা সুনামির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, সেখানে এটা খুবই কার্যকর আবাস। এর দেয়াল অনেকটা ভেলার মতো কাজ করবে। ফলে অনেক মানুষের জীবন রক্ষা পাবে। যদিও ভেসে থাকার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ, ওপরে কংক্রিটের আবরণ আর ভেতরে লোহার ফ্রেম থাকায় এটি কতটুকু ভেসে থাকার উপযোগী তাও একটা বড় প্রশ্ন। তবে ভেতরের খালি বোতলে যে পরিমাণ বাতাস থাকে, তা কিন্তু একটি দেয়ালকে তাত্ত্বিকভাবে ভাসিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট বলেই মনে করেন বেজেউ।
প্লাস্টিক নিয়ে মানুষের আতঙ্ক এই জন্য নয় যে এটা শুধু পরিবেশদূষণ করে। বরং এটা প্রাণিকূলের জন্যও আতঙ্ক। প্লাস্টিকের কারণে অনেক প্রাণীই আজ সংকটাপন্ন। অনেক পশু, পাখি, মাছ আজ বিলুপ্তপ্রায়। আর মানবদেহের ক্যানসারের অন্যতম কারণ এই প্লাস্টিক! এখন প্রশ্ন হলো, এ রকম একটা বিপজ্জনক জিনিসের তৈরি বাড়িতে বসবাস কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত? এ প্রশ্নের উত্তরে তাঁদের যুক্তি হলো, যেহেতু বোতলগুলো লোহার খাঁচায় কংক্রিটের আবরণে বদ্ধ থাকে, সেহেতু সরাসরি সূর্যের আলো বা তাপে উত্তপ্ত হয় না, তাই এগুলো থাকে ঠান্ডা। তা ছাড়া প্রাকৃতিক মাধ্যাকর্ষণজনিত কারণে দেয়ালের মধ্য দিয়ে বায়ু চলাচল করতে পারে সে কারণে এতে স্যাঁতসেঁতে ভাব থাকে না। ফলে এর মধ্যে কোনো ক্ষতিকারক ছত্রাক, অণুজীব বা বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। এ কারণে এ ধরনের বাড়িতে স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রা প্রায় শূন্য।
রবার্ট বেজেউ আশা করছেন, তিনটি পর্যায়ে তিনি এ রকম ১২০টি বাড়ি বানাবেন। আর এ জন্য যে বোতল প্রয়োজন হবে তা ‘বোতল সংগ্রহের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র পরিবারগুলোকে কাজে লাগিয়ে সংগ্রহ করবেন। তিনি একটি ইকো-লজও বানাতে চান। যেখানে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল ও ঔষধি গাছের বাগান থাকবে। আবার এ ধরনের বাড়ি তৈরি করতে মানুষকে যেন বেশি পরিমাণে উদ্বুদ্ধ করা যায় তার জন্য তিনি প্রশিক্ষণ দেওয়ারও পরিকল্পনা করছেন।
প্লাস্টিক বোতল দিয়ে তিনি যে শুধু বাড়ি বানানোর চিন্তাই করছেন তা কিন্তু নয়। তিনি অস্থায়ী নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, খামারবাড়ি, সুইমিংপুল, বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ট্যাংক, কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য নালা, গুদামঘর, রাস্তাসহ অনেক কিছুই চিন্তা করছেন। অনেকের কাছে তাঁর এসব চিন্তাকে পাগলামী মনে হয়েছে। আসলে বিষয়টিকে আমরা কীভাবে গ্রহণ করছি এটা বড় কথা। ইতিবাচকভাবে নাকি একজন খেয়ালি মানুষের খেয়ালি কর্মকাণ্ড হিসেবে? তবে কোনটি ঠিক কোনটি বেঠিক, এটা তো আগে থেকে বলা কঠিন। একমাত্র সময়ই তা বলতে পারবে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৮তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৭।