প্রাত্যহিক জীবনের নিত্যব্যবহার্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ পানি। সকালে ঘুম ভাঙার পর দিন শুরুই হয় পানির ব্যবহারে; রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগেও চাই পানি। সারা দিনের নানা কাজে পানির ব্যবহার প্রায় সর্বত্রই লক্ষণীয়। তৃষ্ণা নিবারণ, গোসল, রান্না, কাপড় কাচা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বাগানে সেচসহ নানা কাজে পানির ব্যবহার ব্যাখ্যা করা নিষ্প্রোয়োজন। শিল্পকারখানা অচল পানি ছাড়া; এতে দারুণভাবে ব্যাহত হয় শিল্প উৎপাদন। গ্রামে নলকূপ, কূপ, পুকুর, খাল ও নদীর মতো উৎস থেকে পানি পাওয়া গেলেও নগরজীবনে একমাত্র ভরসা ওয়াসা ও তদসংশ্লিষ্ট সংস্থার সরবরাহকৃত পানি। দিন-রাতের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে এই পানি পাওয়া গেলেও বাকি সময়টা নির্ভর করতে হয় নিজস্ব সংরক্ষণের ওপর। যথাযথভাবে পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ না করলে পড়তে হয় দারুণ ভোগান্তিতে। আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবন, শিল্পকারখানা, কৃষি খামারসহ সর্বত্রই পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অনন্য এক মাধ্যম পানির ট্যাংক।
যেভাবে এল পানির ট্যাংক
আগে পানি ও খাবারের খোঁজে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটেছে মানুষ। বিশেষ করে পানির সংস্থান নিশ্চিত করতে নদী, ঝরনা, ঝিরি ও জলাধারকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে জনবসতি। এমনকি পানিকে ঘিরেই অর্থাৎ জলাধারকে ঘিরেই সূচিত হয়েছে সভ্যতার ক্রমবিকাশ। কিন্তু পানির আধারের খুব কাছাকাছি সবার পক্ষে সম্ভব হয়নি আবাসস্থল গড়ে তোলা। এ জন্য মানুষের বুদ্ধির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দূরের পাহাড়, ঝরনা বা ঝিরির পানি ছোট খাল, নালা বা কাঠের পাইপের সাহায্যে জনবসতিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করেছে তারা নিজস্ব প্রয়োজনেই। ধীরে ধীরে তা পৌঁছে গেছে স্বয়ং আবাসে। কিন্তু বিপত্তি বাধে গ্রীষ্মকালে। তখন পানির উৎস অনেকটাই শুকিয়ে যায়। এ জন্য মানুষ পানি সংরক্ষণে বিশেষ একধরনের তাগিদ অনুভব করে। সে তাগিদ থেকেই কাঠ, গাছের গুঁড়ি, সিরামিক ও পাথর দিয়ে একধরনের চৌবাচ্চা বা জলাধার তৈরিতে সক্ষম হয় মানুষ। আসলে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট জলাধারগুলোই ছিল এ কাজের অনুপ্রেরণা।
প্রথম দিকে স্থাপনার মধ্যে এই পানির সংগ্রহাগার তৈরি হলেও পরে মানুষ সক্ষম হয় ছাদের ওপরে ট্যাংক স্থাপনে। মূলত মাধ্যাকর্ষণ বলকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞ গণিতবিদেরা এ ধরনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সক্ষম হন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০-১৫০০ শতাব্দীতে সিন্ধু সভ্যতায় এমন প্রযুক্তিতে ছিল গ্রানারিজ ও পানির ট্যাংক, যার প্রমাণ এখনো মেলে। এ ছাড়া বিশ্বের অনেক প্রসিদ্ধ প্রত্নস্থানে মানুষের তৈরি এমন পানির ট্যাংকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বিশেষত মন্দির ও বড় ভবনে পানির ট্যাংক স্থাপন করা হতো। ১৯ শতকে আমেরিকার নিউইয়র্কের স্থাপনাগুলো ৬ তলার বেশি উচ্চতায় করার প্রয়োজন হয়। কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা দেয় প্রতিটি ভবনে নিজস্ব পানির ব্যবস্থা রাখার। এই ঘোষণার পরে স্থপতি ও প্রকৌশলীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন পানির ট্যাংকের ডিজাইন ও নির্মাণকৌশল নিয়ে। তাঁরা এমনভাবে ট্যাংক নির্মাণ করেন, যা দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এটি আসলে পানির ট্যাংক! ধীরে ধীরে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে ট্যাংকের এই নির্মাণকৌশল। মূলত বৈদ্যুতিক পাম্প আবিষ্কারের ফলেই ঘটেছে আমূল পরিবর্তন। এ সময়ে নগরে পানি সরবরাহে উঁচু টাওয়ারের ওপর বড় আকারের ট্যাংক স্থাপিত হয়।
বৈশ্বিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পানি সংগ্রহের ট্যাংক ব্যবস্থারও উন্নতি ঘটে। কোম্পানিগুলোও শুরু করে বাহারি সব পানির ট্যাংক তৈরি। বর্তমানে শহরের প্রায় সব বাড়িতেই রয়েছে পানির ট্যাংক। বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে তৈরি ও উৎপাদিত হয় পানির ট্যাংক। এগুলোর মধ্যে প্রি-স্ট্রেস কংক্রিট, ইট, প্লাস্টিক অন্যতম।
পানির ট্যাঙ্কের রকমফের
পানির ট্যাংক সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। যেমন-
১. বাসার ছাদে প্লাস্টিক, ইট বা কংক্রিটের ট্যাংক
২. ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংক।
ছাদের পানির ট্যাংক
এখন প্রায় সব বাড়ির ছাদেই রয়েছে পানির ট্যাংক। ছোট বাড়ির জন্য ছোট আকারের আবার বড় বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রয়োজন বড় আকারের ট্যাংক। তবে শিল্পকারখানার পণ্য উৎপাদনে, খাদ্য প্রস্তুতিতে পানির প্রচুর চাহিদা থাকায় এখনকার ট্যাংকগুলো হয় অনেক বড় আকারের। এসব পানির ট্যাংক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়-
- প্লাস্টিক (পলিইথিলিন, পলিপ্রপাইলিন)
- ফাইবারগ্লাস
- কংক্রিট
- পাথর
- স্টিল।
ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংক
মূলত ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি সংগ্রহ করে রাখতে প্রয়োজন হয় এ ধরনের পানির ট্যাংক। এই ট্যাংকে জমাকৃত পানি বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে ছাদের ট্যাংকিতে তোলা হয়।
প্লাস্টিক পানির ট্যাংক
কংক্রিট বা ইট নির্মিত পানির ট্যাংকে দ্রুত পানি ময়লা হয় সেই সঙ্গে ফাটল ধরে বিধায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে প্লাস্টিক পানির ট্যাংক। এই ট্যাংকের পানির পরিমাণকে লিটার দিয়ে মাপা হয়। নিরাপদ পানির জন্য প্লাস্টিক ট্যাংকে থাকে ফুডগ্রেডসহ বিভিন্ন ধরনের স্তর। কোম্পানিভেদে রং ও স্তরেরও পার্থক্য হয়। এই স্তরের গুণগতমানের ওপর পানির ট্যাংকের ভালো-মন্দ মান অনেকাংশে নির্ভরশীল। বর্তমানে বাজারে এক, দুই ও তিন স্তরের পানির ট্যাংক পাওয়া যায় বেশি।
পানির ট্যাংকের পরিচর্যা
জীবাণুমুক্ত নিরাপদ পানি পেতে সব সময়ই পানির ট্যাংকের যত্ন নেওয়া উচিত। বাড়ির ট্যাংকের যত্নে যে যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে মেনে চলা উচিত-
- ট্যাংক ভূগর্ভে অথবা বাড়ির ছাদে যেখানেই রাখুন না কেন, নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
- ট্যাংকের ঢাকনা সব সময় বন্ধ রাখুন।
- ট্যাংকের পানি সরবরাহ পাইপে কোনো ছিদ্র থাকলে তা বন্ধ করে দিন।
- ট্যাংকের মধ্যে যাতে ময়লা-আবর্জনা না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- ট্যাংকের ভেতরের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ রোধে উদ্যোগী হোন।
- মাঝেমধ্যে ট্যাংকের পানি পরীক্ষা করে নিন, দেখুন কোনো জীবাণুু আছে কি না।
- ছাদে পানির ট্যাংকে সাধারণত বৃষ্টির পানি ঢুকতে পারে না; তবুও এদিকে নজর রাখুন।
- ট্যাংকটি ছাদের যে জায়গায় আছে, সেটি অন্যান্য স্থান থেকে উঁচু হলে ভালো হয়।
- বৃষ্টিতে ছাদে যেন পানি না জমে, সেদিকেও খেয়াল রাখুন।
- ট্যাংকের পানি পরিষ্কারের জন্য ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করুন। ব্লিচিং পাউডার দিয়ে সম্পূর্ণ ট্যাংকটি ধুয়ে ব্লিচিংযুক্ত পানি ফেলে দিন। পানি গন্ধমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহারে বিরত থাকুন।
- বর্ষায় মাটির নিচের ট্যাংকের যত্ন নিন বেশি করে। কেননা, অতিবর্ষণে ট্যাংক ডুবে যেতে পারে। তাই বৃষ্টির কারণে ম্যানহোলের ময়লা পানি বা বৃষ্টির পানি যেন ঢুকতে না পারে সে জন্য আলাদাভাবে ট্যাংকের চারদিক ইটের দেয়াল তুলে দিন। অথবা যে পথ দিয়ে ট্যাংকে পানি প্রবেশ করতে পারে, সে পথটি বন্ধ করে দিন। আর বৃষ্টির পানি বা দূষিত পানি ঢুকে গেলে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ট্যাংকটি পরিষ্কার করে মোটরের সাহায্যে পানি সেচে ফেলুন।
বাজারদর
বাজারে সেরা, গাজী, মদিনা, পদ্মা, দেশসহ বিভিন্ন কোম্পানির ট্যাংক পাওয়া যায়। সাধারণত ৫০০, ১০০০ ও ২০০০ লিটারের ট্যাংকগুলো দোকানে পাওয়া গেলেও ৫০০০ বা তার বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ট্যাংকগুলো কোম্পানি থেকে হোম ডেলিভারি দেওয়া হয়। পরিমাপভেদে বিভিন্ন কোম্পানির ট্যাংকের দরদাম জানানো হলো। তবে কোম্পানির ছাড় ও অন্যান্য অফার বা স্থানভেদে এই মূল্যের তারতম্য হতে পারে। তবে দাম বেশি হলেও ভালো মানের ট্যাংক কেনাটাই শ্রেয়।
| সাইজ (লিটার) | ব্র্যান্ড | |||
| সেরা | গাজী | মদিনা | পদ্মা | |
| ৫০০ | ৩৩০০ | ৩৫০০ | ৩২০০ | ৩১০০ |
| ১০০০ | ৬৬০০ | ৭০০০ | ৬৪০০ | ৬২০০ |
| ২০০০ | ১৩২০০ | ১৪০০০ | ১২৮০০ | ১২৪০০ |
| ৩০০০ | ১৯৮০০ | ২১০০০ | ১৯২০০ | ১৮৬০০ |
| ৪০০০ | ২৬৪০০ | ২৮০০০ | ২৫৬০০ | ২৪৮০০ |
| ৫০০০ | ৩৩০০০ | ৩৫০০০ | ৩২০০০ | ৩১০০০ |
প্রাপ্তিস্থান
ঢাকার বাংলামোটর, গ্রিন রোড, পান্থপথ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা, বংশাল, উত্তরার স্যানিটারি হার্ডওয়্যার দোকানগুলোয় পাওয়া যায় প্লাস্টিকের বাহারি সব ট্যাংক। বিভিন্ন কোম্পানির নিজস্ব ব্র্যান্ডশপেও মিলবে এই ট্যাংক। এ ছাড়া রাজধানীসহ দেশের সর্বত্রই সব ধরনের স্যানিটারি ও হার্ডওয়্যারের দোকানে পানির ট্যাংক পাওয়া যায়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৫তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৮।