ইটের গাঁথুনিতে শৈল্পিক স্থাপনা

প্রাকৃতিক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ ইট। ইট স্থাপনাকে স্থায়িত্বের পাশাপাশি দেয় নান্দনিকতার ছোঁয়া। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই ব্যবহার হওয়া এ ইটের আবেদন মোটেও কমেনি, বরং বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী নির্মিত হচ্ছে হরেক রকম আর ডিজাইনের ইটের স্থাপনা। স্কাইক্রেপার বা আকাশচুম্বী স্থাপনাগুলোতে ইটের ব্যবহার কমলেও আবাসিক তথা মাঝারি মানের স্থাপনাতে ইটের বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। এসব স্থাপনা বিশ্বব্যাপী সমাদৃতও বটে। সম্প্রতি বাংলাদেশে দুটি ইটের স্থাপনা অর্জন করেছে সম্মানজনক আগা খান অ্যাওয়ার্ড। এর একটি স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের ডিজাইনকৃত রাজধানীর দক্ষিণখানের বায়তুর রউফ মসজিদ, অন্যটি স্থপতি কাসেফ মাহবুব চৌধুরীর গাইবান্ধার ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার। প্রকৃতিতে এখন শীতের আমেজ। স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণের এটাই উত্তম সময়। আর তাই ইটখোলা ও ইট উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে ব্যাপক কর্মতৎপরতা। নির্মিত হচ্ছে অসংখ্য স্থাপনা। ইটের গাঁথুনির নানা কৌশল ও নিয়মকানুন সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে স্থাপনা হয়ে উঠে আরও নান্দনিক ও টেকসই। 

ইতিহাসের পাতা থেকে

নির্মাণ উপকরণ হিসেবে ইটের ব্যবহার শুরু হয়েছিল ব্রোঞ্জ যুগে। দক্ষিণ তুরস্ক আর জেরিকো শহরের আশপাশে খ্রিষ্টের জন্মেরও ৭ হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা সভ্যতাসমূহে ইট ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়ার নিকটবর্তী দিয়াবাকির কাছাকাছি পাওয়া গেছে খ্রিষ্টপূর্ব ৭ হাজার ৫০০ বছর আগের সবচেয়ে প্রাচীনতম ইটের সন্ধান। অনেক গবেষক মনে করেন, ইট ব্যবহারের শুরুটা আরও আগে হতে পারে। অর্থাৎ প্রস্তর যুগে। হয়তো সেসব স্থাপনা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ বছর আগে ইটের সন্ধান মিলেছে পাকিস্তানের প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার মহেঞ্জোদারো ও মহাগড়ে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় ইটের অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান।

পোড়ানো ইটের আগে কাদামাটির তৈরি ইট রোদে শুকিয়েই ব্যবহার করা হতো। আগুনে পুড়িয়ে ইট তৈরির পদ্ধতির পর যেকোনো বৈরী আবহাওয়ায় টিকে থাকতে সক্ষম স্থায়ী আবাস নির্মাণ করতে শেখে মানুষ, যা রোদে শুকানো ইট দিয়ে সম্ভব ছিল না। স্থাপনা নির্মাণে প্রাচীন মিসরীয়রাও রোদের শুকানো ইট ব্যবহার করত। হরপ্পা বুহেন এবং মহেঞ্জোদারোতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। দেয়ালে দেয়ালে ইট তৈরি আর সেগুলো পরিবহন করার চিত্র এখনো দেখা যায়। সেই সময়ের ইটের অনুপাত ছিল ৪:২:১। 

রোমানরা রোদে শুকানো আর আগুনে পোড়ানো দুই ধরনের ইটই ব্যবহার করত। ইটগুলো সাধারণত বসন্তে তৈরি হতো। কেবল সাদাটে অথবা লাল মাটি তারা ইট তৈরির জন্য ব্যবহার করত। ইট অন্তত দুই বছর আগে তৈরি করে রাখা হতো। ভ্রাম্যমাণ ইটের ভাটা ছিল তাদের। যে কারণে বিশাল রোমান সা¤্রাজ্যজুড়েই পোড়ামাটির ইট ব্যবহারে সফলতা ছিল। বর্গ, ত্রিভুজ, গোল কিংবা আয়তাকার ইট তৈরি করত তারা। ভাটায় পোড়ানো ইট ছিল সাধারণত ১ অথবা ২ রোমান ফুট বাই ১ রোমান ফুট। কিছু ক্ষেত্রে ৩ রোমান ফুট পর্যন্ত হতো। এই ধরনের ইটের ব্যবহার তাদের সভ্যতার প্রথম শতক থেকেই শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে পুরো সাম্রাজ্যেই সব ধরনের সরকারি ও ব্যক্তিগত স্থাপনা নির্মাণে ইটের ব্যবহারের প্রচলন হয়।

গ্রিকরাও ইট ব্যবহারে বেশ পারদর্শী ছিল। ১২ শতকে উত্তর ইতালি থেকে উত্তর জার্মানি পর্যন্ত এলাকায়  ইটের আবির্ভাব হয় নব রূপে। সমকালটাকে ‘ব্রিক গথিক পিরিয়ড’ বলা হয়। কারণ, এই ইটের ব্যবহার শুরুর আগে উত্তর ইউরোপে গথিক স্থাপত্য কৌশলটা অনেক বেশি প্রচলিত ছিল। পরবর্তী সময়ে লাল মাটি পুড়িয়ে তৈরি ইট ব্যবহার শুরু হয় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে। ব্রিক গথিক ধাঁচের ভবন বাল্টিক দেশ অর্থাৎ সুইডেন, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, লিথুনিয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া, বেলারুশ ও রাশিয়াতে দেখা যায়। ব্রিক গথিকের সময়টাতেই মূলত পাথর থেকে সরে এসে স্থাপনা নির্মাণে ইটের ব্যবহার হয়। যে কারণে স্থাপত্যবিদ্যাতেই বড়সড় বিপ্লব ঘটে যায়। নানা আকৃতির ইট বিভিন্ন ভাস্কর্য নির্মাণেও ব্যবহৃত হতে থাকে।

বিশ্বের  অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও ইটের ব্যবহার হচ্ছে সুপ্রাচীন কাল থেকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দের বগুড়ার মহাস্থানগড়, খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ অব্দের নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর দুর্গনগরী, অষ্টম শতকের (৭৮১-৮২১) নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, কুমিল্লার শালবন বিহারসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীনতম প্রতœস্থলের প্রধানতম নির্মাণ উপকরণই ইট।

ইটের জনপ্রিয়তার কারণ

  • বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার বছর ধরে স্থাপনায় ইটের ব্যবহার হয়ে আসছে। কারণ, ইটের আছে নানাবিধ সুবিধা। সেগুলো হচ্ছে –
  • বাহ্যিক সৌন্দর্য বা অ্যাসথেটিক বিউটি
  • বৈচিত্র্যময় রং ও হরেক রকম টেক্সার
  • উচ্চশক্তিসম্পন্ন বিধায় নিরাপদ নির্মাণ, বহু বছর টিকে থাকে
  • পোরসিটি বা ভেদ্যতা ক্ষমতা থাকায় ইট আর্দ্রতা গ্রহণ ও ত্যাগ করতে পারে বিধায় তাপমাত্রা ও জলবায়ুর সঙ্গে সহজেই খাপ খায়
  • সঠিকভাবে ডিজাইনকৃত ইটের ভবন প্রায় ৬ ঘণ্টা আগুন থেকে সুরক্ষা প্রদানে সক্ষম
  • ইট অত্যন্ত শব্দরোধী নির্মাণ উপকরণ
  • ইট ভবনে ইনস্যুলেশনে দারুণ সহায়ক অন্যান্য নির্মাণ উপকরণের তুলনায়
  • ইট পরিবেশের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে গ্রহণ ও বর্জন করে। ৩০ শতাংশ পর্যন্ত এনার্জি সাশ্রয় করতে পারে কাচ ও কাঠের তুলনায় 
  • কংক্রিটের তুলনায় অধিক লোনারোধী 
  • সহজে প্লাস্টার করা যায় 
  • পরিবেশবান্ধব।

ইটের ব্যবহার 

  • স্থাপনার বিভিন্ন আকৃতির দেয়াল নির্মাণে
  • মেঝে বা ফ্লোর তৈরিতে
  • আর্চ ও কার্নিশ তৈরিতে
  • খোয়া তৈরিতে
  • সুরকি তৈরিতে 
  • সড়ক পেভমেন্ট নির্মাণে
  • সুইমিংপুল নির্মাণে।

ইটের আকৃতি বা সাইজ

বাংলাদেশে পিডাব্লিউডি (পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট) শিডিউল অনুযায়ী ইটের সাইজ সাধারণত ৯.৫’’ X ৪.৫’’X ২.৭৫’’ মাপের বাংলা ইট ব্যবহৃত হয়। মর্টারসহ ইটের আকার হয় ১০’’ X ৫’’X ৩’’ । অন্যান্য আকৃতির ইটও পাওয়া যায়, তবে তা সিরামিক ও কংক্রিট ব্লক।  

ইটের রকমফের

হরেক রকম আকার-আকৃতিতে ইট প্রস্তুত করা হয়। ইটের বাহ্যিক গঠন ও গুণাগুণ নির্ভর করে তৈরির পদ্ধতি ও ব্যবহৃত উপকরণের ওপর। সেই হিসাবে ইটকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। সেগুলো হচ্ছে-

  • সাধারণ ইট বা বাংলা ইট
  • সিরামিক ইট বা ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিক
  • কংক্রিট ব্রিক
  • স্যান্ড-লাইম ব্রিক
  • হলো ব্রিক
  • ফ্লাই অ্যাশ ব্রিক

সাধারণ ইট বা বাংলা ইট

এই ইট তৈরিতে সাধারণ মাটির মোল্ড তৈরি করে শুকানো হয়। তারপর চিমনির মধ্যে পুড়িয়ে একে শক্তপোক্ত করা হয়। এই ইট সর্বাধিক ব্যবহৃত। তবে ইটের সারফেস অমসৃণ হওয়ায় প্লাস্টার করার প্রয়োজন হয়। এ ধরনের ইট সাধারণ পাঁচ রকম হয়ে থাকে। সেগুলো হচ্ছে-

  • প্রথম শ্রেণির ইট
  • দ্বিতীয় শ্রেণির ইট
  • তৃতীয় শ্রেণির ইট
  • ঝামা ইট
  • পিলা ইট।

প্রথম শ্রেণির ইট

  • প্রথম শ্রেণির ইটগুলোর রং ও মাপ একই রকম হয়।
  • ইট ভালোমতো পোড়ানো হয়।
  • হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করলে ধাতব শব্দ হয়।
  • একটি ইট খাড়া অবস্থায় রেখে এর ওপর অন্য একটি ইট দিয়ে ঞ এর মতো তৈরি করে ১ মিটার ওপর থেকে ফেললে ওপরের ইটটি সহজে ভাঙে না।
  • নখ দিয়ে বা চাবি দিয়ে ইটের গায়ে দাগ বসানো যায় না।
  • ইটকে ২৪ ঘণ্টা পানিতে ডুবিয়ে রাখলে ওজনের ১৫ শতাংশ পরিমাণ পানি শোষণ করে।

দ্বিতীয় শ্রেণির ইট

  • অনেকটা প্রথম শ্রেণির মতো, ভালো পোড়ানো থাকে তবে একটু বেশি পোড়ানো থাকে।
  • দুটি ইট পরস্পর আঘাত করলে ধাতব শব্দ হয় না।
  • ২৪ ঘণ্টা পানিতে ডুবিয়ে রাখলে এর শুষ্ক ওজনের সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ এর বেশি পানি শোষণ করবে না।
  • এর আকার আকৃতি এবং রং কিছুটা অসমান এবং ইটের তলা অমসৃণ থাকে।

তৃতীয় শ্রেণির ইট

  • এই ধরনের ইট অনেকটা কম পোড়ানো থাকে
  • সহজে ভেঙে যায় এবং হালকা রঙের হয়ে থাকে
  • যখন দুটি ইট একে অপরকে আঘাত করে তখন দুর্বল শব্দ হয়
  • এর আকার-আকৃতি খুবই অসমান থাকে
  • ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এর ওজনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশের বেশি পানি শোষণ করে না। 

সিরামিক ইট

এই ইট খুবই উন্নতমানের প্রথম শ্রেণির ইটের অন্তর্ভুক্ত। ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিক নামেও পরিচিত। মেশিনে তৈরি হয় বিধায় আকার ও আকৃতি ঠিক থাকে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অত্যধিক তাপে গ্যাস অথবা বিদ্যুতে পোড়ানোর ফলে এর রঙের সাম্যতা সর্বত্র বজায় থাকে। এই ইটের ফেয়ার ফেস অত্যন্ত মসৃণ ও দৃষ্টিনন্দন হওয়ায় প্লাস্টারের প্রয়োজন হয় না। তবে স্থাপনার নান্দনিকতা বজায় রাখতে ব্রিক ওয়ার্ক বেশ সাবধানতার সঙ্গে অভিজ্ঞ রাজমিস্ত্রি দিয়ে করাতে হয়। না হলে ফেয়ার ফেসের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সাধারণ ইটের থেকে এই ইটের লোড বিয়ারিং ক্ষমতাও দারুণ যা ভার্টিক্যালি বেশি লোড নিতে পারে। এটা ড্যাম ও রাসায়নিক প্রতিরোধী। সাধারণ ইটের তুলনায় এই ইটের নির্মাণব্যয় বেশি। সিরামিক ইটে ৫০-৬০ শতাংশ সিলিকা (বালু), ২০-৩০ শতাংশ অ্যালুমিনা (ক্লে), ২-৫ শতাংশ লাইম, ৭ শতাংশ আয়রন অক্সাইড, ১-৫ শতাংশ ম্যাগনেসিয়া ও ১ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকতে পারে। বিভিন্ন ধরনের সিরামিক ইটের মধ্যে রয়েছে-

  • সলিড
  • থ্রি হোল
  • টেন হোল।

স্যান্ড-লাইম ব্রিক 

এই ইট তৈরি হয় বালু, ফ্লাই অ্যাশ ও লাইমের মিশ্রণে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ভেজা অবস্থায়। সাধারণত মোল্ড বানিয়ে চাপ প্রয়োগ করে ইটের আদল দেওয়া হয়। এই ইটের যেসব সুবিধা রয়েছে-

প্রচলিত ইটের মতো এর রং লাল নয় বরং ধূসর

মসৃণ ফিনিশিংযুক্ত হওয়ায় প্লাস্টারের প্রয়োজন হয় না

লোড বিয়ারিং ক্ষমতা থাকায় দারুন কার্যকরী।  

অধিক পোড়া বা ঝামা ইট

অধিক পোড়ানোর ফলে ইট ফাঁপা হয়ে যায় এবং আকার এতটাই বিকৃত হয় যে সাধারণ নির্মাণকাজে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এটা সাধারণত খোয়া তৈরিতে ব্যবহার করা হয়, যা চুন কংক্রিটের ভিত্তি ও রাস্তার কাজে ব্যবহার করা হয়।

কম পোড়া বা পিলা ইট

কম পোড়া ইটকে সাধারণত পিলা ইট বলে। এগুলো অর্ধেক পোড়ানো হয় যা হলদেটে রঙের হয়ে থাকে। এসব ইটের কোনো শক্তি থাকে না। তাই এগুলো সুরকি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

কংক্রিট ব্রিক

কংক্রিট ব্রিক সলিড কংক্রিট থেকে প্রস্তুত করা হয়। সাধারণত ফ্যাসাদ, পার্টিশন ওয়াল ও সীমানা দেয়াল নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। 

ফ্লাই অ্যাশ ব্রিক

ফ্লাই অ্যাশ ব্রিক তৈরি হয় কাদামাটি আর ফ্লাই অ্যাশ দিয়ে প্রায় ১০০০ ডিগ্রি সে. তাপে। তবে এই ইটের শক্তিমাত্রা খুবই কম। বিশেষ করে যদি সঠিকভাবে প্রস্তুত করা না হয়। আর্দ্রতা ও পানির সংস্পর্শে এই ইট আকারে বড় হতে পারে।   

হলো ব্লক

ইটের পরিবর্তে এখন অনেক নির্মাণকাজে ব্লক ইট বা হলো ব্লক ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ, তৈরিতে মাটি বা মাটি পোড়ানোর কোনো ঝামেলা নেই। ব্যবহার হয় পাথর, বালু ও সিমেন্ট। ইটের তুলনায় একটি ব্লক ৪ থেকে ৬ গুণ বড় এবং ভেতরে ফাঁপা। তাই ব্লক ইট পরিবেশবান্ধব, নির্মাণে খরচ কম এবং ভবনের ওজনও কমে যায়। বাড়ি নির্মাণের হলো ব্লক খুবই উপযোগী। হলো ব্লক ব্যবহারে যে সুবিধাদি পাওয়া যায়:

  • ইটের গাঁথুনির ওজন ৪০ শতাংশ কমায়, যার ফলে সাশ্রয়ী ডিজাইন সম্ভব হয়।
  • ঘরের আয়তন প্রতি ১০০ বর্গফুটে ৬-১০ বর্গফুট বৃদ্ধি পায়।
  • দেয়ালে লোনা ধরে না ও জ্যাম হয় না।
  • শব্দ, তাপ, আগুন ও আর্দ্রতা প্রতিরোধক।
  • সহজে প্লাস্টার করা যায় এবং এর পুরুত্ব সাধারণ ইটের চেয়ে অর্ধেক (১২ মিমি-৬ মিমি)।
  • ইলেকট্রিক্যাল ও প্লাম্বিং কাজে সহায়ক।
  • ঘরের আয়তন প্রতি ১০০ বর্গফুটে ৬-১০ বর্গফুট বাড়ায়।

দেয়ালে ইটের বন্ডিং

ইটের সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব অনেকাংশেই নির্ভর করে দেয়ালে ইটের গাঁথুনির ওপর। নিয়মকানুন বা পদ্ধতি ছাড়া এলোমেলোভাবে ইট গেঁথে দেয়াল বা অন্য কোনো কাঠামো তৈরি করলে তা টেকসই হয় না। এ জন্য একই আকার-আকৃতির ইট দ্বারা নিয়ম অনুযায়ী গাঁথুনি করা হয়। এ জন্য ইটকে একের পর এক সাজিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে অবিচ্ছিন্ন দেয়ালে পরিণত করার পদ্ধতিকে বন্ড বলে। ইটের সারিকে বলা হয় কোর্সেস . 

ভালো বন্ডিং বা ইট সাজাতে করণীয় 

  • ইটের আকার, আয়তন হবে সুষম 
  • কমপক্ষে ইটের এক-চতুর্থাংশ হবে ল্যাপ  
  • উচিত কমসংখ্যক ব্যাট বা আধলা ইট ব্যবহার করা 
  • অলটারনেট কোর্সে হেডারের সেন্টার লাইন এবং স্ট্রেচারের সেন্টার লাইন একই উলম্ব রেখায় ছেদ করবে
  • অলটারনেট কোর্সের খাড়া জয়েন্টগুলো একই খাড়া লাইনে থাকবে
  • ফেসিংয়ে স্ট্রেচার ও হার্টিংয়ে হেডার ব্যবহার করা উচিত।

ইটের গাঁথুনির সঠিক পদ্ধতি

ইটের গাঁথুনির কাজে ইট স্থাপনই সবচেয়ে বড় কৌশল। ভালো ইট, সঠিক সিমেন্ট-বালু বা চুন-সুরকির মসলা ব্যবহার করেও ইটের কাজ খারাপ হতে পারে। কেননা সঠিকভাবে ইট স্থাপন, কোর্স সাজানো, বন্ড, জোড়, ওলন ঠিক রাখা প্রয়োজন। তাই সঠিকভাবে কাজ করতে হলে যে পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা উচিতÑ

ইট বাছাই 

দেয়ালের বিভিন্ন অংশ, যেমনÑফেসিং, ব্যাকিং ও হার্টিং-এর জন্য ইট বাছাই করতে হবে। দেয়াল কত পুরু হবে তার ওপর নির্ভর করে ইট বাছাই করা প্রয়োজন। ফেসিং কাজের জন্য ভালো ও সমান মাপের ইট নির্বাচন করা উচিত।

ইট সাজানো 

কাজের জায়গায় ইট ঠিকভাবে সাজিয়ে রাখতে হবে। এক হাজার কিংবা দুই হাজার করে ইট একটি স্টকে রাখতে হবে। এটা সাজানো থাকলে ইটের কোনাগুলো বা ধারগুলো সহজে নষ্ট হবে না।

ইট ভেজানো 

শুকনো ইটের পানি শোষণের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। তাই ইটকে কাজে লাগানোর আগে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এ জন্য চৌবাচ্চা তৈরি করে ইট ভেজানোর ব্যবস্থা করতে হয়। প্রতিদিনের কাজের শেষে পরের দিনে যত ইট কাজে লাগানো হবে তা চৌবাচ্চায় ডুবিয়ে রাখতে হবে। যে কারণে ইট ভেজানো প্রয়োজন- 

  • ইটের গায়ে সহজেই সমানভাবে মসলা লাগানো যায়।
  • শুকনো ইট মসলা থেকে পানি শোষণ করে। ফলে সিমেন্টের রাসায়নিক ক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে না। যার কারণে ইটের গাঁথুনি দুর্বল বা ব্যর্থ হতে পারে।
  • চুল্লির ময়লা, আবর্জনা বা লবণ জাতীয় পদার্থ ইটের গায়ে থাকলে তা পরিষ্কার হয়ে যায়। ফলে উত্তম জোড়া ও বন্ড উৎপন্ন হয়।

ভিত্তির ওপর মসলা বিছানো 

ভিত্তির ঢালাইয়ের ওপর কমপক্ষে ১.৫ সেন্টিমিটার গভীর করে মসলা বিছিয়ে দিতে হবে। প্রথমে দুই দেয়ালের জোড়া (Corner Joint) যেখানে পড়বে, সেখানে মসলা বিছিয়ে গাঁথুনির কাজ আরম্ভ করতে হয় অর্থাৎ কর্নার থেকে গাঁথুনির কাজ শুরু করতে হবে।

কর্নার তৈরি 

প্রথমে দেয়ালের কর্নারে ইট বসাতে হবে। এরপর বেডের ওপর বিছানো মসলার ওপর ইটকে আস্তে আস্তে চাপ দিয়ে বসাতে হবে। চাপার পরে কংক্রিট আর ইটের মধ্যে ১ সেন্টিমিটার মসলা থাকবে। পরবর্তী ইটের মধ্যবর্তী খাড়া জোড়া যেন ১ সেন্টিমিটার হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

গাঁথুনির লাইন সোজা রাখা 

দেয়ালের দুই প্রান্তে প্রথম কোর্স ইটের গাঁথুনি করে তার ওপর সুতার দুই প্রান্তে ইট ঝুলিয়ে দিলে সুতা টানটান হয়ে থাকবে। এখন মাঝের অংশে ইটের গাঁথুনি সুতা বরাবর করলে গাঁথুনির লাইন ও মাথা সুতার লাইনের মতো সমান থাকবে।

দ্বিতীয় কোর্স স্থাপন 

প্রথম স্তরের ওপর কমপক্ষে ১.৫ সেন্টিমিটার পুরু করে মসলা বিছিয়ে দিতে হবে। প্রান্তে স্ট্রেচার ইট, মর্টারের ওপর এমনভাবে বসাতে হবে যেন ১ সেন্টিমিটার পুরু জোড়া থাকে। খাড়া পাশে মর্টার চেপে দিয়ে দ্বিতীয় স্ট্রেচার বসাতে হবে। লেভেলের সাহায্যে সমতল ও প্লাম্বের সাহায্যে খাড়া পরীক্ষা করতে হবে।

ব্লক

দীর্ঘস্থায়ী নির্মাণকাজে সব সময় প্রথম শ্রেণির ইট ব্যবহার করা উচিত। পাকা কাজে অথবা বাড়ির প্রাচীর নির্মাণকাজে বা অস্থায়ী শেড তৈরির কাজে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ইট ব্যবহার করা যেতে পারে।

ইটের পজিশন

ভাগে ভাগ করা যায় কীভাবে বিছানো যায় এবং কোন মুখ করে থাকে দেয়ালের ৬টি পজিশন। এগুলো হচ্ছে-

  • স্ট্রেচার বা স্ট্রেচিং ব্রিক
  • হেডার বা হেডিং ব্রিক
  • সোল্ডার 
  • সেইলর
  • রোলক
  • সাইনার বা রোলক স্ট্রেচার।

সচিত্রে বিভিন্ন পজিশন দেখানো হলো-

ইট গাঁথুনির ধরন

  • স্ট্রেচার বন্ড
  • হেডার বন্ড
  • ইংলিশ বন্ড
  • ফ্লেমিশ বন্ড
  • সিঙ্গেল ফ্লেমিশ বন্ড
  • ডাবল ফ্লেমিশ বন্ড
  • ফেসিং বন্ড
  • ডাচ বন্ড
  • ইংলিশ ক্রস বন্ড
  • ব্রিক অন এডজ বন্ড
  • র‌্যাকিং বন্ড
  • জিগজ্যাগ বন্ড
  • গার্ডেন ওয়াল বন্ড
  • সাসেক্স বন্ড
  • মন্ক বন্ড
  • র‌্যাট ট্রাপ বন্ড।

অন্যান্য ধরনের বন্ডের মধ্যে রয়েছে-ইটকে কেটে বিভিন্ন আকার দেওয়া হয়-দুই ভাগে, তিন ভাগে কিংবা থ্রি-কোয়ার্টার ব্যাট স্ট্রেচিং

  • থ্রি-কোয়ার্টার ব্যাট হেডিং
  • হাফ ব্যাট
  • কোয়ার্টার ব্যাট 
  • ক্লোজার কুইন
  • থ্রি-কোয়ার্টার ক্লোজার কুইন
  • কিং ক্লোজার।

নিয়ম মেনে ইট স্থাপনা নির্মিত হলে তা একদিকে যেমন হবে নান্দনিক, তেমনি হবে টেকসইও। ইট পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ হলেও বাংলাদেশে এখনো তা অধিকাংশ ইট ভাটায় তৈরি হয়, যা পরিবেশদূষণ ঘটায়। সম্প্রতি ইট তৈরিতে অনেক আধুনিক প্রযুক্তি এসেছে, যা দেশের অনেক স্থানে ব্যবহার করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সব ভাটা আধুনিক প্রযুক্তির অধীনে এলে নির্মাণ উপকরণ হিসেবে ইট হয়ে উঠবে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই। 


প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৪তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৮

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top