ইস্টার দ্বীপের ভাস্কর্য

লাতিন আমেরিকার দেশ চিলির বিচ্ছিন্ন প্রায় এই দ্বীপটি যে কারণে বেশি বিখ্যাত তা এর ভূ-প্রকৃতি (আগ্নেয়-দ্বীপ) বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়। প্রকৃতপক্ষে এখানে আবিষ্কৃত কিম্ভূত আর বৃহদাকৃতির মূর্তিগুলোর জন্য। স্থানীয়ভাবে এগুলো ‘মোয়াই’ নামে পরিচিত। মোয়াই ভাস্কর্যের যে জিনিসটি প্রথমে আপনার নজর কাড়বে তা হলো এর বিশাল আকার আর কিছুটা অসামঞ্জস্য মাথা ও ধড়ের অনুপাত। মোয়াই মূর্তির বৈশিষ্ট্যই এটি। দেহের তুলনায় বেশ বড় আকারের মাথা। মোয়াইয়ের বিশালাকৃতি আর অদ্ভুত-দর্শন মূর্তি দেখার বিস্ময় যদি আপনার কেটে যায়, তবে আপনার জন্য পরবর্তী বিস্ময় হচ্ছে কে এই বিশাল মূর্তিগুলোকে এখানে এনে রেখেছে বা কারা এর কারিগর? এই ভেবে অবাক হওয়া। ইস্টার দ্বীপ ভ্রমণপিপাসুদের কাছে অনেক কারণেই আকর্ষণীয়। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের অবস্থিত এই দ্বীপটি ভূতাত্ত্বিকদের পাশাপাশি পর্যটকদেরও মন আর নজর কেড়েছে এখানে অবস্থিত অদ্ভুতদর্শন সব ভাস্কর্যের কারণে।

ইস্টার দ্বীপের স্থানীয় নাম রাপা নুই (Rapa Nui), এটি একটি পলিনেশিয়ান শব্দ। এই দ্বীপের ‘রাপা নুই’ বা বড় রাপা নামকরণের পেছনে প্রচলিত গল্পটি হচ্ছে কিছু দাস ব্যবসায়ী স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে দ্বীপটি ছিনিয়ে নেয়। দাস ব্যবসায়ীর দলটি রাপা নামক অন্য একটি দ্বীপের সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেলেছিল। পরবর্তী সময়ে এরা দ্বীপটির নামকরণ করে ‘রাপা নুই’ নামে। আর আমরা যে এখন একে ইস্টার দ্বীপ নামে চিনি তার কারণও দ্বীপের আরেক বহিরাগত দল। ডাচ দিগ্বিজয়ী জ্যাকব রজভিন ১৯২২ সালের ইস্টার সানডের দিনে (৫ এপ্রিল, ১৯২২) এই দ্বীপে তার অনুসন্ধিৎসু দলের সঙ্গে অবতরণ করেন। জ্যাকব অবশ্য ‘ডেভিস আইল্যান্ড’-এর খোঁজে বেরিয়েছিলেন। তাঁর হঠাৎ আবিষ্কৃত এই নুন দ্বীপটির নাম দেন ‘পা’শ আইল্যান্ড’ (Paasch-Ezland) ডাচ্্ ভাষায় যার অর্থ ইস্টার। আধুনিক বিশ্বের কাছে সে থেকে দ্বীপটি ইস্টার দ্বীপ নামেই পরিচিত।

রাস্তা থেকে নেমে মোয়াই মূর্তি দেখার উদ্দেশ্যে রওনা দিলে পাহাড়ের কোলঘেষে মোয়াইয়ের মাথাগুলো প্রথমে আপনার নজরে আসবে। মোয়াই মূর্তির সূতিকাগার এলাকাটি রানো রারাকু (Rano Raraku) বা মোয়াই নার্সারি নামে পরিচিত। মোয়াই নার্সারিতে গেলে আপনি মোয়াই তৈরির ধাপগুলো সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাবেন। আগ্নেয়গিরির থেকে উদ্্গত চুনাপাথর থেকে এগুলো বানানো হয়েছে। কোনটা মাত্রই বানানো শুরু হওয়া থেকে অর্ধসমাপ্ত এবং পুরোপুরি প্রস্তুত সব রকম মূর্তির দেখা মিলবে। এখান থেকেই পরে দ্বীপের অন্যান্য স্থানে মূর্তিগুলো বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভীষণ ভারী একটি মূর্তি পাথর কুঁদে কোন প্রযুক্তির সাহায্যে হাজার বছর আগে মানুষ এদের তৈরি করেছিল, সেটা ভাবার থেকেও বেশি অবাক লাগে এইগুলো তারা কীভাবে বহন করেছিল সেটা নিয়ে ভাবতে। পাথুরে যুগের মানুষেরা এখানেই অমীমাংসিত রহস্যের জন্ম দিয়েছেন। এখানে আবিষ্কৃত ৮৮৭টি মূর্তির ৫৩টি ছাড়া বাকি সবই এই আগ্নেয়গিরির পাথুরে তৈরি। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ বরাবর উঠে গেলে পুরো এলাকাটির ৩৬০ ডিগ্রি প্যানারমিক ভিউ পেয়ে যাবেন সহজেই।

এই স্থানের অদূরেই আহু টঙ্গারিকি (Ahu Tongariki) অবস্থিত। এটাকে আপনি গ্রামের গোরস্থান বলতে পারেন। আহু হচ্ছে মোয়াই ভাস্কর্যের জন্য দ্বীপটির সবচেয়ে ফটোজেনিক স্থান, মানে দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় ছবি তুলতে পারবেন এখানে। এখানে মোয়াই মূর্তিগুলো খেয়াল করে দেখবেন সবাই সমুদ্রের থেকে পেছনে ফিরে রয়েছে, যেন সমুদ্র থেকে দ্বীপের দিকে মুখ করে আছে। এর পেছনের কারণ কী, সেটি অবশ্য অজানা। যদিও ভূতাত্ত্বিক আর রেডিও কার্বন ডেটিংয়ের মধ্যে সঠিক সময়কাল নিয়ে কিছুটা মতভেদ আছে। তবু, ধারণা করা হয় এখানে যে পলিনেশিয়ান মানুষেরা এসে বসত গড়েছিল, তারাই এই মূর্তিগুলো তৈরি ও বহনের কাজ করেছিল। তাও আনুমানিক আজ থেকে ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে।

পুকাও টপনটস (Pukao Topknots), পুকাও মানে হচ্ছে মাথার উপর মাথালি বা টুপির মতো কিছু। মোয়াইয়ের কিছু কিছু মূর্তিতে এ রকম টুপিসদৃশ স্থাপনা দেখা যায়। এই পুকাওগুলো লাল আগ্নেয় পাথরের তৈরি আর মূর্তিগুলোর বয়স হিসেবে বেশ নুন। আনুমানিক ষোড়শ শতাব্দীতে এগুলো তৈরি করা হয়। মূলত এই টুপিগুলো পরে মূর্তির মাথায় বসানো হয়। এর প্রকৃত কারণ যদিও অজানা, কোনো কোনো ভূতাত্ত্বিকের মতে, টুপিগুলো ক্ষমতার প্রতীক। রাপা নুইয়ে পুরুষদের মধ্যে এই টুপিসদৃশ চুলের ছাঁট বেশ জনপ্রিয়।

উইকিপিডিয়া

মোয়াইগুলো এখন যেভাবে আছে শুরু থেকে কিন্তু সেভাবে ছিল না। ইস্টারের গৃহযুদ্ধকালীন সব ওলট-পালট হয়ে গিয়েছিল। এরপর বিশ শতকের সুনামিতে মোয়াইগুলো দ্বীপের ভেতরের দিকে সরে আসে। ১৭৫০ এর দশকে এই মূর্তিগুলোর মাথায় টুপি বসানো হয়। একদম সঠিক সময় জানা না গেলেও ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৭০০ দশকে যখন ইউরোপিয়ান পর্যটকেরা এই দ্বীপে পা রেখেছিলেন তাঁরা কোনো মূর্তির মাথায় টুপি দেখেননি। আবার ১৭৭৪ সালে ক্যাপ্টেন কুক যখন ইস্টারে যান তিনি অনেক মূর্তির মাথাতেই টুপি দেখতে পান। তাই এই টুপির স্থাপনা যে এই সময়ের মধ্যকার ঘটনা সেটা বলাবাহুল্য। গৃহযুদ্ধে আটকে পড়া আদিবাসীরা এই টুপিগুলোর নির্মাতা বলে ধারণা করা হয়।

সাদা বালুকা আর নীল পানির সমুদ্রসৈকত আনাকেনাতে (Anakena) সাতটি মোয়াইয়ের অবস্থান আরেকটি সুন্দর দৃশ্য। যেন নির্জন দ্বীপের সপ্তর্ষি। আহু আকিভি (Ahu Akivi) উপকূলের মোয়াইয়েরা অনন্য এদের অবস্থানের জন্য। পুরো দ্বীপের মধ্যে শুধু এখানেই মোয়াইগুলো সমুদ্রের দিকে মুখ করে অবস্থান করছে।

মোয়াই ভাস্কর্যের মূর্তিগুলোর তো চোখ নেই। কোনো কোনো মূর্তির মাথায় টুপি থাকলেও চোখের সন্ধান মেলেনি। আহু আকিভিতে আবিষ্কৃত হয় এই মোয়াইয়ের আসলে চোখ ছিল। ভূতাত্ত্বিকেরা এখানে চোখের সন্ধান পান, যেগুলো সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি, যাদের মণি কালো আর লাল পাথরের সমন্বয়ে তৈরি করা। আবিষ্কৃত এই চোখগুলো মোয়াইয়ের চক্ষুহীন কোটরের মাপের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

একেকটি মোয়াইয়ের ওজন, আকৃতি নেহাত কম নয়। সব থেকে উঁচু মোয়াইটি ৩৩ ফুট উঁচু আর ওজনে ৮২ টন। তবে সব থেকে ভারী মোয়াইটি এত উঁচু নয়, কিছুটা খর্বাকৃতির, ওজন ৮৬ টন। একটি অসমাপ্ত মোয়াই দেখে আন্দাজ করা হয় সম্পূর্ণ হলে মূর্তিটির উচ্চতা হতো ৬৯ ফুট আর ওজন প্রায় ১৪৫-১৬৫ টনের মতো। এ রকম ভারী আর বিশালাকৃতির মূর্তিগুলো দ্বীপবাসী কীভাবে বহন করেছিল, সেটি নিয়ে নানা রকম মত প্রচলিত আছে। কাঠের গুঁড়ি, ঠেলাগাড়ি, রশির সহায়তা ইত্যাদি মতবাদের সঙ্গে ভিনগ্রহের বাসিন্দার সাহায্য নেওয়া পর্যন্ত সব রকম মতই শোনা যায়। অবশ্য সঠিক জিনিসটি আজ পর্যন্ত অজানাই রয়ে গেছে।

মোয়াই মূর্তির মাথা আর দেহের অনুপাত ৫ : ৩, পাতলা ঠোঁট, খাঁড়া নাক, মোটা ভ্রু, চেহেরায় কিছুটা ঔদ্ধত্য বা দাম্ভিকতার প্রকাশ। গড়ে একেকটি মোয়াই ১৩ ফুটের মতো আর ওজনে ১৪ টনের মতো আর বেড় ৫ ফুটের মতো। যদিও মোয়াই মূলত আগ্নেয় পাথরের তৈরি, কয়েকটি মোয়াই তৈরিতে ব্যাসল্ট, লাল আগ্নেয় জমাট লাভা ইত্যাদির ব্যবহারও হয়েছে।

অনেক ভূতাত্ত্বিকের মতে, মোয়াই ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশের একধরনের মাধ্যম। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনেরা মোয়াই তৈরি করে সেগুলোকে চিরস্থায়ী রূপদান করতে চেয়েছে। রাপা নুইয়ের পূর্বপুরুষেরা এসব মোয়াইকে হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবত। মনে করত এই মূর্তির মধ্যে আধ্যাত্মিক আর জাদুর শক্তির সমাবেশ ঘটে। দ্বীপবাসীর ওপর নজরদারি করে। সে জন্যই সব মোয়াই দ্বীপের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যতিক্রম আহু আকিভির সাত মোয়াই। ওরা সমুদ্রের দিকে ফিরে আছে দ্বীপের দর্শনার্থীদের পথ দেখাতে। কারও কারও মতে, এই সাত মোয়াই তাঁদের রাজার অবতরণকে স্বাগত সম্ভাষণ জানাতে অপেক্ষা করে রয়েছে। 

উইকিপিডিয়া

ইস্টার দ্বীপ জনবিচ্ছিন্ন আগ্নেয় খাতের কাছে বিশাল সাগরের ছোট্ট একটা দ্বীপ। এখানে নেই কোনো বড় শহর গড়ে ওঠার নিদর্শন কিংবা খুব উন্নত সভ্যতার বিকাশের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ। ইস্টার দ্বীপে পৌঁছানোর সবচেয়ে সুবিধাজনক এবং সম্ভবত একমাত্র উপায় হচ্ছে, চিলির সান্টিয়াগো থেকে বিমানে চেপে বসা। পুরো দ্বীপটিতে এই আধুনিক সময়েও মাত্র একটি শহর (হাঙা রোয়া- Hanga Roa), যেখানে আপনি প্লেন থেকে অবতরণ করবেন। এ ছাড়া এখানে আর কোনো পাবলিক যানবাহনের আশা করবেন না যেন। ইস্টারে ওসবের বালাই নেই। দ্বীপ ঘুরে দেখতে চাইলে হোটেল বা গেস্ট হাউসের মালিকের কাছ থেকে প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে নেওয়াই উত্তম। অবশ্য চাইলে ট্যুর বাসেও যেতে পারেন।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৪তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৯।

মহুয়া ফেরদৌসী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top