Image

মাশরুম যখন ভবনের ইনসুলেশনে

আমেরিকান স্টার্টআপ এক কোম্পানি (নতুন কার্যক্রম শুরু হয়েছে যে কোম্পানির) ছত্রাক থেকে নিরোধক তৈরিতে নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করে সারা বিশে^ দারুণ আলোড়ন ফেলেছে। মোড়ক বা বিল্ডিংয়ের কাজে নিরোধকের মতো প্লাস্টিক ফোমের বিকল্প ও প্রতিদ্বন্দ্বী পণ্য হিসেবে ‘ইকোভেটিভ ডিজাইন’ নামের এই কোম্পানির মাশরুম ইনসুলেশন (Mushroom Insulation) নজর কেড়েছে সবার। আর কৃষি খাতের উপজাত পণ্যের সঙ্গে মাইসেলিয়াম (একধরনের ছত্রাক বিশেষ)-এর বিক্রিয়ার ফলে উৎপাদিত এই নিরোধক তৈরির প্রকল্পটি ‘ক্রাডল টু ক্রাডল প্রোডাক্ট ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’ প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জনের বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছে।

আমরা জানি, ছত্রাকের তন্তুগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত, যাতে নিজ থেকে এটি বংশবিস্তার করতে পারে; এটি মূলত একসঙ্গে গুচ্ছ হিসেবে জন্মায়। ইকোভেটিভ ডিজাইন ছত্রাকের এই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়েই নিরোধক তৈরির পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করেছে। দুটি পাইন কাঠ বোর্ডের মাঝে মাইসেলিয়াম জন্মানো হয়। তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই মাইসেলিয়ামগুলো বেড়ে বোর্ডের মধ্যকার ফাঁকা জায়গা ভরাট করে ফেলে। পাইন বোর্ডটা দেখতে তখন ঠিক একটা স্যান্ডউইচের মতো দেখায়। মাসখানেকের মধ্যেই এই মাশরুম বা ছত্রাকের স্তরটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে বোর্ডের আকার ধারণ করে। জীবন্ত মাশরুমের এই ইনসুলেশন স্ট্রাকচারাল ইনসুলেশনের মতোই কার্যক্ষম।

এটি শুনতে যত সহজ মনে হচ্ছে, এর শুরুটা কিন্তু অতটা সহজ ছিল না। নিজেদের স্বপ্নপূরণ আর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার তাগিদে নতুন কিছু করার চিন্তা প্রতিভাবান দুই তরুণকে সব সময়ই উজ্জীবিত করত। নিউইয়র্কের রেন্সেলিয়ার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মেধাবী এই দুই তরুণ ইঞ্জিনিয়ার ইবেন বেয়ার ও গেভিন ম্যাকিনট্যায়ার তখন শেষ বর্ষের ছাত্র। একদিন তাদের মাথায় দারুণ এক আইডিয়া খেলে গেল। তারা ঠিক করল এমন কিছু উদ্ভাবন করবে, যা হবে পরিবেশবান্ধব একই সঙ্গে ব্যয়সাশ্রয়ী। গ্র্যাজুয়েশন শেষ হতেই এই দুই ক্লাসমেট শুরু করল স্টার্টআপ বিজনেস। তাদের গঠিত কোম্পানি ‘ইকোভেটিভ ডিজাইন’ কৃষিপণ্যের উপজাতকে কাজে লাগাতে চাইল। বেয়ার ও ম্যাকিনট্যায়ার ছত্রাক আর কৃষি উপজাত পণ্যের সমন্বয়ে বাজারে প্রচলিত প্লাস্টিক ইনসুলেশনের বিকল্প পণ্য উৎপাদনের পদ্ধতি নিয়ে ভাবছিল। বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক নিয়ে কাজ করতে করতে একসময় মাইসেলিয়াম ব্যবহার করে তারা কাঙ্খিত ফল পেতে লাগল। কিন্তু কোম্পানির গবেষণা এবং পণ্য তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করতে দরকার ছিল প্রচুর অর্থের। এই অর্থ জোগাড় করতে বেয়ার আর ম্যাকিনট্যায়ার অংশ নিল বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। সেরা বিজনেস আইডিয়া, ব্যতিক্রমী উদ্ভাবন ইত্যাদি ক্যাটাগারিতে পেল বেশ কটি পুরস্কার। পুরস্কার হিসেবে পাওয়া প্রাইজমানি দিয়ে ব্যবস্থা হলো কোম্পানির ব্যয় বহনের। ধীরে হলেও একসময় সফলতা পেতে শুরু করল ওরা। তাদের তৈরি এই নতুন ধরনের ইনসুলেটকে তারা গ্রিন্সুলেট (Greensulate) নামে পরিচিতি দিল।

গ্রিন্সুলেট বা মাশরুম ইনসুুলেশন হচ্ছে ইঞ্চি প্রতি তিন ‘আর’ ভ্যালুবিশিষ্ট (R-3-Per-Inch) অনমনীয় ইনসুলেশন ম্যাটেরিয়াল বা নিরোধক কাজে ব্যবহৃত উপাদান, যা একীভূত মাইসেলিয়াম আর কৃষি উপজাত (প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন শস্যের ভুসি/কুঁড়া ব্যবহার করা হয়েছে) এর সমন্বয়ে সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপন্ন পণ্য। মাইসেলিয়াম ফোমের মতো হওয়ায় নিরোধক হিসেবে এটি বেশ কার্যকরী। ‘আর’ ভ্যালু দিয়ে কোনো উপাদানের তাপরোধী ক্ষমতা পরিমাপ করা হয়। দেয়াল বা ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান নিরোধক হিসেবে ব্যবহার করার আগে এর ‘আর’ ভ্যালু দেখে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। যে উপাদানের ‘আর’ ভ্যালু যত বেশি তার তাপনিরোধক ক্ষমতা তত বেশি।

ম্যাটেরিয়াল ডিস্কট্রিক্ট

ইকোভেটিভ ডিজাইনের প্রধান বৈজ্ঞানিক হিসেবে গেভিন ম্যাকিনট্যায়ার গ্রিন্সুলেট তৈরির পদ্ধতি বর্ণনা করেছে। কৃষিবর্জ্য যেমন, গম বা ধানের তুষ ইত্যাদির মধ্যে ছত্রাক (শিকড়ের মতো আঁশ-জাতীয় মাইসেলিয়াম নামক একটি ছত্রাক) কলম করা হয়। তারপর এটিকে ছাঁচের মধ্যে ঢালা হয়। এই ছাঁচটি খুব সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পাঁচ থেকে দশ দিনের মতো রাখা হয়। এই সময়ের মধ্যে মাইসেলিয়াম তুষের মধ্যে বেশ ভালোভাবে বংশবিস্তার করে। তুষের মধ্যে জন্মানো এই ছত্রাকটি একদম অনমনীয় ফোমের আকার ধারণ করে। এবার এটিকে এখান থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয় আর মাইসেলিয়ামের উৎপাদন বন্ধের ব্যবস্থা করা হয়। এবার পরিশোধনের পালা। পরিশোধন শেষে এটি ব্যবহারের উপযুক্ত হয়। গ্রিন্সুলেটের উদ্ভাবকদের মতে, কোনো কিছুতে না ভেজানো পর্যন্ত শুষ্ক গ্রিন্সুলেটের আকার ও আকৃতি অটুট থাকে।

প্রস্তুতকৃত গ্রিন্সুলেট ইনসুলেশনে কোনো বাষ্পীয় উপাদান (Volatile Organic Compounds-VOCs), রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ, প্লাস্টিক বা কৃত্রিম কোনো উপাদান নেই। এটা সম্পূর্ণই প্রাকৃতিক। এমনকি অন্য জৈবভিত্তিক পণ্যের মতো এতে কোনো খাদ্যোপদানও নেই। গ্রিন্সুলেট ইঞ্চি প্রতি ৩.০ ‘আর’ ভ্যালু (R-Value) অর্জনে সক্ষম হয়েছে।  গেভিন ম্যাকিনট্যায়ার বিশ্বাস করে, তাদের তৈরি এই গ্রিন্সুলেট আরও উচ্চ ‘আর’ ভ্যালু অর্জনে সক্ষম। গ্রিন্সুলেট উৎপাদনের সময়টাতেও কোনো কার্বনের নিঃসরণ হয় না আর এটি সহজেই মাটিতে পচনশীল হওয়ায় পরিবেশের কোনো ক্ষতিও করে না।  

প্রথমে মোড়কের কাজে ব্যবহারের জন্য গ্রিন্সুলেট তৈরির ভাবনা থাকলেও ইকোভেটিভ ডিজাইন এটিকে বিল্ডিংয়ের ইনসুলেশন হিসেবে ব্যবহার উপযোগী করে উৎপাদনের চিন্তাভাবনা করে। অর্থনৈতিক কারণ ও গবেষণার কাঙ্খিত ফল লাভে প্রচুর সময় ব্যয় হওয়াতে কোম্পানিটি তাদের পণ্য নিয়ে বাজারে আসতে বেশ সময় নিয়েছে। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া প্রজেক্টটি সফলভাবে বাণিজ্যক উৎপাদনে আসে ২০১২ সালে। ইকোভেটিভ ডিজাইন অবশ্য কাজ করে প্রি-অর্ডারেরও।

ইকোভেটিভ ডিজাইনের মিশন হচ্ছে পরিবেশবান্ধব, দূষণমুক্ত এবং ব্যয়সাশ্রয়ী মাশরুমের পণ্য তার গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। ইকোভেটিভ ডিজাইন মূলত তিন ধরনের পণ্য বাজারজাত করে থাকে। GIY (Grow It Yourself) Mushroom Materials (কোম্পানি সম্পূর্ণ সহযোগিতা দেবে, মাশরুম দিয়ে আপনি যে আকৃতির, যে পণ্যই তৈরি করতে চান না কেন), MycoFoam এবং MycoBoard। গ্রাহক তার নিজের চাহিদানুযায়ী পণ্যের অর্ডার দিলে তা নিমেষেই পৌঁছে যাবে গ্রাহকের দোরগোড়ায়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৩তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭।

Related Posts

বাংলাদেশে টেকসই সড়ক নির্মাণ বাধ্যবাধকতা

বর্তমান বিশ্বে অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো সড়ক নির্মাণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান…

গরমে ঘর ঠান্ডা রাখার উপায়

আমাদের প্রত্যাহিক জীবনে আবহাওয়া ও পরিবেশ নানাভাবে ছাপ রাখে। পরিবেশ পরিস্থির সঙ্গে তাল মিলিয়েই প্রতিনিয়ত চলতে হয় আমাদের।…

বিস্ময়কর যন্ত্র ক্রেন

আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির পেছনে যেমন রয়েছে মানুষের দূরদর্শিতা, তেমনি রয়েছে বিস্ময়কর নানা যন্ত্রের ব্যবহার। স্থাপনা নির্মাণে ভারী ভারী…

সড়ক নির্মাণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ (দশম পর্ব)

সড়ক নির্মাণকাজে সার্বিক মান নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন প্রকার সড়ক নির্মাণ কল্পে সড়কসমূহের প্রকারভেদ, প্রয়োজনীয় মালামাল, যন্ত্রপাতি এবং কাজের পদ্ধতিসংক্রান্ত…

ফ্লাইং উইন্ডমিল

শক্তির নবতর সম্ভাবনা মহাবিশ্ব অসীম এক শক্তির আধার, এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমাদের গ্রহে শক্তির…

চৈনিক জলপ্রপাত ভবন

চীনের দ্রুতগামী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সহসঙ্গী হয়েছে কনস্ট্রাকশন বুম (আকস্মিক নির্মাণযজ্ঞ)। এসব ভবন যেমন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন, তেমনি দৈত্যাকার। উদ্ভট…

অটোমেটিক প্লাস্টারিং মেশিন

সময়সাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর নির্মাণকাজকে যথাসম্ভব কম সময় আর শ্রমে সম্পন্ন করতে উদ্ভাবিত হচ্ছে নানান প্রযুক্তি। তা সত্ত্বেও ভবন…

সড়ক নির্মাণে পেভিং মেশিন

সড়ক নির্মাণ বেশ অর্থ, সময় ও শ্রমসাপেক্ষ ব্যাপার। নির্মাণের প্রতিটি ধাপে যে পরিমাণ সময় ও শ্রমের প্রয়োজন হয়…

ফটোভোলটাইক কাচ সৌরবিদ্যুতের নতুন সম্ভাবনা

ঘরের ভেতরে সহজেই যেন আলো প্রবেশ করতে পারে, এ জন্য জানালায় কাচের ব্যবহারের প্রচলন অনেক আগ থেকেই। তবে…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

নিউইয়র্ক সিটির চার নতুন জেলের পেছনের স্থাপত্য চিন্তা
prada galleria
গোল্ডেন সেকশন থেকে কোস্টারিকার পাহাড়ে ত্রিভুজাকৃতির বাড়ি
রান্নাঘরে খেলাচ্ছলে টুইস্ট নিয়ে এসেছে ডিজাইনবুম শপের নতুন কিউরেটেড সংগ্রহ
বাগানের ভেতর রঙিন খিলানে বিস্তৃত হলো এক ইরানি বাড়ি: গেলারেহ হাউস
বেঙ্গাজির নতুন পরিকল্পনার রূপরেখা আঁকছে ZHA
ফেসবুক পোস্ট থেকে ফিরে এলো ফুটুরো হাউস
ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার ও কার্বন নি:সরণ
আসন্ন RIBA ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের শর্টলিস্টে রংপুরের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি