মধ্যযুগীয় সামরিক স্থাপত্যর অনন্য নিদর্শন ক্যাসল দেল মন্তে (ক্যাসল অব মাউন্টেন)। প্রাসাদটি ইতালির দক্ষিণ-পূর্বের আপুলিয়ার আঁন্দ্রেয়া পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত। ক্যাসল দেল মন্তে আক্ষরিক অর্থেই পাহাড়ের প্রাসাদ। আসলে এটি পাহাড়ের ওপরে নির্মিত একটি সুরক্ষিত প্রাসাদ-দুর্গ। এলাকাটির মাটি উর্বরতার জন্য একসময় বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। পানি সরবরাহ ভালো থাকায় প্রচুর পরিমাণে সবজি ফলত। তা সত্ত্বেও জায়গাটি প্রাসাদ নির্মাণের জন্য তেমন উপযুক্ত নয়। সমতল থেকে ৫৪০ মিটার উচ্চতায় সান্তা মারিয়া দেল মন্তের আশ্রমের পাশে এ রকম ছোট একটা পাহাড়ের ওপর মহান রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেদরিক কেন এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন, সেটি অবশ্য আজও অজানা। সম্রাট শিকার অভিযানে অবসর যাপনের জন্য এই প্রাসাদটির নির্মাণকাজ শেষ করার তাগিদ দিয়েছিলেন বলে নথিতে পাওয়া গেলেও এর নির্মাণকাজ পুরোপুরি সম্পূর্ণ হয়েছিল বলে কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি সম্রাট এটিকে কখনো তাঁর অবকাশ যাপনের জন্য ব্যবহার করেছেন এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
তেরো শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ বারো শ চল্লিশের দশকে সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেদরিক এই প্রাসাদ-দুর্গটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেদরিক অঞ্চলটির আধিপত্য পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে (মায়ের তরফ থেকে)। ক্যাসল দেল মন্তে অবশ্য ব্যবহৃত হয়েছে প্রাদেশিক কয়েদখানা হিসেবেও। এখানে ম্যানফ্রেডের পুত্রত্রয় হেনরি, আজ্জো ও এনজোর পাশাপাশি হোয়েন্সটোফেনের অন্য সমর্থকেরা ১২৬৬ সালের পর থেকে কারাবাস করেছেন। প্লেগের মহামারিতে সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও এটি কিছুদিন ব্যবহৃত হয়েছিল। সময়ের ব্যবধানে প্রাসাদটি অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থাকে। একসময় এর মার্বেল পাথরের দেয়াল আর কলাম, চারপাশের সুরক্ষিত সীমানাপ্রাচীরÑসবই হারিয়ে যায়।

প্রাসাদটির তুলনামূলক ক্ষুদ্রায়তন দেখে প্রথম দিকে ধারণা করা হতো এটি বোধ হয় সম্রাটের অবকাশ যাপন কেন্দ্র। কিন্তু এর সুরক্ষিত সীমানাপ্রাচীর, প্রচলিত প্রাসাদের ধারণার বাইরে ব্যতিক্রমী গঠন সব মিলিয়ে এটিকে দেখে দুর্গ বলেই মনে হয়। আপুলিয়া অঞ্চলে সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেদেরিক ছোট-বড় মিলিয়ে বেশ কিছু প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন কিন্তু ক্যাসল দেল মন্তে এদের সবার থেকে ব্যতিক্রম। ক্যাসল দেল মন্তে একটা অষ্টাভুজ দুর্গ। এই অষ্টাভুজ দুর্গের প্রতিটি কর্নারে আবার একটি করে অষ্টাভুজাকৃতি টাওয়ার আছে। এ সময় থেকে সে সময়ে এই টাওয়ারগুলো আরও মিটার পাঁচেকের বেশি উঁচু ছিল। আর সম্ভবত তখন এটি ছিল তিন তলাবিশিষ্ট। বর্তমানে দুই তলার প্রতিটিতে আটটি করে কক্ষ রয়েছে। আর তাই কেন্দ্রের ফাঁকা উঠোনটির আটটি সাইড। প্রতিটি প্রধান কামরার সিলিংয়ে ভল্ট আছে। তিন দিকের কর্নার টাওয়ারে আছে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। প্রাসাদ-দুর্গটির দুইটি প্রবেশমুখ। একটি পেছন দিকের গোপন প্রবেশমুখ। যেটি সহজে কারও নজরে পড়ে না আর অন্যটি সামনের দিকে। সামনের দিকের প্রবেশমুখটি যথাযথ অলংকৃত। সামনের দিকের এই প্রধান প্রবেশপথের ক্ল্যাসিক্যাল ডিজাইন দেখেই বোঝা যায় সম্রাটের গ্রিক-রোমান স্থাপত্যের প্রতি ছিলেন বিশেষ আগ্রহী।
অষ্টভুজাকৃতির নকশা যেকোনো প্রাসাদের জন্য আসলেই একটু ব্যতিক্রম। এই বিষয়টি নিয়ে তাই রয়েছে হরেক রকম মতভেদ। কেউ কেউ ক্যাসল দেল মন্তেকে প্রাসাদ বলেই মানতে চান না। তাঁদের মতে, সম্রাট এটিকে তাঁর জন্য একটি হন্টিং লজ হিসেবে বানিয়েছিলেন। কিন্তু আগেই বলেছি, ক্যাসল দেল মন্তে আর যা-ই হোক, কখনোই হন্টিং লজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। আরেক দলের মত হচ্ছে, এটির এমন বিচিত্র নকশা আসলে পৃথিবী আর আকাশের সম্মিলিত প্রতীক। কারণ, অষ্টভুজ হচ্ছে বৃত্ত আর বর্গের মাঝামাঝির প্রতীক বিশেষ। যেখানে বৃত্তকে দিয়ে আকাশ আর বর্গকে দিয়ে পৃথিবীকে বোঝানো হয়েছে। ধারণা করা হয়, সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেদেরিক সম্ভবত জেরুজালেমের ডোম অব দ্য রক অথবা আচেন ক্যাথেড্রালের দ্য প্যালেস চ্যাপেলের নকশা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। প্রাসাদটির প্রধান দেয়াল ২৫ মিটার আর এর ভিত ২৬ মিটার পুরুত্বের। মূল অষ্টভুজটির প্রতিটি পাশ ১৬.৫ মিটার দীর্ঘ আর অষ্টাভুজাকৃতি কর্নার টাওয়ারগুলোর একেক পাশ ৩.১ মিটার দীর্ঘ। ৫৬ মিটারের ব্যাসের প্রাসাদটির প্রধান প্রবেশদ্বার পূর্বমুখী।

যত দূর জানা যায়, আঠারো শতকের দিকে এই প্রাসাদ-দুর্গটি থেকে এর সব মার্বেল পাথর আর অলংকরণগুলো লুট হয়ে যায়। হাউস অব ব’র্বনের সদস্যরা এই মার্বেল কলাম আর জানালার ফ্রেমগুলো তাঁদের প্যালেস ইন ক্যাসার্তাতে পুনর্ব্যবহার করে। বহুবছর পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর ইতালি এটিকে ১৮৭৬ সালে ২৫ হাজার লিরার বিনিময়ে কিনে নেয় এবং পরে ১৯২৮ সালের এটির পুনর্নির্মাণ শুরু করে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৪তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭।