এয়ার ফ্রেশনারে ফ্রেশ অন্দর

নিজেকে রিফ্রেশ রাখতে আমাদের কত আয়োজন! পারফিউম, বডি স্প্রে, আতর ইত্যাদি যেন আমাদের যাপিত জীবনের রোজকার অনুষঙ্গ। কিন্তু নিজেকে পরিপাটি রাখলেই তো আর হলো না, নিজ গৃহ, কর্মস্থলটাকেও রাখতে হবে সতেজ ও সজীব। প্রায়ই আমাদের ঘরে, রান্নাঘরে, বাথরুমে, অস্বস্তিকর কিছু গন্ধ পাওয়া যায়। বিশেষ করে বর্ষায়। তখন পড়তে হয় অস্বস্তিতে। অন্যদিকে ঘরে যদি সৌরভময় পরিবেশ থাকে, তাহলে মনটাও থাকে চাঙা। তা ছাড়া ঘরে ঢুকেই যদি সুঘ্রাণ পাওয়া যায়, তাহলে আগত অতিথিদের কাছেও নিজের বা পরিবারের সদস্যদের রুচিবোধ প্রকাশ পায়। আর তাই দুর্গন্ধ দূর করে সুবাশিত অন্দর পেতে এয়ার ফ্রেশনার বা সুগন্ধি দারুন কার্যকর।   

এয়ার ফ্রেশনারের নানা আঙ্গিক

চারপাশের ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ যেমন অন্দরে প্রবেশ করে ঘরকে করে তোলে দুর্গন্ধময়। আবার ধূমপান, ব্যবহৃত জুতা-মোজার গন্ধ ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ থেকেও সৃষ্টি হয় কটু গন্ধ। বসার ঘর বা শোবার ঘর ছাড়াও রান্নাঘর ও খাবারঘরে রান্নাবান্না ও বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য থাকাতেও উটকো গন্ধের সৃষ্টি হয়। বাদ যায় না টয়লেটও। কিন্তু সবখানে তো একই ধরনের এয়ার ফ্রেশনার কার্যকরী নয়। এয়ার ফ্রেশনার সাময়িক সময়ের জন্য দুর্গন্ধ থেকে প্রশান্তি দেয়। এ জন্য বসার ঘর বা শোবার ঘরে এয়ার ফ্রেশনার উপযোগী হলেও রান্নাঘর ও টয়লেটের জন্য নিতে হয় বিকল্প ব্যবস্থা। তা ছাড়া এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহারও বেশ ব্যয়বহুল ব্যাপার। এ জন্য বাথরুমের জন্য ন্যাপথলিনের সঙ্গে মিশ্রিত সুগন্ধি, রান্নাঘরে বা কক্ষের জন্য এয়ার উইক বেশ কার্যকর। আগে অফিস, দোকান বা বাসগৃহ সুগন্ধি করতে ব্যবহার করা হতো আগরবাতি বা ধূপ। এমনকি এখন রয়েছে সেই চল। এই আগরবাতি বা ধূপ দিয়েও সাময়িকভাবে দুর্গন্ধ দূর করা সম্ভব। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সুগন্ধিযুক্ত মোমবাতির ব্যবহার করেও ঘরের পরিবেশকে করা যায় প্রাণবন্ত। উল্লেখ্য, ঘর ছাড়াও গাড়ির জন্যও এয়ার ফ্রেশনার বেশ কার্যকরী।

সুগন্ধির বৈচিত্র্য

এয়ার ফ্রেশনারের সতেজতা মনকে প্রশান্তি দেওয়ার পাশাপাশি কাজেও আনে গতি। এ জন্য বাসাবাড়ির পাশাপাশি অফিস, হোটেল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিনোদন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করা হয়। কিন্তু সব পরিবেশে একই ধরনের স্প্রে মানায় না। ব্যক্তিভেদেও সুগন্ধি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাছবিচার রয়েছে। কারণ, সবার পছন্দ এক নয়। এ জন্য বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের একাধিক সৌরভের এয়ার ফ্রেশনার পাওয়া যায়। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

  • অর্কিড
  • লিলি
  • লেমন
  • অরেঞ্জ
  • ভ্যানিলা
  • ল্যাভেন্ডার
  • জেসমিন
  • চন্দন
  • জুঁই
  • বেলি
  • মিন্ট
  • সুইট মিন্ট প্রভৃতি।

এয়ার ফ্রেশনারের ধরন

বিভিন্ন মডেলের বাহারি এয়ার ফ্রেশনার পাওয়া যায় বাজারে। এসবের কোনোটা একবার আবার কোনোটা রিফিল পরিবর্তন করে বারবার ব্যবহার করা যায়। ওয়ান টাইম ক্যানগুলোই বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে বাজারে এখন রিফিল সিস্টেমও পাওয়া যায়। এ ছাড়া অটোমেটিক স্প্রে এয়ার ফ্রেশনারও এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যা কিছু সময় পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুগন্ধি ছড়িয়ে দেয়। ৫, ১৫, ২৫, ৫০ মিলি সাইজের এসব স্প্রে বোতল ৫০০ থেকে ৩০০০ বার পর্যন্ত স্প্রে করা যেতে পারে। এলইডি ডিসপ্লে সমৃদ্ধ এয়ার ফ্রেশনারও বেরিয়েছে বাজারে। তবে তা কিছুটা ব্যয়বহুল। এ ছাড়া ন্যাপথলিনের সঙ্গে মিশ্রিত সুগন্ধি ও এয়ার উইকও বাজারে পাওয়া যায় সহজেই।

দরদাম

ব্র্যান্ডসৌরভ/ধরনপরিমাণমূল্য (টাকা)
ফে এয়ার ফ্রেশনারলাইম৩০০ মিলি১৯০-২২০
ফে এয়ার ফ্রেশনারল্যাভেন্ডার৩০০ মিলি১৯০-২২০
ফে এয়ার ফ্রেশনারগোলাপ৩০০ মিলি১৯০-২২০
ফে এয়ার ফ্রেশনারম্যাগ্নোলিয়া৩০০ মিলি১৯০-২২০
ফে এয়ার ফ্রেশনারঅ্যান্টি ট্যোবাকো৩০০ মিলি২৩০-২৬০
স্প্রিং এয়ার ফ্রেশনারফ্লোরাল ফ্রেশ      ৩০০ মিলি২০০-২২০
ওয়েভ এয়ার ফ্রেশনারজেসমিন৩০০ মিলি২০০-২১০
অ্যালেক্স অ্যাকুয়া সেন্স এয়ার ফ্রেশনারমিশ্র ফলের ফ্লেভার৩৫০ মিলি২৭৫-২৮৫
এটিএম এয়ার ফ্রেশনার ৭০ মিলি১০০-১১০
ফ্রেশ এন ফ্রেশ এয়ার ফ্রেশনারল্যাভেন্ডার৩০০ মিলি২১০-২২০
আমবিপিউর এয়ার ফ্রেশনারব্ল ওশান৩০০ মিলি২৪০-২৫০
অ্যাঞ্জেলিক এয়ার ফ্রেশনারঅর্কিড ব্রিজ৩০০ মিলি১৯০-২২০
গোদরেজ রুম ফ্রেশনারব্লূ২৭০ মিলি১৯০-২১০
অ্যাডমায়ার        ৪০০ মিলি৪০০-৪৫০ 
ব্র্যান্ডসৌরভ/ধরনপরিমাণ        মূল্য (টাকা) 
ওডনিল এয়ার ফ্রেশনারমিস্টিক গোলাপ৭৫ গ্রাম৬০
ওডোনিল নিউ এয়ার ফ্রেশঅর্কিড ডিউ/ল্যাভেন্ডার৫০ গ্রাম৪০-৪৫
গোদরেজ এয়ার পকেটব্রাইট টাঙ্গি ডিলাইট১০ গ্রাম৬০
গোদরেজ এয়ার পকেটবান্ডিল৩ পিস১৫০
অর্কিড এয়ার ফ্রেশনারজেসমিন৫০ গ্রাম৪৫-৫০

এ ছাড়া অটোমেটিক রুম স্প্রে অ্যান্ড এয়ার ফ্রেশনার ৬০০-২০০০ টাকায় পাওয়া যাবে। এগুলোর রিফিল শেষ হয়ে গেলে তা আবারও লাগানো যাবে। এলইডি ডিসপ্লেসহ অটোমেটিক রুম স্প্রে অ্যান্ড এয়ার ফ্রেশনারের দাম পড়বে ১২০০-৫০০০ টাকা পর্যন্ত। এয়ার উইক ২৫০ মিলি ২৫০-২৬০ টাকায় পাওয়া যাবে। এ ছাড়া আগরবাতির দাম পড়বে প্যাকেটপ্রতি ১০-৩০ টাকা। 

পাবেন যেখানে

দেশের অধিকাংশ বড় কসমেটিকসের দোকান, সুপার শপ এমনকি মুদি ও স্টেশনারি দোকানগুলোতে পাবেন আপনার পছন্দের এয়ার ফ্রেশনার। এ ছাড়া চাল-ডাল ডট কম, বাজার এখানেই ডট কম, আজকের ডিল ডট কম, দোকানদার ডট কমসহ বিভিন্ন অনলাইন শপে অর্ডার দিয়েও সহজেই পেতে পারে পছন্দের এয়ার ফ্রেশনারটি।

এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহারে চাই সতর্কতা

গন্ধের সঙ্গে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক অত্যন্ত প্রবল। বাজে গন্ধ আমাদের বিরক্তির উদ্রেগ করে কিন্তু সুগন্ধ মানসিক ক্লান্তি ও চাপ দূর করে মনে আনে প্রশান্তি। এ জন্য অনেকেই ঘরে ঘন ঘন এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহার করেন। তা ছাড়া বিভিন্ন ধরনের দুর্গন্ধ দূর করতে বেশির ভাগ মানুষই এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করেন। কিন্তু এয়ার ফ্রেশনারের যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর ফেলতে পারে খারাপ প্রভাব। আমাদের অনেকেরই ধারণা, এয়ার ফ্রেশনার বাতাসকে বিশুদ্ধ করে। আসলে কিন্তু তা নয়, সাময়িক সময়ের জন্য দুর্গন্ধকে আড়াল করে মাত্র।

এয়ার ফ্রেশনারের যে সুন্দর সুবাস, সেটা আসলে কতটা নিরাপদ? তা আমরা ভেবে দেখেছি কি! এয়ার ফ্রেশনারে সুগন্ধি হিসেবে যা ব্যবহার করা হয় তা আসলে রাসায়নিক। এসব রাসায়নিকের মধ্যে থ্যালেট নামের ক্ষতিকর উপাদান থাকে, যেগুলো মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর। নিশ্বাসের সঙ্গে শরীরে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক প্রবেশ করলে তা বাড়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি। যাঁরা অ্যালার্জিতে ভুগছেন তাঁদের জন্য এই উপকরণটি চোখ ও নাকের ভেতরে সৃষ্টি করতে পারে অস্বস্তিকর অনুভূতির। এয়ার ফ্রেশনারে যে ধরনের উপাদান থাকে, তাতে সরাসরি ক্যানসার না হলেও এর আশঙ্কা রয়েছে। শ্বাসকষ্ট রয়েছে এমন রোগীদের ঘরে এয়ার ফ্রেশনার বা সুগন্ধি পণ্যের ব্যবহার না করাই ভালো। এমন ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। অনেকের ফুসফুস বা নাকের অ্যালার্জি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয় এয়ার ফ্রেশনার। এ জন্য এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে যত কম ব্যবহার করা যায় ততই ভালো।

মারামানি হাউজ প্ল্যানস

স্বাস্থ্যসম্মত সুগন্ধি পেতে

বাজারে যেমন ভালো মান ও ব্র্যান্ডের এয়ার ফ্রেশনার রয়েছে, তেমনি অস্বাস্থ্যকর ও নকল এয়ার ফ্রেশনারেও সয়লাব। আবার কিছু এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ অনেকে সহ্য করতে পারে না। দামি ব্র্যান্ডের পণ্যগুলো নিয়মিত ব্যবহার করাও বেশ ব্যয়বহুল। সে ক্ষেত্রে বাজার থেকে এয়ার ফ্রেশনার না কিনে পছন্দের ঘ্রাণ অনুযায়ী নিজেই ঘরে তৈরি করে নিতে পারেন নামমাত্র খরচে। তা ছাড়া তৈরিতে তেমন ঝামেলাও নেই। আসুন, জেনে নেই ঘরে সুগন্ধি বানানোর কৌশল-

এয়ার ফ্রেশনার তৈরিতে যা যা লাগবে

  • পানি
  • কমলা বা মালটার খোসা
  • কয়েক টুকরো দারচিনি
  • লবঙ্গ।

যেভাবে তৈরি করবেন

একটি পাত্রে পানি, লবঙ্গ, দারুচিনি ও কমলার খোসা একসঙ্গে করে চুলার আগুনে ফুটাতে হবে। ৫-৭ মিনিট পানি ফুটিয়ে চুলা থেকে নামিয়ে ঠান্ডা হয়ে গেলে একটি স্প্রে বোতলে ভরে নিন। এরপর সাধারণ স্প্রের মতো ব্যবহার করুন। এটি প্রায় এক সপ্তাহের মতো ব্যবহার করতে পারবেন। একই পদ্ধতিতে লেবু, পুদিনা, লেমনগ্রাস পাতাসহ বিভিন্ন ফলের সৌরভে সুগন্ধি তৈরি করতে পারবেন।

টিপস

এয়ার ফ্রেশনার সাময়িক সময়ের জন্য দুর্গন্ধকে আড়াল করে মাত্র। এ জন্য যত কম ব্যবহার করা যায়, ততই ভালো। অন্দরে ভ্যাপসা ও দুর্গন্ধ থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইলে জানালা-দরজা খুলে আলো-বাতাস ঢুকতে দেওয়া সবচেয়ে ভালো উপায়। পণ্যটি ব্যবহারে বিবেচনায় রাখুন-

  • ভালো ব্র্যান্ডের এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহার করা উচিত
  • সস্তায় পাওয়া যায় বলে ফুটপাত থেকে কোনো ধরনের এয়ার ফ্রেশনার কেনা উচিত নয়
  • কেনার আগে মেয়াদ দেখে নিন
  • ব্যবহারের আগে ভালোভাবে ঝাঁকিয়ে নিন
  • খাদ্যদ্রব্য খোলা অবস্থায় থাকলে স্প্রে করবেন না
  • সরাসরি ব্যবহার্য পোশাকে স্প্রে করবেন না
  • এটি শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন
  • এয়ার ফ্রেশনারের খালি কৌটা দিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল পণ্য তৈরি করে। এ জন্য ব্যবহারের পর বোতল বা কৌটা সরাসরি ফেলে না দিয়ে নষ্ট করে ফেলুন।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৪তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৯।

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top