রাইসিনা হিল 
মোগল ও পাশ্চাত্য স্থাপত্যের অনন্য স্মারক

অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপনা, প্রাচীন নির্মাণশৈলী ও নান্দনিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন তথা রাইসিনা হিল। রাষ্ট্রপতির সরকারি কার্যালয় ও বাসভবন এটি। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন নিয়ে সবারই রয়েছে উৎসাহ, কৌতূহল আর হরেক রকম প্রশ্ন। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হওয়ায় বিশ^ব্যাপী ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। শত-কোটির অধিক জনগণের বসতি, একাধিক ভাষা ও সংস্কৃতির বৃহৎ দেশ ভারত। আর ইতিহাস, সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও চেতনার মূল উৎসভূমি ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন। ঐতিহ্যের এক অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে এ ভবনের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা, যা সারা বিশে^ সমানভাবে সমাদৃত। ভারতীয় রাষ্ট্রপতির বাসভবনটি যেন ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে শত বছর ধরে। আলোচিত রাষ্ট্রপতির এ বাসভবনের ভেতরটা  ব্যয়বহুল। অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর জন্য ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আর এ কারণেই ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন সর্বত্রই হচ্ছে সমান প্রশংসিত।

স্বাধীনতার পরে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ভারতের সংবিধানের ধারক ও বাহকের ভূমিকা পালন করে আসছে এই বিখ্যাত ভবনটি। এর অবস্থান নয়াদিল্লির রাজপথের পশ্চিমে। ভবনটির অন্যদিক ইন্ডিয়া গেট। প্রাসাদতুল্য এ ভবনটি একসময় ব্রিটিশ ভাইসরয়ের কার্যালয় ছিল। ভবনটির প্রধান ডিজাইনার ব্রিটিশ সরকারের স্থপতি এডুইন ল্যান্ডসার লুটিয়েনস।

প্রায় ৪০ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনটি চারতলাবিশিষ্ট। এই ভবনটিতে রয়েছে ৩৪০টি কক্ষ। প্রতি তলায় রয়েছে লাইব্রেরি। রয়েছে ৭৪টি লবি, ১৮টি সিঁড়ি ও ছোট-বড় মোট ১৭টি ঝরনা। ভবনটি নির্মাণ করতে ৭০০ মিলিয়ন ইট ও ৩ মিলিয়ন ঘনফুট পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে দুই মাত্রাবিশিষ্ট বেলেপাথর। সূর্যালোক থেকে সৃষ্ট আলো সরাসরি ভবনে প্রবেশ করতে পারে না। এর প্রতিরোধক হিসেবে জানালার মতো জাফরি পাথরের জালি ব্যবহার করা হয়েছে, যা দিনের বেলায়ও তুলনামূলক অন্ধকার ও শীতল রাখে ভবনের প্রতিটি কক্ষকে। রাষ্ট্রপতি ভবনের বিখ্যাত নির্দশন সাঁচি। সাঁচি হচ্ছে বৌদ্ধদের নির্দেশে নির্মিত বিশাল গম্বুজ। প্রতিটি সাঁচি সমদূরত্বে স্থাপিত। রাষ্ট্রপতি ভবনের এ দৃশ্যমান দীর্ঘ গম্বুজের সারি বিশালতাকে দূর থেকে চেনার ইঙ্গিত বহন করে।

রাষ্ট্রপতি ভবনের সুসজ্জিত দরবার হল, অশোক হল, মার্বেল হল, উত্তর ড্রয়িং রুম, নালন্দা সুইটের মনোরম দৃশ্য দেখে দর্শনার্থীরা সহজেই মুগ্ধ এর সৌন্দর্য আর জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে। ভবনের অভ্যন্তরে ১৩ একর এলাকাজুড়ে রয়েছে ব্রিটিশ শৈলীর একটি মোগল উদ্যান। মোগল উদ্যানটি প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি-মার্চে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। দর্শকেরা সকাল সাড়ে নয়টা থেকে প্রবেশের অনুমতি পেয়ে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত অবস্থান করে এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। সোমবার সাপ্তাহিক বন্ধ। এ ছাড়া অন্য সব দিন দর্শনার্থীদের জন্য নিয়মিত চালু থাকে উদ্যানটি। মাঝে মাঝে বিশেষ দিবসে গণমাধ্যমে জনসাধারণের জন্য উদ্যান পরিদর্শনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। উদ্যানসমূহে প্রবেশ এবং প্রস্থানের জন্য রাষ্ট্রপতির ভবনের ৩৫ নম্বর গেট ব্যবহার করে দর্শনার্থীরা। আর এই ৩৫ নম্বর গেটটি নর্থ অ্যাভিনিউর কাছাকাছি চার্চ রোডের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। ২০০ মিটার ও ১৭৫ মিটার বর্গাকারের এ উদ্যানের পূর্ব ও উত্তর-দক্ষিণে দুটি চলমান চ্যানেল রয়েছে। এই চ্যানেলের ক্রসিংয়ে ছয়টি পদ্ম আকৃতির ঝরনা আছে। এই ঝরনাটি ১২ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত ক্রমবর্ধমানভাবে সক্রিয়, যা দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। ঝরনার শীতল কলকল সুর মন ও শরীরকে মুগ্ধ করে দেয়। পাখির ভোজনের জন্য শস্যদানাভর্তি কাঠের ট্রে উদ্যানের সৌন্দর্যকে দ্বিগুণ করেছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি ভবনে টেনিস কোর্ট, পোলো গ্রাউন্ড, গলফ খেলার স্থান এবং একটি ক্রিকেট মাঠ রয়েছে। ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি বাঙালি সন্তান প্রণব মুখার্জি ঐতিহাসিক এ ভবনটির বর্তমান বাসিন্দা।

ভবনের সুবিশাল ৩৪০টি কক্ষের অন্যতম হচ্ছে ইয়েলো ড্রয়িং রুম। এ রুমেই রাষ্ট্রপতির কাছে মন্ত্রিসভা, স্পিকারসহ সাংবিধানিক মর্যাদাসম্পন্ন পদের ব্যক্তিরা শপথ গ্রহণ করেন। নিচতলায় রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা, রাজ্য ড্রয়িং রুম, রাষ্ট্রীয় বলরুম, রাজ্য ভোজনশালা, ভবনের ভেতরে এবং অন্যান্য কক্ষে অতিরিক্ত বাসস্থানসহ ৫৪টি বেডরুম রয়েছে। ভবনে রয়েছে ১০৪ আসনের বসে খাওয়া-দাওয়া করার বিশেষ রুম। আরও রয়েছে আকর্ষণীয় ঝলমল অশোক হল। এই অশোক হলের মেঝেটি কাঠের তৈরি। এখানে বিদেশি অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো হয়। রাজ্যপ্রধানদের দেখা করার জন্য রয়েছে নর্থ ড্রয়িং রুম। রাষ্ট্রপতি ভবনের অন্যতম আকর্ষণ দরবার হল। একসময় এখানে ছিল সিংহাসন। যেখানে ব্রিটিশ অধিপতিরা বসতেন। বর্তমানে আর সেখানে সিংহাসন নেই। সিংহাসনের স্থানে এসেছে কারুকার্য খচিত চেয়ার। রাষ্ট্রীয় লাইব্রেরি, রাষ্ট্রীয় ড্রয়িং রুম, ব্যক্তিগত বাসস্থান, রাজ্য ভোজনশালা, রাষ্ট্রীয় বলরুম হচ্ছে রাষ্ট্রপতি ভবনের প্রধান প্রান্তভাগ। রাষ্ট্রপতি ভবনের কাছাকাছি রয়েছে বিখ্যাত মেট্রোপলিটন হোটেল, ক্রাউন প্লাজা হোটেল, তাজ প্যালেস হোটেল, শ্রীলঙ্কা নানক কন্টিনেন্টাল ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল দ্য গ্র্যান্ড।

উইকিপিডিয়া

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ভারত সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয় নয়াদিল্লির রাইসিনা হিল তথা রাষ্ট্রপতি ভবন। এই হিলেই অবস্থান ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনের। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, একাধিক অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, সেক্রেটারিয়েট ভবন, ভারতের পার্লামেন্ট, রাজপথ ও ভারত গেটসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও কাঠামোবেষ্টিত। বর্তমানের হাউজিং দিল্লি থেকে একটু দূরে নয়াদিল্লির নতুন এলাকা ভারতের রাষ্ট্রপতির সরকারি কার্যালয় ও বাসভবন, যা এই রাইসিনা হিলেই। স্থানীয়  গ্রামের ৩০০ পরিবারের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে এই হিলটি তৈরি করা হয়েছিল। রাইসিনা হিল গঠন করা হয়েছে ১৮৯৪ সালের ভূমি অধিগ্রহণ আইনের মাধ্যমে। ২২৬ মিটার বা ৭৪১ ফুট ১৮ মিটার বা ৫৯ ফুট এলাকা নিয়ে গঠিত এটি, ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় হাউস হিসেবে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯১১ সালে একটি পরিকল্পনা কমিশন গঠন করে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়। পরিকল্পনা কমিশন ১৯১২ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীশ্বরের জন্য প্রাসাদ তৈরির উদ্যোগ নেয়। আর রাইসিনা হিলেই ভবনটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বর্তমানে দিল্লি থেকে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে নয়াদিল্লির রাইসিনা হিলকে ভারতের নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দিল্লি থেকে যমুনা নদীর সংযোগ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। কারণ, এটি সুনিষ্কাশিত স্থান। সর্বপ্রথম রাইসিনা হিল ১৬০০ সালের শেষে ১৭০০ সালের শুরুর দিকে মহারাজা কর্ণ সিং গঠন করেন। তাঁর ডাকনাম কাদলা রাও। তিনি ছিলেন ওই সময়ের শাসক। ওই সময়ের শাসকদের উপাধি ছিল রাও সিমা। তাঁর নামানুসারেই এই পাহাড়ের নাম রাখা হয়েছিল রাইসিনা হিল। ওই সময় দিল্লি শহরের নামও ছিল রাইসিনা। কিন্তু সময়ের অন্তরালে হারিয়ে গেছে দিল্লির আগের নাম ও ঠিকানা। বর্তমানে এই শহরের মাত্র দুটি স্থানে রাইসিনা হিল ও রাইসিনা রোডের অস্তিত্ব রয়েছে। বাকি সব এখন কেবলই ইতিহাস।

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস থেকে আরও জানা যায়, সম্রাট পঞ্চম জর্জ দিল্লিতে ভারতের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দিল্লিকে রাজধানী শহরের আদলে গড়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সে সময়ের প্রখ্যাত ব্রিটিশ স্থপতি এডুইন ল্যান্ডসার লুটিয়েনসের হাতে। তাঁর হাতেই রাইসিনা হিল হয়ে উঠল এক নতুন নগরী। এ জন্য ব্রিটিশ সরকার অনুমোদন দেয় চার লাখ পাউন্ড। প্রথমে চার বছরের মধ্যে ভবনটি নির্মাণ শেষ হবে বলে মনে করা হলেও এটি নির্মাণে সময় লাগে প্রায় ১৭ বছর। হিন্দু, বৌদ্ধ, মোগল, গ্রিক, রোমান স্থাপত্যে নির্মিত এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন প্রায় ২৯ হাজার শ্রমিক। ব্রিটিশ সরকারের দুই প্রখ্যাত স্থপতি এডুইন ল্যান্ডসার লুটিয়েনস ও হার্বার্ট বেকার একত্র হয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে সমানভাবে কাজ শুরু করে ভাইসরয় হোমের ডিজাইন করলেও বর্তমানে রাষ্ট্রপতি ভবন নামে পরিচিত এই ভবনটি নির্মাণে পরে তাঁরা নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন।

মোগল, ভারতীয় ও পাশ্চাত্য স্থাপত্যশিল্পে নির্মিত এ ভবন ভারতীয়দের অহংকার হলেও রাষ্ট্রপতি এ ভবনেই লুকিয়ে আছে ভারতীয়দের বঞ্চনার হাজারো ইতিহাস। ভবনের দেয়ালের লাল চিহ্ন এখনো মনে করিয়ে দেয় ব্রিটিশদের হাতে ভারতীয়দের নির্যাতন ও বঞ্চনার কথা। এ ভবনটি ভারতের মাটিতে এবং এই অঞ্চলের মানুষের টাকায় নির্মিত হলেও দেয়ালের লাল চিহ্নটির ওপরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না ভারতীয়দের। সেখানে কেবল সাদা চামড়ার মানুষগুলোই যেতে পারতেন। আর তাই লাল চিহ্নের ঠিক ওপরে দেয়ালের রং সাদা। সেখানে কেবল ব্রিটিশরাই যেতে পারতেন। ব্রিটিশ শাসনামলে এ ভবনটি ভাইসরয়ের সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তখন এর নাম ছিল ‘ভাইসরয়’স হাউস’। এরপর স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর সি রাজ গোপাল এটির নামকরণ করেন ‘গভর্নর হাউস’।

ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের গাইড সূত্রে এই রাষ্ট্রপতি ভবনের পরিচিতি ও ইতিহাস বর্ণনার পাশাপাশি ভবনের বিভিন্ন হল, কক্ষ ও স্থানের নামকরণের ব্যাখ্যাও জানা যায়। রাষ্ট্রপতি ভবনে ব্রিটিশরা গার্ডেন তৈরি করলেও কেন মোগল গার্ডেন নাম রাখা হয়েছে তা জানা যায়। মোগলরা যেভাবে বাগান তৈরি করতেন ঠিক সেই ধরন অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে এই বাগান। তাই এর নামকরণ করা হয়েছে মোগল গার্ডেন। অন্য কোনো কারণ নেই। মোগলরা বাড়ির পাশেই বাগান রাখতেন। ভবনের বিভিন্ন কক্ষ এবং স্থান সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায় গাইডের কাছে। কয়েকটি দেয়ালে লাল রং ব্যবহারের কারণেরও বর্ণনা রয়েছে তাঁর ভাষ্যে।

উইকিপিডিয়া

নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের চিত্তাকর্ষক বৈশিষ্ট্য অনন্য নান্দনিক এক নিদর্শন মোগল উদ্যান। রাষ্ট্রপতি ভবনে আকর্ষণীয় বাগান, যা মোগল গার্ডেন নামেই সমধিক পরিচিতি। এই বাগানে রয়েছে ২৫০ রকমের গোলাপ এবং দেশি-বিদেশি হাজারো ফুলের সমাহার। ভবনে রয়েছে জয়পুর কলাম, জয়পুরের মহারাজার কাছ থেকে পাওয়া একটি উপহার, যা রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনের প্রধান ফটকের মাঝখানে ১৪৫ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রাসাদের পাদদেশে বিজয় চক্র হিসেবে পরিচিত একটি প্রশস্ত বর্গক্ষেত্র আছে। নয়াদিল্লির প্রেসিডেন্ট হাউসে যে ব্যাপক বৌদ্ধ তামার গম্বুজ রয়েছে তা এক কিলোমিটার দূরত্ব থেকে দেখা যায়। এই অবিশ্বাস্য গম্বুজের নিচের প্রায় ২২.৮ মিটার ব্যাস পরিমাপের বৃত্তাকার দরবার হলে ভাইসরয়ের সিংহাসন ছিল। ভারতের জাতীয় জাদুঘর সম্পন্ন হওয়ার আগে এই দরবার হলটি কয়েক বছরের জন্য জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ ছাড়া এখানেই ভারতের শ্রেষ্ঠত্বের অর্জুন পুরস্কার প্রদান করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি।

সুদর্শনীয় এই ভবনে নিশ্চিত করা হয়েছে ভারতের রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তার বিষয়টিও। অনিন্দ্য এই ভবনটি যে শুধু ভারতীয়দের জন্যই আকর্ষণীয় তা নয়, এটি বিশে^র অন্যান্য দেশের পর্যটকদেরও সমানভাবে আকৃষ্ট করে। রাইসিনা হিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রাসাদ রাষ্ট্রপতি ভবন। মোগল, ভারতীয় শৈলী, ইউরোপীয় স্থাপত্য, রোমানীয় শৈলীসহ ফারসি স্থাপত্য শৈলী আছে এর গায়ে। রাষ্ট্রপতি ভবন নয়াদিল্লির একটি প্রধান ও অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনা। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানের ভবনের মধ্যে বৃহত্তম বাসভবন, একই সঙ্গে এটি একটি দর্শনীয় স্থানও বটে। ভেতরে ও বাইরে সুশোভিত। আকর্ষণীয় গম্বুজ আকৃতির ছাদ, পানি পাথরের অববাহিকা ও জালি রাষ্ট্রপতি ভবনের স্থাপত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভবনের গম্বুজ রোমান স্থাপত্যে নির্মিত। বলা হয়, এটি বিখ্যাত সাঁচি স্থাপত্যের প্রভাব নির্দেশ করে। রাষ্ট্রপতি ভবনের স্তম্ভ সুশোভিত মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি এই মহান স্মৃতিসৌধের ডিজাইন ভারতীয় শৈলীর উপস্থিতিরই জানান দেয়।

নয়াদিল্লির আশ্চর্যজনক এ সৌধ একটি অসাধারণ সৃষ্টি। এই সুবিশাল প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না কিন্তু অবশ্যই দূর থেকে মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। এই সুন্দর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদটি রাতের আলোকসজ্জায় আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে বিশেষ করে ভারতের স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবসের মতো জাতীয় দিবসে। ২২ ডিসেম্বর ২০১২ সালে রাইসিনা হিল হয়ে ওঠে ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক মিলনস্থল। ২০১২ সালের দিল্লির গণধর্ষণের মামলার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না করার অভিযোগ আনা হয়। এই নগরী নারীদের জন্য সবচেয়ে অনিরাপদের নগরীতে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করে আন্দোলনকারীরা। এ ধরনের দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ২০ হাজার নাগরিক এ হিলে অবস্থান নেয়।

২০১৪ সালের জুলাইয়ে ভারতে ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি রাষ্ট্রপতি ভবনের ভেতরে উদ্বোধন করেন। জাদুঘরে রাষ্ট্রপতি ভবনের শিল্প, স্থাপত্য ও সাবেক রাষ্ট্রপতিদের জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগৃহীত আছে। ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রাসাদ থেকে শুরু করে সর্বশেষ প্রতিভা পাতিল পর্যন্ত সব রাষ্ট্রপতির জীবন সম্পর্কে এখানে তথ্য সংরক্ষণ করা রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি ভবনের অশোক হলের পুনর্নির্মাণকাজ শুরু করা হয় ১৯৮৫ সালে। ভারতের স্থপতি সুনিতা কোহলির নেতৃত্বে এই নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৮৯ সালে। এর সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য পরে সুনিতা কোহলি ও স্থপতি চার্লস কোরিয়ার নেতৃত্বে ২০১০ সালে দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রপতি ভবনের পুনর্নির্মাণ শুরু হয়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৭তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৫

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top