বিশ্বের প্রথম বর্জ্যশূণ্য শহরে

পরিবেশদূষণের অন্যতম কারণ বর্জ্য। বিশেষ করে সমুদ্রের তলদেশে জমা হওয়া প্লাস্টিক বর্জ্যরে কারণে অস্তিত্বসংকটে অসংখ্য জলজ প্রাণী। এমন উদ্বেগের মধ্যে জাপানের একটি বর্জ্যশূণ্য শহর পেয়েছে বর্জ্যমুক্ত বা ‘জিরো ওয়েস্ট’ শহরের তকমা। প্লাস্টিক আসার আগে কখনো কারও চিন্তায় জিরো ওয়েস্ট বিষয়টি আসেনি। প্লাস্টিকের মাধ্যমে ভয়াবহ রকম পরিবেশদূষণ পৃথিবীর অনেক মানুষকে সচেতন করছে। তাঁরা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে চিন্তিত ও শঙ্কিত। প্রচলিত পদ্ধতিতে বর্জ্য পুড়িয়ে, মাটি চাপা দিয়ে কিংবা পানিতে ফেলা এড়িয়ে পুনর্ব্যবহার করার পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াকে ‘জিরো ওয়েস্ট বা বর্জ্যশূণ্য’ বলা হয়। ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে জাপানে প্রথম জিরো ওয়েস্ট কর্মসূচি হাতে নেওয়ার মধ্য দিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত সূচিত হয়েছে সূর্যোদয়ের দেশের কামিকাতসু শহরে।

জিরো ওয়েস্ট আন্দোলন শুরু যেখান থেকে

১৯৮০ সালের দিকে প্রথম হিপ্পিদের নাম শোনা যায়। তারা অনেকটা বন্য জীবনযাপন করতে চাইত। অনেকটা ফিরিয়ে দাও অরণ্য টাইপের। হিপি (বা হিপ্পি) উপসংস্কৃতি ছিল মূলত ১৯৬০-এর দশকের মধ্যবর্তীকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংগঠিত একটি যুব আন্দোলন যা বিশ্বজুড়ে অন্যত্র দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ‘হিপি’ শব্দটি এসেছে ইংরেজি হিপস্টার থেকে। যারা নিউইয়র্ক সিটির গ্রিনিচ গ্রাম আর সান ফ্রান্সিস্কোর হাইট-আশব্যুরে ডিস্ট্রিকে অবস্থান নিত। হিপ এবং হেপ পদের উৎপত্তি অনিশ্চিত, যদিও ১৯৪০-এর দশকে দুটো পদই আফ্রিকান আমেরিকান জাইভ অপশব্দের অংশ।

২০০৮ সালে জিরো ওয়েস্ট আন্দোলন ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা শপথ নিয়েছে পৃথিবীতে ময়লা-আর্বজনা কম ফেলবে। ২০১৬ সালে এসে এটা ভালোভাবে পরিচিতি পেয়েছে। উন্নত দেশের মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক কেজির কাছাকাছি ময়লা-আবর্জনা ফেলে। অনেকে সামষ্টিক হিসেবে আরও বেশিও হতে পারে। জিরো ওয়েস্ট মুভমেন্ট ভয়াবহ রকম পরিবেশদূষণ নিয়ে পৃথিবীর মানুষকে করেছে অনেক সচেতন। তারা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে চিন্তিত ও শঙ্কিত। এই চিন্তা থেকে তারা কেবল প্লাস্টিক যুগের আগে যেভাবে মানুষ চলত, সেই জীবনব্যবস্থায় ফিরে যেতে চাচ্ছে। এ যুগে এ ধরনের কার্যক্রম অত্যন্ত কঠিন। ‘ক্যানসারের জন্য প্লাস্টিক দায়ী’Ñএ ধারণায় অনুপ্রাণিত হয়ে স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিরা প্লাস্টিক বর্জন করে জিরো ওয়েস্টের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ধীরে ধীরে জিরো ওয়েস্ট পার্টির জন্য গড়ে উঠছে বিশেষ মার্কেট, বিশেষ ব্যবস্থা ও কমিউনিটি।

বিশ্বের প্রথম বর্জ্যশূণ্য শহর

সবুজ শ্যামল ধানক্ষেত ও বন-পাহাড়ের কোলঘেঁষে, জাপানের পশ্চিমাঞ্চলের শিকোকু দ্বীপে অবস্থিত, সবচেয়ে ছোট্ট শহরটির নাম কামিকাতসু। শহরটির আয়তন ১০৯ দশমিক ৬৮ বর্গকিলোমিটার। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১৩ জন। তবে গত কয়েক বছর ধরেই জিরো ওয়েস্ট প্রসঙ্গে বিশ্ববাসীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে জাপানের ছোট্ট এই শহরটি। শহরটির বর্জ্য পরিশোধন করে সেসব বস্তু ব্যবহার করা হয় নানা কাজে। কামিকাতসুর জনসংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৫২৯ জন। ২০০৩ সাল থেকে শহরটিতে ময়লা-আবর্জনা পরিশোধনের আন্দোলন শুরু হয়। তখন প্রতিবছর বর্জ্য জমা হতো ৫০০ টন। ২০১৬ সালে তার পরিমাণ নেমে দাঁড়ায় ৩০০ টনে। চলতি বছরের শেষে পুরোপুরি বর্জ্যমুক্ত হতে যাচ্ছে কামিকাতসু।

এই শহরের পথে-ঘাটে কোথাও নেই ময়লা ফেলার জায়গা। এমনকি শহরটিতে নেই কোনো ময়লার গাড়িও। তবুও কোথাও চোখে পড়বে না এক টুকরো ময়লা-আবর্জনা। কারণ, এখানকার বাসিন্দারা নিজেরাই তাঁদের আবর্জনা পরিষ্কার করে নিয়ে আসেন ওয়েস্ট রিসাইকেলিং সেন্টারে। এই সেন্টারে আবর্জনা জমা দিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবর্জনা ধুয়ে শুকিয়েও নিতে হয়।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, জাপানের এই শহরটিতে আবর্জনা সংগ্রহ করার কোনো কর্মীই নেই। শহরের বাসিন্দারা ঘরের ২০ শতাংশ আবর্জনা মাটির নিচে পুঁতে রাখেন আর বাকি ৮০ শতাংশ আবর্জনা নাগরিকেরা নিজ উদ্যোগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে দিয়ে আসেন। সেখানে এসব আবর্জনা ৪৫টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। এরপর সেগুলোকে রিসাইক্লিংয়ের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ময়লা-আবর্জনা পরিশোধিত করে পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। ফলে সেখানে অনেক সেকেন্ডহ্যান্ড শপ গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন বর্জ্য ও আবর্জনা থেকে নানা ধরনের পণ্য বানানো হয়। আর নাগরিকেরাও তা সানন্দে কিনে ব্যবহার করেন।  

কামিকাতসু শহরের ওয়েস্ট কালেকশন সেন্টারে খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন, কার্টন, ফ্লায়ারসহ বিভিন্ন ধরনের হালকা কাগজ-জাতীয় দ্রব্যের জন্য যেমন আছে নির্দিষ্ট ঝুড়ি, তেমনই কঠিন পদার্থ অ্যালুমিনিয়াম, স্প্রে, স্টিল এসবের জন্য আছে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা। এমনকি প্লাস্টিক বোতল ও বোতলের ক্যাপের জন্যও আছে আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট জায়গা। মোট ৪৫টি ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন বর্জ্যকে সাজাতে হয় কামিকাতসুর বাসিন্দাদের। নিঃসন্দেহে এটি বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হতে তাদের বেশ সময়ও লেগেছে। একবার অভ্যাস হওয়ার পর এখন আর তেমন সমস্যা হয় না তাঁদের। ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় সুনির্দিষ্টভাবে আবর্জনা সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা এখন স্বাভাবিকভাবেই হচ্ছে। রিসাইকেলিং সেন্টারের কর্মীরা আবর্জনা সাজানোর প্রক্রিয়াটি দেখাশোনা করে থাকে। সঠিক জায়গায় ঠিকঠাক আবর্জনা যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করেন তাঁরা। প্রতিটি বস্তুকে সাজানোর জন্য আছে নির্দিষ্ট নীতিমালাও। শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা চর্চায় তাঁদের জীবন হয়ে উঠেছে দূষণমুক্ত।

২০০৮ সালের এক জরিপে দেখা যায়, প্রতিটি বস্তু খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হয় বলে শহরটির ৪০ শতাংশ বাসিন্দাই এ পদ্ধতি পছন্দ করতেন না। তবে তাতেও বদলায়নি শহরের আইন। কারণ, বর্জ্য পদার্থ পোড়ানোর জন্য চুল্লি কেনা ও ব্যবহার করার চেয়ে এ পদ্ধতিটি অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। শহরটিতে প্রায় ৮০ শতাংশ বর্জ্য পদার্থই রি-সাইকেল করা হয়।

বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে কামিকাতসু

বর্তমানে জাপানে প্রতিটি ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সবার আগে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়। আর জাপানের সর্টিং সিস্টেমও বর্তমানে ব্যাপকতার দিক দিয়ে সারা বিশ্বে অন্যতম। জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ইয়োকোহামার জনসংখ্যা ৩৭ লাখ। সম্প্রতি সেখানকার বাসিন্দাদের ২৭ পাতার একটি ম্যানুয়াল দেওয়া হয়েছে। নতুন এ নীতিমালায় বিস্তারিত বলা হয়েছে, কীভাবে তাদের নিত্যদিনকার বর্জ্যকে ৫০০টি ভিন্ন ভিন্ন ভাগে ভাগ করতে হবে।

কামিকাতসুর রিসাইকেলিং স্টেশনটিকে রিসাইকেল এক্সচেঞ্জ শপও বলা যায়। শহরের বাসিন্দারা নিয়মিত এখানে এসে তাঁদের অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, পছন্দসই জিনিসপত্র বিনামূল্যে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও পান। রাস্তার শেষ মাথার একটি ফ্যাক্টরিতে স্থানীয় এক নারীর ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করেন। যেমন, পুরোনো কিমোনোর (জাপানি ঐতিহ্যবাহী পোশাক) কাপড় ব্যবহার করে বানানো হয় টেডি বিয়ার। শহরের ৬০ শতাংশ অধিবাসীই নতুন এই পদ্ধতি নিয়ে সন্তুষ্ট। পাশাপাশি ২০২০ সালের মধ্যে জিরো ওয়েস্ট সিটি হওয়ার লক্ষ্য অর্জনেও আশাবাদী তারা। চুল্লি ও ল্যান্ডফিলের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়া আনতে চায় স্থানীয় প্রশাসন। তবে সেটাই যথেষ্ট না। শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার কমানোর প্রচেষ্টা না থাকলে জিরো ওয়েস্ট সিটি হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। শুধু আবর্জনা নিয়ে কাজ করলেই হবে না, আবর্জনার উৎপাদন কীভাবে কমানো যায়, সেটা নিয়েও প্রচুর কাজ করছে কামিকাতসুর প্রশাসন।

প্রচলিত পদ্ধতিতে, ধানক্ষেত ও চুল্লিতে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য পদার্থ পোড়ানো হতো জাপানে। এখন আর সে অবস্থা নেই। কাঠের চপস্টিক, রান্নার তেল ইত্যাদি পাঠানো হয় বিভিন্ন রিসাইকেলিং কোম্পানিতে। এতে স্থানীয় সরকার যেমন লাভবান হয়, তেমনি এসব ব্যবহার করে তৈরি করা হয় কাগজ কিংবা সারের মতো পণ্য। খাদ্য বর্জ্য প্রসেস করার জন্য ব্যবহৃত হয় স্বল্প পরিসরের হোম-কম্পোস্টিং সিস্টেম। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সহায়তায়, কামিকাতসুর ৯৮ শতাংশ বাড়িতেই জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ থাকায়, শহরটিতে কোনো ধরনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল কম্পোস্টিং ব্যবস্থারও প্রয়োজন হয় না। গৃহস্থালি খাদ্যবর্জ্যরে ব্যবস্থাপনাও হয়ে যায় কামিকাতসুর ঘরে ঘরেই।

কামিকাতসুর পথ ধরে

২০১৫ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে নগরায়ণের চেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে বর্জ্য উৎপাদন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে ২০২৫ সাল নাগাদ পৃথিবী পরিণত হবে আরও ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মানুষের আবাসস্থলে। সেখানে একজন মানুষ দৈনিক ৩ পাউন্ড করে বর্জ্য উৎপাদন করলে তা বর্তমান বৈশ্বিক বর্জ্য উৎপাদন-মাত্রা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যাবে। প্রবৃদ্ধির হারে নগরায়ণকে বর্জ্য উৎপাদন পেছনে ফেলেছে বহু আগেই।

বিশ্বব্যাপী কামিকাতসুর দেখানো পথ অনুসরণ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে পরিবেশবান্ধব করতে এখন কাজ করছে বেশ কিছু শহর। ২০১৫ সালে স্যান ডিয়েগো তাদের নগর পরিকল্পনায় জিরো ওয়েস্ট সিটি হওয়ার লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ও ২০৪০ সালের মধ্যে শতভাগ সাফল্য অর্জন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। একইভাবে নিউইয়র্কও আগামী ১৫ বছরের মধ্যে একই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বোস্টনভিত্তিক ওয়েব ম্যাগাজিন সিটি-ল্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলিতে কয়েক লাখ মানুষ আছে। সেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ বর্জ্য রিসাইকেল করা হয়। স্যান ফ্রান্সিসকোতে ৭০ শতাংশ। এ ছাড়া আমেরিকার বেশ কয়েকটি শহরে এ হার ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ইতালিতেও এখন কামিকাতসুতে ব্যবহৃত পদ্ধতি কাজে লাগানো হচ্ছে। এসব নিয়ে মূলত কাজ করে যাচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনগুলো।

এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সিগুলোর প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যেও জিরো ওয়েস্টের কথা জানা যায়, তথ্যানুসারে আমেরিকায় রিসাইকেলিং রেট এখন ৩৪ শতাংশ। ওয়াশিংটন ডিসি শহরে মাত্র ১৬ শতাংশ বর্জ্য    রি-সাইকেল করা হয়। এ সমস্যার পেছনে প্রধান কারণ দুইটি। প্রথমত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাজার দখল করে রাখা কোম্পানিদ্বয়ের সিংহভাগ আয় আসে ল্যান্ডফিল থেকে। তাই, ব্যবসার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো পদ্ধতিতে তারা আগ্রহী নয়। বর্জ্য পদার্থ মাটি চাপা দেওয়ার ব্যবস্থাপনাই ল্যান্ডফিল নামে পরিচিত। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো রাজনীতি। রিপাবলিকানরা মনে করে সমুদ্রের উচ্চতা মোটেও বাড়ছে না। বাড়লেও তাদের কিছু যায়-আসে না। অন্যদিকে বার্নি স্যান্ডার্স বাদে ডেমোক্র্যাট নেতাদের এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। এই দুই কারণে আমেরিকায় জিরো ওয়েস্ট বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

পরিবেশরক্ষায় ৫ আর (5R)

পরিবেশরক্ষার জন্য তিনটি ‘আর’ বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। তা হলো-

১.    রিডিউস (দ্রব্যাদির ব্যবহার কমানো)

২.   রিইউজ (দ্রব্যাদি পুনরায় ব্যবহার করা)

৩.   রি-সাইকেল (দ্রব্যাদি মাটিতে না ফেলে অন্য সামগ্রী তৈরি করা)

তবে সম্প্রতি জিরো ওয়েস্ট মুভমেন্টে যুক্ত হয়েছে আরও দুটি ‘আর’। আর তা হচ্ছে-

১.    রিফিউজ (পরিবেশ নষ্টকারী দ্রব্যাদি ফ্রি দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করা)

২.   রট (অপ্রয়োজনীয় পচনশীল দ্রব্য পচিয়ে কম্পোস্ট তৈরি করে মাটিতে ফেলা)।

প্লাস্টিক যুগের জীবনধারার হাতছানি

জিরো ওয়েস্ট আন্দোলনের অনেকে আছেন, যাঁরা রিইউজেবল প্লাস্টিক ব্যবহার করেন। অনেকে আছেন একদমই প্লাস্টিক ব্যবহার করেন না। তাঁরা আরও কট্টরপন্থী। অনেকে আছেন অর্গানিক ফসল ছাড়া ক্যামিক্যালযুক্ত শস্য, সবজি বা ফল খান না। প্লাস্টিক যুগের আগে যে জীবনধারা ছিল, তা অনেকেই একই জীবনধারা মেনে চলছেন।

  • তাঁরা বাজার থেকে পণ্য কিনতে কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করছেন। তরল দ্রব্যাদির ক্ষেত্রে ব্যবহার করছেন কাচের বোতল।
  • স্যানিটারি সামগ্রী সাবান, টুথপেস্ট, লোশন, শ্যাম্পু নিজেরাই অর্গানিক সামগ্রী দিয়ে তৈরি করে কাচের কন্টেইনারে রাখছেন। বাঁশের তৈরি টুথব্রাশ ব্যবহার করছেন। কাপড়ের তৈরি স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করছেন। নিজে বাসায় সাবান, শ্যাম্পু, লোশন ও টুথপেস্ট তৈরি করার রেসিপি আছে জিরো ওয়েস্ট পার্টির ব্লগ ও ইউটিউবে।
  • তাঁরা রিইউজের মূলনীতি মেনে পুরাতন কাপড় ব্যবহার করছেন। কাপড় ছিঁড়ে গেলেও রিডিউস মূলনীতির জন্য সেলাই করে বারবার পরিধান করছেন। তাঁদের প্রত্যেকের কাপড়, জুতা ও অন্যান্য সামগ্রী এত কম থাকে যে তাঁরা যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে দ্রুত বের হতে পারেন।
  • কম কাপড় ও বিলাসী সামগ্রী না থাকার কারণে তাঁদের রক্ষণাবেক্ষণ সময় কম ব্যয় করতে হয় বলে তাঁরা অনেক সময় পান। ফলে তারা অর্গানিক বাগান করার যথেষ্ঠ সময় পান।
  • তাঁরা পুরোনো ও অল্পসংখ্যক কাপড় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে সরকারি ও বেসরকারি কাজ করে যাচ্ছেন। কাপড় পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে পুনরায় পুরোনো মার্কেটে বিক্রি করে অন্য একটি পুরোনো কাপড় কিনে আনছেন।
  • তাঁরা খুব হিসাব করে বাজার করেন যেন কোনো কিছু অপচয় না হয়। প্লাস্টিকের বদলে তাঁরা ফ্রিজে সবজি কাচের কনটেইনারে বা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে রাখেন। সবজি ও ফল একদম প্রয়োজন না হলে খোসা ছাড়ান না, খোসাসহ তাঁরা রান্না করেন বা খেয়ে ফেলেন। এতে তাঁদের রান্নাঘরে খুব কম বর্জ্য হয়।
  • যাঁদের বাগান আছে, তাঁরা রান্নার বর্জ্য বাগানে কম্পোস্ট বিনে রেখে তাতে কম্পোস্ট করে ফেলেন। যাঁদের বাগান নেই, তাঁরা রান্নাঘরের বর্জ্য ডিপ ফ্রিজে স্টিলের কনটেইনারে জমান, যাতে ঘরের মধ্যে পচে না গিয়ে দুর্গন্ধ না হয়।
  • প্রতিদিন ময়লা ফেলার চেয়ে ফ্রিজে জমিয়ে সাপ্তাহিকভাবে ফেলা কম পরিশ্রমের। তাঁরা তাঁদের ফ্রিজে জমানো ময়লাগুলো সাপ্তাহিকভাবে যেদিন চাষি বাজারে বাজার করতে যান, সেদিন সেখানকার কম্পোস্ট বিনে বা প্রতিবেশীর কম্পোস্ট বিনে ফেলে আসেন।
  • তাঁরা বর্জ্য কমানোর জন্য বড় কাগজ কিনে আগের আমলের মতো খাতা তৈরি করেন। সন্তানদের জন্য পুরোনো ক্যালকুলেটর কেনেন। অর্থাৎ তাঁরা সবই পুরোনো সামগ্রী কিনে রিইউজ ফরমুলা মানছেন।
  • সমস্ত খাদ্যসামগ্রী কাচের জারে সংরক্ষণ করেন।
  • খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী প্যাকেজিংয়ে সাধারণত গড়ে ১৫ শতাংশ টাকা কোম্পানিগুলো খরচ করে। এ টাকাটা সম্পূর্ণভাবে আবর্জনা হিসেবে চলে যায়। জিরো ওয়েস্ট পার্টি মনে করে বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে খামোখা বর্জ্য হিসেবে ১৫ শতাংশ টাকা খরচের কোনো মানেই নেই।

জিরো ওয়েস্ট পার্টি অন্যান্য সাধারণ মানুষ থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ কম টাকায় জীবন ধারণ করতে পারে। এটার জন্য খুব যে কষ্ট করতে হয়, তা কিন্তু নয়। কেবল জীবনযাপনের প্রক্রিয়াটা বদলাতে হবে। এ টাকায় চলার কারণে তাঁদের ধারকর্জ করতে হয় না। তাঁদের বড় একটা সেভিং হয়। যার দ্বারা তাঁরা অন্যদের চেয়ে বেশি পরিমাণে বিদেশ ঘুরতে পারে। পরিবেশবান্ধব সোলার বিদ্যুৎ সিস্টেম কিনে নিজেদের ব্যবহারের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সোলার হতে নিতে পারে। ব্যাটারিচালিত ও সৌরশক্তির চার্জে চালিত পরিবেশবান্ধব উন্নত গাড়ি কিনতে পারে। ইত্যাদি আরও অনেক কাজে তাঁদের সাশ্রয়ের টাকা খরচ করতে পারে। অনেকেই পলিথিন ও অন্যান্য ব্যাগ পুনরায় ব্যবহার করছেন। মানুষ ধীরে ধীরে আরও সচেতন হলে জিরো ওয়েস্ট না পারলেও অন্তত ওয়েস্ট রিডিউসে যাওয়া সম্ভব। এতে পরিবেশ রক্ষা পাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছুটা কর্তব্য পালন করা হবে। এই জিরো ওয়েস্ট পার্টির পঞ্চম স্তম্ভ অনুসরণ করলে একদিকে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা হবে, অন্যদিকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যাবে। এ ছাড়া মিতব্যয়িতা ধর্মীয় কাজেরও গুরুত্বপূর্ণ অনুশাসন।

নগরায়ণ ও শিল্পায়নের আগ্রাসনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিকাশ ও ব্যবস্থাপনায় উৎকর্ষের স্বপ্নদ্রষ্টাদের জন্য জাপানিজ কামিকাতসু শহরটি নিঃসন্দেহে একটি অনুপ্রেরণার নাম। হয়তো একটু একটু করে এভাবেই একদিন অন্য শহরগুলো জিরো ওয়েস্ট প্ল্যানেট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ পাবে বিশ্বময়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২০।

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top