প্রাত্যহিক জীবনে পানির প্রয়োজনীয়তা যে সীমাহীন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুরু হয় পানির ব্যবহার, শেষ হয় ঘুমোতে যাওয়ার আগে। পানির এই প্রাত্যহিক প্রয়োজন মেটাতে কতই না আয়োজন! ভূগর্ভ, নদী, জলাশয়, ঝরনাসহ বিভিন্ন উৎসের পানির পাম্প, পাইপ লাইন ও অন্যান্য ব্যবস্থা আজ আমাদের হাতের নাগালে; একেবারে অন্দর-বাহির সবখানে। এখন আর কুয়া, দূরের নদী বা পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় না, নলকূপ চাপারও ঝামেলা নেই। ওয়াটার ট্যাপ বা পানির কল ঘোরালেই বের হয় অবিরাম পানির ধারা। ভবনের প্লাম্বিং সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ওয়াটার ট্যাপের বহুমুখী প্রসঙ্গই এবারের আয়োজনে।
ওয়াটার ট্যাপ নামেই এ দেশে অধিক পরিচিত এ ফিটিংসটির নামের বৈচিত্র্যও কম নয়। ফসেট (Faucet), স্পিগট (Spigot), সিলকক (Silcock), বিবকক (Bibcock) নামেও রয়েছে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। ওয়াটার ট্যাপ মূলত ভাল্বনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র, যা তরল কিংবা গ্যাসীয় পদার্থ নির্গমন করে। তবে সাধারণত ট্যাপ ব্যবহৃত হয় ভবনের প্লাম্বিং সিস্টেম থেকে পানিকে ব্যবহারের উপযোগী করতে। স্টেলনেইস স্টিল, পিতল, লোহা, তামা ও প্লাস্টিকের ট্যাপ বাজারে পাওয়া যায়। তবে সম্প্রতি এই ফিটিংসে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ক্রেতার রুচি, চাহিদা মেটাতে ও অন্দরের আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলতে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বাহারি ডিজাইন, রং, ফিচার ও প্রযুক্তিসম্পন্ন দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের দারুণ সব ওয়াটার ট্যাপ।
ফিরে দেখা
সভ্যতার শুরু থেকেই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আবিষ্কৃত হয় প্লাম্বিং সিস্টেম। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলেও পানির ধারা আটকে রাখাটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পানির কল আবিষ্কারের মাধ্যমে পানির ধারাকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু আধুনিক ট্যাপ উদ্ভাবনের ইতিহাস যেমন দীর্ঘ, তেমনি আজকের এই রূপ পেতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হয়েছে এ অনুষঙ্গটিকে। ১৭০০ শতাব্দীতে প্লাম্বিং সিস্টেমে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে রোম ও ইতালির বিভিন্ন জায়গায়। সে সময়ে ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাসাবাড়িতে ও দাপ্তরিক কার্যালয়ে পানির সংযোগে ট্যাপ স্থাপন করা হতো।
পুরোনো ট্যাপগুলোতে নরম রাবার অথবা নিউপ্রিন ওয়াশার বেশি ব্যবহৃত হতো। এ ছাড়া পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে একটি স্ক্রু ভাল্বের ওপর বসিয়ে দেওয়া হতো। একে বলা হতো গ্লোব ভাল্ব। এতে ট্যাপ দারুণ লিক-প্রম্নফ ক্ষমতা পেত। আর শাট-অফ নামে একধরনের ব্যয়বহুল ভাল্ব ব্যবহার করা হতো সাধারণত গ্যাস ট্যাপের জন্য। পরে ১৮৪৫ সালে উদ্ভাবিত হয় স্ক্রু-ডাউন ট্যাপ। ধীরে ধীরে গরম ও ঠান্ডা পানির জন্য দুই ভাল্ববিশিষ্ট ট্যাপ উদ্ভাবিত হয়। এই মিক্সার ট্যাপ উদ্ভাবন করেন কানাডিয়ান প্রকৌশলী থমাস ক্যাম্পবেল। তবে এতে থাকে দুটি হাতল। এ সময়ে এই ট্যাপ বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে উন্নত দেশগুলোতে। ১৯৩৭ সালে আল মোয়েন নামের একজন প্রকৌশলী ভুলক্রমে গরম পানির হাতল চেপে তাঁর হাত পুড়িয়ে ফেললে সিদ্ধান্ত নেন এক হাতলবিশিষ্ট পানির ট্যাপ উদ্ভাবনের। প্রথম দিকে এই ডিজাইন গ্রহণে সবার আপত্তি থাকলেও ডিজাইনের উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে যখন একটি ট্যাপেই গরম ঠান্ডা পানি নিয়ন্ত্রণের কৌশলে সবাই অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। ১৯৪৫ সালে বল ভাল্বযুক্ত ট্যাব উদ্ভাবিত হয়। এ ছাড়া সিরামিক ডিস্ক ও উলভারিং ব্রাশ যুক্ত করা হয় পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে।
তবে কিছু সমস্যা থেকেই যায়, যার অন্যতম মরিচা। কারণ, আগে লোহার তৈরি ট্যাপই অধিক প্রচলিত ছিল। যেসব ট্যাপে মরিচা নিরোধক প্রলেপ না থাকত বা কম থাকত, সেগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত। যদিও পরে তামা বা কপার, নিকেল, দস্তা এমনকি মিশ্র ধাতুর ট্যাপ তৈরি করে সমস্যাটির সমাধান করা হয়। এ ছাড়া ওয়াটার ট্যাপের মানোন্নয়নে ও স্থায়িত্ব বাড়াতে শুরু হয় নানা ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার।
ট্যাপের যত যন্ত্রাংশ
- ভাল্ব
- স্পাউট
- কার্টিজ
- ফ্লাঙ্গেস
- স্প্রিং সেট
- স্ক্রু
- মিক্সিং চেম্বার
- ওয়াটার ইনলেটস
- হেড।
কার্যপ্রণালি
ট্যাপের হুইল ঘোরালে বা টানলেই যে পানি বের হয় তার পেছনেও রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশের কার্যোপযোগিতা। যখন ট্যাপ হুইল ঘোরানো হয় তখন ওয়াশারের সঙ্গে যুক্ত স্ক্রুটি ওপরে উঠে আসে। এতে পানির প্রবাহ চালু হয় আবার যখন বিপরীত দিকে ঘোরানো হয় তখন স্ক্রু নিচে নেমে এলে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়। পানি প্রবাহের এই সিস্টেমটি কাজ করে বাতাসের চাপ, গ্রাভিটি ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর। যেখানে পানির গভীরতা যত বেশি বা পাইপের পুরুত্ব যত বেশি, ট্যাপে পানির ধারা তত তীব্র। সূত্রে প্রকাশ করলে যা দাঁড়ায়-
P = ρgh
যেখানে,
P প্রেসার বা চাপ
ρ পানি বা তরলের ঘনত্ব
G গ্রাভিটি
H পানির উচ্চতা
ট্যাপের রকমফের
- বল
- ডিস্ক
- কার্টিজ
- ওয়াইড স্প্রেড
- পুশ-বাটন
- কম্প্রেশন ওয়াশার
- অটোমেটেড।
ব্যবহার হয় যেখানে
- বাথ ফিলার ট্যাপ
- বাথ/শাওয়ার মিক্সার
- বেসিন ট্যাপ ও মিক্সার
- হাই বেসিন মিক্সার
- কিচেন মিক্সার
- ওয়াল মাউট
- পিলার ট্যাপ
- মিক্সার ট্যাপে।
বাহারি রং
- স্টিল
- গোল্ডেন
- কপার/ডিঅক্সিডাইজড হাইফসফরাস কপার
- ব্রোঞ্জ
- ক্রোম (ম্যাট, ব্রাশড বা পলিশড)
- এনামেল (কোটেড কালার)
- ব্রাশ নিকেল
- পলিশ নিকেল
- এন্টিক
- পিউটার
- প্লাটিনাম
- কার্বন স্টিল।
উন্নতমানের ট্যাপের বিশেষত্ব
যেহেতু প্রতিনিয়তই ব্যবহার করতে হয় পানির কল বা ট্যাপ, সেহেতু তা হওয়া চাই গুণগতমানসম্পন্ন ও দীর্ঘস্থায়ী। আধুনিক ওয়াটার ট্যাপের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় উন্নতমানের কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ। বাইরের আবরণের ঔজ্জ্বল্য ধরে রাখার জন্য প্রথমে নিকেল এবং পরে জিংক ক্রোমিয়ামের পাতলা প্রলেপ দিয়ে কোটিং করা হয়। মরিচা প্রতিরোধের জন্য লাগানো হয় এলয় কপার, জিংক ও ক্রোমিয়ামের কোটিংও। এ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটারাইজড মেশিনে ও রোবট দিয়ে সম্পন্ন হয় এর তৈরির প্রক্রিয়া। ফলে ফিটিংসের ডাইমেনশন ও নজেল ছিদ্র হয় নিখুঁত। বিশে^র উন্নত দেশগুলোতে ট্যাপের মান গুরুত্বসহকারে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিশেষ করে গরম পানির জন্য ব্যবহৃত ট্যাপগুলো। এমনকি বিল্ডিং কোডেও অন্তভুর্ক্ত রাখে। ভালো মানের ট্যাপে যেসব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
- পানি মসৃণভাবে পড়ে
- পানির ধারা সাবলীল যা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে না
- লিক প্রম্নফ
- দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যবহার করা যায়
- মরিচারোধী
- ফাটল ধরে না।
ব্র্যান্ডভেদে দরদাম
আমাদের দেশে চীন, মালয়েশিয়া, ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা ওয়াটার ট্যাপ পাওয়া যায়। তবে দেশেও এখন উন্নতমানের ট্যাপ তৈরি হচ্ছে, যা সহজেই মিলবে বাজারে। দেশি ব্র্যান্ডের মধ্যে আরএফএলের শাইন, রয়েল, শরীফ, টাইগার, আরএজেড, রাজ, নূপুর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ব্র্যান্ড, মান, ডিজাইন ও বিক্রয়োত্তর সেবাভেদে দেশি ট্যাপের দাম ৩০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে এবং বিদেশি ট্যাপের দাম পড়বে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে।
প্রয়োজনীয় টিপস
পানির লাইনে জীবাণুর উপস্থিতির কারণে কিছুদিন পরপর ট্যাপ পরিষ্কার করা উচিত। এতে ট্যাপের ঔজ্জ¦ল্য ভাব বজায় থাকে।
ট্যাপ পরিষ্কার করতে নরম কাপড় ও কম পরিষ্কারক রাসায়নিক ব্যবহার করা উচিত। এতে রং নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
দীর্ঘ সময় পর পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুক্ষণ পানি ছেড়ে রাখা দরকার। এতে ব্যাকটেরিয়া দূরীভূত হয়।
সস্তা ও নন-ব্র্যান্ডের ওয়াটার ট্যাপ না কেনাই উত্তম। কারণ, কিছুদিনের মধ্যেই এসব ফিটিংসের রং ও মান নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
বাজারে প্রাপ্ত ওয়াটার ট্যাপে বিভিন্ন মেয়াদের গ্যারান্টি অথবা ওয়ারেন্টি দেয়। পণ্য কেনার আগে বিক্রয়োত্তর সেবার বিষয়টি ভালোমতো জেনে নেওয়া ভালো।
ভালো ও দীর্ঘস্থায়ী সেবা পেতে প্লাম্বিং-ব্যবস্থা ও উপকরণগুলো গুণগতমানের ও দক্ষ মিস্ত্রি দিয়েই কাজটি করানো উত্তম।
যেখানে পাবেন
রাজধানীতে বাথরুম ফিটিংস পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার হাতিরপুল, বাংলামোটর ও গ্রিন রোড (গ্রিন সুপার মার্কেট)। সেখানে বিভিন্ন ডিজাইনের পানির ট্যাপ পাবেন। এ ছাড়া নবাবপুর, বনানী, মিরপুর, উত্তরা, কুড়িল, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা ছাড়াও দেশব্যাপী স্যানিটারীসামগ্রী বিক্রির দোকানে মিলবে এ পণ্যটি। এ ছাড়া অথবা ডট কম সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনলাইনেও এ পণ্যটি বিক্রয় ও সরবরাহ করে থাকে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৭তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৯
সড়ক নির্মাণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ (সপ্তম পর্ব)
ইঞ্জি. মো. হাফিজুর রহমান, পিইঞ্জ.
সব কাজের মান নিয়ন্ত্রণকল্পে ওই কাজে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃতব্য উপাদানসমূহের গুণগত মান যাচাই করা এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। অতএব, সড়ক নির্মাণ এবং নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতকরণার্থে ভৌত কাজ শুরু করার আগেই ব্যবহৃতব্য উপাদানসমূহের গুণাগুণ যাচাই করে নেওয়া অত্যাবশ্যক। এ লক্ষ্যে সিমেন্ট কংক্রিট (সিসি) কিংবা রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট (আরসিসি) রোড নির্মাণের প্রধান উপাদানসমূহ; যেমন-
- রড
- সিমেন্ট
- বালু
- খোঁয়া (ইট/পাথর ভাঙা) ও
- পানি।
প্রতিটি কাঁচামালের গুণগত মান যাচাই করে নিতে হবে। কারণ, এসব মালামালের ফিজিক্যাল আর কেমিক্যাল প্রোপার্টিজের ওপর নির্মিতব্য কংক্রিটের শক্তি ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে। অতএব, কাজ শুরু করার আগেই মালামাল নির্বাচন করা এবং স্যাম্পল কালেকশন করে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে এর গুণাগুণ যাচাই করে নেওয়া জরুরি। উপরোল্লিখিত মালামালের গুণাগুণ যাচাই করার জন্য সাধারণত যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়ে থাকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
রড
রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিটের (আরসিসি) জন্য রড বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান একটি উপদান, যা কংক্রিটের বহন ক্ষমতা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। রড বিভিন্ন গ্রেড বা মানের হয়ে থাকে। ফলে, নির্মিতব্য কংক্রিটের গুরুত্ব ও বহন ক্ষমতা অনুসারে কোন গ্রেডের রড কীভাবে ব্যবহার করা হবে তা নির্ণয় করা হয়, যা নির্ণয়কল্পে নির্ধারিত কিছু নিয়মনীতি আছে সে অনুসারে অভিজ্ঞ কোনো প্রকৌশলী দ্বারা ডিজাইন করা হয়ে থাকে।
উল্লেখ্য, কংক্রিটের বহন ক্ষমতা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে রডের ফিজিক্যাল এবং কেমিক্যাল প্রোপার্টিজসমূহ বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ফলে, যেকোনো রড কাজে ব্যবহারের আগে তার গুণগত মান যাচাই করে নেওয়া অত্যাবশ্যক। রডের ফিজিক্যাল এবং কেমিক্যাল প্রোপার্টিজসমূহ যাচাই করার লক্ষ্যে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তন্মধ্যে সাধারণ কতগুলো টেস্ট রয়েছে:
- রডের ল্যাব টেস্টসমূহ
- বেন্ডিং টেস্ট
- হার্ডনেস টেস্ট
- টেনসাইল স্ট্রেইন্থ টেস্ট
- করোশন রেসিস্ট্যান্ট টেস্ট
- কমপ্রেসিভ স্ট্রেইন্থ টেস্ট
- টরশন টেস্ট
- শেয়ার টেস্ট ইত্যাদি।
সিমেন্ট
যেকোনো ধরনের কংক্রিট তৈরির জন্য সিমেন্ট অন্যতম প্রধান উপাদান, যা বাইন্ডিং ম্যাটেরিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এই সিমেন্টের গুণগত মানের ওপর নির্ভরশীল কংক্রিটের সার্বিক গুণাগুণ। তাই সিমেন্টের ফিজিক্যাল ও কেমিক্যাল উভয় প্রকার মান রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ফলে, সিমেন্ট উৎপাদন পরবর্তী সময়ে কাজে ব্যবহারের পূর্ব পর্যন্ত সঠিকভাবে সংরক্ষণ করাও জরুরি একটি বিষয়। উন্মুক্ত আকাশের নিচে (খোলা আবহাওয়া) কিংবা আর্দ্র স্থানে সিমেন্ট সংরক্ষণ করা উচিত নয়। এ ছাড়া সিমেন্ট সংরক্ষণ করার সময় সরাসরি ফ্লোরের ওপর সিমেন্ট রাখাও ঠিক নয়।
ফ্লোরের ওপর ৬” উঁচু মাচা তৈরি করে তার ওপর স্টিলের প্লেইন শিট বিছিয়ে সিমেন্ট স্টোরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হয়। এ ছাড়া, চারপাশের দেয়াল থেকে ৬” ফাঁকা রেখে সিমেন্টের বস্তার স্তূপ দেওয়া জরুরি। কোনো অবস্থাতেই এক মাসের অধিক সময় সিমেন্ট গুদামজাত করে রাখা উচিত নয়। সর্বোপরি, কাজে ব্যবহারের আগে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে সিমেন্টের গুণগত মান যাচাই করে নেওয়া অত্যাবশ্যক। এ লক্ষ্যে, কিছু টেস্টের নাম এবং টেস্ট করার পদ্ধতি বর্ণিত হলো-
সিমেন্টের ল্যাব টেস্টসমূহ
- ফাইননেস টেস্ট
- সেটিং টাইম টেস্ট (ইনিশিয়াল অ্যান্ড ফাইনাল)
- সাউন্ডনেস টেস্ট
- কেমিক্যাল কম্পোজিশন টেস্ট
- স্ট্রেইন্থ টেস্ট (কম্প্রেসিভ অ্যান্ড টেনসাইল) ইত্যাদি।
বালু
যেকোনো কংক্রিট তৈরির জন্য সিমেন্ট, বালি ও খোঁয়া তিনটি মূল উপাদান। কংক্রিটের এই তিনটি উপাদানকে এগ্রিগেট বলা হয়। অত্র এগ্রিগেটকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা:
- ফাইন এগ্রিগেট (সিমেন্ট ও বালি) এবং
- কোর্স এগ্রিগেট (খোঁয়া)।
এই বালুর আবার নানা প্রকারভেদ আছে। যেমন-
- ফাইন
- মিডিয়াম ও
- কোর্স।
এসব বালুর গুণাগুণ বিশ্লেষণে এর ফিজিক্যাল ও কেমিক্যাল প্রোপার্টিজসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়ে থাকে।
সব ধরনের বালুই সাধারণত মোটা-চিকন বিভিন্ন সাইজের দানাবিশিষ্ট হয়ে থাকে। ব্যবহৃত বালুর দানার সাইজের ওপর কংক্রিটের জমাটবাঁধা এবং শক্তি ও স্থায়িত্ব অনেকাংশেই নির্ভরশীল। বালুর মধ্যে কাদামাটি কিংবা লবণ থাকতে পারে, যা কংক্রিটের শক্তি বৃদ্ধিতে অন্তরায় সৃষ্টি করে। ফলে, যেকোনো কংক্রিট তৈরির আগে ব্যবহৃতব্য বালুর স্যাম্পল কালেকশন করে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে এর গুণগত মান নির্ণয় করার লক্ষ্যে যে টেস্টসমূহ করা হয়-
- বালুর ল্যাব টেস্টসমূহ
- ফাইননেস মডুলাস (এফ.এম.) টেস্ট
- সিল্ট কনটেন্ট টেস্ট
- স্যালাইনিটি টেস্ট ইত্যাদি।
খোঁয়া (কোর্স এগ্রিগেট)
খোঁয়া কংক্রিটের আর একটি প্রধান উপাদান, যা কংক্রিটের আয়তন ও শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই খোঁয়া ইট কিংবা পাথর দুই ধরনের মালামাল ভেঙে তৈরি করা হয়। কংক্রিটের ব্যবহার এবং কাঙ্ক্ষিত শক্তি ও গুরুত্ব অনুসারে ইট কিংবা পাথরের খোঁয়া ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফলে, যেকোনো কংক্রিট তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহৃতব্য ইট কিংবা পাথর থেকে যেসব খোঁয়া পাওয়া যায়, তার গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, খোঁয়ার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য ইট কিংবা পাথরের গুণাগুণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে কাঙ্ক্ষিত মানসম্পন্ন খোঁয়া পেতে সহজ হয়। ম্যানুয়াল কিংবা মেকানিক্যাল উভয় পদ্ধতিতেই ইট কিংবা পাথর ভেঙে খোঁয়া তৈরি করা হয়ে থাকে। কাজের গুরুত্ব ও ধরন অনুসারে বিভিন্ন সাইজের খোঁয়া ব্যবহার করা হয়। কংক্রিটের কাঙ্ক্ষিত শক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মিক্স ডিজাইন করে খোঁয়ার সাইজ এবং মিশ্রণের অনুপাত নির্ণয় করা হয়।
এ ছাড়া, কংক্রিট তৈরির ক্ষেত্রে খোঁয়ার ফিজিক্যাল এবং কেমিক্যাল কম্পোজিশন একটি মুখ্য বিষয়, যার ওপর নির্ভর করে কংক্রিটের শক্তি ও স্থায়িত্ব। ফলে, নির্মাণকাজে ব্যবহারের আগেই ব্যবহৃতব্য খোঁয়ার স্যাম্পল কালেকশন করে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে এর গুণগত মান নির্ণয় করা হয়ে থাকে।
- খোঁয়া (কোর্স এগ্রিগেট) এর ল্যাব টেস্টসমূহ
- ক্রাশিং টেস্ট
- এব্রেশন টেস্ট
- গ্রেডিং টেস্ট
- ইমপেক্ট টেস্ট
- সাউন্ডনেস টেস্ট ইত্যাদি।
পানি
যেকোনো প্রকার কংক্রিট তৈরিতে পানির ভূমিকা অনন্য। জীব কিংবা উদ্ভিদের জন্য পানির অপর নাম যেমন জীবন, তেমনি কংক্রিটের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই, মানুষের জীবনে পানি ব্যবহারে যেমন সতর্কতা অবলম্বন করা হয়, কংক্রিট তৈরি করতে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তদ্রুপ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, পানির গুণাগুণ বিশ্লেষণে মানুষের খাওয়ার উপযোগী পানিই কংক্রিট তৈরির জন্য উপযোগী বলে বিবেচিত।
প্রসঙ্গত, পানি ও সিমেন্টের ফিজিক্যাল এবং কেমিক্যাল কম্পেজিশনগুলো একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। ফলে, কংক্রিটের জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ স্থায়িত্ব অনেকাংশেই পানির গুণগত মানের ওপর নির্ভরশীল। অতএব কংক্রিট মেশানোর কিংবা কিউরিং করার জন্য ব্যবহৃতব্য পানি ব্যবহারের আগে ল্যাব টেস্ট করে নেওয়া জরুরি। কারণ, কংক্রিটের জন্য ক্ষতিকারক নানা ধরনের পদার্থ পানিতে বিদ্যমান, যেমন-
- ওয়েল
- অ্যাসিড
- এলকালি
- সল্ট
- সুগার ইত্যাদি।
উপরোল্লিখিত পদার্থগুলো কংক্রিট এবং কংক্রিটের মধ্যস্থ স্টিল উভয়ের জন্যই বিশেষ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কাজের কোয়ালিটি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিষয়গুলো অবহেলা করা উচিত নয়। আশার বিষয় যে, বর্তমানে আমাদের দেশে কোয়ালিটি কালচার নিয়ে কিছুটা সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এখন সর্বস্তরের মানুষের মাইন্ডসেট দরকার। সর্বশেষ, কংক্রিট মেশানোর জন্য পানির মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপশি পরিমাণ (সিমেন্ট ও পানির অনুপাত) নিয়ন্ত্রণ করাও একটি মুখ্য বিষয়।
(চলবে)
ডিজিএম (কিউএ অ্যান্ড এমআর)
দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.
ক্যাপশন:
রড ও রড টেস্টের কিছু নমুনা
বালি ও বালি টেস্টের কিছু নমুনা
খোঁয়া (কোর্স এগ্রিগেট) ও খোঁয়া টেস্টের কিছু নমুনা
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৭তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৯