গবেষণাগারে কংক্রিট বারের ফাটল পরীক্ষা ও সেন্সিং স্কিনে দৃশ্যমান কংক্রিট ফাটলের নানা প্যারামিটার (উপর থেকে)

ভবনের ফাটল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি সেন্সিং স্কিন

অত্যন্ত নিরেট ও শক্তিশালী নির্মাণ উপকরণ হওয়ায় বিশ্বের অধিকাংশ স্থাপনা নির্মাণের প্রধান অবলম্বন কংক্রিট। কিন্তু উপকরণটি শক্তিমাত্রায় অনন্য হলেও এর রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতাও। যাকে তুলনা করা যায় চাঁদের কলঙ্কের সঙ্গে! উঁচু-নিচু গর্ত যেমন চাঁদের কলঙ্ক, তেমনি কংক্রিটের কলঙ্ক ফাটল। নির্মাণত্রুটি, মানহীন সিমেন্ট, মর্টারের ভুল অনুপাত, ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে কংক্রিটে ফাটল ধরতে পারে। এই ফাটল ভবনের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক। বিশেষ করে কলাম ও বিমের ফাটল। তবে অনেক স্থাপনার জটিল গঠনের কারণে অনেক সময় সাধারণ ও সূক্ষ্ন ফাটল সহজে চোখে পড়ে না। ধীরে ধীরে এই ফাটল আকারে বড় হয়ে স্থাপনার জন্য মারাত্মক পরিণাম বয়ে আনে; ঘটায় ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, উড়ালসড়ক, সেতু, কালভার্ট প্রভৃতি অবকাঠামোতে দুর্ঘটনা ঘটলে ধ্বংসযজ্ঞ যেমন বেশি হয়, তেমনি জীবনহানির ঘটনাও ঘটে বেশি। অথচ শুরুতেই যদি ফাটল শনাক্ত করা যায়, অর্থাৎ ফাটল দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি তা চিহ্নিত করা যায়, তবে তার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমূহ দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। আর এমনই এক ফাটল শনাক্তকারী প্রযুক্তি সেন্সিং স্কিন, যার মাধ্যমে অবকাঠামোর ফাটল ও কংক্রিটের ক্ষতিগ্রস্ত স্থান শনাক্ত করা যায় সহজেই।

নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটি (North Carolina State University) এবং দ্য ইউনিভার্সিটি অব ইস্টার্ন ফিনল্যান্ডের (The University of Eastern Finland) একদল গবেষকের যৌথ আবিষ্কার এই প্রযুক্তি। দীর্ঘ গবেষণায় তাঁরা প্রযুক্তিটি উন্নয়নে সফল হন। যদিও কংক্রিট ফাটল সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে গবেষণা। ইতিপূর্বে গবেষণায় কিছু সাফল্য এলেও আবিষ্কৃত প্রযুক্তি ও পদ্ধতিগুলো ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল প্রকৃতির। তা ছাড়া এটির ছিল কিছু সীমাবদ্ধতাও। প্রযুক্তিতে শুধু ফাটল হয়েছে কি না তা জানা সম্ভব ছিল কিন্তু তার পরিমাপ, ধরন ও বিপদের মাত্রা প্রকাশ করা যেত না। কিন্তু আধুনিক এই সেন্সিং স্কিন প্রযুক্তিতে ফাটলের পরিমাণসহ আনুষঙ্গিক নানা তথ্য জানা যায়। কারণ, এই স্কিনে জুড়ে দেওয়া হয়েছে নিরবচ্ছিন্ন মনিটরিং সিস্টেম। এই প্রযুক্তিটি ফাটল চিহ্নিত করবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে সিগন্যাল দেবে অবকাঠামোতে কোনো ফাটল আছে কি না, তা সে যত সুরক্ষিতই হোক না কেন।

সেন্সর প্রসেসর, পলিমার লেয়ার ও কংক্রিট ফাটল (উপরে বা থেকে)

সেন্সিং স্কিন একধরনের অনুভূতিশীল ত্বক মনে হলেও আসলে তা পাতলা আবরণবিশিষ্ট কপার কেব্ল, যার মাধ্যমে প্রবাহিত হয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। এই কপার বিশেষ ধরনের পেইন্টের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়, যার কেন্দ্রে থাকে বিশেষ ধরনের সেন্সর ডিভাইস। এটা কনডাক্টিভ সারফেস সেন্সর (Conductive Surface Sensor) নামেও পরিচিত। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে অবকাঠামোর ওপরে রাখা একটি প্যারামিটারের চারদিকে ইলেকট্রোড ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপরে ইলেকট্রোডের ওপরে সেন্সিং স্কিনের পাতলা আবরণ বা প্রলেপ দেওয়া হয়। এরপর কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে ইলেকট্রোডের মধ্যে সামান্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এতে সব সময় বিদ্যুতের দুটি ইলেকট্রোড প্রবাহিত হয় এবং তা একটি কম্পিউটারে মনিটরে রেকর্ড করা হয়। সেন্সরটি অবকাঠামোর মধ্যে কোথাও ফাটলের অস্তিত্ব পেলে তা ক্যালকুলেশনের মাধ্যমে তার বিস্তারিত কম্পিউটার মনিটরে প্রদর্শন করে। প্রদর্শিত এসব তথ্য সেন্সিং স্কিনের স্থানিক বিতরণ তড়িৎ পরিবাহিতা নিরূপণ করতে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। যদি ত্বকের পরিবাহিতা হ্রাস পায়, তাহলে এর মানে হলো ফাটল ধরেছে বা অন্যভাবে স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২০০৯ সালে আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স (ASCE) দেশটির সামগ্রিক অবকাঠামোর কোয়ালিটি ও সার্বিক অবস্থা যাচাইয়ে একটি সমীক্ষা চালায়। যদিও তা দেশটির অবকাঠামোর সামগ্রিক অবস্থা ও উন্নয়নের রুটিনমাফিক রক্ষণাবেক্ষণ কাজ। কিন্তু বিশাল এ দেশটির লাখ লাখ অবকাঠামো সম্পর্কে নিয়মিত তত্ত¡াবধান অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল বিষয়। এ জন্য তারা চেয়েছিল এমন কোনো প্রযুক্তি যদি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোতে স্থাপন করা যায় তাহলে সময়, ব্যয়, শ্রমÑ সবকিছুই বাঁচবে। সেন্সিং স্কিনের এই প্রযুক্তি তাদের প্রত্যাশার উপযুক্ত উদ্ভাবন। দেশটির কর্তৃপক্ষ চাইছে এই প্রযুক্তির আরও ব্যাপকতর গবেষণা ও উন্নয়ন। এটি করা সম্ভব হলে সেতু, বাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উড়ালসড়ক, টানেলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কোনো ঝামেলা ছাড়াই নিরবচ্ছিন্ন ফাটল মনিটরিং করা সম্ভব।

সেন্সিং স্কিনে দৃশ্যমান কংক্রিট ফাটলের পর্যায়ক্রমিক চিত্র

HYPERLINK “http://newsoffice.mit.edu/2011/concrete-sensing-cracks-0701” \l “share-choices” গবেষকেরা প্রযুক্তিটিকে কার্যকরী রূপ দিতে এবং সর্বসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করতে ব্যবহার করেছেন সহজ কিছু উপকরণ। যেমন, কপার কয়েল, সিলিকন, ফেব্রিক ইত্যাদি। এ ছাড়া কোটিংয়ের মধ্যে কার্বন ন্যানোটিউব বেজড ফিল্ম মেশানো হয়েছে, যাতে সূক্ষ¥ ফাটল সম্পর্কেও জানা যায়। আর সেন্সর তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে কনভেনশনাল ফাইবার অপটিক, যা একে নমনীয় রাখে। গবেষকেরা অবকাঠামোর ধরনের ওপর ভিত্তি করে সেন্সর স্কিনের কয়েকটি গ্রেডিং করেছেন। যেমন, ভবন হলে এ, সেতু হলে বি, বড় কারখানা হলে সি ইত্যাদি। গবেষকেরা চাইছেন এই প্রযুক্তির সঙ্গে জীবন্ত নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি যুক্ত করতে। তাহলে ভবনে কোনো ধরনের ফাটল বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেরামত করা যাবে।

গবেষণাগারে কংক্রিট বারের ফাটল পরীক্ষা ও সেন্সিং স্কিনে দৃশ্যমান কংক্রিট ফাটলের নানা প্যারামিটার (উপর থেকে)

সেন্সিং স্কিন আধুনিক প্রকৌশল ও প্রযুক্তির যুগান্তকারী এক আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের ফলে কংক্রিটের ফাটল দেখা দিলেও সঙ্গে সঙ্গে তা চিহ্নিত করে মেরামতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে। ফলে কমবে ঝুঁকি, হ্রাস পাবে দুর্ঘটনা। যদিও প্রযুক্তিটির উন্নয়নে ব্যাপক গবেষণা অব্যাহত রয়েছে এবং তা আলোর মুখ দেখলে নিশ্চিত হবে নিরাপদ অবকাঠামোয় মানুষের অবস্থান।

সুবীর কুমার সাহা

প্রকাশকাল: বন্ধন ৭৩ তম সংখ্যা, মে ২০১৬

Related Posts

গরমে ঘর ঠান্ডা রাখার উপায়

আমাদের প্রত্যাহিক জীবনে আবহাওয়া ও পরিবেশ নানাভাবে ছাপ রাখে। পরিবেশ পরিস্থির সঙ্গে তাল মিলিয়েই প্রতিনিয়ত চলতে হয় আমাদের।…

বিস্ময়কর যন্ত্র ক্রেন

আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির পেছনে যেমন রয়েছে মানুষের দূরদর্শিতা, তেমনি রয়েছে বিস্ময়কর নানা যন্ত্রের ব্যবহার। স্থাপনা নির্মাণে ভারী ভারী…

সড়ক নির্মাণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ (দশম পর্ব)

সড়ক নির্মাণকাজে সার্বিক মান নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন প্রকার সড়ক নির্মাণ কল্পে সড়কসমূহের প্রকারভেদ, প্রয়োজনীয় মালামাল, যন্ত্রপাতি এবং কাজের পদ্ধতিসংক্রান্ত…

ফ্লাইং উইন্ডমিল

শক্তির নবতর সম্ভাবনা মহাবিশ্ব অসীম এক শক্তির আধার, এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমাদের গ্রহে শক্তির…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq