Image

নির্মাণশিল্পে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ (পর্ব-১)

অবকাঠামো নির্মাণে সংশ্লিষ্ট সব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। নির্মাণশিল্পে পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রকল্পগুলো যথাসময়ে সম্পাদন করা অন্যতম একটি বিষয়, যা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকার কোনো বিকল্প নেই। পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষা করে সময়মতো নিরাপদভাবে সব কাজ সম্পাদন করার ক্ষেত্রে অন্তরায় এবং করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করাই আজকের মূল উদ্দেশ্য।

একটি নির্মাণ প্রকল্পে নিয়োজিত শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়িয়ে চলা এবং পারিপাশ্বিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং প্রতিকারের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একটি নির্মাণ প্রকল্পে প্রত্যক্ষভাবে দুটি পক্ষ কাজ করে থাকে, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষ। এই দুই পক্ষের সুষ্ঠু সমন্বয়, সার্বিক প্রচেষ্টা এবং আন্তরিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রকল্পের প্রতিটি কাজ সুষ্ঠুভাবে সুসম্পাদিত হয়ে থাকে, এখানে কারও কোনো অবহেলা করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পে অন্যান্য শিল্পের তুলনায় দুর্ঘটনাজনিত হতাহতের তুলনামূলক হার অনেক বেশি। বিভিন্ন সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায় বছরে প্রতি ১ লাখে মৃতের সংখ্যা প্রায় ১০ জন। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত আহত হওয়ার সংখ্যা তো আছেই। ফলে, নির্মাণশিল্পে পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়িয়ে চলা এবং পরিবেশরক্ষায় প্রকল্পসমূহে দুর্ঘটনা ঘটার কারণগুলো অনুসন্ধান করা, প্রতিরোধ/প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি। তাই দুর্ঘটনা ঘটার অন্যতম কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো। যেমন-

ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নির্মাণ শ্রমিক
  • দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া
  • এ বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান, দূরদর্শিতা এবং ব্যবস্থাপনার অভাব
  • কর্তৃপক্ষের অসাবধানতা
  • কর্মরত শ্রমিক ও কর্মচারীদের সচেতনতা এবং মোটিভেশন না থাকা
  • পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি না থাকা
  • কাজের জন্য অতিরিক্ত চাপ প্রদান ও অতিরিক্ত কাজ করানো
  • সেইফটি-বিষয়ক রুলস রেগুলেশন মেনে না চলা ইত্যাদি

মনে রাখা দরকার, নির্মাণশিল্পের প্রতিটি কাজের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি আছে, আছে বিধিবিধানসমূহ, যা মেনে চলা জরুরি। ফলে একটি প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্ল্যানিং স্টেজেই বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একটি ইমারত নির্মাণ প্রকল্পের কথাই যদি ধরি, তাহলে সেখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত যে বিষয়গুলো আসে, তা নিচে তুলে ধরা হলো, যার প্রতিটি কাজ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু একটি কর্মপরিকল্পনা থাকা জরুরি। অন্যথায়, প্রকল্পসমূহ সময়মতো সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে নানাবিধ অন্তরায় সৃষ্টি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে করণীয়-

  • প্রকল্প এলাকায় নিরাপত্তাবেষ্টনী স্থাপন করা
  • ভালো মানের যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রীর ব্যবস্থা রাখা
  • অভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগ দেওয়া এবং পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশরক্ষার ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেওয়া
  • নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়িয়ে চলার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং সাজসরঞ্জাম জোগান দেওয়া
  • প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ওষুধপত্র এবং যন্ত্রপাতি কর্মস্থলে মজুত রাখা
  • আশপাশের পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা
  • কর্মস্থল সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা
  • পয়োনিষ্কাশন এবং স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা
  • স্বাস্থ্যসম্মত আবাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা
  • সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা
  • প্রকল্প এলাকায় নির্বিঘ্নে চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা
  • ইমারতের বাইরের অংশে কাজ করার জন্য সেইফটি নেটের ব্যবস্থা থাকা
  • নির্মাণকর্মীদের জন্য পিপিই যেমন: সেইফটি বেল্ট, সেইফটি হেলমেট, সেইফটি শু, হ্যান্ডগøাভস মজুত থাকা
  • টেকসই ও মজবুত শাটারিং এবং স্ক্যাফোল্ডিং মালামাল থাকা নিশ্চিত করা
  • ত্রুটিমুক্ত হোয়েস্ট মেশিন, ওয়ার্কিং লিফট এবং অন্যান্য মেশিনপত্র থাকা
  • অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নিশ্চিত করা
  • আপৎকালীন দ্রæত নির্গমনের রাস্তার নির্দেশনা থাকা
  • কর্মীদের জন্য কাজের শেষে বিশ্রাম ও বিনোদনের ব্যবস্থা
  • শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তানির্বিশেষে সবার জন্য নিয়মিত ট্রেনিং এবং মোটিভেশনের ব্যবস্থা ইত্যাদি

সর্বোপরি, প্রতিটি কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা নিয়মিত তদারক করার জন্য একটি চেক লিস্ট থাকা প্রয়োজন।

নির্মাণ সাইটে প্রাথমিক চিকিৎসাজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির সম্পৃক্ততা জরুরী

এ ছাড়া, ফাউন্ডেশনের মাটি কাটার কাজে শোর প্রটেকশনের ব্যবস্থা থাকা এবং সুপার স্ট্রাকচারের বহির্দেয়ালে কাজের সময় সেইফটি নেট ব্যবহারের পাশাপাশি উন্মুক্ত স্থানে মেটালিক ট্রে নির্মাণ করা জরুরি। সেই সঙ্গে কোনো দুর্ঘটনা যাতে না ঘটতে পারে, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এরপরও কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা দরকার। ‘সেইফটি ফার্স্ট’ এই কথাটি সবার মনে রাখা জরুরি।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান, পিইঞ্জ, লাইফ ফেলো: আইইবি; লাইফ মেম্বর: বিএএস, বিএসটিকিউএম, এওটিএস (জাপান), এক্স-এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (সার্ভিসেস), এডিটিএল

প্রকাশকাল: বন্ধন ১৬৬ তম সংখ্যা, জুন ২০২৪

Related Posts

হাতে তৈরি পাঁচটি আইকনিক চারু ও কারি শিল্পের বাড়ি

চারু ও কারু শিল্পের আন্দোলন শিল্পবিপ্লবের যান্ত্রিকতার বিপরীতে মানুষের হাতে তৈরি নকশা, স্থানীয় উপকরণ এবং সরল সৌন্দর্যের ওপর…

মন্ট্রিলে বাড়ি বানাতে যত জটিলতা

মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে জীবনের বৈচিত্রতা। মানুষের জন্য আবাসন বাড়ছে, বাড়ছে আবাসনেরও জটিলতা। কোথায় বানাবেন বাড়ি? প্রতিবেশির বাড়ির সাথে…

হাটসন ভ্যালি শেক্সপিয়ারের স্থায়ী থিয়েটার মঞ্চ

যুক্তরাষ্ট্রের হাটসন ভ্যালি শেক্সপিয়ার একটি নামিদামি থিয়েটার কোম্পানী। দীর্ঘদিন তারা মুক্তমঞ্চে নাটক প্রদর্শনী করে আসছিলো। এটি স্যামুয়েল এইচ.…

সীমাবদ্ধতা যখন স্থাপত্যের শক্তি হয় তখনও মিলে পুরস্কার

স্থপতিদের গুণের শেষ নেই, মননশীলতারও শেষ নেই। তারা অসম্ভবকে সম্ভব এবং সম্ভাবনাময় করে তুলতে পারে চিন্তা ও কর্মে।…

ByBySarwar Alam Apr 23, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Zabun Nesa Mosq.
BRAC
Oberio Palace
Soil
“যত মানুষ ফুটবলের ভক্ত, তত মানুষ স্থাপত্য নিয়েও আগ্রহী হোক”
হাতে তৈরি পাঁচটি আইকনিক চারু ও কারি শিল্পের বাড়ি
RIAS ২০২৬ সালের বার্ষিক পুরস্কারের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা
গাছকে জড়িয়ে গড়া আমার ঠিকানা
শহরের শরীরে খোদাই করা এক গৃহকাব্য