নির্মাণের একাল সেকাল

মানুষের আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নতুন কিছু নয়, বরং বহুকাল আগের। ব্যাবিলনের টাওয়ার অব বাবেলের সঙ্গে বর্তমানের আরব আমিরাতের বুর্জ খলিফার মধ্যে অনেক পার্থক্য চোখে পড়লেও একটা সাধারণ মিল হচ্ছে মানুষের ওপরে ওঠার প্রবল ইচ্ছা। হাজার হাজার বছর ধরে আমরা এই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কত রকম চেষ্টাই-না করেছি। টাওয়ার অব বাবেল অথবা চার হাজার বছর আগের ১৪৫ মিটার উঁচু পিরামিডের পর সর্বশেষ প্রায় ৮৩০ মিটার বা ২ হাজার ৭২২ ফুট উচ্চতার আজকের বুর্জ খলিফা তৈরি করেই আমরা হাত-পা গুটিয়ে বসে নেই। শুরু করেছি জেদ্দার কিংডম টাওয়ার। যদিও ইচ্ছা ছিল এক মাইল অর্থাৎ ১ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছানোর, কিন্তু বিভিন্ন কারণে ১ হাজার মিটারেই আপাতত থামতে হচ্ছে।

হাজার বছর আগের অনেক উঁচু উঁচু স্থাপনার যেসব নিদর্শন পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের বসবাসের জন্য কিংবা অর্থনৈতিক কোনো কারণে ছিল না। এসব তৈরি হয়েছিল বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। লাখো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে। নির্মাণকাজে তখন হাতি, ঘোড়া আর মানুষের কায়িক শ্রমই ছিল একমাত্র ভরসা। সে সময় যেহেতু যন্ত্র বা প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের জ্ঞানের বাইরে ছিল, তাই এই প্রাণ বিসর্জন ছিল অনেকটাই অনিবার্য বিষয়। আর এই বিসর্জন তো আর সাধারণ মানুষের জন্য হতে পারে না! অবশ্যই তারা ছিল সমাজের উঁচুতলার মানুষ, ধর্মীয় নেতা, দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা। তাঁদের ইচ্ছা, সামাজিক অবস্থান ও ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য তৈরি হয়েছিল এসব। অবশ্য এখন প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তাও অনেক পাল্টেছে। বর্তমানের সর্বোচ্চ স্থাপনা বুর্জ খলিফা বিশেষ কোনো ব্যক্তির বা হাতে গোনা কয়েকজনের প্রয়োজন অথবা ইচ্ছাপূরণের জন্য তৈরি হয়নি। এর পেছনে যেমন আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন আছে, তেমনি রয়েছে অর্থনৈতিক কারণ। ফলে এটা সাধারণের জন্য উন্মুক্ত।

বর্তমানে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত এ রকম কিলোমিটার উচ্চতার শত তলাবিশিষ্ট অনেক ভবন তৈরি হলেও এই তো প্রায় পৌনে দুই শ বছর আগেও সাধারণ মানুষ উঁচু ভবন বলতে পাঁচ কিংবা ছয়তলা পর্যন্তই চিন্তা করত। কারণ, নিত্যদিন এর বেশি কয়েকবার ওঠানামা করা সাধারণ কাজ ছিল না। মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছয়তলা পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করা সহজ কাজ নয়। তাই বাড়ি বা জমির মালিকেরা এর বেশি উঁচু বাড়ি বানাতে আগ্রহী ছিলেন না। এ কারণে  সে সময় বহুতল ভবন বা স্কাইক্র্যাপার্স (Skyscrapers) বলতে ৫০ কিংবা ৬০ ফুট উচ্চতার ভবনকেই বোঝানো হতো (যদিও কারও মতে, এই উচ্চতা ১০০ ফুট পর্যন্ত ছিল, যদিও বিতর্ক আছে এ নিয়ে)। কিন্তু ১৯৫২ সালে যখন ‘এলিশা গ্রেভস ওটিস’ ওপরে ওঠানামা করার জন্য নিরাপদ লিফট বা এলিভেটর তৈরি করল, তখন বহুতল বা উঁচু ভবনের একটা বিরাট সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। এরপর বলা যেতে পারে নির্মাণশিল্পে সীমা ছাড়ানোর একটি প্রতিযোগিতা শুরু হলো।

ভবন তৈরির উপকরণেও অনেক নতুনত্ব এল। সে সময় পোড়ামাটির ইট ও চুন-সুরকির গাঁথুনির দেয়াল আর ছাদে বা এ রকম বিশেষ স্থানে মোটা মোটা লোহার তির-বর্গা ব্যবহারই প্রধান। কাঠের ব্যবহার আগেও যেমন ছিল, এ সময়ও অনেকটা তেমনিভাবেই চলছিল। কিন্তু যখন সিমেন্ট তৈরি হলো তখন লোহার রড, সিমেন্ট, বালু এবং এর সঙ্গে ইট বা পাথরের টুকরো মিশিয়ে কংক্রিট তৈরি করতে শিখল, তখন ওপরে ওঠার আর এক ধাপ উন্নতি হলো। কিন্তু নির্মাণকাজে বা পদ্ধতিতে খুব একটা বিশেষ পরিবর্তন হলো না। তখনো মানব শ্রমের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারিনি স্থপতিরা।

ভারী লোহার রড বা কংক্রিট ওপরে ওঠানোর জন্য তখন ক্রেন বা লিফট কিংবা পরিবহনের জন্য মোটর গাড়ির ব্যবহার শুরু হয়েছিল বটে কিন্তু এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো যন্ত্রের ব্যবহার লক্ষ করা যায় না। তখনকার ডিজাইনও ছিল হাতে আঁকা। বড় বড় টেবিলের ওপর বড় বড় কাগজ বিছিয়ে চলত আঁকাআঁকির কাজ। হিসাবনিকাশ করা হতো গণিতের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কাগজ-কলমে। সে সময়ের মাঝারি আকারের নির্মাণকাজে যে পরিমাণ কাগজ ও কালি ব্যবহার করা হতো তা দিয়ে বর্তমানের বড় বড় বেশ কয়েকটি স্কাইক্র্যাপারের পরিকল্পনা করা যায়। কিন্তু উনিশ শতকের কম্পিউটার আবিষ্কার ছিল মানব সভ্যতার উন্নয়নের একটা বড় উপাদান। বলতে পারি, এখান থেকে মানব সভ্যতার মোড় ঘুরে যায়। আজকে আমরা যেকোনো ক্ষেত্রে অটোমেশন বলতে যা বুঝি তার অধিকাংশই হচ্ছে কম্পিউটার-নির্ভর। এদিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায় নির্মাণশিল্পেও কম্পিউটারের বিরাট এক ভূমিকা আছে।

পরিকল্পনা ও যোগাযোগ হতে শুরু করে নির্মাণ সাইটের নিয়ন্ত্রণ, কোথায় কম্পিউটারের ব্যবহার নেই? আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগ পর্যন্ত মানুষ নির্মাণকাজের পরিকল্পনা ও নকশার জন্য নির্ভর করে এসেছে ২ হাজার ৩০০ বছরেরও বেশি আগে আবিষ্কৃত ইউক্লিডের দি ইলেমেন্টেস (The Elements)-এর ভিত্তির ওপর। সঙ্গে পিথাগোরাস তো ছিলই। ১৯৫৭ সালে প্রথম কম্পিউটারে ডিজাইনের জন্য তৈরি হলো একটি ক্যাড (Computer Aided Design-CAD) সফটওয়্যার প্রন্টো (PRONTO). যদিও এটা বেশ জটিল সফটওয়্যার ছিল কিন্তু তারপরও এটাকে আমরা একটা মাইলফলক বলতে পারি। কিন্তু ১৯৬০ সালের দিকে যখন এমআইটির লিংকন ল্যাবরেটরিতে স্কেচ প্যাড (Sketchpad) নামের আর একটি ক্যাড সফটওয়্যারের জন্ম হলো তখন ডিজাইন বা নকশা তৈরির কাজে বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন হলো। অবশ্য সেই সময় আগের ড্রয়িং টেবিলগুলোকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়নি, কিন্তু কম্পাস ও পেনসিলের খোঁচা আর টি-স্কয়ার, সেট স্কয়ারের অত্যাচার হতে কিছুটা নিস্তার পেয়েছিল। এরপর কয়েক দশকের মধ্যে যখন আটোক্যাড, ভেক্টরওয়ার্কস, থ্রি-ডি ম্যাক্সের মতো সফটওয়্যার তৈরি হলো তখন নির্মাণশিল্প পুরোপুরি কম্পিউটারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল, বিশেষ করে ডিজাইনের ক্ষেত্রে। কমে গেল মানব শ্রমের ওপর নির্ভরশীলতা।

আগেই আলোচনা করা হয়েছে একটা সময় ছিল যখন নির্মাণকাজের জন্য জন্তু ও মানব শ্রম ছিল একমাত্র উপায়। পরে বিশেষ করে শিল্পবিপ্লবের (১৭৬০-১৮৪০) পর যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়, তখন থেকে নির্মাণশিল্পেও অনেক যন্ত্র ও প্রযুক্তি ব্যবহার হতে থাকে। জন্তুরা নির্মাণকাজ থেকে বাদ পড়ে যায় অনেক আগেই। কিন্তু যন্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানব শ্রমকে বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাদের অনেক ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়েছে বা হচ্ছে এখনো।

প্রকৃতপক্ষে অটোমেশন বলতে আমরা যা বুঝি তার শুরুটা হয়েছে কম্পিউটার আবিষ্কারের পর থেকে। বিগত কয়েক দশকের মধ্যে মডার্ন ইলেকট্রনিকসের উন্নতি এবং তার সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর বিশেষ করে মাইক্রো চিপসের আবিষ্কার ও উন্নয়ন কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটা বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে। নির্মাণশিল্পে অটোমেশন বলতে আমরা মূলত দুই ধরনের অটোমেশনের কথা বলতে পারি। একধরনের হচ্ছে, ইন্ডাস্ট্রি লেভেলের, আর একধরনের হচ্ছে নির্মাণ সাইটের অটোমেশন। নির্মাণশিল্পের প্রতিটি উপাদান যেমন ইট, রড বা লোহার তৈরি কোনো কিছু, সিমেন্ট, কাঠ নির্মিত কোনো জিনিস তৈরির কারখানায় এখন যে ধরনের পরিবর্তন এসেছে তা কয়েক দশক আগে ছিল কল্পনার বাইরে। প্রতিটি কারখানায় রয়েছে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত আধুনিক মেশিন। এ জন্য এখন যেমন উৎপাদন বেড়েছে বহু গুণ, তেমনি কমেছে মানব শ্রমের ওপর নির্ভরশীলতা। উদাহরণ হিসেবে সাধারণ একটা ইটের কথাই চিন্তা করে দেখি। মাত্র কয়েক দশক আগে মানুষ হাত দিয়ে ইট বানিয়েছে, পুড়িয়েছে, তারা নিজেরাই মাথায় করে বহন করেছে, তারপর তৈরি করেছে ইমারতের দেয়াল। আর এখন মাটি খনন হতে শুরু করে দেয়াল তৈরি পর্যন্ত প্রায় সবকিছু হচ্ছে যন্ত্রের সাহায্যে।

আবার নির্মাণ সাইটের অটোমেশনকে কয়েক দশক আগের সঙ্গে তুলনা করলে একটু আশ্চর্যই হতে হয়। শত শত ফুট ওপরে একজন শ্রমিক তার নিজের অবস্থানটি সময়মতো টের না পেলেও নিচ থেকে বা অনেক দূর থেকে তাকে সাবধান করে দেওয়া হচ্ছে তার ঝুঁকি সম্পর্কে, প্রয়োজনে নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে নিরাপদ থাকার জন্য। যখন একসময় বড় বড় পাথর ওপরে ওঠানোর জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে হাজার মানুষকে, তখন এ সময় দূরনিয়ন্ত্রিত ক্রেন দিয়ে সহজেই উঠিয়ে ফেলা হচ্ছে। ফ্যাক্টরিতে বিম, কলাম, দেয়াল, ছাদ তৈরি করে জায়গামতো একটির সঙ্গে আরেকটি জুড়ে দিলেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে বড় বড় বহুতল ভবন। মাইলের পর মাইল সড়কে ইট বিছিয়ে চলেছে কোনো রোবট গাড়ি। দেয়াল তৈরি বা তাতে প্লাস্টারের কাজও করছে ভিন্নধর্মী কোনো রোবট। ওই দিনটি হয়তো আর খুব বেশি দূরে নয়, যখন মানুষ শুধু কম্পিউটারে বসে নকশা তৈরি করবে আর বড় বড় রোবট তাদের চেয়েও বড় বড় মেশিন দিয়ে তৈরি করবে বিরাট বিরাট বহুতল ভবন, কোন মানুষের হাতের স্পর্শ ছাড়াই!

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১০০তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৮।

আবু সুফিয়ান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top