ব্যক্তিগত ঘটনার সূত্র ধরেই এ বিষয়ে লিখতে বসা। প্রসঙ্গত, ব্যক্তিগত কাজে একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সিইওর কাছে গেলে ভিজিটিং কার্ডের পদবিতে ম্যানেজমেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ (এমআর) পদটি দেখে তিনি অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে জানতে চান আপনার কোম্পানি তো ‘আইএসও-৯০০১ : ২০০৮ সনদ’ পেয়েছে, এখন আবার এমআরের কাজটা কী? তাঁর কথার মূল বক্তব্য ‘আইএসও’ সনদ তো পেয়েছি, এখন আর এর দরকার কী? অর্থাৎ এর বাস্তবায়ন কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে তিনি মনে করেন না কিংবা বিষয়টি সম্পর্কে তিনি ভালোভাবে জানেন না। এটি জানাতেই এই লেখার অবতারণা।
২০০৫ সালে বর্তমান প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগদানের পর টোটাল কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট (টিকিউএম) সিস্টেমের ওপর দেশে-বিদেশে নানা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এতদ্সংক্রান্ত বিভিন্ন সভা-সেমিনারে যোগ দেওয়াসহ টিকিউএম চর্চায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছি। এ ছাড়া ২০০৬ সাল থেকে আমি আমার চলতি দায়িত্বের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ‘ম্যানেজমেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ (এমআর)’ হিসেবে ‘আইএসও-৯০০১ : ২০০৮ সনদ’ অর্জন ও রক্ষণাবেক্ষণকল্পে যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমার লব্ধজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে চাই- টিকিউএম চর্চা আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই একটি অংশ, যার সুফল সর্বক্ষেত্রেই বিদ্যমান; তবে তা হতে হবে নিরবচ্ছিন্ন ও আন্তরিক। মনে রাখা দরকার, টিকিউএম চর্চা করার জন্য আলাদা কোনো ক্ষেত্রের প্রয়োজন নেই। এটি পরিবার থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য টিকিউএম সিস্টেম চর্চা ও বাস্তবায়ন করা অত্যাবশ্যক। আর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টিকিউএম চর্চার কার্যকারিতা ও যথার্থতা মূল্যায়নের জন্য ‘আইএসও-৯০০১ : ২০০৮ (কিউএমএস) সনদ’ একটি পরিমাপক যন্ত্র।
‘আইএসও’ বলতে কী বোঝায় এবং ‘আইএসও-৯০০১ : ২০০৮ সনদ’ কী এবং কেন এর প্রয়োজন? ইদানীং বাংলাদেশের নানা ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ‘আইএসও’ সনদ অর্জনের প্রচলন শুরু হলেও বিষয়টির গুরুত্ব সম্পর্কে কমবেশি সবাই ওয়াকিবহাল নয়। বিভিন্ন্ন কোম্পানি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম অর্জন তথা ব্যবসায়িক প্রসারের লক্ষ্যে উল্লেখিত সনদ প্রাপ্তির চেষ্টা করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, অত্র সনদ প্রাপ্তির পর তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ওপর ‘আইএসও-৯০০১ : ২০০৮ সার্টিফাইড’ সিল দিয়ে থাকে। জানি না এ দিয়ে কী বোঝাতে চায় তারা। অন্যদিকে ভোক্তারা এসব পণ্যের ওপর ওই সিল দেখে আত্মতুষ্ট হয়ে পণ্যটি কেনে কিংবা ব্যবহার করে। কিন্তু এই সনদটি কিসের ওপর দেওয়া হয়, কেনই-বা দেওয়া হয় এবং এর কার্যকারিতাই বা কী? এত সব তথ্য সমন্ধে ক্রেতারা অনেকেই জানেন না বা জানার চেষ্টাও করেন না।
প্রথমত, আমাদের জানা দরকার, ‘আইএসও’ সনদ বলতে কী বোঝায় এবং কারা, কীভাবে, কিসের ওপর এই সনদ দেয়? দ্বিতীয়ত, এটি পাওয়ার আগে ও পরে কী কী করা উচিত? মনে রাখা দরকার, এতদ্সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর নানা নিয়মনীতি এবং বিধিনিষেধ আছে, যা মেনে চলা আবশ্যক। এ বিষয়ে স্বচ্ছ কোনো ধারণা না থাকার কারণেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আগে-পরে করণীয় বিষয়গুলোকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে শুধু সনদপ্রাপ্তির বিষয়টিকেই মুখ্য হিসেবে গণ্য করেÑ কত দ্রুত, কীভাবে সনদ পাওয়া যায় তার ওপরই বিশেষগুরুত্ব আরোপ করা হয়। পাশাপাশি এটাও উল্লেখ্য যে ইতিমধ্যে আমাদের দেশে বেশকিছুসংখ্যক কোম্পানি ‘আইএসও’ সনদ অর্জন করে থাকলেও কয়জন তা সুষ্ঠুভাবে মেইনটেইন করে সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। আর তাই এ সনদ অর্জনের পর তা মেইনটেইন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ফলে, প্রাপ্ত সনদের মান সমুন্নত রাখতে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
নিয়মানুযায়ী ‘আইএসও’ সনদ অর্জন এবং মেইনটেইন করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজমেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ (এমআর)’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে সব নিয়মনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকরত অর্জন ও সংরক্ষণ করতে হয় ওই সনদ। এ ছাড়া ‘আইএসও-৯০০১ : ২০০৮ সনদ’ প্রাপ্তির জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সার্বিক উন্নতিকল্পে প্রণীত সব ধরনের নিয়মনীতির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং সুশৃংখলভাবে চর্চার বিষয়টি নিশ্চিতকরণার্থে ওই প্রতিষ্ঠানের সব শাখা বা বিভাগীয় প্রধানদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এতদ্সঙ্গে, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কিছুসংখ্যক সদস্যকে ‘ইন্টারনাল অডিটর’ হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়ে অভ্যন্তরীণ সব কার্যক্রম নিয়মিতভাবে অডিট করার মাধ্যমে বিদ্যমান অবস্থার উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে সব ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরা প্রয়োজন। সর্বশেষ, ‘আইএসও-৯০০১ : ২০০৮ সনদ’ প্রাপ্তির লক্ষ্যে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত সব কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রণীত নিয়মনীতি মেনে চলাসংক্রান্ত সব নথিপত্র সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক যাচাইবাছাই এবং বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণতার বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে নবায়নযোগ্য একটি ‘আইএসও’ সনদ প্রদান করে থাকে, যা পরে রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
ফলে, সনদপ্রাপ্তির লক্ষ্যে প্রণীত সব নিয়মনীতির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং ধারাবাহিক উন্নয়নকল্পে ‘ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল অডিটর’ দ্বারা সব ধরনের কার্যক্রম নিয়মিত অডিট করানো জরুরি। পাশাপাশি, প্রতিষ্ঠানে চলমান সব কার্যক্রমের সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণপূর্বক বিরাজমান পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে বিভিন্ন বিভাগ বা শাখাপ্রধানদের সমন্বয়ে ম্যানেজমেন্ট রিভিউকমিটি (এমআরসি) নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। অত্র কমিটি কর্তৃক প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের প্রতিবেদনসমূহ মূল্যায়ন এবং সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সুপারিশমালা প্রণয়নার্থে নির্দিষ্ট একটি মেয়াদ পরপর নিয়মিত সভা করার ব্যবস্থা করতে হয়। সর্বোপরি, ওপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা আবশ্যক। পুনশ্চ, প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত সনদের মেয়াদ শেষে, বিগত দিনে পরিচালিত সব কার্যক্রম ‘আইএসও’-এর নিয়মনীতি অনুসারে প্রণীত নিয়মাবলি অনুসরণ করে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার দালিলিক প্রমাণ ও চলমান কাজের সঙ্গে তার সামঞ্জস্যতাসমূহ ‘এক্সটারনাল অডিটর’ কর্তৃক অডিট করানোর মাধ্যমে প্রাপ্ত সনদটি পরবর্তী মেয়াদের জন্য নবায়ন করাতে হয়, যা অন্তহীন একটি চলমান প্রক্রিয়া।
যা হোক, এখন প্রতিপাদ্য বিষয়ের মূল আলোচনায় আসা যাক, ‘আইএসও’ কী? এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান, যার অর্থ ‘ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন’ বা ‘আইএসও’ নামে পরিচিত। এদের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা আছে, যারা বিশ্বব্যাপী নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন শাখায় ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে তাদের প্রচলিত নিয়মনীতির সামঞ্জস্যতা যাচাই-বাছাই করে ‘আইএসও’ সনদ প্রদান করে থাকে। এরপরও বিভিন্ন শাখার ‘আইএসও সনদ’ বা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের নানা রকম বৈচিত্র্য আছে, যা বিশ্ববাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধনশীল।
(চলবে)
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৮তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৬।