Image

নৈঃশব্দের নীরব স্মারক চেন্দামেজু বৌদ্ধবিহার

কক্সবাজারের কেন্দ্রীয় বৌদ্ধবিহার মহাসিংদোর ছোট্ট গেটে লেখা চেন্দামেজু বৌদ্ধবিহার। গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে খোলা প্রাঙ্গণ; সমানে একটি তিনতলা সমান বাড়ি। তবে এটি এমনভাবে তৈরি দেখে যেন মনে হয় পাঁচতলা। রাখাইনরা এভাবেই ওদের বাড়ি বানায়। বাড়ির নিচতলার ব্যবহার নেই বলেই চলে। এখানে রাখা নানা রকম খাদ্যদ্রব্য বা গেরস্থালি সামগ্রী। জন্মলগ্ন থেকেই রাখাইনদের ওপর বারবার নেমে এসেছে অত্যাচারের খড়গ। এ কারণে তাদের বাড়িঘরের উচ্চতা মূলত চার বা তিনতলার সমান। নিচতলা পুরোটাই খালি। এতে বন্যার সময়ও বেশ সুফল পাওয়া যায়। দোতলা থেকে শুরু হয় তাদের মূল স্থাপনা। এই বৌদ্ধবিহারটির নিচতলা পুরু দেয়ালে তৈরি। ইটের ওপর চুন-সুরকি মিশ্রিত বাড়িটি বেশি দিন আগের নয় এমন চিহ্নই বহন করছে। কিন্তু দোতলায় উঠতেই ধারণাটা ভুল প্রমাণিত হল। বাড়ির ভেতর সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই চোখের সামনে পড়ল কাঠের চোঙা, যা অন্তত ১০০ বছরের পুরোনো। দরজা-জানালা তো আরও বেশি পুরোনো। কোনো এক অদ্ভুত উপায়ে নিচের ইট-পাথরের স্ট্রাকচারের ওপর প্রাচীনকালের মন্দিরখানা পুনস্থাপিত, যা করা হয়েছে খুবই নিখুঁতভাবে। দেখলে বোঝার উপায় নেই। মনে হয় পুরো মন্দিরটাই নতুন। মন্দিরের ভেতর পিতল নির্মিত একখানা বুদ্ধমূর্তি ব্যতীত তেমন কিছু নেই। এটি মূলত বৌদ্ধবিহারের ছোট্ট এক অংশ। মূল অংশ আরও বড়।

চেন্দা মেজু বিহার ফেলে সামনে এগোতেই সরু রাস্তা, যা পেরিয়ে ঝোপঝাড় এবং এরপরেই ইটের সরু রাস্তা পেরিয়ে আরেকটা লোহার ছোট্ট গেইট। সামনে কিছুদূর হাঁটতেই হাতের বাঁ পাশে অং সেন সা নবগ্রহ মন্দির। এই মন্দির আবার নতুন। বয়স ৫০ বছরের বেশি হবে না। স্ট্রাকচারও বেশ নতুন। তবে আগের স্থাপনার মতোই ছয়তলা তৈরি করে ঐতিহ্য রক্ষা করা হয়েছে রাখাইনদের। মূলত রাখাইনরা এ দেশীয় নয়, আঠারো শ শতকের শেষে আরাকান থেকে বাংলাদেশে এসে কক্সবাজার ও পটুয়াখালীতে বসতি স্থাপন করে তারা। এরপর থেকে ওরা এখানেই বসবাস করে আসছে। এবং ধীরে ধীরে মিশে গেছে বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে। কিন্তু ওদেরও আছে হাজার বছরের পুরোনো সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। আদি ব্রাহ্মীলিপিতে পালিভাষায় ‘আরাখাঃ’ অর্থ রক্ষ বা রক্ষক। এ থেকে রাখাইন শব্দটা এসেছে। ভারত উপমহাদেশে আগত আর্যদের বংশোদ্ভূত রাখাইনরা প্রাচীনকালে মগধ রাজ্যে বাস করত। সে সময় মগধ থেকে রখংগ, রখাইঙ্গি, আরখংগ, রোসাংগ, রাখিংগ্রেম্বা বা আরাকানে এসে বসবাস শুরু করলে মগধী বা মগরূপে ইতিহাসে পরিচিতি পায় তারা। মগের মুল্লুক নামের প্রচলিত বাগ্ধারাটা তাদের কাছ থেকেই পাওয়া।

ইতিহাস বলছে, রাখাইনরা কিন্তু এ দেশীয় কেউ নয়। কিন্তু ওদের সরলতা দেখলে বলতে বাধ্য হবেন যে ওরা এ মাটিরই সন্তান। ওদের স্থাপত্যকলাও একদমই এ দেশীয়। নবগ্রহ মন্দিরের পাশেই সরু রাস্তা। কংক্রিটের রাস্তার পাশে রয়েছে কিছু সমাধিসৌধ। গাছের আড়াল থেকে বিহারের খানিকটা দেখাও যায়। যেন নিজেকে লুকিয়ে রাখার আশ্চর্য এক প্রয়াস! পাশেই সিমেন্টের ঢালাই রাস্তা। কিছুদূর হাঁটলেই মনে হবে মঙ্গোলিয়ান সিনেমার কোনো সেটে চলে এসেছি। হঠাৎই চোখের সামনে লাফিয়ে পড়বে কোনো এক মঙ্গোল যোদ্ধা। যুদ্ধ করতে শুরু করবে শত্র“র সঙ্গে! সাজানো-গোছানো বিশালাকার মঙ্গোলিয়ান রাজবাড়ি আকৃতির স্থাপনা। অবাক নয়নে দেখবেন ৬০ বছর আগের স্থাপত্যকলা। কিন্তু দেখে মনে হবে অনেক পুরোনো। কিন্তু যত্নের ছাপ সর্বত্রই। সামান্য ঘাস বা গাছপালা সবকিছুই পরিপাটি করে সাজানো। বাড়ির নিচতলার স্ট্রাকচার অদ্ভুতভাবে কাঠের কলামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে পুরো স্থাপনা নিয়ে। ভূমিকম্পের ভয় নেই। নেই বুয়েট পরীক্ষিত ২০ লাখ সাইক্লিক লোডিংয়ের হিসাব। নেই রেইনফোর্সমেন্ট। নেই ইট-কাঠের সেন্টারিং। শক্তপোক্ত রডের ঢালাই নেই। আছে শুধু কাঠ। সেই কাঠের ওপর কাঠ জোড়া দেওয়া, কিন্তু নেই কোনো পেরেকও। কাঠের মাঝে কাঠ সুন্দর করে ঢুকে গেছে। কাঠ চিরে এমনভাবে বানানো হয়েছে যেন যেকোনো সময় খুলে নিয়ে অন্যত্র বসিয়ে দেওয়া যাবে পুরো স্থাপনাকে। রাখাইন স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন এই স্থাপনার ভেতর আছে শুধুই বিশালাকার ও অনেক ভারী কাঠের বিম ও কলাম। কোনো রকম ইট-পাথরের অস্তিত্ব নেই মূল অংশে। ব্যাস-টিন মোড়ানো স্ট্রাকচারটি দাঁড়িয়ে আছে কয়েক শ বছরের জন্য। অদ্ভুত এক বিশ্বস্থতায় ডিজাইন করা হয়েছে স্ট্রাকচারটির। অথচ এখন এটুকু করতেই বেরিয়ে যেত লাখ লাখ টাকা ও সময়। স্ট্রাকচার সিস্টেমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পুরো স্থাপনাটা দাঁড়িয়ে আছে কাঠের পিলার ও বিম দিয়ে। কারুকাজ করা রট আয়রনের কাজও আছে বেশ। কম ভারী নয় এই বাড়িখানা। অথচ অবলীয়ায় একে ডিজাইন করেছেন যাঁরা, তাঁদের স্ট্রাকচার সেন্স বর্তমান যেকোনো ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে বেশি ছাড়া কম  নয়। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে বলতে হয় এর স্থাপত্যকাল যে ২০০ বছরেরও আগের!

ফেসবুক

এখানেই রয়েছে বিশালাকার এক বোধিবৃক্ষ। তথাগত বুদ্ধ এরকমই এক বৃক্ষের নিচে ধ্যানরত অবস্থায় বোধি লাভ করেন। সেই গাছ সংরক্ষিত আছে বর্তমান ভারতের গয়া তথা বুদ্ধ গয়ায়। সেই বোধিবৃক্ষের আত্মীয়স্বজন হতে পারে এই গাছটি। বৌদ্ধরা বোধিবৃক্ষের রেপ্লিকাগুলোকেও একইভাবে সম্মানের সাথে আরাধনা করে। সেই গাছের পাশেই সুন্দর নতুন ভবনের স্ট্রাকচারে জ্বলজ্বল করছে ‘কেন্দ্রীয় বৌদ্ধমন্দির মহাসিংদো’। এই অংশের বর্তমানে নতুন করে রিকনস্ট্রাকশন চলছে। তবে গেটে আছে চৈনিক স্থাপত্যকলার ছাপ। এই অংশটা পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ থেকেই আলাদা। এখানকার পুরোটা বিদেশি স্ট্রাকচারের সমাবেশ। ভেতরে চলছে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ। হয়তো পুরোনো ছাদ সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান মন্দির কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাদের মাঝে মন্দিরের মূল রাখাইন ঐতিহ্য রক্ষার তেমন কোনো প্রয়াস নেই। একদম আধুনিক স্ট্রাকচার সেখানে। বিম-কলামের ছড়াছড়ি। বোঝা যায় এখানে প্রতিবছর মন্ত্রী-এমপিরা আসেন। তাদের আগমনস্থলে কাঠের পুরোনো স্ট্রাকচার বেমানান। তাই হয়তো এই উদ্যোগ। এখানে আছে বিশাকালার বেশ কিছু বুদ্ধমূর্তি। আছে পিতলের মূর্তিও। তবে কোনো কোনোটাকে স্বর্ণের মূর্তি ভেবে ভুল হয়। কনস্ট্রাকশন কাজ চলছে অথচ পুরো এলাকা বিশেষভাবে নীরব। কোনো সাড়া শব্দ নেই। স্ট্রাকচারগুলোর কাজ যারা করছে, তাদের যথাসম্ভব নীরবে কাজ করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে মন্দিরের ছাদ ঢালাই চলছে আর নিচেই আছে শ্রদ্ধার্ঘ আর বুদ্ধমূর্তি। ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক আশ্চর্য দৃশ্য। কিছু মানুষ কাজ করছে কিন্তু তাদের নীরবতায় শ্বাসের শব্দও অনেক জোরে শোনা যায়। তাদের কাজ চলছে নিয়ম করেই। ব্যাঘাত ঘটছে না। এখানে ছবি তোলা নিষিদ্ধ। হয়তো এখনকার সন্ত্রাসী হামলার কারণেই ছবি তোলার সুব্যবস্থা নেই। পুরোটাজুড়েই আছে নানা রকম পুজোর উপকরণ। একদিকে ধুনো জ্বলছে। তাতেই সুগন্ধে ম-ম করছে চারপাশ। স্ট্রাকচার যেগুলো পুরোনো সবই কাঠের। কাঠের জয়েন্টগুলো বেশ শক্ত ও পোক্তভাবেই আটকে আছে। প্রাঙ্গণের মাঝে মন্দির। আর চারপাশে স্ট্রাকচার। এই স্ট্রাকচার আগের সেই মন্দিরের মতোই পুরোনো। কাঠের কলাম ও বিমের সঙ্গে আটকে আছে কাঠের ছাদ। পুরো প্রকৃতিগত এই স্ট্রাকচার সিস্টেম দেখলেই অবাক হতে হয়। এর মাঝেই আধুনিকতম এমন স্ট্রাকচার তৈরি হচ্ছে। রামুতে কয়েক বছর আগেই ঘটে গেছে নৃশংস সেই বৌদ্ধবিহার ধবংসের ঘটনা। সেই ঘটনা থেকেই শিক্ষা নিয়ে এখানে তৈরি হতে চলেছে আধুনিক মন্দির স্ট্রাকচার!

ফেসবুক

মন্দিরের ভেতর আছে বেশ কিছু পুরোনো বৌদ্ধমূর্তি। আছে নানা রকম বুদ্ধের অবয়ব। মন্দিরজুড়ে আছে বিশাল পরিসরের খালি পায়ে ঘোরার জায়গা। এখানে বিশেষ দিনগুলোতে ভক্তবৃন্দ ঘুরতে পারেন। বুদ্ধমূর্তির চারপাশে ঘোরা বা চক্র স্থাপন তাদের উপাসনার একটি অংশ। প্রাঙ্গণজুড়ে সিমেন্টের ঢালাই দেখেই বোঝা যায় এখানে প্রতিবছর কী পরিমাণ লোক-সমাগম হয়। বৌদ্ধদের বিশেষ করে কক্সবাজারের বৌদ্ধদের এই বিশালাকার মিলন মেলায় প্রতিবছর কঠিন চিবর দান অনুষ্ঠান হয়। বৌদ্ধ পূর্ণিমায় হয় ফানুশ উৎসব। লাখ লাখ রাখাইন ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলেমিশে যায় কক্সবাজারের স্থানীয় অধিবাসীরাও। সবার মাঝে তৈরি হয় ভ্রাতৃত্বের নিদারুণ বন্ধন। প্রাচীন এই মন্দিরখানা দেখে ফিরলেও মন পড়ে থাকে ওখানে। পায়ের জুতোজোড়া যেখানে রেখেছিলাম, মাঠের ওপর সেখানেই আছে। কেউ ধরেনি! খানিকটা অবাক হলাম। কী সহজ-সরল তাদের জীবন। ঢাকার যান্ত্রিকতায় ফেরত যেতে যেতে ভাবছিÑ আমিও তো হতেই পারতাম তাদের মতো। কিন্তু বাস্তবতা আর সময়ের নিদারুণ টান আমাকে ফিরতে বাধ্য করছে। হয়তো একদিন সব বন্ধন ছিন্ন করে এখানে চলে আসব। সেই ফ্যান্টাসিময় স্বপ্ন দেখতে দেখতে ছাড়তে শুরু করলাম কেন্দ্রীয় বৌদ্ধবিহার মহাসিংদো। পেছনে পড়ে রইল ফেনীল জলরাশিÑ সঙ্গে প্রাচীন বৌদ্ধবিহার।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৭তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬।

Related Posts

ফেনীর নামকেও সমৃদ্ধ করে চাঁদগাজী মসজিদ

বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক স্মৃতি আমাদের নস্টালজিক করে তোলে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো ঐতিহাসিক মসজিদগুলো। এমনই এক ঐতিহাসিক…

তাজহাট জমিদার বাড়ি বাংলার ইতিহাসের সাক্ষী

তাজহাট জমিদার বাড়ি বাংলার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এক স্মারক। পুরান রংপুর যা বর্তমানে তাজহাট উপজেলা হিসেবে পরিচিত সেখানেই গড়ে…

কংক্রিটের নগরীতে চারশ বছরের মোঘল স্থাপত্য ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহ

ব্যস্ত ট্রাফিক, আধুনিক ক্যাফে, আর বহুতল ভবনের ভিড়ে ঠাসা আজকের ধানমন্ডি। ঢাকার অন্যতম অভিজাত ও কোলাহলপূর্ণ এই এলাকার…

ইট-পাথরে গাঁথা ইতিহাসের পাতা: বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ঈদগাহের গল্প

‘ঈদ’ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। আত্মত্যাগের মহিমা নিয়ে হাজির হয় ঈদুল আজহা। ঈদের দিন সকালে ঘুম…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

একরঙা শহর: স্থাপত্য থেকে রঙের হারিয়ে যাওয়া
লস অ্যাঞ্জেলেসে লেহরার আর্কিটেক্টসের বর্ণিল সাপোর্টিভ হাউজিং
Lotus
ইন্দোনেশিয়ার বাড়িতে সবুজ ছাদে পরিবার থাকবে একসূত্রে
ইস্তানবুল মডার্ন: মাছের আঁশের মতো চকচকে এক জাদুঘর
চীন ও নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা এবং আমাদের যা করণীয়
within the earth
ব্রিক ইন আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এর জন্য আবেদন শুরু হয়েছে
water tower