গ্রিসের সিফনস দ্বীপের উপকূলীয় পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ‘পৃথিবীর ভেতের’ (Within the Earth) যেন কোনো নতুন ভবন নয়। এটি যেনো বহুদিন পাহাড়ের শরীরের অংশ হয়ে থাকা একটি স্থাপত্য। প্যারিসভিত্তিক স্থপতি আলেক্সান্ডার পাভিলিডিস এমন একটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন, যা নিজেকে চারপাশের প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে দেয়নি। এটি মাটি, পাথর, কৃষিজ টেরেস ও পুরোনো রিটেইনিং ওয়ালের সঙ্গে মিশে যেতে চেয়েছে যেনো।
২০২৫ সালে সম্পন্ন এই বাড়িটি সিফনসের ঐতিহ্যবাহী কৃষিভূমির টেরেসের ধারাবাহিকতায় তৈরি একটি ভূগর্ভস্থ আবাসন।
দূর থেকে দেখলে বাড়িটিকে প্রায় দেখাই যায় না। পাহাড়ের ঢালে থাকা পাথরের দেয়াল, মাটির স্তর এবং পুরোনো একটি রাখালের কুঁড়েঘরই যেন দৃশ্যের প্রধান উপাদান। অথচ সেই দৃশ্যমান সরলতার নিচে রয়েছে আলো, ছায়া, জল, পাথর ও আকাশকে কেন্দ্র করে তৈরি এক জটিল আবাসিক অভিজ্ঞতা।
ভূদৃশ্যের ধারাবাহিকতা
উইদিন দ্য আর্থ প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রচলিত অর্থে একটি আলাদা ভবন হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে না। সিফনসের পাহাড়ি ভূদৃশ্য ঐতিহ্যগতভাবে কৃষিকাজের জন্য তৈরি অসংখ্য ধাপযুক্ত টেরেস ও পাথরের রিটেইনিং ওয়াল দিয়ে গঠিত।

এসব দেয়াল শুধু সৌন্দর্যের জন্যই নয়। এগুলো মাটি ধরে রাখে, চাষযোগ্য জমি তৈরি করে এবং পাহাড়ের ক্ষয় রোধ করে।
পাভলিডিস সেই ঐতিহ্যকেই স্থাপত্যের মূল নীতিতে পরিণত করেছেন। নতুন বাড়িকে পাহাড়ের ওপর বসানোর পরিবর্তে তিনি বাড়িটিকে পাহাড়ের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। একটি পুরোনো রিটেইনিং ওয়ালের জায়গাতেই নতুন স্থাপত্যটি তৈরি হয়েছে। ফলে ভবনটি যেন ভূদৃশ্যের ওপর বিদ্যমান কৃষি-টেরেসেরই একটি নতুন স্তর।
এখানেই প্রকল্পটির স্থাপত্যিক গুরুত্ব। এটি ল্যান্ডস্কেপ স্থাপত্য এবং আবাসিক স্থাপত্যের সীমারেখাকে প্রায় মুছেই দিয়েছে।
প্রবেশপথের রহস্য
বাড়িটির প্রবেশপথও প্রচলিত পথের মতো নয়। পাহাড়ের ওপরের অংশে থাকা একটি পুরোনো রাখালের কুঁড়েঘরের নিচের দিক থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে মাটির ভেতরে। দর্শনার্থী যত নিচে নামেন, ততই বাইরের উজ্জ্বল ও উন্মুক্ত ভূদৃশ্য থেকে সরে গিয়ে প্রবেশ করেন অপেক্ষাকৃত অন্ধকার, ঠান্ডা ও সুরক্ষিত এক জগতে।
সিঁড়ির শেষে রয়েছে একটি স্কাইলিট অ্যাট্রিয়াম। স্কাইলিট অ্যাট্রিয়াম হলো বদ্ধ জায়গায় সূর্যের আলোযুক্ত উঠুনের মতো খোলা জায়গা। স্থপতি আলেক্সান্ডার এই প্রকল্পের নিচ তলায় একটি অগভীর জলাধার বা স্থাপন করা হয়েছে, যা বাড়ির শোবার ঘর ও বসবাসের জায়গাগুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রাকৃতিক বিভাজন তৈরি করে।
অর্থাৎ প্রবেশপথটি কেবল আলো বাতাস চলাচলের অংশ নয়। এটি পুরো বাড়ির অভিজ্ঞতার প্রারম্ভিক পরিচয় মাত্র। বাইরে থেকে ভেতরে যাওয়ার পরিবর্তে এখানে অনুভূত হয়—উপরের পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে মাটির গভীরে প্রবেশ করা।

টেরেসের ভাষায় সাজানো ঘর
বাড়ির পরিকল্পনা সিফনসের কৃষিজ টেরেসের জ্যামিতি অনুসরণ করে। বসবাসের প্রধান অংশগুলো পাহাড়ের ঢাল বরাবর লম্বালম্বি সাজানো হয়েছে। ফলে বসার ঘর, শোবার, ডাইনিং রুম এবং রান্নাঘরের একদিকে দীর্ঘ অক্ষ তৈরি করে, অন্যদিকে সেগুলো সরাসরি বড় একটি টেরেসের সঙ্গে যুক্ত।
এই পরিকল্পনা একই সঙ্গে কার্যকরী এবং প্রেক্ষিতনির্ভর। বাড়ির ভেতরের বায়ু চলাচল যেমন সহজ থাকে, তেমনি বাইরের কৃষিজ টেরেসের অনুভূতিও অক্ষুণ্ণ থাকে।
শোবার ঘরগুলো তুলনামূলকভাবে পেছনের দিকে রাখা হয়েছে। মোটা পাথরের স্তম্ভ এগুলোকে আংশিক আড়াল করে। প্রতিটি শোবার ঘরের সঙ্গে রয়েছে ছোট ব্যক্তিগত বারান্দা। ফলে বাড়িটি একদিকে অত্যন্ত উন্মুক্ত সমুদ্রদৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে ব্যক্তিগত পরিসরও বজায় রাখে।
মাটির নিচে আলো আনার কৌশল
ভূগর্ভস্থ স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাকৃতিক আলো ও বায়ু নিশ্চিত করা। পাভলিডিস এই সমস্যার সমাধান করেছেন বারান্দা এবং স্কাইলিটের মাধ্যমে।
বাড়ির গভীর অংশে ছোট ছোট মুক্ত বারান্দা রাখা হয়েছে। এসব বারান্দাতে গাছ লাগানো হয়েছে, ফলে মাটির নিচের ঘরগুলোও সরাসরি আকাশ ও উদ্ভিদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।

একটি বাথরুমের নলাকার ঝর্নার ওপর রয়েছে গভীর একটি স্কাইলিট। উপরের ছোট্ট আকাশের খোলা অংশ দিয়ে আলো সরাসরি নিচে এসে পড়ে। একই ধরনের স্কাইলিট বাড়ির বিভিন্ন অংশে দিনের আলোকে মাটির গভীরে নিয়ে আসে।
এখানে জানালা শুধু বাইরে দেখার জন্য নয়। আলোকে স্থাপত্যের উপাদানে পরিণত করার মাধ্যম।
পাথর, কংক্রিট ও কাঠের সংলাপ
উইদিন দ্য আর্থের উপকরণ অত্যন্ত সংযত। প্রধান উপাদান হলো অমসৃণ শুকনো পাথরের দেয়াল, উন্মুক্ত কংক্রিট এবং পালিশ করা পাথরের মেঝে। পাথরের দেয়ালগুলো বাড়িটিকে পাহাড়ের সঙ্গে একাত্ম করে, আর কংক্রিট ছাদ ও মেঝে স্থাপত্যে একটি শক্তিশালী, প্রায় মনোলিথিক চরিত্র তৈরি করে।
কিন্তু সম্পূর্ণ পাথর ও কংক্রিটের পরিবেশ যাতে অতিরিক্ত কঠিন বা অনাত্মীয় না হয়ে ওঠে, সে জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ওক কাঠ। দরজা, ফ্রেম, আসবাবে কাঠের উষ্ণতা পাথরের শীতলতার সঙ্গে একটি ভারসাম্য তৈরি করে।
এই উপাদানের বৈসাদৃশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাথর ও কংক্রিট মনে করিয়ে দেয় যে বাড়িটি মাটির ভেতরে তৈরি। অপরদিকে কাঠ মনে করিয়ে দেয় এটি মানুষের বসবাসের জায়গা।
তাপ নিয়ন্ত্রণে মাটির ব্যবহার
ভূগর্ভস্থ হওয়ার কারণে বাড়িটির পরিবেশগত কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ। পাথর, কংক্রিট ও কাচের তাপীয় জড়তা দিনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং রাতের শীতলতা ধরে রাখতে পারে। বাড়ির বারান্দাগুলো প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ তৈরি করে।
এ ছাড়া সামনের অংশকে গভীরভাবে অবতল করা হয়েছে, যাতে সরাসরি সূর্যের তাপ কম প্রবেশ করে। বিশেষ করে সিফনসের মতো তীব্র সূর্যালোক ও গরমের অঞ্চলে এই কৌশল স্থাপনাটির ভেতরে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
অর্থাৎ এখানে স্থায়িত্ব কোনো আলাদা প্রযুক্তি হিসেবে যোগ করা হয়নি। ভবনের অবস্থান, ভর, উপকরণ এবং ভূদৃশ্যের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই নিষ্ক্রিয় পরিবেশগত কৌশল তৈরি হয়েছে।
জল, আলো ও আকাশের স্থাপত্য
এই বাড়ির স্থাপত্যে জলও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রবেশপথের অগভীর জলাধার শুধু দুটি স্থানিক অঞ্চলকে আলাদা করে না। পানির ওপর প্রতিফলিত আলো ঘরের সিলিংয়েও পরিবর্তনশীল আলোক-প্রভাব তৈরি করে।

পাভলিডিসের নকশায় এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে পাথর ও কংক্রিটের ভারী ভরের মধ্যে হঠাৎ একটি পরিষ্কার জ্যামিতিক স্থান তৈরি হয়। কোথাও বর্গাকার কোথাও বৃত্তাকার খোলা, আবার কোথাও আকাশের দিকে খোলা সূর্যের আলো।
ফলে বাড়ির অভিজ্ঞতা একটানা অন্ধকার নয়। বরং অন্ধকারের মধ্যে আলো, কঠিন পাথরের মধ্যে জল, এবং মাটির গভীরে আকাশ—এই বিপরীত উপাদানগুলো পরস্পরকে আরও শক্তিশালী করে।
নিচের স্তরে আরেকটি পৃথিবী
বাড়ির নিচের স্তরেও টেরেসের ধারণা অব্যাহত রয়েছে। একটি প্যাভিলিয়নের মতো পাথরের কলামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং তার পাশে রয়েছে সুইমিং পুল। এটি বাড়ির ভেতর ও বাইরের মধ্যবর্তী আরেকটি রূপান্তরের জায়গা তৈরি করেছে।
উপরের কৃষিজ টেরেস যেমন এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে নেমে যায়, বাড়িটিও তেমনভাবে এক স্তর থেকে আরেক স্তরে এগোয়। ফলে স্থাপত্য এবং ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে একটি ধারাবাহিক বিভাগীয় সম্পর্ক তৈরি হয়।
এটি প্রকল্পটির অন্যতম শক্তিশালী দিক। স্থপতি শুধু পরিকল্পনা নয়, পুরো পাহাড়কে একটি সেকশন হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
অদৃশ্য স্থাপত্যের দর্শন
উইদিন দ্য আর্থ আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। স্থাপত্য কি সবসময় দৃশ্যমান হওয়ার জন্য তৈরি হবে?
সমকালীন স্থাপত্যে অনেক ভবন তাদের আকৃতি, রঙ বা প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেকে আলাদা করে তুলতে চায়। কিন্তু পাভলিডিসের প্রকল্পের শক্তি ঠিক বিপরীতে। তিনি এমন একটি বাড়ি তৈরি করেছেন যার প্রধান স্থাপত্যিক বক্তব্য হলো নিজেকে আড়াল করা।
দূর থেকে কেবল পুরোনো রাখালের ঘরটি দৃশ্যমান আছে। বাড়িটি মাটির নিচে। সমুদ্রের দিকে তাকালে অবশ্য এর বারান্দা, খোল জায়গা ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।
এই অদৃশ্যতা কোনো দুর্বলতা নয়। এটি একটি সচেতন স্থাপত্যিক অবস্থান। প্রকল্পটির ভাষা এমন যেনো প্রকৃতির পাশে ভালো স্থাপত্য কখনো কখনো প্রকৃতির চেয়ে বেশি দৃশ্যমান না হয়। বরং এমন স্থাপত্যকে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে হবে।
ঐতিহ্য থেকে সমকালীন স্থাপত্য
সিফনসের ঐতিহ্যবাহী পাথরের দেয়াল, কৃষিজ টেরেস ও ভূমির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সম্পর্ককে পাভলিডিস সরাসরি অনুকরণ করেননি। তিনি সেই ঐতিহ্যের যুক্তি গ্রহণ করেছেন।
পুরোনো টেরেসের মতো বাড়িও ভূমির ঢাল অনুসরণ করে। পুরোনো রিটেইনিং ওয়ালের মতো পাথর এখানে মাটি ধরে রাখে। কৃষিজ টেরেসের মতো মেষপালকের কুড়েঘর লম্বালম্বিভাবে বিস্তৃত। আবার স্থানীয় স্থাপত্যের মতোই পাথর এখানে শুধু ফিনিশিংয়ের উপকরণ নয়। এটি স্থাপত্যের মৌলিক চরিত্রের অংশ।

এই কারণেই উইদিন দ্য আর্থকে শুধুমাত্র একটি সুন্দর অবকাশ যাপনের কেন্দ্র হিসেবে দেখলে প্রকল্পটির গভীরতা ধরা পড়ে না। এটি আসলে ভূমি, ঐতিহ্য, জলবায়ু এবং আধুনিক আবাসিক স্থাপত্যের মধ্যে একটি সংলাপ।
কেন উইদিন দ্য আর্থ গুরুত্বপূর্ণ?
উইদিন দ্য আর্থের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাপত্য মানেই সবুজ ছাদ বা সৌরপ্যানেল যুক্ত ভবন নয়। কখনো কখনো স্থাপত্যের সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত হতে পারে ভবনটিকে যতটা সম্ভব ভূদৃশ্যের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া।
এখানে মাটি তাপীয় ভর হিসেবে কাজ করে, পাথর স্থানীয় ভূদৃশ্যের ভাষা বহন করে। বারান্দা আলো ও বাতাস আনে এবং গভীর সম্মুখভাগ সূর্যের তাপ কমায়। একই সঙ্গে বাড়িটি সিফনসের ঐতিহাসিক কৃষিজ টেরেসকে নতুন আবাসিক ভাষাকে তুলে ধরে।
এই প্রকল্পটি তাই একটি বাড়ির চেয়েও বেশি কিছু। এটি দেখায়, আধুনিক স্থাপত্য যখন কোনো স্থানের ইতিহাস, জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতিকে গভীরভাবে বুঝতে পারে, তখন নতুন ভবনকে পুরোনোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয় না। সেটি ধীরে ধীরে সেই ভূদৃশ্যেরই অংশ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: ডিজেইন
























