মহুয়া, মালুয়া, ঈশা খাঁর দেশে (পর্ব ২)

মসুয়ার রায় পরিবার

বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তাঁর সুযোগ্য পুত্র শিশুসাহিত্যের আরেক ছান্দসিক ছড়াশিল্পী সুকুমার রায় এবং সুকুমার রায়ের পুত্র আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। তিন প্রজন্মের এই তিন কীর্তিমান পুরুষ আজ কিশোরগঞ্জবাসীর কাছে গর্বের ধন হিসেবে সমাদৃত। কীর্তিমান এই তিন পুরুষের পিতৃভূমি কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া গ্রামে অবস্থিত। ছায়া সুনিবিড় মসুয়া গ্রামে ‘বাবুর বাড়ি’ নামে খ্যাত ভগ্নপ্রায় বাড়িটি আজও ঐতিহ্যের স্মারক আর কালের সাক্ষী হয়ে আগ্রহী পর্যটকদের অনুসন্ধানী মনকে স্মৃতিকাতরতায় ভরিয়ে তোলে।

ঈশা খাঁর স্মৃতিবিজড়িত জঙ্গলবাড়ি

কিশোরগঞ্জ শহর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে করিমগঞ্জ উপজেলার নরসুন্দা নদীর তীরে বন-জঙ্গলঘেরা স্থানটি ‘জঙ্গলবাড়ি’। এ এলাকাটিই বারভুঁইয়া নেতা মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁ দ্বিতীয় রাজধানী ও দুর্গ হিসেবে ব্যবহার করতেন। তবে বর্তমানে অবশিষ্ট আছে কেবল উত্তর-দক্ষিণে লম্বা ইটের প্রাচীর দিয়ে ভাগ করা দুটি চত্বর। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে প্রাচীরটি ‘প্রাসাদ প্রাচীর’ নামে পরিচিত। এর দক্ষিণ প্রান্তে একটি তোরণ আছে। তোরণটির সামনে ‘করাচি’ নামে পরিচিত একটি পূর্বমুখী একতলা ভবন। এর উত্তরে তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ। তোরণের পেছনে ‘অন্দর মহল’ নামে একতলা দক্ষিণমুখী ভবন আছে। গোটা ইটের দেয়াল চুনকামসহ পাথর লেপন দিয়ে ঢাকা। সম্পূর্ণ নিরাবরণ। সামনে আছে লম্বা একটি পুকুর। মসজিদটির স্থাপত্যে মোগল প্রথাসিদ্ধ রীতির ছাপ রয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঈশা খাঁর স্মৃতিবিজড়িত জঙ্গলবাড়িকে সংরক্ষণের আওতায় এনে প্রত্নতত্ত্ব পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে।

চন্দ্রাবতী

চন্দ্রাবতী (১৫৫০-১৬০০) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম বাঙালি এবং মধ্যযুগীয় উপমহাদেশের প্রথম মহিলা কবি। তাঁর পিতা মনসা মঙ্গলকাব্যের অন্যতম রচয়িতা দ্বিজ বংশী দাস এবং মাতার নাম সুলোচনা। চন্দ্রাবতীর রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্য হলো: মলুয়া, দস্যু কেনারামের পালা, রামায়ণ। ড. দীনেশচন্দ্র সেন ১৯৩২ সালে চন্দ্রাবতীর রামায়ণ প্রকাশ করেন। লৌকিক, মানবিক ও কিছু মৌলিক উপাদান সংযোগের ফলে এই রামায়ণ কাব্যটি বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।

সুন্ধা গ্রামের জয়ানন্দ নামের এক বালকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ছোট্ট চন্দ্রার। একপর্যায়ে তাদের বিয়ের দিনও ধার্য হয়। জয়ানন্দের একমাত্র অভিভাবক তার মামা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় জয়ানন্দ ধর্মান্তরিত হয়ে অন্যত্র বিয়ে করেন। রাগে-দুঃখে নিজেকে শক্ত করলেন চন্দ্রা। নিজেকে শিব সেবা আর সাহিত্য সাধনায় নিমজ্জিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এ জন্য তার বাবা তার জন্য শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। যখন জয়ানন্দের বোধোদয় হয়, ততক্ষণে চন্দ্রা অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। এক সন্ধ্যায় জয়ানন্দ শিবমন্দিরে এসে চন্দ্রাকে অনেক ডাকলেও একাগ্রচিত্তে সাধনায় লিপ্ত চন্দ্রার কানে এ আওয়াজ যায়নি। অনেক পরে চন্দ্রা বুঝতে পারে দেবালয় কলুষিত হয়েছে। কলসি নিয়ে ফুলেশ্বরী (স্থানীয়) নদীতে গেলে জলে ভাসতে দেখে জয়ানন্দের লাশ। আবেগ ধরে রাখতে পারেনি চন্দ্রা। অবশেষে নদীতে ঝাঁপ দেয় চন্দ্রা তথা চন্দ্রাবতী নিজেও।

জয়ানন্দের গ্রাম সুন্ধা খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত পাটোয়ারী গ্রাম আজও আছে। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে উত্তর-পূর্Ÿ দিকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। আর আছে ফুলেশ্বরী নদীর ধারে চন্দ্রাবতীর পূজিত শিবমন্দির। মন্দিরের দেয়ালে অসংখ্য পোড়ামাটির অলংকরণ এঁকে সুশোভিত করে তুলেছে। ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক এ মন্দির দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রচুর দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মন্দিরটি সংরক্ষণ করছে।

ঈশা খাঁর স্মৃতিবিজড়িত জঙ্গলবাড়ি, সংগৃহীত

সরারচরেও রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

আগের নাম ফতেপুর হলে বর্তমানে সরারচর বলেই খ্যাত বাজিতপুর উপজেলার বাণিজ্যকেন্দ্র সরারচর। ভৌগোলিক দিক বিবেচনায় এই জনপদ নৌ, সড়ক, রেল ও হাওরাঞ্চলের নিকটবর্তী হওয়ায় এখানে দ্রুত বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। এখানকার প্রাচীন জীবনব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে কিছু প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন চোখে পড়বে। এর মধ্যে প্রাচীন বাড়ি, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট, মন্দির, মসজিদ, মাজার অন্যতম, যা বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায়, তৎকালীন কিছু শৌখিন মানুষের ধর্মের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের প্রতিফলন এবং তাদের সচ্ছল জীবনবিন্যাস।

জনশ্রুতি আছে সরারচরে যে কয়টি প্রাচীন স্থাপনা পাওয়া যায়, তার মধ্যে বেশির ভাগই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের। যাঁরা ছিলেন অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল, পেশায় ব্যবসায়ী। তেমনি একটি জোড়া মঠ রয়েছে সরারচর শিবনাথ স্কুলের ছাত্রাবাসের পাশে। এর আনুমানিক বয়স সম্ভবত ১৪০-১৬০ বছর। এই মঠটি নিয়ে তথ্য সংগ্রহে যত দূর জানা গেছে, কটিয়াদীর বাসিন্দা শিবনাথ সাহা এসে যখন এখানে স্কুল স্থাপনের ইচ্ছায় জায়গা ক্রয়ের প্রস্তাব করেছিলেন তখন এই জায়গার উত্তাধিকারীরা মঠের জায়গা বাদ দিয়ে স্কুলের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। আর এই জোড়া মঠটি ছিল প্রয়াত ডা. তারক বাবুর পিতা ও মাতামহ শ্রী রামনারায়ণ সাহা ও পত্নী দূর্গা রানী সাহার। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের অনেক সাক্ষ্য ধারণ করে আছে নিপুণ কারুকার্য খচিত এই মঠটি, যা আজ অযত্নে-অবহেলায় প্রায় ধ্বংসের পথে।

শিবনাথ স্কুলের নিকটবর্তী পশ্চিমে ও সরারচর রেলগেটের দক্ষিণ পূর্বকোণের কোনো একটি স্থানে একটি প্রাচীন মঠ ছিল, যা বছর দশেক আগে প্রকাশ্যেই বিনা বাধায় ভেঙে ফেলা হয়। সরারচর বাল্লা-কামালপুর প্রাইমারি স্কুলের আগে ও সরারচর এয়ারপোর্টের পশ্চিমে আফতাব হ্যাচারিসংলগ্ন রামচন্দ্র সাহা ও তাঁর পত্নীর জোড়া মঠ হয়েছে, যা সিরামিক ও নিপুণ কারুশৈলীতে পরিপূর্ণ। এই জোড়া মঠটি সরারচরের অন্য মঠগুলো থেকে সম্ভাব্য নবীন কিন্তু কারুকার্যে দৃষ্টিনন্দন। এই মঠের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাতব অংশগুলো ইতিমধ্যে চুরি হয়ে গেছে এবং দিন দিন এর স্থাপত্যশৈলী বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া সরারচরের কামালপুর, মজলিশপুর, নিলোখী, গোবিন্দপুর মৌজায় বেশ কিছু প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্থাপনা রয়েছে, যার ওপর পরিপূর্ণ গবেষণায় উঠে আসবে এই এলাকার প্রাচীন ইতিহাস।

সরারচরেও রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ছবিঃ চারপাশে

ভাগলপুর দেওয়ানবাড়ি মসজিদ ও শিলালিপি

কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলা থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে ১১০৫ হিজরি সনে দেওয়ান গাউস খান এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত করেন। মসজিদটি ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পরবর্তী সময়ে মসজিদটিকে পুনঃসংস্কার করা হয়। মসজিদের সামনের বারান্দাটি একটি আধুনিকায়ন এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নির্মাণকার্য সম্পন্ন করেন, মসজিদের ইমাম কোয়ার্টার ও দেয়াল প্রাচীর মসজিদ রিপিয়ারিং ভাগলপুর বিশিষ্ট শিল্পপতি আলহাজ জহুরুল ইসলাম সাহেব সম্প্রসারণ করে দেন। মসজিদের বর্তমান মাসিক ব্যয় দেওয়ানবাড়ি ও ইসলাম পরিবার থেকে বহন করা হচ্ছে। মসজিদটির নির্মাণশৈলী মোগল ও সেন বংশীয় স্থাপত্যের স্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে। সুনিপুণ সৌন্দর্যময় কারুকার্য চমৎকার। এ মসজিদটি এখনো প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় আসেনি। ভাগলপুর দেওয়ানবাড়ির তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব রয়েছে। মসজিদের পূর্বের দেয়ালে রয়েছে তিনটি এবং উত্তর-দক্ষিণের দেয়ালে দুটি দরজা। মসজিদের চার কোণে চারটি বড় কৌণিক মিনার রয়েছে। মসজিদে রয়েছে দুটি শিলালিপি।

দিল্লির আখড়া হাওর অন্যতম সেরা আকর্ষণ

দিল্লির আখড়া নামের মধ্যেই ঐতিহাসিক ছাপ। স্থানটি ভারতের দিল্লির কোনো অংশ নয়, কিশোরগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত মিঠামইন উপজেলার শেষ প্রান্তে এর অবস্থান। দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্মৃতিবিজড়িত এই দিল্লির আখড়াকে কেন্দ্র করে রয়েছে বিশাল খোলা জায়গা। আখড়ার চারদিকে এই বিশাল জায়গায় রয়েছে প্রায় তিন হাজার হিজলগাছ। প্রাচীন এই আখড়া আর হিজলগাছগুলো হাওরের এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি, যা সবাইকেই হাতছানি দিয়ে ডাকে। দিল্লির আখড়ার প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে জানা যায়, দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে সাধক নারায়ণ গোস্বামী এই আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। আখড়ার সেবায়েত বৈষ্ণবদের মতে, দিল্লি আখড়ার বর্তমান বয়স প্রায় সাড়ে ৪০০ বছর।

‘কিশোরগঞ্জের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, বিধঙ্গলের ‘রামকৃষ্ণ গোসাই’র মতাবলম্বী বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের আখড়ার মধ্যে মিঠামইনের দিল্লির আখড়াটি বিখ্যাত। হাওর এলাকার অন্যতম সেরা আকর্ষণ এই আখড়া। নদীর তীরে হিজলগাছের সারি, প্রাচীন দেয়াল ও অট্টালিকা, ভেতরে অপূর্ব সুন্দর পরিবেশে যেকোনো আগন্তুককে কাছে টানবে। আখড়ার ভেতরে রয়েছে আধ্যাত্মিক সাধক নারায়ণ গোস্বামী ও তাঁর শিষ্য গঙ্গারাম গোস্বামীর সমাধি। আরও রয়েছে ধর্মশালা, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকশালা ও বৈষ্ণবদের থাকার ঘর। আখড়ার দুই দিকে রয়েছে দুটি পুকুর। সাধক নারায়ণ গোস্বামীর অলৌকিক গুণের কথা শুনে দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীর এখানে এসে সাধক নারায়ণ গোস্বামীর নামে বিশাল এলাকা লাখেরাজ দিয়ে একটি আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। সে থেকে আখড়াটি ‘দিল্লির আখড়া’ নামে পরিচিত হয়ে আসছে। সম্রাট জাহাঙ্গীর ১২১২ সালে আখড়ার নামে একটি তামার পাত্রে ওই জমি লিখে দেন। কিন্তু ১৩৭০ সালে ডাকাতরা এই পাত্রটি নিয়ে যায় বলে আখড়ার সেবায়েতরা জানান। দিল্লির আখড়ায় প্রতি বছর ৮ চৈত্র মেলা বসে। এই মেলাকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের সবাই মেতে ওঠেন উৎসবে।

ইতিহাস সত্যের সত্য। ইতিহাস আমাদের সত্য শিক্ষার বিরাট এক ভান্ডার। কিন্তু কালক্রমে আমাদের অসচেতনতায় দেশ থেকে বিস্মৃত হতে বসেছে আমাদের গৌরবান্বিত ঐতিহ্যমণ্ডিত ইতিহাস। ইতিহাসের স্মৃতি ধরে রাখা দায় আমাদেরই।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫

সারোয়ার আলম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top