নির্মাণকাজের জন্য যে নির্দিষ্ট সাইট নির্বাচন করা হয়, প্রাথমিক পর্যায়ে সাইটগুলো নির্মাণ কাজের উপযোগী থাকে না। বাস্তবে আমরা তো এমন অনেক প্রকল্প দেখেছি, যেখানে নির্মাণ তো দূরের কথা, সাইটে পৌঁছানোই অনেক কষ্টের কাজ। আবার এমন কিছু দুর্গম সাইট থাকে, যেখানে অনেক পরিশ্রমের পরে পৌঁছানো গেলেও দেখা যায় সাইটটি কয়েক হাত পানির নিচে অথবা বিশাল মাটির স্তূপ। তাই নির্মাণকাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সাইটের নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতিগুলোকে ব্যবহারের উপযোগী ও কার্যময় রাখার কৌশলকে নির্দিষ্ট সাইটের মবিলাইজেশন (Mobilization) বলা হয়।
নির্মাণসামগ্রী কাদা, আবর্জনা, গাছপালা, লতাপাতা বা অনুরূপ ক্ষতিকারক পদার্থের সংস্পর্শে যাতে ব্যবহারের অনুপযোগী না হয়ে পড়ে এবং যন্ত্রপাতিসমূহ মরিচা, ধুলাবালি, বৃষ্টি বা রৌদ্রের কারণে কার্যক্ষমতা নষ্ট না হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়। গৃহীত এই ব্যবস্থাকেই যন্ত্রপাতি ও মালামালের মবিলাইজেশন বলা হয়। সাধারণত ঠিকাদার নিজের খরচে প্রকল্প এলাকায় মবিলাইজেশনের ব্যবস্থা করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই খরচ বাঁচানোর জন্য তড়িঘড়ি করে মবিলাইজেশনের কাজ সারতে চায়। ফলে প্রকৃত মবিলাইজেশনের সব সুবিধা থেকে প্রকল্পের কর্মকর্তা, কর্মচারী, লেবার বঞ্চিত হয়ে কাজ হয় বাধাগ্রস্ত। তাই বর্তমানে অনেক ব্যক্তিমালিকানাধীন, বহুজাতিক নির্মাণপ্রতিষ্ঠান কাজের শুরুতে মবিলাইজেশনের জন্য আলাদা বাজেটে ব্যবস্থা করে থাকে। যার ফলে মবিলাইজেশনের কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়।
সাইট মবিলাইজেশনের জন্য মালামাল ও যন্ত্রাংশ
- ইট
- বালু
- সিমেন্ট
- সিআই সিট
- মেইন গেট
- ওশি
- কুড়াল
- বেলচা
- কোদাল
- বৈদ্যুতিক বাতি
- ইলেকট্রিক তার
- ফায়ার বাকেট
- ফায়ার অ্যালার্ম
- টর্চলাইট
- ইলেট্রিশিয়ান
- পেরেক
- সুতা
- পানির গ্লাস
- প্যান
- ড্রাম
- জগ
- মগ
- চুলা
- ইলেকট্রিক বোর্ড, সুইচ সকেট
- টেবিল
- চেয়ার
- বাঁশ
- ঝাড়ু
- প্যাভেস্টাল ফ্যান
- জিআই তার
- কাপ-পিরিচ সেট
- ফ্ল্যাক্স
- ফাস্ট এইড বক্স
- টয়লেটের জন্য রিং
- ছাতা
- নোটিশ বোর্ড
- আগ্নিরোধক যন্ত্রপাতি (ফায়ার এক্সটিংগুইশার)
তবে অবস্থান ও কার্যশ্রেণিভেদে আরও মালামাল ও যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হওয়াটাই স্বাভাবিক। মবিলাইজেশনের কাজ সম্পাদন করতে যে বিষয়গুলো অনুসরণ করতে হবে-
- প্রথমে প্রকল্প এলাকায় সাইটের প্রপার্টি লাইন বরাবর একটি অস্থায়ী বাউন্ডারি নির্মাণ করতে হবে। সেটা নির্ভর করবে প্রকল্প মেয়াদের ওপর। যেমন- দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হলে ইটের গাঁথুনি দিয়ে করা যায় অথবা গ.ঝ ইড়ী বা এক্সেলের সাহায্যে স্টিল সিট দিয়ে করা যায়। স্বল্পমেয়াদি হলে সিআই সিট বা বাঁশের তৈরি বাউন্ডারি ব্যবহার করা যায়। আবার প্রাইম লোকেশনে খুবই দৃষ্টিনন্দন অস্থায়ী বাউন্ডারির জন্য লাইটিং বোর্ড এসিপি প্লাস্টিক বোর্ড এসএস সিটের সীমানা করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
- প্রকল্পের মধ্যে কোনো ইউটিলিটি লাইন থাকলে তার সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন- বৈদ্যুতিক খুঁটি, ড্রেন লাইন প্রভৃতি।
- কোনো ছোট বা বড় গাছপালা থাকলে সেগুলোকে কাটতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে যদি গ্রিন এরিয়ার মধ্যে বড় কোনো দামি বা ভালো গাছ থাকে আর সেটার জন্য যদি নির্মাণকাজে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হয়, তাহলে ইচ্ছা করলে সেটা রেখেও নির্মাণকাজ করা যায়।
- সম্পূর্ণ সাইট এরিয়ায় সব আগাছা মুক্ত করে, মাটি সমতল করে প্রাথমিক ড্রেসিং করতে হবে।
- লেবার সেট মালামাল রাখার গুদামঘর বা স্টোর রুম, বাথরুম, সাইট অফিস, কিচেনের নির্মাণকাজ করতে হবে।
- সব ইউটিলিটি কানেকশন করাতে হবে এবং পানি, বিদ্যুৎ যেখানে গ্যাস লাইন আছে তা দ্রুত অস্থায়ী স্থাপনার মাধ্যমে নির্মাণ সাইটে সংযুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে টেলিফোন, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেট লাইন চালু করতে হবে।
- বাউন্ডারি করার সময় সাইটে মালামাল প্রবেশ করানোর জন্য উত্তম লোকেশনে সম্মুখে বা রাস্তার সঙ্গেই প্রশস্ত একটা মেইন গেট সম্ভব হলে লেবার বা অন্যান্য সবার প্রবেশের জন্য পকেট গেটের ব্যবস্থা করতে হবে।
- কখনো যদি কোনো পুরোনো বিল্ডিং ভেঙে নতুন নির্মাণকাজ করতে হয়, সে ক্ষেত্রে মবিলাইজেশনের সময় সব ইউটিলিটি সংযোগলাইন (ডিসকানেক্ট) বিচ্ছিন্ন করতে হবে। ভবনের চারপাশে স্কাফোল্ডিং করে চট দিয়ে চারদিকে ঘিরে নিয়ে ওপর থেকে বিল্ডিং ভাঙার কাজ শুরু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত দামি মালামাল আগেই সরাতে হবে। তারপরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধাপে ধাপে ভাঙা এবং রাবিশ সরানোর কাজ করতে হবে।
- নির্মাণকাজের দরুন বা প্রয়োজনের ওপর যদি অন্য কোনো অস্থায়ী রাস্তা নির্মাণের প্রয়োজন হয় তা দ্রুত শেষ করতে হবে।
- মবিলাইজেশনের পরেই নির্মাণকাজের শুরু হয় তাই নির্মাণ শুরুর পরে প্রয়োজন হতে পারে এমন যেকোনো কাজ যদি মবিলাইজেশনের আওতাভুক্ত হয় তা সম্পূর্ণ করে সাইটকে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার জন্য পরবর্তী স্টেজে ছেড়ে দিতে হবে।
সাইট মবিলাইজেশনের কাজ শেষ হলে প্রকল্পের লে-আউট দেওয়া হয়। সে জন্য দক্ষ জনবলের ব্যবস্থা, সাইট অফিস চালু, সব ডকুমেন্টেশন এবং মালামাল স্টোরে মজুদ করার প্রয়োজন হয়। আর এভাবেই পরবর্তী সময়ে মাটি কাটা, পাইলিং করা, পাইল কাট অব লেন্থ ভাঙা, পাইল ক্যাপের মাটি কাটা, সি সি কাস্টিং, রড বাঁধা, ফাউন্ডেশন ঢালাই, কলাম, রিটেইনিং ওয়াল সাটারিং, ঢালাই, ছাদ ঢালাই, গাঁথুনি এবং এভাবেই ফিনিশিং শেষে প্রজেক্ট হ্যান্ড ওভার করা হয়। কিন্তু যদি সর্বপ্রথমেই মবিলাইজেশনের কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করা হয় তাহলে যেসব সুবিধা প্রকল্প চলাকালীন পাওয়া যায়-
- সহজগম্যতায় মালামাল স্টোর করা এবং ব্যবহার করা
- ব্যবহার দ্রুততার সঙ্গে করা অথবা মিক্সার মেশিন বা রুফহোয়েস্টের এমন স্থান নির্বাচন যেন সহজেই সব মালামাল উত্তোলন করা এবং নামানো যায়
- অফিস স্টাফ, সাপ্লায়ার, কন্ট্রাক্টর, লেবার, ফায়ারম্যানসহ সবার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা
- যেকোনো ছোট-বড় নির্মাণ মেশিনারিজ দ্রুত ব্যবহার করতে পারা
- লেবারদের থাকা, খাওয়া, গোসল বা বাথরুমের জন্য উত্তম পরিবেশ সৃষ্টি
- নির্মাণকাজের নির্মাণ সময় কমানো।
সর্বোপরি ঝুঁকিমুক্ত সহজগম্য ও আরামদায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই সাইট মবিলাইজেশনের উদ্দেশ্য। তাই দক্ষতার সঙ্গে সাইট মবিলাইজেশনের কাজটা সম্পন্ন করতে পারলে প্রকল্পের প্রতিটি পর্যায়ে তার সুফল পাওয়া যায়। তাই একটা বৃহৎ নির্মাণের সার্বিক দিক বিবেচনায় হয়তো সাইট মবিলাইজেশন যতই সামান্য হোক কিন্তু কম গুরুত্বের নয়।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫