আগামী ২০২০ সালের পর থেকে জার্মানিসহ আরও কয়েকটি দেশ জিরো-এনার্জি হাউস বাধ্যতামূলক করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ এ সময়সীমার পর কোনো নতুন বাড়ি বা ভবনে সরকার বা কোনো কোম্পানি বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জ্বালানির সংযোগ দিতে পারবে না। আরও সহজ করে বলতে গেলে বলা যায়, প্রতিটি নতুন ভবন বা বাড়ির প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাড়ি বা ভবনেই উৎপাদন করতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণমুক্ত দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে। তারা তাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে যে এই নির্ধারিত সময়ের পর এসব দেশ থেকে আর কোনো কার্বন নিঃসরণ ঘটবে না। এর বদলে ব্যবহৃত হবে বিকল্প জ্বালানি। এমনই এক অভিনব বিকল্প জ্বালানি বায়ো-রিঅ্যাক্টর।
বাড়ি বা কলকারখানার ছাদের সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে সম্প্রতি আরও যুক্ত হয়েছে সৌর সড়ক, সৌরশক্তি থেকে হাইড্রোজেন উৎপন্ন করার জন্য কৃত্রিম পাতা বায়োনিক লিফসহ এ রকম আরও কত-কী! ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও যন্ত্রপাতিতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ঘরবাড়ির ডিজাইনেও পরিবর্তনের পাশাপাশি এসেছে নতুনত্ব। বাড়ির ছাদে সাধারণ টালির বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এমন টালি। মজার বিষয় হচ্ছে, এসব কিছুর মধ্যে খুব সাধারণ কিছু মিল রয়েছে আর তা হচ্ছে প্রথমত, এই পদ্ধতিগুলোর কোনোটিই কার্বন উৎপাদন বা নিঃসরণ করে না; দ্বিতীয়ত, সব পদ্ধতিই সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল; তৃতীয়ত, কোনোটিতেই কোনো প্রকার জৈব উপাদান ব্যবহৃত হয় না। তার মানে এই নয় যে জৈব উপাদান ব্যবহার করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্য কোনো শক্তি উৎপাদন সম্ভব নয়। এর প্রমাণ হচ্ছে সোলার লিফ ফ্যাসাদ (Solar Leaf Facade)। এই সোলার লিফ ফ্যাসাদ ২০১৩ সালে প্রথম প্রদর্শিত হয় জার্মানির হামবুর্গে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল বিল্ডিং এক্সিবিশনে। এটাকে বিশ্বের প্রথম কোনো ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত জৈব-চুল্লি বা বায়ো-রিঅ্যাক্টর হিসেবে দাবি করে এর উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান। এখানে অতি ক্ষুদ্র শেওলা-জাতীয় জৈবকে ব্যবহার করে বায়োমাস ও তাপ উৎপাদন করা হয়। এসব শেওলা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। ফলে দ্রুত বৃদ্ধি পায় ও তাপ উৎপন্ন করে। এই জৈব-চুল্লি অনেকগুলো ছোট অংশে বিভক্ত এবং এর একেকটি অংশ বছরে প্রায় ২ দশমিক ৫ টন কার্বন বাতাস থেকে শোষণ করতে সক্ষম-বিশ^াস এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের।
বায়ো-রিঅ্যাক্টর তথা সোলার লিফ ফ্যাসাদ হচ্ছে বায়োমাস ব্যবহার করে প্রথম বিকল্প শক্তির উৎস, যেটাকে বাড়ি বা ভবনে স্থাপন করা যায়। আলো থেকে তাপ উৎপাদন পদার্থবিদ্যার বেশ পুরোনো একটা পদ্ধতি, যেটা সাধারণত সোলার থার্মাল ডিজাইনে ব্যবহার করা হয়। অন্য দিকে আলো থেকে বায়োমাস হচ্ছে একটা প্রাণরসায়ন বিক্রিয়া, যেখানে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যায় এ রকম শেওলা-জাতীয় বস্তু ব্যবহার করে উৎপন্ন করা হয়। এ ধরনের ক্ষুদ্র শেওলার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অন্যান্য উদ্ভিদের চেয়ে এরা সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে দ্রুত বাড়তে পারে। কারণ, এসব ক্ষুদ্র শেওলা হচ্ছে এককোষী প্রাণী। আর প্রতিটি কোষ দিনে দুইবার বিভাজিত হয়, ফলে এরা গাণিতিক হারে বাড়ে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে বায়োমাস সংগ্রহ করে। শুকনো এক গ্রাম বায়োমাস থেকে ২৩ থেকে ২৭ কিলো জুল শক্তি পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে এসব বায়োমাসকে প্রসাধন ও ওষুধশিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে অথবা পশুখাদ্য বা খাদ্যের সম্পূরক হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। শেলের ঘনত্বের ওপর নির্ভর করে কালচার মিডিয়ামের স্বচ্ছতা ১০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
কয়েক বছর আগে দেখা গেছে জার্মানিতে ফটোভোল্টাইক ও সোলার থার্মাল সিস্টেম ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করা হয়েছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে বায়োমাস ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করা হয়েছিল ৮ শতাংশ। ফটোভোল্টাইক ও সোলার থার্মাল সিস্টেম ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে তা সঞ্চয় করতে হলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ব্যয়বহুল ব্যাটারির ব্যবহার। পক্ষান্তরে বায়োমাস থেকে শক্তি উৎপাদন করে সংরক্ষণের জন্য ব্যাটারির মতো ব্যয়বহুল কোনো স্টোরেজের প্রয়োজন হয় না।
কীভাবে কাজ করে এই সোলার লিফ? ভবনের ফ্যাসাদের দেয়ালের ওপর যখন একটি সোলার লিফ প্যানেল অর্থাৎ একটি বায়ো-রিঅ্যাক্টর বসানো হয় তখন এটি একটি রেইন স্ক্রিনের মতো কাজ করে। একটি দেয়ালে পুরো দেয়ালজুড়ে একটি সোলার লিফ প্যানেল না বসিয়ে ছোট ছোট অনেক প্যানেল বসানো হয়। সাধারণত এসব প্যানেল উচ্চতায় ২ দমমিক ৫ মিটার আর প্রস্থে শূন্য দশমিক ৭ মিটার হয়ে থাকে এবং প্রয়োজন হলে একে বিভিন্নভাবে প্রসারিত করা যায়। এসব প্যানেল যাতে সর্বোচ্চ সময় সূর্যের আলোর সংস্পর্শে থাকতে পারে সে জন্য বিভিন্ন দিকে ঘোরানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। যখন সোলার লিফ প্যানেল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকে তখন এর বাইরের আবরণটি থার্মাল বাফার হিসেবে কাজ করে।
একটা সোলার লিফ প্যানেল হয় অনেকগুলো কাচের স্তরবিশিষ্ট। আসলে এর কার্যক্ষমতা বাড়াতে ও ফ্যাসাদের ডিজাইনের যে সৌন্দর্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে তা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে কারণে অনেক কাচের স্তর ব্যবহার করা হয়। প্যানেলের ভেতরে ১৮ মিলিমিটার প্রশস্ত একটি খালি জায়গা থাকে, যেখানে শেওলাগুলো ২৪ লিটার পানির মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে এবং তাদের বৃদ্ধি ঘটায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত ও তাপ নিরোধক করতে বায়ো-রিঅ্যাক্টরের সামনে ও পেছনে দুটি লেমিনেটেড সেফটি গ্লাস বসানো হয়। প্রতিটি বায়ো-রিঅ্যাক্টরের ভেতর নিচের দিক থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর কিছু বাতাস প্রবাহিত করা হয়। ফলে বাতাসের চাপে বড় বড় বুদবুদ হয়ে পানি ওপরের দিকে উঠতে থাকে। এতে করে ভেতরে থাকা শেওলাগুলো আন্দোলিত হয় ও কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করতে থাকে। একই সঙ্গে কাচের ভেতরের দিকটিও পানি ও বাতাসের চলাচলের কারণে পরিষ্কার হয় এবং খালি চোখে ভেতরের অংশ দেখা যায়।
এই বায়ো-রিঅ্যাক্টরের আরেকটা বিশেষ সুবিধা হচ্ছে এর কর্মদক্ষতার তুলনায় রক্ষণাবেক্ষণ-প্রক্রিয়া খুবই সহজ এবং খরচ একেবারেই নগণ্য। এর কালচার মিডিয়ায় বায়ু ও পানির প্রতিটি ইন-ফ্লো ও আউট-ফ্লো সার্ভিসিং পাইপ সোলার লিফের সাব-স্ট্রাকচারের সঙ্গেই যুক্ত থাকে। এটা মূলত চক্রাকার পদ্ধতিতে কাজ করে এবং প্লান্ট রুমের সঙ্গে যুক্ত থাকে। আর নিয়ন্ত্রণ করা হয় ভবনের নির্দিষ্ট একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে। যেখান থেকে ভবনে ব্যবহৃত অন্যান্য শক্তি যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এখান থেকেই শেলের ভেতর শেওলার ঘনত্ব ও কালচার মিডিয়ায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয়। বায়ো-রিঅ্যাক্টর থেকে যে তাপ উৎপন্ন হয় তা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। এই তাপকে কোনো সময় পানি গরম করার কাজে ব্যবহার করা হয় আবার কোনো সময় ভূ-গর্ভস্থ জিও-থার্মাল সিস্টেমে ব্যবহার করা হয়। এটা একবার চালু করা হলে তা বছরজুড়ে চলতে থাকে আর আলো থেকে প্রাপ্ত শক্তির প্রায় ১০ শতাংশ বায়োমাস হিসেবে এবং ৩৮ শতাংশ শক্তিকে তাপে রূপান্তর করতে পারে। যদি ফটোভোল্টাইক সোলার শেলের কর্মদক্ষতার সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে দেখা যায়, ফটোভোল্টাইক সোলার শেল সূর্যের আলোর ১২ থেকে ১৫ শতাংশ অন্য শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে। অথচ এই বায়ো-রিঅ্যাক্টর ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ অন্য শক্তিতে রূপান্তর করে। তা ছাড়া এটি বাসাবাড়ি থেকে বা অন্য কোনো উপায়ে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসকে শোষণ করে বায়োমাসে রূপান্তর করে, যা বায়ুতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এক বছরে ২০০ বর্গমিটারের একটি বায়ো-রিঅ্যাক্টর যে পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম:
| বায়োমিথেন প্রোডাকশন | ৬১২ ঘন মিটার |
| মিথেন থেকে প্রাপ্ত শক্তি | ৬৪৮৭ কিলো ওয়াট ঘণ্টা |
| মিথেন হিসেবে প্রাপ্ত নিট শক্তি | ৪৫১৪ কিলো ওয়াট ঘণ্টা (প্রায়) |
| তাপ হিসেবে প্রাপ্ত নিট শক্তি | ৬০০০ কিলো ওয়াট ঘণ্টা (প্রায়) |
| কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস শোষণ | ০৬ টন |
প্রতি বর্গমিটারের একটি বায়ো-রিঅ্যাক্টরের সাধারণ তথ্য:
| বায়োমাস প্রোডাকশন | ৯০০ কেজি প্রতি এক বছরে |
| বায়োমাস থেকে উৎপাদিত শক্তি | ৩৪৫ কিলো জুল/বর্গমিটার/দিন |
| বায়োমাস থেকে উৎপাদিত মিথেন গ্যাস | ১০.২০ লিটার/বর্গমিটার/দিন |
বায়োমাসে প্রচুর পরিমাণে শক্তি উৎপাদনকারী উপাদান রয়েছে। এই রিঅ্যাক্টরে উৎপাদিত বায়োমাস যে শুধু শক্তি উৎপাদনের কাজেই লাগবে তা কিন্তু নয়। এসব বায়োমাসের খাদ্য ও ওষুধশিল্পেও রয়েছে অনেক চাহিদা। তবে এর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে শুরু থেকেই প্রয়োজন একটা সামগ্রিক সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯২তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭।