‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’ শীর্ষক বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, তার মধ্যে একটি বাংলাদেশ। মাত্রাতিরিক্তি ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, কলকারখানা, নির্মাণকাজসহ নানা কারণে সৃষ্টি হচ্ছে বায়ুদূষণ। আর বায়ুদূষণের জন্য সৃষ্ট বিভিন্ন রোগ যেমন, হৃদ্্রোগ, শ্বাসকষ্টজনিত জটিল সমস্যা, ক্যানসার ও ফুসফুসের সংক্রমণে ভুগে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চমে। এসব রোগের কারণে ২০১৭ সালে সারা দেশে মারা যায় ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ। ভয়াবহ এই নীরব ঘাতক থেকে বাঁচতে বন্ধ করতে হবে দূষণের যত উৎস। কিন্তু তা করলে উন্নয়ন ব্যাহত হয়ে দেশ অচল হয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে দূষণের মাত্রা অনেকটাই কমানো সম্ভব। দূষিত বায়ু থেকে বাঁচতে অত্যন্ত কার্যকর যন্ত্র এয়ার পিউরিফায়ার বা বায়ু পরিষোধক যন্ত্র। এই যন্ত্র ব্যবহার করে শিল্প-কারখানা, অফিস ও বাসাবাড়ির বায়ু অনেকটাই দূষণমুক্ত করা সম্ভব।
বায়ুদূষণের নেপথ্যে
এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি বা ইপিএ-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ের বায়ুদূষণ সংঘটিত হয়, বাতাসে ফটোকেমিক্যাল অক্সিডেন্ট, কার্বন মনো-অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সিসা প্রভৃতির মতো ক্ষতিকর কণা (Particulate Matter) যুক্ত হওয়া। এসব জনস্বাস্থ্য, বায়ুমণ্ডল ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দ্বিতীয় পর্যায়ের দূষণ হচ্ছে বিষাক্ত বায়ু। এখন পর্যন্ত বায়ুকে বিষাক্ত করে এ রকম ১৮০টিরও বেশি উপাদান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের জৈব রাসায়নিক, উদ্বায়ী জৈব যৌগ, ধাতু এবং যৌগিক ধাতু, জ্বালানি, দ্রাবক, পারদ, আর্সেনিক, অ্যাসবেস্টস, বেনজিনসহ আরও অনেক কিছু। বায়ুতে এ ধরনের পদার্থের খুবই ক্ষুদ্রতম উপস্থিতিও স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তৃতীয় পর্যায়ের বায়ুদূষক হচ্ছে গ্রিনহাউস গ্যাস। যেমন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লুরোকার্বন, মিথেন ও ওজোন। এ ধরনের উপাদান যেমন মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি বায়ুমণ্ডল ও পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। এসব উপাদানের মূল উৎস হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা। পণ্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে বায়ুদূষণকারী এসব উপাদান উৎপন্ন হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশ্রিত হয়।
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে যত পদ্ধতি
সব ধরনের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো একটি সাধারণ যন্ত্র বা ব্যবস্থা নিলেই হয় না বরং বায়ুদূষণকারী পদার্থের ধরনের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে শিল্প-কারখানায়। কারণ, শিল্প-কারখানায় একেকটি পণ্য উৎপাদিত হয় একেক ধাপে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সাধারণত যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতমÑ
- কম্বাস্টন (Combustion) বা জ্বলন পদ্ধতি
- কনভার্শন (Conversion) বা পরিবর্তিত পদ্ধতি
- কালেকশন (Collection) বা সংগ্রহকরণ পদ্ধতি
কম্বাস্টন বা জ্বলন পদ্ধতিতে বায়ু দূষণকারী উপাদানসমূহ ধ্বংস করে ফেলা হয়, তাই তা বায়ুমণ্ডলে মিশে কোনো ক্ষতি করতে পারে না। অন্যদিকে কনভার্শন পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পদার্থসমূহকে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বা নিস্ক্রিয় পদার্থে পরিণত করা হয়। আবার যখন দূষণকারী উপাদানকে উপজাত বায়ু থেকে সরিয়ে বায়ুমণ্ডলে বা পরিবেশে ছাড়া হয় তখন এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কালেকশন বা সংগ্রহ পদ্ধতি। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ধরন অর্থাৎ কী ধরনের বর্জ্য উৎপাদন করে তার ওপর ভিত্তি করে বায়ুদূষণরোধী এক বা একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সাধারণত বায়ুদূষণকারী অপসারণ বা হ্রাসের জন্য নিচের ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা হয় সেগুলো হচ্ছে-
- স্ক্র্যাবার (Scrubber)
- এয়ার ফিল্টার (Air Filter)
- সাইক্লোন (Cyclones)
- ইলেকট্রস্ট্যাটিক প্রেসিপিটেটর (Electrostatic Precipitator)
- মিস্ট কালেক্টর (Mist Collector)
- ইনসিনেরেটর (Incinerator)
- ক্যাটালাইটিক রি-অ্যাকটর (Catalytic Reactor)
- বায়োফিল্টার (Biofilter)
স্ক্র্যাবার
শিল্প-কারখানায় বহুল ব্যবহৃত বায়ুদূষণরোধক হচ্ছে স্ক্র্যাবার। শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত দূষিত বাতাসে যেসব বায়ুদূষক বিভিন্ন বস্তুকণা ও গ্যাস মিশ্রিত থাকে, তা ইন্ডস্ট্রিয়াল এয়ার স্ক্র্যাবারের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে ছাড়ানোর আগে পরিশোধন করা হয়। সাধারণত দুই ধরনের স্ক্র্যাবার ব্যবহার করা হয়। যেমন, ড্রাই স্ক্র্যাবার এবং ওয়েট স্ক্র্যাবার। ড্রাই স্ক্র্যাবার শুষ্ক পরিশোষণ স্ক্রাবার নামেও পরিচিত। এটি যেসব শুষ্ক রাসায়নিক পদার্থ বায়ুদূষণ করে, সেই সব পদার্থকে এমনভাবে পরিবর্তন করে, যেন তারা অক্ষতিকর বা নিস্ক্রিয় পদার্থে পরিণত হয় যেমন, সোডিয়াম কার্বনেট। এই রকম পরিবর্তন করে শিল্প উপজাত বায়ু বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে তার দূষণের পরিমাণ অনেক কমিয়ে ফেলা সম্ভব হয়। রাসায়নিক বিক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে, স্ক্র্যাবার চেম্বারের মধ্যে থাকা ফিল্টারগুলো কল-কারখানার দূষিত নির্গমন গ্যাস থেকে ক্ষতিকর এজেন্টগুলো সংগ্রহ ও অপসারণ করে। অনেক ক্ষেত্রেই সংগ্রহকৃত বা অপসৃত এজেন্টগুলো পুনরায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ রকম সম্ভব না হলে স্ক্র্যাবিং বর্জ্যটি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ধ্বংস করা হয়। সাধারণত, ড্রাই-স্ক্র্যাবারগুলো শিল্প ক্ষেত্রে নির্গত অ্যাসিড গ্যাস অপসারণ বা প্রতিরোধ করতে ব্যবহৃত হয়। ড্রাই-স্ক্র্যাবিং প্রক্রিয়া চলাকালীন এজেন্টগুলোকে নিউট্রাল করে ফেলার ফলে সৃষ্ট রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো নির্গমনের অম্লতা হ্রাস করে এবং বায়ুদূষণকারী এজেন্ট বা উপাদান অপসারণ করে।
অন্য দিকে ওয়েট স্ক্র্যাবার, যা আর্দ্র পরিশোষণ স্ক্র্যাবার বা ওয়েট কালেক্টর নামেও পরিচিত। এ ধরনের স্ক্র্যাবার সাধারণত শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত দূষিত জলীয় পদার্থ বা পানিতে দ্রবণীয় বিভিন্ন ধরনের গ্যাসকে পৃথক করার কাজে ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে হয় দূষিত জলীয় পদার্থকে কোনো গ্যাসীয় পদার্থের ভেতর দিয়ে চালনা করা হয় অথবা কোনো দূষিত গ্যাসীয় পদার্থকে কোনো তরলের ভেতর দিয়ে চালনা করা হয়। যেন দূষিত গ্যাস জলীয় পদার্থের সংস্পর্শে এসে অথবা দূষিত তরল গ্যাসীয় পদার্থের সংস্পর্শে এসে তার ভেতরে থাকা ক্ষতিকর পদার্থকে হয় আলাদা করে ফেলে অথবা শোষণ করে নেয়। বাজারে সাধারণত তিন ধরনের ওয়েট স্ক্র্যাবার পাওয়া যায়। যেমন, ভেনচুরি, প্যাকড বেড বা টাওয়ার এবং বাবলিং স্ক্র্যাবার।
এয়ার ফিল্টার
বায়ুদূষণ রোধে শিল্প-কারখানায় বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি হচ্ছে এয়ার ফিল্টার। এয়ার ফিল্টারে বায়ুদূষকের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত উপাদানে তৈরি প্রয়োজনীয় মাপের বিভিন্ন ধরনের ফিল্টার ব্যবহার করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাপড় বা ধাতব জালি অথবা সিরামিকের ছাঁকনি ব্যবহার করে দূষিত বতাস থেকে ধুলা, রাসায়নিক, জীবাণুসহ এ ধরনের বিভিন্ন বায়ুদূষককে আলাদা করে ফেলা হয়। এ ধরনের ফিল্টার শুধু শিল্প-কারখানায় ব্যবহার করা হয় তা নয়, বরং বাসগৃহ অথবা বাণিজ্যিক ভবনেও এ ধরনের ফিল্টার ব্যবহার করে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। তবে শিল্প-কারখানা যেহেতু বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস, সেহেতু এখানে উৎপাদিত দূষিত বায়ু বায়ুমণ্ডলে মিশে যাওয়ার আগেই তা পরিশোধন করার ব্যবস্থা রাখা হয়। এই পরিশোধন কাজে সাধারণত হেপা ফিল্টার, ফেব্রিক ফিল্টার এবং কার্টিজ ডাস্ট কালেক্টর ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত হাই ইফিসিয়েন্সি পার্টিকুলেট এয়ার ফিল্টারকে সংক্ষেপে হেপা ফিল্টার বলা হয়। এই ধরনের ফিল্টারে সাধারণত ফাইবার গ্লাসে নির্মিত একধরনের ফিল্টার ম্যাট ব্যবহার করা হয়। এই ফিল্টার ম্যাটের মাধ্যমে বিভিন্ন বায়ুবাহিত কণা, ধোঁয়া, ধুলাসহ বিভিন্ন জৈবদূষক বায়ু থেকে আলাদা করা হয়। সাধারণত এই হেপা ফিল্টার ০.৫ মাইক্রো মিটার থেকে ২.০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত দূষিত কণা বায়ু হতে পৃথক করতে পারে। যখন কল-কারখানার দূষিত বায়ুকে এই হেপা ফিল্টারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয় তখন এর ভেতরে থাকা ফিল্টার ম্যাটে দূষিত কণাগুলো আটকে যায়। এর মধ্যে থাকা গ্যাসের সাথে ক্ষুদ্র কণাগুলো যখন ঘর্ষণ খায়, তখন তাদের গতি কমে যায় এবং তা সহজেই ফিল্টার ম্যাটে আটকা পড়ে। যদিও অনেক হেপা ফিল্টার সর্বনিম্ন ০.৩ মাইক্রো মিটার ব্যাসের বস্তুকণা আটকে ফেলতে পারে। তারপরও এ ধরনের ফিল্টার অন্যান্য বায়ুদূষণমুক্তকারী যন্ত্র যেমন, আলট্রাভায়োলেট লাইট, আয়োনাইজার অথবা অ্যাক্টিভেটেড কার্বন এয়ার ফিল্টারের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
বায়ু শোধনের জন্য আরেক ধরনের যে এয়ার ফিল্টার ব্যবহার করা হয়, তাকে ফেব্রিক ফিল্টার বলে। অনেক সময় এটাকে ব্যাগহাউসও বলা হয়ে থাকে। কারণ, এ রকম এয়ার ফিল্টার দেখতে অনেকটা সিলিন্ডার আকৃতির ব্যাগের মতো। বিভিন্ন শিল্পের দূষিত উপজাত বায়ুকে এই ব্যাগের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। ফলে বাতাসে থাকা বিভিন্ন ধরনের বায়ুদূষণকারী আণুবীক্ষণিক পদার্থ এই ব্যাগের ভেতর আটকে যায়। পরে আটকে যাওয়া পদার্থগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর ব্যাগ থেকে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ব্যাগহাউসে সংগৃহীত বায়ুদূষণকারী পদার্থগুলোকে বের করার জন্য কোনো সময় এটিকে ঝেড়ে ফেলা হয়, আবার কখনো উল্টো দিক থেকে কম্প্রেসড বায়ু বা স্বাভাবিক বায়ু প্রবাহিত করা হয়। এর ফলে ব্যাগে জমা হওয়া পদার্থগুলো ব্যাগের নিচের দিকে থাকা একটি হপারে গিয়ে জমা হয় এবং এটি আবার কাজ করার জন্য পরিষ্কার হয়ে যায়। আর হপারে জমা হওয়া বস্তুগুলোকে তাদের ধরন অনুযায়ী হয় ধ্বংস করে ফেলা হয় অথবা পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়। এ ধরনের ফেব্রিক ফিল্টার সাধারণত পাওয়ার প্ল্যান্ট, রি-রোলিং মিল, মেটাল প্রসেসিং সেন্টার বা ফাউন্ড্রির মতো শিল্পে অন্যান্য এয়ার ফিল্টারের সঙ্গে এ ধরনের ফেব্রিক এয়ার ফিল্টারও ব্যবহার করা হয়।
ব্যাগহাউসের মতো আরেক ধরনের এয়ার ফিল্টার বায়ু শোধনের জন্য ব্যবহার করা হয়, যাকে কার্ট্রজি ডাস্ট কালেক্টর বলা হয়। এই কার্ট্রজি ফিল্টার আর ব্যাগহাউসের কার্যপদ্ধতি প্রায় একই রকম। এ ধরনের ফিল্টারে ব্যাগের পরিবর্তে একধরনের কার্ট্রজি ব্যবহার করে বায়ু থেকে দূষিত পদার্থ পৃথক করা হয়। এই ফিল্টাকেও নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিষ্কার করতে হয়। কিন্তু এর সুবিধা হচ্ছে কার্ট্রেিজর ধরন অনুযায়ী এর কর্মদক্ষতা ফেব্রিক ফিল্টারের চেয়ে অনেক বেশি। এটি ফেব্রিক ফিল্টারের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম পদার্থ আটকাতে পারে।
আরেকটি বহুল ব্যবহৃত বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র হচ্ছে সাইক্লোন ডাস্ট কালেক্টর। এটিও এয়ার ফিল্টারের মতোই কাজ করে। সাধারণত বাতাসে ভেসে বেড়ানো বিভিন্ন ধরনের শুকনো বস্তুকণাকে আলাদা করে বাতাসকে দূষিত হওয়া থেকে রক্ষা করে। তবে এই পদ্ধতিতে কোনো ধরনের ফিল্টার মিডিয়াম যেমন, ফেব্রিক্স বা ধাতব জালি ব্যবহারের পরিবর্তে সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্স ব্যবহার করে বায়ু হতে দূষিত বস্তুকণাকে আলাদা করা হয়। শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত দূষিত গ্যাস বা বাতাসকে একটি সর্পিল পথে নলাকার চেম্বারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। এই চেম্বারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় উপস্থিত বস্তুকণা চেম্বারের গায়ে বাধাগ্রস্ত হয়ে নিচের দিকে পড়ে যায় এবং একটি নির্দিষ্ট হপারে জমা হয়। ফলে পরিষ্কার গ্যাসীয় বা বায়ু ওপর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। হপারে জমা হওয়া এসব পদার্থকে তাদের প্রকৃতি অনুসারে হয় ধ্বংস করে ফেলা হয় অথবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়। সাধারণত এ ধরনের ফিল্টার ৫০ মাইক্রো মিটার ব্যাসের বা তার চেয়ে বড় বস্তুকণা পৃথক করতে পারে। তবে অনেক সাইক্লোন ডাস্ট কালেক্টর ১০ মাইক্রো মিটার ব্যাসের বস্তুকণা অপসারণ করতে সক্ষম। এসব ফিল্টার খুব কমই এককভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। সাধারণত ব্যাগহাউস বা ফেব্রিক এয়ার ফিল্টারের সঙ্গে এর ব্যাপক ব্যবহার করা হয়।
ইলেকট্রোস্ট্যটিক প্রেসিপিটেটর
ইলেকট্রোস্ট্যটিক প্রেসিপিটেটর (Electrostatic precipitators-ESP) বা সংক্ষেপে ইএসপি এটা অনেকটা এয়ার ফিল্টার ও সাইক্লোনের মতোই কাজ করে। শিল্প-কারখানার দূষিত বায়ু থেকে ধুলাসহ বিভিন্ন ধরনের বায়ুদূষণকারী বস্তুকণা সংগ্রহ ও অপসারণ করে। তবে এয়ার ফিল্টার ও সাইক্লোনের কর্মপদ্ধতি হতে এর কর্মপদ্ধতিতে রয়েছে অনেক পার্থক্য। ইএসপি সাধারণত কোনো যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার না করে ইলেকট্রস্ট্যাটিক চার্জিংয়ের মাধ্যমে বায়ু থেকে দূষিত পদার্থ পৃথক করে। এর ভেতরে থাকা ইলেকট্রোড ও কালেক্টিং প্লেটের মধ্যে হাইস্ট্যাটিক ইলেকাট্রক্যাল পটেনসিয়াল ডিফারেন্স তৈরি করে তার মধ্য দিয়ে বায়ু ও গ্যাস প্রবাহিত করা হয়। ফলে এর ভেতরে থাকা বস্তুকণা চার্জিত হয়ে কালেক্টিং প্লেটের সঙ্গে আটকে যায়। একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর কালেক্টিং প্লেটের স্ট্যাটিক ইলেকট্রিক্যাল পটেনসিয়াল ডিফারেন্স শূন্য হয়ে যায় এবং বস্তুকণা তা থেকে ঝরে পড়ে এর নিচে থাকা হপারে গিয়ে জমা হয়। মেশিনের ধরন অনুযায়ী হয় যান্ত্রিক পদ্ধতিতে হপার থেকে বের করা হয় অথবা পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। যেসব ইএসপিতে পানি ব্যবহার করে ধুলা বা বস্তুকণা পরিষ্কার করা তাকে ওয়েট ইএসপি বলা হয়। সাধারণত একটি ইএসপিতে বেশ কয়েকটি কালেক্টিং প্লেট থাকে, এসব প্লেট চক্রাকারে চার্জিং ও ডিসচার্জিং হয়। তাই এর কার্যক্ষমতা প্রায় ১০০ শতাংশ হয়ে থাকে।
মিস্ট কালেক্টর
মিস্ট কালেক্টরকে অনেক সময় শুধু মিস্ট বা ময়েশ্চার এলিমিনেটর ফিল্টারও বলা হয়। এই ফিল্টার বায়ু থেকে বিভিন্ন ধরনের গ্যাসীয় পদার্থ, দূষিত ধোঁয়া, আর্দ্রতা, বাষ্প বা এই ধরনের যেসব পদার্থ রয়েছে তা বায়ু থেকে পৃথক করার কাজে ব্যবহার করা হয়। এ ফিল্টারে এক ধরনের জালি ব্যবহার করা হয়। এই জালির মাধ্যমে গ্যাস বা বায়ু থেকে প্রথমে তৈলাক্ত পদার্থ আলাদা করে ফেলা হয়। আলাদা হওয়া এই সব তেলজাতীয় পদার্থ একটি চেম্বারে জমা হয় যেন তা পরে আবার প্রক্রিয়াজাত করে পুনরায় ব্যবহারোপযোগী করা যায়।
কিছু কিছু মিস্ট কালেক্টর ৩ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত অনেক সূক্ষ্ম তরল কণা পৃথক করতে পারে। এ ধরনের কিছু মেশিন অ্যাসিড বা যেকোনো ক্ষয়কারক পদার্থ থেকেও ক্ষতিকর পদার্থ বের করতে পারে। তবে যখন তুলনামূলক বড় কোনো কণা মিশ্রিত থাকে, তখন ফিল্টারে জমা হয়ে অনেক সময় ফিল্টারকে বন্ধ করে দেয়, ফলে গ্যাস স্ট্রিম চলাচল করতে পারে না। আবার যেখানে তাপমাত্রা ১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি থাকে, সেখানেও এ ধরনের ফিল্টার খুব বেশি কার্যকর নয়। এ ধরনের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বায়ুদূষণ রোধে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে।
ইনসিনেরেটর
ইনসিনেরেটর হচ্ছে এমন একটি যন্ত্র, যা দূষণকারী পদার্থকে দহন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অক্ষতিকর উপজাতে পরিণত করে। এ ধরনের যন্ত্র কঠিন, তরল বা বায়বীয় সব ধরনের বর্জ্য পদার্থকে পুড়িয়ে ফেলার কাজে ব্যবহার হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেসব শিল্প-কারখানায় নির্গত উপজাত গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করে বায়ুর মান ঠিক রাখা খুব বেশি জরুরি, সেই সব জায়গায় এটি বেশি ব্যবহার করা হয়। কারণ, প্রায়ই দেখা যায় এসব কারখানা থেকে বিভিন্ন ধরনের রূপান্তরিত উদ্বায়ী জৈব যৌগ বা কনভার্টিং ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড যেমন, হাইড্রোকার্বন বা অন্যান্য মারাত্মক ক্ষতিকর বায়ুদূষণকারী পদার্থ নির্গত হয়। এসব ক্ষতিকর বায়ুদূষণকারী পদার্থকে বিভিন্ন অক্ষতিকর পদার্থে যেমন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন বা অক্সিজেনে পরিণত করে বায়ুদূষণ রোধ করা হয়। সাধারণত ইনসিনেরেটর দূষণ রোধ করত স্ক্র্যাবারের সঙ্গে খুব ভালো কাজ করে। যখন ইনসিনেরেটর দহন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো যৌগ পদার্থ তৈরি করে তখন স্ক্র্যাবিং প্রসেসের মাধ্যমে তা বায়ু থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। শিল্পবর্জ্যরে ওপর নির্ভর করে দুই ধরনের ইনসিনেরেটর ব্যবহার করা হয়। একধরনের ইনসিনেরেটরে বর্জ্যকে রূপান্তরের জন্য কোনো ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হয় না। আবার কোনো কোনো শিল্পবর্জ্য যৌগকে পোড়াতে বা রূপান্তর করতে সম্পূরক জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে কতকগুলো ইনসিনেরেটর যেমন বর্জ্যকে অক্ষতিকর বা নিস্ক্রিয় পদার্থে পরিণত করে, তেমনি কিছু ইনসিনেরেটর আছে, যারা বর্জ্যরে ধরন অনুযায়ী তাকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। ইনসিনেরেটর কার্যক্রম দুভাবে চলতে পারে। কখনো এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে আবার কখনো ব্যাচ আকারে কাজ করে। এটা পুরোটাই নির্ভর করে শিল্প-কারখানা ও তাদের উৎপাদিত বর্জ্যরে ওপর। বহুল ব্যবহৃত ইনসিনেরেটরগুলোর মধ্যে থার্মাল অক্সিডাইজার ও ক্যাটালাইটিক অক্সিডাইজার অন্যতম।
থার্মাল অক্সিডাইজারকে থার্মাল ইনসিনেরেটরও বলা হয়। এই ধরনের মেশিন উদ্বায়ী জৈব যৌগ বা কনভার্টিং ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড, হাইড্রোকার্বন কম্পাউন্ড বা দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস বা ধোঁয়াকে জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই-অক্সাইড বা তাপে রূপান্তর করে। কাজের ধরন অনুসারে থার্মাল অক্সিডাইজার বেশ কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। যেমন, ডিরেক্ট ফায়ার্ড থার্মাল অক্সিডাইজার এটা আফটারবার্নার নামেও পরিচিত, রিজেনারেটিভ থার্মাল অক্সিডাইজার এবং রিকিউপেরেটিভ থার্মাল অক্সিডাইজার। এসব থার্মাল অক্সিডাইজারের উপযোগিতা ব্যবহার নির্ভর করে উৎপাদিত বর্জ্যরে ওপর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যেখানে প্রচুর পরিমাণে উদ্বায়ী জৈব যৌগ তৈরি হয়, সেখানে আফটারবার্নার খুব ভালো কাজ করে। কিন্তু এখানে রিজেনারেটিভ বা রিকিউপেরেটিভ থার্মাল অক্সিডাইজার ব্যবহার করলে তেমন ফলাফল পাওয়া যাবে না।
ক্যাটালাইটিক অক্সিডাইজারে এক ধরনের ক্যাটালিস্ট বেড ব্যবহার করা হয়। এই ক্যাটালিস্ট বেড বিভিন্ন ধরনের দামি ধাতু দিয়ে তৈরি হয়। এই যন্ত্রে তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় জৈব যৌগের পরিবর্তন ঘটায়। শিল্পক্ষেত্রে এ ধরনের অক্সিডাইজার ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড, হাইড্রো কার্বন যৌগ ও গন্ধযুক্ত গ্যাস বা ধোঁয়াকে পরিবর্তন করতে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যেখানে গ্যাস ও তার সাথে ক্ষুদ্র বস্তুকণা থাকে তা দহন করতে বা পরিবর্তন করতে পারে না। কারণ এসব ক্ষুদ্র বস্তুকণা বেডের ওপর একধরনের আবরণ তৈরি করে বেডকে অকার্যকর করে ফেলে। বর্তমানে রিজেনারেটিভ ক্যাটালাইটিক অক্সিডাইজারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যাটালাইটিক অক্সিডাইজার পাওয়া যায়। এদের অনেকের প্রস্তুতকারকেরা দাবি করছেন যে এসব অক্সিডাইজার ক্ষুদ্র বস্তুকণা থাকলেও সঠিকভাবে কাজ করতে সক্ষম।
ক্যাটালাইটিক রি-অ্যাক্টর
ক্যাটালাইটিক রি-অ্যাক্টর সিলেকটিভ ক্যাটালাইটিক রিডাকশন নামেও পরিচিত। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে প্রতিনিয়ত প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন অক্সাইড উৎপাদিত হয়ে বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হয়ে বায়ুদূষণ করছে। এ ধরনের বায়ুদূষণ রোধ করতে ক্যাটালাইটিক রি-অ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়। যখন কল-কারখানা বা যানবাহন থেকে ধোঁয়া বের হয় তখন এর মাধ্যমে তাতে প্রথমে অ্যামোনিয়া মিশ্রিত করা হয়, ফলে নাইট্রোজেন অক্সাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন উৎপন্ন করে। একই সঙ্গে ইনসিনেরেটরের মতো এটিও কিছু বায়বীয় দূষণকারীকে দহন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিস্ক্রিয় বা নিরপেক্ষ পদার্থে পরিণত করে। আধুনিক মোটরযানে এ ধরনের রি-অ্যাক্টর এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। জ্বালানি হিসেবে জীবাশ্ম তেল ব্যবহারের ফলে যানবাহনে সাধারণত তিন ধরনের বায়ুদূষণকারী পদার্থ উৎপন্ন হয়। যেমন, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড। ক্যাটালাইটিক রি-অ্যাক্টর এই তিন ধরনের পদার্থকে নিয়ন্ত্রণ দ্বারা বায়ুদূষণ রোধ করে। তবে যেসব শিল্প-কারখানায় প্রচুর পরিমাণে এ ধরনের বায়ুদূষণকারী পদার্থ উৎপন্ন হয়, সেখানে এ ধরনের রি-অ্যাক্টর ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। কারণ, আকার বা কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর খরচও অনেক বেশি বেড়ে যায়। তা ছাড়া সব রকম দূষিত বায়বীয় পদার্থ বা বস্তুকণা পরিষোধন করতে পারে না। তাই বড় বড় শিল্প-কারখানায় ক্যাটালাইটিক রি-অ্যাক্টরের পরিবর্তে ইনসিনেরেটর বা এ ধরনের বায়ু পরিশোধক ব্যবহার করা হয়।
বায়োফিল্টার
নাম থেকেই এ ফিল্টারের ধরন সম্পর্কে ধারণা করা যায়। বায়োফিল্টার হচ্ছে এমন একধরনের ফিল্টার, যেখানে বায়ু পরিশোধনের জন্য বিভিন্ন ধরনের অণুুজীব যেমন, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক ব্যবহার করা হয়। এসব ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক বাতাসে মিশে থাকা দূষিত পদার্থকে পানিতে দ্রবীভূত করে ফেলে। ইনসিনেরেটর দূষণকারী উপাদানকে পুড়িয়ে ধ্বংস করে বা পরিবর্তন করে ফেলা হয় কিন্তু বায়োফিল্টারে দূষণকারী উপাদানকে না পুড়িয়ে ধ্বংস বা পরিবর্তন করা হয়। এই ফিল্টারের মধ্যে থাকা অণুজীব বাতাস থেকে দূষণকারী উপাদানকে সংগ্রহ করে তা হয় শোষণ করে অথবা বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তরলে পরিণত করে। সাধারণত বায়ু থেকে ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড বা জৈব বায়ুদূষণকারী কোনো প্রকার উপজাত উৎপাদন করা ছাড়াই পরিশোধন করতে পারে।
বায়ুদূষণ কোনো সুনির্দিষ্ট একক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয় না। একেক সময় একেক কারণে তা হয়ে থাকে। বিশেষ করে শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন উপজাত তৈরি হয়। এসব উপজাতই বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। তা ছাড়া যানবাহনের ও নির্মাণশিল্পের ধোঁয়া ও ধুলাবালুও বাযুদূষণের তালিকায় রয়েছে শীর্ষে। অধিকাংশ সময় একই উৎস থেকে বিভিন্ন ধরনের দূষণকারী উপাদান নির্গত হওয়ার কারণে শুধু একটি শোধনযন্ত্র ব্যবহার করে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক প্রকারের শোধনযন্ত্র ব্যবহার করা জরুরি। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞগণই ভালো পরামর্শ দিতে পারেন।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৯তম সংখ্যা, মার্চ ২০২০।