সম্ভাবনাময় প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার

নির্মাণকাজ অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ও জটিল প্রক্রিয়া। প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি ভবন নির্মাণ করতে প্রয়োজন হয় অনেক সময়ের। স্থাপনার আকৃতি ও আয়তনভেদে নির্মাণ সম্পন্ন হতে কয়েক মাস থেকে লেগে যায় কয়েক বছর। ধরা যাক আপনি একটি পাঁচতলা কংক্রিট ভবন নির্মাণ করতে যাচ্ছেন। ভবনটির অবস্থান, নির্মাণপণ্যের প্রাপ্যতা, অর্থ ও জনবলের পর্যাপ্ততাসহ ভবনটি ডিজাইনভেদে নির্মাণে সময় লাগবে কমপক্ষে এক থেকে তিন বছর। কিন্তু এমন যদি হয় ওই একই আয়তনের ভবন মাত্র কয়েক মাসে নির্মাণ করা সম্ভব, যা হবে কংক্রিট ভবন থেকেও অধিক স্থায়ী ও টেকসই। আধুনিক নির্মাণকৌশলে নির্মিত এই নির্মাণ পদ্ধতির নাম ‘প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার’। কংক্রিটের ভবনের চেয়ে এর নির্মাণ সময় লাগে অনেক কম। তা ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা ভূমিকম্প সহনীয়। স্বল্পসময়ে দীর্ঘস্থায়ী ঝামেলামুক্ত স্থাপনা নির্মাণ করা যায় বলে বিশ্বে বহু আগ থেকেই এ নির্মাণপদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এ ধরনের স্থাপনা। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ফ্যাক্টরি ভবন, ওয়্যার হাউস, অফিস ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে স্টিল স্ট্রাকচারে। ফলে বাণিজ্যিকভাবে প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার ও স্টিল নির্মাণ উপকরণ গড়ে উঠছে এক নতুন সম্ভাবনাময় শিল্প খাত হিসেবে। শুধু নির্মাণেই নয়, প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং পণ্য রপ্তানিতেও দিচ্ছে অপার সম্ভাবনার হাতছানি।

প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার কী?

স্থাপনা নির্মাণে এত দিন নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে রড, সিমেন্ট, ইট, বালু, কাঠ, রেডিমিক্স কংক্রিট ও অন্যান্য উপকরণ। এসব উপকরণ বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করে নির্মাণ সাইটে আনার পর শুরু হয় নির্মাণযজ্ঞ। কিন্তু প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার নির্মাণপ্রক্রিয়া প্রচলিত পদ্ধতি থেকে ভিন্ন। প্রিফেব্রিকেশন হল একটি ওয়ার্কশপ বা কারখানায় নির্মাণ সাইটের কাঠামোর উপাদানগুলোকে উচ্চ প্রযুক্তির সাহায্যে স্টিল বা ইস্পাত দিয়ে ডিজাইন অনুযায়ী উৎপাদন ও প্রস্তুত করা। এই প্রক্রিয়াতেও ভবনের জন্য কংক্রিট বিম, কলামের পরিবর্তে তৈরি হয় স্টিল কলাম ও বিম। একই প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয় স্টিল মেটাল রুফ ও ফ্লোর সিট, সিঁড়ি, থাম সাপোর্টার্স, ফাউন্ডেশন বোল্ট, গ্যালভানাইজ স্ট্রাকচারের ডেকিং এবং ভবন তৈরিতে আর যা লাগে। ওয়ার্কশপে এসব নির্মাণ উপকরণসমূহ তৈরি ও প্রক্রিয়াকরণ শেষে নির্মাণস্থলে নিয়ে তা স্থাপন করা হয়।

নির্মাণ উপকরণসমূহের প্রতিটি অংশই তৈরি করা হয় নির্ধারিত ডিজাইন ও সাইজ অনুযায়ী। তারপর এটাকে সাইটে ড্রয়িং অনুযায়ী সঠিক স্থানে বসানো বা সংযোজন করা হয়। এরপর প্রতিটি অংশে বোল্ট জয়েন্ট ও ওয়েল্ডিংয়ের কাজগুলো খুব সূক্ষ¥ভাবে সম্পন্ন করা হয়। ফাউন্ডেশন স্তম্ভের সঙ্গে কলাম ও বিম জয়েন্ট দেওয়ার পর বিমগুলোর ওপর মেটাল শিট বসিয়ে তৈরি হয় দেয়াল। একইভাবে তৈরি হয় ৩-৪ ইঞ্চির ঢালাই ছাদ। কংক্রিট ভবনে প্রতিটি কলামে ছাদ ঢালাইয়ের পর তা কিউরিংয়ের জন্য সময় লাগে ২৮ দিন। ফলে ঢালাই কাজে প্রয়োজন হয় অনেক সময়। কিন্তু স্টিল ফ্রেমের ভবনে তা লাগে না। কারণ, পুরো স্ট্রাকচারের ফ্রেমগুলো অন্যত্র প্রিফেব্রিকেট করে নির্মাণাধীন স্থানে শুধু সেট করতে যতটুকু সময় লাগে।

প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার উপকরণসমূহ

প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং শিল্পের মূল উপাদান স্টিল হট রোলড কয়েল, স্টিল কালার কোটেড কয়েল, গ্যালভানাইজড কয়েল ইত্যাদি। এ ছাড়া

  • স্টিল কলাম
  • স্টিল বিম
  • স্টিল বার
  • ফ্লাট বার
  • এইচ বিম
  • ইউ চ্যানেল
  • স্টিল স্তম্ভ
  • টাই বার
  • ওয়াল শিট
  • থাম সাপোর্টার্স
  • ফাউন্ডেশন বোল্টসহ অন্যান্য।

স্থাপনায় প্রিফেব্রিকেটেড স্টিলের ইতিকথা

প্রাচীনকাল থেকে চলছে প্রিফেব্রিকেশন প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রায় ৩৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ইংল্যান্ডে নির্মিত পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ইঞ্জিনিয়ার্ড সড়ক ‘দ্য সুইট ট্র্যাক’ নির্মিত হয়েছিল প্রিফেব্রিকেটেড টিম্বারে। ওয়ার্কশপে প্রক্রিয়াকৃত টিম্বারগুলো তৈরি করে প্রকল্প স্থানে থেকে এনে জোড়া লাগানো হয়। এ ছাড়া বহুকাল আগে শ্রীলঙ্কার সিংহলী রাজারা বৃহৎ কাঠামো নির্মাণের জন্য প্রিফেব্রিকেটেড প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন, যা প্রায় ২০০০ বছরের পুরোনো। এই স্থাপনাগুলো নির্মাণে কিছু সেকশন পৃথকভাবে তৈরি করে তারপর একসঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, অনুরাধাপুরা এবং পোলোন্যারুয়া রাজ্যে এ ধরনের অসংখ্য স্থাপনা এখনো বিদ্যমান। ১৯ শতকের অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাজ্যে থেকে অসংখ্য প্রিফেব্রিকেটেড বাড়ি আমদানি করেছিল। বিংশ শতাব্দীতেও এ ধরণের বাড়ি নির্মাণ পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন, যুক্তরাজ্যে হাজার হাজার শহুরে পরিবারের অস্থায়ী আবাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিস্ফোরিত হয়। ১৮৫১ সালে লন্ডনে নির্মিত ক্রিস্টাল প্রাসাদটি লোহা ও কাচের তৈরি কাঠামোটি একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। এ ছাড়া বিভিন্ন টাওয়ার (আইফেলসহ অন্যান্য), সেতু ও স্থাপনা নির্মাণেও প্রিফেব্রিকেটেড স্টিলের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী লক্ষণীয়।

প্রিফেব্রিকেটেড স্টিলে নির্মিত হচ্ছে যেসব স্থাপনা

আগে প্রিফেব্রিকেশন প্রক্রিয়ায় উঁচু টাওয়ার ও সেতুর নির্মাণকাজ বেশি হলেও অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে নির্মাণসুবিধা থাকায় ক্রমেই সব ধরনের নির্মাণকাজে স্টিলের ব্যবহার বাড়ছে। প্রাথমিকভাবে এগুলো কারখানা, শেড, ওয়ার্কশপ, স্টোরেজ নির্মাণে ব্যবহৃত হলেও সম্প্রতি অফিস, আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনও নির্মিত হচ্ছে প্রিফেব্রিকেশন প্রক্রিয়ায়। 

  • নেটওয়ার্ক টাওয়ার
  • বহুতল বাণিজ্যিক ভবন
  • গার্মেন্টস ও অন্যান্য ফ্যাক্টরি ভবন
  • মেটাল গ্যারেজ
  • গাড়ি পার্কিং শেড
  • গ্যাস ও ফুয়েল স্টেশন
  • সামরিক স্থাপনা
  • রেস্টুরেন্ট
  • স্টেডিয়াম গ্যালারি শেড
  • গবাদিপশুর শেড ও অন্যান্য।

বাংলাদেশে প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচারের ব্যবহার

একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝার জন্য মাথাপিছু আয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। তেমনি দেশটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধির পথে কতটা এগিয়ে যাবে তা বোঝার জন্য মাথাপিছু স্টিলের ব্যবহার অন্যতম উপায়। আমেরিকা, কানাডা, জাপান, জার্মানি, কোরিয়াসহ উন্নত দেশসমূহের মাথাপিছু স্টিল ব্যবহারের হার ৫০০-৭০০ কেজি। দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাথাপিছু স্টিল ব্যবহারের হার যথাক্রমে ভারত ৫৯ কেজি, চায়না ৪৬০, ব্রাজিল ১২৩ কেজি। বিশ্বে গড় মাথাপিছু স্টিল ব্যবহারের হার ২১৫ কেজি, এশিয়ায় ২৪০ কেজি আর বাংলাদেশে ৪০ কেজি। বাংলাদেশে মাথাপিছু স্টিল ব্যবহারের হার বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায়ও অনেক কম। ২০০০ সালের আগে প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার উপকরণসমূহ বিদেশ থেকে আমদানি করে দেশে ফিটিং করা হতো। পরে দেশে প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং তৈরি করার মতো শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে।

হ্যাভিট স্টিল স্ট্রাকচার

বিগত ১০ বছরে দেশে ৭০টির মতো প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং/স্ট্রাকচার তৈরির শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে (সূত্র: বাংলাদেশের স্টিল বিল্ডিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন)। তবে বাংলাদেশে স্টিল ফ্রেমের ভবন নির্মাণের শুরু নব্বইয়ের দশকে। সে সময়ে শুধু কারখানা বা ওয়ার্কশপ তৈরি হতো। এর আগে ব্রিটিশ আমলে হেভি স্টিল স্ট্রাকচারে নির্মিত হয়েছে পাবনার পাকশীতে পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজসহ বেশ কিছু বড় বড় রেল সেতু। নব্বইয়ের দশকে এ দেশে বেশ কিছু শিল্পকারখানা ও ইপিজেডের গার্মেন্টস কারখানা নির্মিত হয় স্টিলে। রানা প্লাজাধসের পর গার্মেন্টসসহ অন্যান্য জনবহুল ভবন নির্মাণে স্টিল কাঠামোর ব্যবহার বহুগুণে বেড়েছে। শিল্পায়ন, অবকাঠামো এবং যোগাযোগ খাতে এই শিল্পটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। সমীক্ষা অনুযায়ী বর্তমানে দেশের অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বহুতল গার্মেন্টস ভবন, বাণিজ্যিক ভবন, অফিস বিল্ডিং, পাওয়ার স্টেশনসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে এখন প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল ব্যবহৃত হচ্ছে। পদ্মা সেতু যার অন্যতম উদাহরণ।

স্টিলে নির্মিত কতিপয় বাংলাদেশি স্থাপনা

  • ১০তলা ইনডিপেনডেন্ট টিভি ভবন, তেজগাঁও, ঢাকা।
  • গাজীপুরের কালিয়াকৈরের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের ১২০ ফুট উচ্চতার ৬ লাখ বর্গফুটের ভবন।
  • গুলশানের শান্তা প্রপার্টিজ লিমিটেডের ১৪ তলা বাণিজ্যিক ভবন, গ্লাস হাউস।
  • বসুন্ধরায় নির্মিত হচ্ছে ৪ লাখ বর্গফুটের বসুন্ধরা করপোরেট হেড অফিস।
  • বিজয় সরণিতে ৬ তলা র‌্যাংগস গ্রুপের হেড অফিস।
  • চ্যানেল নাইন স্টুডিও, তেজগাঁও, ঢাকা।
  • ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বারিধারা, ঢাকা।
  • নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি অডিটোরিয়াম, বারিধারা, ঢাকা।
  • কনকর্ড গার্মেন্টস লি., মিরপুর, ঢাকা।
  • আকিজ জুট মিলস, নওয়াপাড়া, যশোর।
  • আনোয়ার ইস্পাত, টঙ্গী, গাজীপুর।
  • ঢাকা টোব্যাকো, আকিজ গ্রুপ, টঙ্গী, গাজীপুর।
  • আকিজ সিরামিকস, ভালুকা, ময়মনসিংহ।

প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার নির্মাণ পদ্ধতি

দ্রুত নির্মাণ সুবিধা ও অধিক স্থায়িত্বের জন্যই মূলত প্রিফেব্রিকেটেড স্ট্রাকচার জনপ্রিয়তা পেয়েছে বেশি। স্টিল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অন্যান্য ভবনের মতোই প্রথমে সাইট প্রস্তুত করতে হয়। অর্থাৎ মোবিলাইজেশনের কাজ সম্পন্ন করা। এরপর সেখানে ওয়ার্কশপে তৈরি প্রিফেব্রিকেটেড স্ট্রাকচারগুলো এনে প্রতিস্থাপন করা হয়। কিন্তু বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে ফাউন্ডেশন বা ভিত নির্মাণ আগে থেকেই সম্পন্ন করে স্প্যান জয়েন্ট দিতে হয়। প্রকল্পের ডিজাইন অনুযায়ী আগে থেকেই কলাম, বিম ও প্যানেলসহ অন্যান্য নির্মাণ উপকরণসমূহ প্রস্তুত থাকে। পরে ড্রয়িং অনুযায়ী সঠিক স্থানে বসানো বা সংযোজন করা হয়। কলাম ও বিমের স্প্যান বসানোর পর প্রতিটি অংশে বোল্ট জয়েন্ট ও ওয়েল্ডিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এরপর বিমগুলোর ওপর মেটাল শিট (ডেক প্যানেল) বসিয়ে তৈরি হয় মেঝে। বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে স্ট্রাকচারের ওজনের ওপর নির্ভর করে লোহার জালি দেওয়া হয়। ডিজাইন অনুযায়ী জালিতে প্রয়োজনীয় ডায়ামিটারের রড স্থাপন করা হয়। তারপর রেডিমিক্স কংক্রিট দিয়ে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি পুরুত্বের ঢালাই করা হয়। সব শেষে ছাদ ঢালাইয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিউরিং করা হয়। স্থাপনার দেয়াল তৈরিতে চাহিদা অনুযায়ী কাচ, ইট বা শিট ব্যবহার করা হয়।

স্টিল স্ট্রাকচারের বিশেষত্ব

বর্তমানে বহুতল ভবন তৈরির ক্ষেত্রে স্টিল কনস্ট্রাকশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। এর কারণ স্টিলের স্বাভাবিক গুণ বা ধর্ম। স্টিল ফ্রেমে তৈরি বহুতল ভবন জনপ্রিয় হওয়ার কারণ স্টিল কাঠামো ওজনে হালকা, তৈরি করা সহজ, যেকোনো প্রয়োজনে এটি স্বল্পসময়ের মধ্যে সহজেই খুলে ফেলা যায়, দীর্ঘস্থায়ী ও স্থানান্তরযোগ্য। তা ছাড়া কংক্রিট স্থাপনার তুলনায় তা অধিক পরিবেশবান্ধব ও ভূমিকম্প সহনীয়। স্টিল কাঠামোর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে-

  • স্টিল যেকোনো নির্মাণ উপকরণের তুলনায় শক্তিশালী
  • নির্মাণ সময় কম লাগে
  • ধসে পড়ার ঝুঁকি কম বিধায় নিরাপদ
  • সহজে বাঁকা হয় না ও ভাঙে না
  • তুলনামূলক কম বর্জ্য উৎপাদন করে বিধায় পরিবেশবান্ধব
  • পুনর্ব্যবহারযোগ্য
  • স্থানান্তরযোগ্য
  • ভূমিকম্প সহনীয়
  • কাঠামো ওজনে হালকা
  • প্রয়োজনে হলে কাঠামোর কোনো স্প্যান কম সময়ের মধ্যে সহজেই খুলে নেওয়া যায়
  • ভবনের থার্মাল ইনস্যুলেশন ও শব্দরোধী ব্যবস্থাও করা সম্ভব।

স্টিল স্ট্রাকচার ভবন ও কংক্রিট ভবনের তুলনামূলক চিত্র

স্টিল স্ট্রাকচার ভবনকংক্রিট স্ট্রাকচার ভবন
স্টিল স্ট্রাকচার প্রিফেব্রিকেশন পদ্ধতিতে নির্মাণ করা হয় বিধায় প্রকল্পের সময় কম লাগে       কংক্রিটের ভবন নির্মাণে সময় লাগে অনেক বেশি। কারণ কিউরিং করতে অনেক সময় ব্যয় হয়
স্টিল স্ট্রাকচার ভবন তৈরির ব্যয় বেশিকংক্রিটের ভবন তৈরিতে ব্যয় কম
স্টিল স্ট্রাকচারে পাইলিংয়ের প্রয়োজন হয় না। ডেক প্যানেলের ফ্লোর তৈরি করা হয়। এর ওপর কংক্রিট ফ্লোরের জন্য রড ব্যবহার করে ৩ ইঞ্চি ঢালাই করে ফ্লোর তৈরি করা হয়কংক্রিটের উঁচু ভবনের ক্ষেত্রে পাইলিং করতে হয়। মাটির তলদেশে কোনো কারণে পানির স্তর হঠাৎ নেমে গেলে তৈরিকৃত বহুতল ভবন ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে
রিসেল ভ্যালু বেশিরিসেল ভ্যালু কম
সেবা সার্ভিসের লাইনগুলো ফলস সিলিংয়ের মধ্য দিয়ে টানা হয়সেবা সার্ভিসের লাইনগুলো সিলিংয়ের ওপর দিয়ে টানা হয়
সাধারণত স্থাপনা হয় ভূমিকম্পরোধীসাধারণ কংক্রিট স্থাপনা ভূমিকম্প সহায়ক নয়
আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি। কেননা স্টিল গলে গিয়ে ভবনের পুরোটাই নষ্ট হয়ে যায়আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম। কংক্রিটের ভবনের রডগুলো কংক্রিটে ঢাকা থাকায় এগুলো গলে যাওয়ার আগেই আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে
স্টিল স্ট্রাকচারের মাধ্যমে পুরোনো স্থাপনাগুলোকে খুব সহজে সংস্কার করা যায়কংক্রিটের তৈরি পুরোনো স্থাপনাগুলোকে সহজে সংস্কার করা যায় না
স্টিল পুনরায় ব্যবহার করা যায়পুনরায় ব্যবহারের সুযোগ কম কংক্রিটের ক্ষেত্রে
আরসিসি স্ট্রাকচারের চেয়ে স্টিলের স্ট্রাকচারের ওজন অনেক কম। একটা ১০ তলা বিল্ডিং আরসিসিতে করলে যে ওজন হবে স্টিল দিয়ে করলে ওজন অর্ধেকে নেমে আসবেকংক্রিট ভবনের ওজন বেশি

প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল স্থাপনা নির্মাণের সুবিধাসমূহ

  • স্টিল ভবন নির্মাণ মূলত প্রিফেব্রিকেটেড প্রক্রিয়ায় করা হয়। তাই ভবন নির্মাণ স্থানে স্বভাবতই কাজের মাত্রা কম থাকে। এতে ভবনের নির্মাণ কাজে সময় লাগে কম।
  • অধিকাংশ নির্মাণসামগ্রী অন্য স্থান থেকে তৈরি করে যে স্থানে ভবন নির্মাণ করা হবে সেখানে এনে সংযোজন করা হয়। এতে ভবন নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে যে পরিমাণ জায়গা দরকার তার প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে শহরে নির্মাণ উপকরণ রাখা খুবই ব্যয় সাপেক্ষ ও ঝামেলাপূর্ণ ব্যাপার।
  • কংক্রিট ঢালাই ও গাথুনির কাজ করার প্রয়োজন হয় না বিধায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কাজে কোনো বিঘ্ন ঘটে না।
  • স্টিল স্ট্রাকচার ভবনে সাধারণত লম্বা স্প্যান থাকে; যে কারণে অ্যাপার্টমেন্টের অভ্যন্তরীণ স্পেস বেশি থাকার জন্য পছন্দমতো ঘর ও বারান্দার লে-আউট তৈরি করা যায়। এতে লে-আউট পরিবর্তনও করা যায়। এটার বড় সুবিধা হলো অ্যাপার্টমেন্টের অভ্যন্তরীণ দেয়ালের অবস্থান বদলে নতুনভাবে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা। ভেতরে স্পেস বেশি থাকায় ডিজাইনের জন্য সহজেই স্থানান্তরযোগ্য।
  • দুর্ঘটনা প্রতিরোধের অন্যতম উপায় হতে পারে স্টিল ভবন। কারণ ইস্পাত অত্যন্ত শক্ত ধাতু।
  • ওয়ার্কশপে প্রিফেব্রিকেশন হয় বলে নির্মাণস্থলে কম বর্জ্য নির্গত হয়। ফলে পরিবেশ দূষণ হয় না। আরসিসি দিয়ে একটা বিল্ডিং করলে দেখা যায়, ইট, বালু, রড রাস্তায় রাখা হয়। এরপর মিক্সিংয়ের সময় পুরো এলাকা দূষিত হয়। স্টিল বিল্ডিংয়ে কিন্তু পরিবেশ দূষিত হওয়ার সুযোগ নেই। এতে নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশে পরিবেশ ও শব্দ দূষণ কম হয়।
  • ইস্পাত প্রায় শতভাগ পুনরুদ্ধারযোগ্য, যার রিসেল ও রিসাইকেল ভ্যালু বেশি। ফলে গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল এই নির্মাণ উপকরণটিকে সমর্থন করে। যত দিন ইচ্ছে ব্যবহারের পর চাইলে পরবর্তী সময়ে স্ক্র্যাপ অর্থাৎ কাঠামোগুলো খুলে বিক্রি করে দেওয়া যায়। আর আরসিসি দিয়ে বিল্ডিং করলে রিসেইল তো করা যায়ই না, উল্টো বরং ভাঙতে টাকা খরচ করতে হয়।
  • এটি ওজনে হালকা এবং নির্মাণসামগ্রী স্থানান্তর করতে সুবিধা হয়
  • ওজন হালকা হলেও শক্ত এবং উচ্চ শক্তিসম্পন্ন
  • আবহাওয়াজনিত কারণে ক্ষয় হয় খুবই সামান্য
  • সাধারণ তাপমাত্রায় এটার আয়তন কমে না কিংবা কুঁচকে যায় না
  • ফ্রেমওয়ার্কের প্রয়োজন হয় না
  • এটি ভূমিকম্পবান্ধব। কংক্রিট দ্বারা তৈরি ভবনের ফ্লেক্সিবিলিটি নেই। সেই তুলনায় স্টিল ফ্রেমের ভবন অনেক ফ্লেক্সিবল। ফলে সাধারণ ভূমিকম্পে এর কোনো ক্ষতি হয় না। আবার উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পে এটি সম্পূর্ণ ধসে না গিয়ে হেলে পড়বে। ফলে হতাহত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকবে।
  • দূরবর্তী স্থান (পাহাড়, হাওর, বাঁওড়) যেখানে পানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগব্যবস্থা ও আবহাওয়ার বিরূপতা রয়েছে, সেখানে এ ধরনের নির্মাণপদ্ধতি অবলম্বন করা আদর্শ।

প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল উপকরণের যত অসুবিধা

  • ভালোমতো গ্যালভানাইজিং না করা হলে মরিচা পড়ার আশঙ্কা থাকে।
  • কংক্রিটের চেয়ে অগ্নিনিরোধক ক্ষমতা বেশ কম। ফলে স্টিল ফ্রেমের ভবনের আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়। অনেক সময় আগুনের মাত্রা বেড়ে গেলে স্টিল গলে পুরো ভবনই ধ্বংস হয়ে যায়।
  • স্টিলের ফ্রেমের মেম্বার সাইজ কম হলে বাঁকানোর আশঙ্কা থাকে বেশি।
  • স্টিল স্ট্রাকচারের মেমব্রেন ও স্প্যান তুলনামূলক ভারী ও দীর্ঘ হওয়ায় পরিবহনে ভারী যানবাহন প্রয়োজন হয়। এতে বহন খরচ বেশি লাগে।
  • নির্মাণ উপকরণের অধিক ওজন হওয়ায় স্থানান্তর ও সংযোজনে ভারী ক্রেনের প্রয়োজন হয়।
  • স্টিল বারগুলো ঠিকমতো জয়েন্ট ও ওয়েল্ডিং ভালো না হলে স্থাপনার ঝুঁকি বাড়ে।

স্টিল স্থাপনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় ব্যবহার ক্ষেত্র

বেশকিছু অফিস ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মিত হলেও দেশে স্টিল স্ট্রাকচার পদ্ধতি এখনো কারখানানির্ভর। আবাসিক বা বহুতল অফিসে ব্যবহার হচ্ছে খুব কম। এর কারণ এই খাতে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। এ দেশের টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলোতে স্টিল কাঠামো নির্মাণ-বিষয়ক পড়ালেখা এবং মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণেরও যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলে প্রকৌশলীরা এ পদ্ধতির সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিত নন। যার কারণে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও এ পদ্ধতিতে ভবন নির্মাণ করতে পারছেন না। এসব অসংগতি সত্ত্বেও দেশে বর্তমানে ২ হাজারের অধিক প্রকৌশলী কর্মরত আছেন এই শিল্পে। পেশাজীবী প্রকৌশলী ছাড়াও প্রায় ২ লাখ শ্রমিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। উল্লেখ্য, এই শিল্পে প্রশিক্ষিত দক্ষ শ্রমিক দুবাই, সৌদি আরবসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে একই ধরনের কাজ করছেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। তবে আশঙ্কার ব্যাপার, গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটিতে নেই তেমন মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা, যা প্রায় সব দেশেই রয়েছে। স্টিল কাঠামোর মান ধরে রাখতে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা খুবই জরুরি।

তবে যেহেতু এ ধরনের নির্মাণ বাড়ছে এবং গড়ে উঠেছে বেশ কিছু নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। সে ক্ষেত্রে ক্রমেই সৃষ্টি হচ্ছে দক্ষ জনবল। সম্প্রতি ঘোষণা এসেছে রাজধানীর পূর্বাচলে নির্মাণ অপেক্ষায় বহুতল আইকনিক টাওয়ারসহ উত্তরা/পূর্বাচলের মোট ১ লাখ অ্যাপার্টমেন্ট এই প্রিফেব্রিকেটেড পদ্ধতিতেই নির্মাণ করা হবে। দেশের গ্রামাঞ্চলে বাড়িঘর নির্মাণে ব্যবহার করা হয় ঢেউটিন। এই ঢেউটিনের অনেকাংশই নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এবং সঠিক গ্যালভানাইজিং না থাকায় বর্তমানে দেখা যায় অধিকাংশ টিনের ঘরেই মরিচা ধরে। দেশের কিছু স্টিল ভবন নির্মাতা এবং উদ্যোক্তারা ভাবছেন গ্রামের মানুষকে টিনের ঘরের পরিবর্তে কম খরচে উন্নতমানের স্টিলের ঘর তৈরি করতে সহায়তার কথা। এই ভাবনাসমূহ বাস্তবে পরিণত হলে গ্রামের সাধারণ মানুষও পাবে দীর্ঘস্থায়ী আবাস ব্যবস্থা।

রপ্তানি সম্ভাবনা

আগে প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার ও অন্যান্য স্টিল নির্মাণ উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। বর্তমানে এ দেশেই গড়ে উঠেছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান, যারা তৈরি করছে উন্নতমানের উপকরণ। কিন্তু যেহেতু এ দেশে ইস্পাত না থাকায়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের স্টিল বিল্ডিং ম্যানুফ্যাকচারার্স দেশের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, এসব দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ১০ হাজার স্টিল বিল্ডিং তৈরি করেছে। রপ্তানি করেছে ১০ মিলিয়ন ডলারের ১৫টি বিল্ডিং। বিগত ৫ বছরে ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, আবুধাবি, সুদান, রুমানিয়াসহ প্রভৃতি দেশে বাংলাদেশের উৎপাদিত ৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং রপ্তানি করা হয়েছে। দেশে সহজলভ্য দক্ষ জনশক্তি (ইঞ্জিনিয়ার, ওয়েল্ডার, ফিটার, ফেব্রিকেটর ইত্যাদি) প্রকৃতিগতভাবে শ্রমঘন এই শিল্পটির রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশকে উন্নতর শক্তিধর প্রতিযোগী দেশ হিসেবে স্থান করে দিয়েছে। মাত্র ১০ বছরে এই শিল্পে দুই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই শিল্প নির্মাণে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বর্তমানে ৭০টি। দেশে বর্তমানে বছরে ২০০০ কোটি টাকার স্টিল বিল্ডিং/স্ট্রাকচারের চাহিদার বিপরীতে এখন উৎপাদনক্ষমতা ২৫০০ কোটি টাকার পণ্য, যার ফলে এই শিল্পটি দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন নতুন রফতানি খাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এ শিল্পের কাঁচামালের মূল্য ইউএসডি ৬০০-৭০০/টন এবং তৈরি পণ্যের মূল্য ইউএসডি ২০০০-২৫০০ টন। সুতরাং পোশাকশিল্প বা জাহাজ নির্মাণশিল্পের চেয়ে এই শিল্পে মূল্য সংযোজন তুলনামূলক অনেক বেশি। এটি কমালে এই শিল্পটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই সম্ভাবনাময়; এ কথা বলা যায় সহজেই।

পরিশেষে

প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে স্থাপনার ডিজাইন। প্রায় সবখানেই পুরোনো ভবন ভেঙে গড়ে উঠছে নতুন ভবন। কংক্রিট ভবনগুলো ভাঙলে তা থেকে তেমন রিসেল ভ্যালু পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ ৫০ বছর পরেও যদি স্থাপনা অপসারণ করতে বা ডিজাইন পরিবর্তন করতে হয় তাহলে স্টিলের মূল্য ঠিকই পাওয়া যাবে, যা কংক্রিট ভবনের ক্ষেত্রে ভাবাই যায় না। এ জন্য অধিক স্টিল বিল্ডিং স্থাপনে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি এই খাতে যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে তা কাজে লাগাতে হবে। শুধু স্থাপনা বা অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, প্রিফেব্রিকেটেড নির্মাণ উপকরণ রপ্তানি, এ খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা ও তাদের দেশে বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি। তাহলে পোশাকশিল্পের মতো এ খাতটিও হবে দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির খাত।

কালিকা স্টিল

বিশেষজ্ঞ মত

১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে দেশে প্রথমবারের মতো স্টিল স্ট্রাকচারের কাজ শুরু হয়। স্বল্প পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে হলেও তখন এ ধরনের বেশকিছু কাজ হয় দেশীয় ইপিজেডগুলোতে। বেশ কয়েকটি স্টিল কোম্পানি এগিয়ে আসে স্টিল বিল্ডিং নির্মাণে। নির্মাণের দিক দিয়ে স্টিলের কিছু সুবিধা রয়েছে, যা এ শিল্পকে করে তুলেছে সম্ভাবনাময়। যার মধ্যে রয়েছে শিল্প স্থাপনার ক্ষেত্রে স্টিল স্প্যানের ব্যবহার। এতে বড় পরিসরে কাজ করা যায়। আরসিসির তুলনায় এ ধরনের স্থাপনা খুব দ্রুত করা যায়। এতে সময় ও খরচ লাগে কম। এতে বিনিয়োগকারী দ্রুত তাঁর রিটার্ন ফেরত পান। এ ধরনের স্থাপনা ওজনে হালকা হয়। এতে কম লোড লাগায় এটি হয় ভূমিকম্প সহনীয়। স্টিল ডাকটাইল ম্যাটেরিয়াল। এর ডাকটিলিটির জন্য এটি ভূমিকম্পে দারুণ কার্যকর। স্টিল স্ট্রাকচার রি-সাইক্লিনিং করা যায়। এতে স্ক্র্যাব বিক্রি করা যায়, ভেঙে পুনরায় নতুন স্ট্রাকচারে ব্যবহার করা যায়। আমাদের দেশে প্রচলিত স্টিল স্ট্রাকচার দুই ধরনের ১. প্রি-ইঞ্জিনিয়ার্ড বিল্ডিং, ২. হট রোল সেকশন। আমাদের এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে হট রোল সেকশন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোল্ড ফর্ম সেকশনও ব্যবহার করা হয়। তবে আমাদের বেশির ভাগ স্থাপনা প্রি-ইঞ্জিনিয়ার্ড, যা ৫ কিংবা ৬ তলা পর্যন্ত হয়। তবে উন্নত দেশে এ পদ্ধতিতে বড়জোর ২ বা ৩ তলা পর্যন্ত করা হয়। বেশি উঁচু স্থাপনা নির্মাণের ঝুঁকিটা হলো ওয়েল্ডিংয়ে। এটি যথাযথ না হলে স্থাপনা ভূমিকম্প সহনীয় নাও হতে পারে। হট রোল সেকশনের ক্ষেত্রে এ সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো হট রোল সেকশন আমদানি করতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই নির্মাতারা স্থাপনা নির্মাণে প্রি-ইঞ্জিনিয়ার্ড বিল্ডিংয়ের দিকেই ঝুঁকছেন। স্টিল স্ট্রাকচারের কন্ট্রাকশন ক্লিনার, গ্রিনার ও এনভারমেন্ট ফ্রেন্ডলি। তাই এর গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই বাড়ছে। চাহিদার কারণে আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর স্টিল স্ট্রাকচার স্থাপনা নির্মাণে অনেক এগিয়ে। তবে গ্রিন ফ্যাক্টরি নির্মাণে আমাদের এখানে স্টিল স্ট্রাকচারের কাজ হচ্ছে ব্যাপক পরিসরে, যার বেশির ভাগই লিড সার্টিফায়েড। ওপেন আর্কিটেক্ট হওয়ায় এখানে স্পেসটা পাওয়া যায় বেশি। কেননা এখানে বিনিয়োগকারীরা পে-ব্যাক বা রিটার্নটা দ্রুত পাওয়া বলে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণে তাঁদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯২তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭।

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top