ভাবুন তো একটা কাঠের বাড়ি! তার ভেতরটা সুন্দর সুন্দর কাঠের আসবাবে সাজানো। শুধু কাঠের জিনিসপত্র ছাড়া স্টিলের বা অন্য কোনো ধরনের আসবাব নেই। আর এখানে যে কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে তা সাধারণত যে কাঠ আমরা ব্যবহার করে থাকি ইন্টেরিয়র বা ফার্নিচার তৈরিতে, সে ধরনের কোনো কাঠই নয়। সবকিছুই নারকেল কাঠের তৈরি! কথাটা একটু অন্য রকম শোনাল; তাই না? বিষয়টা কিন্তু একেবারেই অসম্ভব নয়। ঘরে কাঠের কাজের সবকিছু করাই সম্ভব নারকেল কাঠ দিয়ে।
বিশ্বে মূলত সমুদ্র তীরবর্তী ট্রপিক্যাল ও হিউমিড অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোতেই এই নারকেলের চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। সারা পৃথিবীতে আনুমানিক ৮ লাখ একর এলাকায় নারকেলের চাষ হয়। এর মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেই চাষ হয় প্রায় ১.৬ লাখ একর এলাকাজুড়ে। বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে নারকেলগাছ পাওয়া যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূল এলাকার মাটি ও জলবায়ু নারকেলগাছ জন্মানোর জন্য দারুণ উপযোগী।
নারকেল ফল হিসেবেও দারুণ জনপ্রিয় আমাদের দেশে। কাঁচা নারকেল বা ডাব স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং রোগীর পথ্য হিসেবে এর রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। ভোজ্য তেল হিসেবে বা মেয়েদের চুলের পরিচর্যায় নারকেলের তেল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নারকেলের ছোবড়া দিয়ে দড়ি, ম্যাট্রেস, জাজিম বানানো হয়। নারকেলগাছের পাতা মাদুর, গৃহের আচ্ছাদন, ঝুঁড়ি, পর্দা, ঝাঁটা ইত্যাদি তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু কাঠ হিসেবে আমাদের দেশে আমড়া কাঠ আর নারকেল কাঠের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। আমড়া কাঠ যেমন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হয় না, তেমনি নারকেল কাঠেরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার নেই। অধিকাংশ সময় নারকেলগাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় কাঁচা বা সেমি-পাকা বাড়িঘর তৈরি করতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারকেলগাছের কাণ্ড ব্যবহার হলেও আসবাবপত্র বা ইন্টেরিয়রের কাজে এর তেমন কোনো ব্যবহার নেই বললেই চলে। অথচ কাঠ হিসেবে এর গুণগতমান নেহাত খারাপ নয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে এ কাঠের ঘনত্ব (Density) ৮০০ কেজি/ঘনমিটার (kg/m3) ও কাঠিন্য (Hardness) জানকা হার্ডনেস টেস্টে (Janka hardness test) ০৭ কিলো নিউটন (kN) পর্যন্ত বা এরও বেশি হতে পারে। আবার এর আঁশ বেশ মোটা হওয়ায় সুন্দর একটা টেক্সচার তৈরি করে।
নারকেলগাছ দীর্ঘজীবী ঘাস গোত্রের উদ্ভিদ। এর উচ্চতা ও জাত মাটির ধরনের ওপর নির্ভর করে ২০ থেকে ৪০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে আর ব্যাস প্রায় ২৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার হয়। গাছের নিচের অংশ ওপরের তুলনায় বেশি মোটা। নারকেলগাছ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যে পরিমাণে লম্বা হয়, সে তুলনায় মোটা হয় না। একটা নারকেলগাছ ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত ফল দিতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে ফলন কমতে থাকে ও ফলের আকার ছোট হয়ে পড়ে। একসময় একে কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনো কিছু করার থাকে না।
নারকেলগাছ কোনো কাঠ উৎপাদনকারী গাছ নয়, এর কোনো গ্রোথ রিং নেই। নারকেলগাছের শুধু বাইরের দিকের শক্ত অংশ কাঠ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মাঝের বা ভেতরের অংশ অনেক নরম হওয়ায় কাঠ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
নারকেল কাঠের মূল আকর্ষণ এর টেক্সচারে। আঁশযুক্ত নারকেল কাঠ দেখতে অনেকটা বাঁশের আঁশের মতো। যদিও বাঁশ ও নারকেলগাছ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ। বেশ মোটা ও গাঢ় বাদামি রঙের টেক্সচারই অন্যান্য কাঠ থেকে একে করে তুলেছে অনন্য। যারা ঘরের মেঝে কাঠ দিয়ে করতে চান, তাদের জন্য নারকেল কাঠ হতে পারে একটা উপযুক্ত পছন্দ। কারণ, এর টেক্সচার দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি কাঠ হিসেবে এটা সাধারণ কাঠের তুলনায় বেশ টেকসই ও মজবুত।
এ কাঠের টেক্সচারকে বিভিন্ন প্যাটার্নে সাজিয়েও মেঝে বা দেয়ালে নতুনত্ব আনা যায়। যেমন হেরিংবোন প্যাটার্ন, ব্লক প্যাটার্ন, ব্রেইড প্যাটার্ন বা আরও অন্য কোনো প্যাটার্ন ব্যবহার করে। পলিশ করে বা লেকার ব্যবহার করে নারকেল কাঠকে সাধারণত তিন রকম রং দেওয়া হয়। একটি কাঠের একেবারেই স্বাভাবিক প্রাকৃতিক রং, আরেকটি স্বাভাবিক রঙের তুলনায় তুলনামূলক হালকা এবং অন্যটি একটু গাঢ়।
নারকেল কাঠের মেঝের বা আসবাবের বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো একদিকে যেমন স্বাস্থ্যসম্মত তেমনি এগুলো পরিষ্কার রাখা সহজ। এর জন্য আলাদাভাবে বিশেষ কোনো পরিচর্যার প্রয়োজন নেই। কাঠের দেয়াল বা মেঝে অন্যান্য শক্ত দেয়াল বা মেঝের তুলনায় বেশি শব্দ শোষণ করে। ফলে ঘর তুলনামূলক অনেক নীরব থাকে। একই সঙ্গে এটা অনেক স্থায়ীও বটে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৭তম সংখা, নভেম্বর ২০১৫