বিশ্বব্যাপী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্তমানে ব্যাপক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত এ সমস্যা সমাধানের যত উপায় খুঁজে পাওয়া গেছে, তার মধ্যে মানুষ আর শিল্পকারখানার বর্জ্য উৎপাদন কমিয়ে ফেলার চেয়ে কার্যকর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। ঢাকা সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতিদিনের উৎপাদিত বর্জ্য চার হাজার মেট্রিক টন আর বিশ্বব্যাংক বলছে, সাত হাজার মেট্রিক টন। অন্য এক জরিপ অনুযায়ী, শুধু গেরস্থালির কাজেই প্রতিদিন ছয় হাজার মেট্রিক টনের বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। গড়ে ঢাকা শহরের একজন মানুষ দৈনিক প্রায় ৬০০ গ্রাম বর্জ্য উৎপন্ন করছে; যদিও এর বেশির ভাগ হচ্ছে খাদ্যদ্রব্যের উচ্ছিষ্ট। কিন্তু বিশ্বব্যাপী যে পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে তার এক-তৃতীয়াংশ সাধারণ ভোক্তার ব্যবহৃত পণ্য থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তার পণ্য উৎপাদনকারী হাজার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহৃত মালামালের বিভিন্ন ধরনের মোড়ক। এসব পরিত্যক্ত মোড়ক একদিকে পরিবেশের জন্য বিরাট এক হুমকি, অন্য দিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিক থেকে তেমনি ব্যয়বহুল। তবে আশার কথা হলো, এসব বর্জ্যরে পুনর্ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রক্রিয়া দিন দিনই বাড়ছে।
মোড়ক থেকে উৎপন্ন বর্জ্যরে পুনর্ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবশ্যই একটা কার্যকর সমাধান। কিন্তু এর চেয়েও আরও কার্যকর সমাধান হতে পারে, যদি মোড়কের ব্যবহার কমানো যায়। অবশ্য মোড়কের ব্যবহার কমানোর কাজটা এককভাবে পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এ জন্য ভোক্তা, মোড়ক ও পণ্য উৎপাদনকারী এবং বিক্রয় প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে এ সমস্যার একটা উপযুক্ত সমাধান অবশ্যই মিলবে। এ জন্য বর্তমানে প্রচলিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা, অসুবিধা ও সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো বর্জ্যরে সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে বুঝতে হবে এবং বোঝাতে হবে। বুঝতে হবে যে বর্জ্যরে পুনর্ব্যবহার, প্রক্রিয়াজাতকরণ নাকি কম মোড়ক ব্যবহার করে বর্জ্য উৎপাদন কমিয়ে ফেলা, কোনটি সামগ্রিক বিবেচনায় বেশি লাভজনক?
দেখা গেছে, বর্জ্য উৎপাদন কমিয়ে ফেলতে পারলে ব্যবসায়িক দিক থেকে এটি বেশি লাভজনক হয়। যখন কোনো প্রতিষ্ঠান মোড়কের বর্জ্য কমিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন দিক থেকে লাভবান হয়। যেমন,
- প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের মোড়ক ও মোড়ক তৈরির উপাদানের জন্য খরচ কমে যায়
- মোড়ক উৎপাদন কমে গেলে উৎপাদনে ব্যবহৃত অতিরিক্ত শক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার কমে যায়
- বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ কমে যায় এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে নতুন কোনো বর্জ্য উৎপন্ন হয় না
- যখন প্রতিষ্ঠান ভোক্তাকে বোঝাতে পারে যে তারা পরিবেশের ক্ষতি কমানোর জন্য মোড়ক ব্যবহার কমিয়ে ফেলেছে তখন ভোক্তাদের মাঝেও পরিবেশ-সচেতনতা তৈরি হবে
- একই সঙ্গে তারা পরিবেশ বাঁচাতে এ ধরনের পণ্যের প্রতি আগ্রহী হবে
- অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত বর্জ্য উৎপন্ন না করায় তারা পরিবেশের জন্য হুমকি না হয়ে পরিবেশরক্ষায় ভূমিকা রাখবে
- প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও তাদের প্রতিষ্ঠানের পরিবেশরক্ষাকারী ভূমিকার জন্য কাজের প্রতি উৎসাহী হবে
- ভবিষ্যতে কঠিন বর্জ্য উৎপাদনের দায় বহনের জন্য আর্থিক ক্ষতি কমে আসবে।
অনেকভাবেই একটি প্রতিষ্ঠান মোড়ক থেকে বর্জ্য উৎপাদন কমাতে পারে। পণ্যের মোড়ক হতে বর্জ্য উৎপাদন কমানোর ধারণা যে বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে চলেছে সেগুলো কার্যকর করতে পারলে বর্জ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ দুটিই বাস্তবসম্মতভাবে কমানো সম্ভব। কিন্তু প্রথমে ভাবতে হবে যে আসলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশরক্ষায় কতটুকু ভূমিকা রাখতে চায়। তা ছাড়া পণ্যের জন্যও এটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত। যেমন:
পণ্যে কোনো মোড়ক ব্যবহার না করা
মোড়ক থেকে বর্জ্য উৎপাদন বন্ধ করার সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। বাজারে অনেক পণ্য রয়েছে, যাতে কোনো মোড়ক ব্যবহারের প্রয়োজনই হয় না। এসব পণ্যে মোড়ক ব্যবহার হয় শুধু চাকচিক্য বাড়ানোর জন্য। অনেক ছোটখাটো পণ্য রয়েছে, যেগুলোর প্রকৃত দামের চেয়ে মোড়কের দামই বেশি বলে মনে হয়। প্রতিযোগিতার বাজারে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হয়তো মনে করে, এভাবে তারা পণ্যটি বাজারে ছাড়লে বেশি লাভ করতে পারবে। আপাতদৃষ্টিতে তারা একটু বেশি লাভ করলেও বা বিক্রি বাড়াতে পারলেও পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের হিসাবে এটাকে অপচয় হিসেবেই ধরা যায়। এ রকম অবস্থায় পণ্য পছন্দ করার ক্ষেত্রে ক্রেতার বা ভোক্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু সব পণ্যই তো মোড়ক ছাড়া বাজারে আসতে পারে না। গুণগতমান ঠিক রাখার জন্য বা পণ্যটিকে অক্ষত রাখার জন্য যদি মোড়ক প্রয়োজন হয়, তাহলে তা অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে।
পণ্যে কম মোড়ক ব্যবহার করা
পণ্যটি বাজারে ছাড়তে যদি আবশ্যিকভাবে মোড়কের প্রয়োজন হয়, তাহলে একটু ভাবার বিষয় হলো কীভাবে কত কম মোড়ক ব্যবহার করে পণ্যটিকে বাজারজাত করা যেতে পারে। সে জন্য নিচের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। যেমন:
- মোড়কের আকার, আকৃতি পরিবর্তন করে কীভাবে এটাকে ছোট করা বা কমিয়ে আনা যায়
- পণ্যের জন্য শুধু এক ধরনের মোড়ক ব্যবহার করা (Single Material Packaging)। অর্থাৎ যদি এটাকে কাগজের মোড়ক দিয়ে বাজারজাত করা সম্ভব হয় তাহলে অযথা ভেতরে আবার পলিথিন দিয়ে না মোড়ানো
- পণ্যের আকার, আকৃতি পরিবর্তন করেও কম মোড়ক ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ধরনের অনেক পণ্য রয়েছে, যার আকার, আকৃতির পরিবর্তন হলেও গুণগতমান বা ব্যবহারের উপযোগিতার কোনো পরিবর্তন হয় না। এ ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে সহজেই মোড়কেরও আকার, আকৃতির পরিবর্তন করা যেতে পারে
- প্রথাগত মোড়কের উপাদান ব্যবহার না করে নতুন ধরনের উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে। যাতে তুলনামূলকভাবে কম মোড়কে বেশি পণ্য মোড়কজাত করা সম্ভব হয়।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য মোড়ক ব্যবহার করা
পণ্যের মোড়ক থেকে বর্জ্য কমানোর জন্য মোড়কে আরেকটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যেতে পারে। যেমন, এমন ধরনের মোড়ক ব্যবহার করা যেন মোড়কটি পুনরায় ব্যবহার করা যেতে পারে। বারবার ব্যবহারযোগ্য মোড়ক একদিকে যেমন পণ্যের মোড়ক উৎপাদনের খরচ কমায়, তেমনি বর্জ্য কমানোর জন্যও একটা কার্যকর ব্যবস্থা। বিভিন্ন ধরনের বোতল, ক্যান, কন্টেইনার ইত্যাদি পুনরায় ভর্তি (Refill) করে ব্যবহার করার নমুনা নির্দিষ্ট অল্প কিছু পণ্যের থাকলেও আরও অনেক পণ্য রয়েছে, যেগুলো খুব সহজেই পুনরায় ভর্তি করে ব্যবহার করা যেতে পারে। মোড়ক তৈরির উপাদানগুলো যেন পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা যায়, সেদিকে খেয়াল রাখাটা বর্জ্য কমানোর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। মোড়কের মূল উপাদান, সিল, লেবেল, টেপ, ছিপি ইত্যাদি যেন কোনো কঠিন বর্জ্য তৈরি না করে, যা সহজে ধ্বংস হয় না বা পরিবর্তন করা যায় না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় এমন কোনো উপাদানে মোড়ক তৈরি করা, যা ক্রেতা বা ব্যবহারকারী ব্যবহারের পর সহজেই রিসাইকেলের জন্য ফেলে দিতে পারে।
পরিবেশবান্ধব মোড়ক তৈরির জন্য এর উপাদান নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি যেন স্বাস্থ্যসম্মত হয়, পণ্যের গুণগতমান অক্ষুণ্ন রাখতে পারে, একই সঙ্গে পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। উপাদান নির্বাচনের সময় নিচের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা জরুরি। যেমন:
- মোড়কে ব্যবহৃত উপাদানে কোনো বিষাক্ত পদার্থ আছে কি?
- যদি থাকে তাহলে কীভাবে দূর করা সম্ভব?
- যদি দূর করা সম্ভব না হয় তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা কী হতে পারে?
- মোড়কটা কি একেবারেই বাদ দেওয়া যায়?
- মোড়কের আকৃতি, পণ্যের আকার, আকৃতি পরিবর্তন করে বা দ্বিতীয় মোড়ক বাদ দিয়ে মূল মোড়কের আকার ছোট করা যায়?
- মোড়কটা কি পুনরায় ব্যবহারের জন্য ফেরত নেওয়া হবে?
- ব্যবহারকারী বা ক্রেতা কি এটা রিফিল করতে পারবে?
- এটা কি রিসাইকেল করা যাবে?
- মোড়কটা কি একটা উপাদানে তৈরি হবে বা সহজে রিসাইকেল করা যাবে?
- এটা যদি দুই বা তার বেশি উপাদানে তৈরি হয় তাহলে কি সহজে এগুলো আলাদা করা যাবে?
- এতে যদি রং বা কালি-জাতীয় কিছু থাকে তাহলে কি সহজে মুছে ফেলা যাবে?
- মোড়কটাতে দুই বা তার বেশি ধরনের স্ট্রেচ র্যাপ বা ফ্লেক্সিবল ফিল্ম ব্যবহার হবে?
- এটা প্লাস্টিক বা এ ধরনের বস্তু দিয়ে তৈরি হলে তা কি নিজেরাই রিসাইকেল করতে পারবে, না রিসাইক্লিং প্লান্টে পাঠাতে হবে?
- মোড়ক রিসাইকেল করার পর কি যথেষ্ট পরিমাণে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পাওয়া যাবে?
মানবসভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নিত্যনতুন পণ্য উদ্ভাবন হচ্ছে আর পাল্লা দিয়ে বর্জ্য উৎপাদনও বেড়ে চলেছে। বর্জ্য উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করা একেবারেই অসম্ভব একটা ব্যাপার, তবে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কমিয়ে আনা অসম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা। আমাদের এ সময়ের একটু সচেতনতাই নিশ্চিত করতে পারে আগামীর নিরাপত্তা।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৭তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬।