সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ প্রতিনিয়ত যেসব জিনিসের খোঁজ করে আসছে তার মধ্যে নির্মাণ উপকরণ অন্যতম। হাজার বছরের চলমান প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। কাঠ বা কংক্রিটের মতো নির্মাণ উপাদানসমূহের ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও অনেকেই এখন আর তা সন্তুষ্ট করতে পারছেন না। কারণ হিসেবে বলা যায়, এসব উপাদানের মধ্যে যেমন অনেক সুবিধা আছে, তেমনি রয়েছে অসুবিধাও। এ সময়ের প্রয়োজন মেটানোর জন্য এসব উপাদান নির্মাতাদের কাছে আর যথেষ্ট নয়। তবে এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় পুরোনো সামগ্রীকে একবারে দূরে ঠেলে দিয়ে নয়, বরং এসব সামগ্রী থেকেই কীভাবে যুগোপযোগী সহায়ক উপকরণ বের করে আনা যায়, সেটাই গবেষণার বিবেচ্য। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ২০১৯ সালে যেসব নির্মাণ উপকরণ বেশ গুরুত্বসহকারে বিবেচিত হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে মাস টিম্বার, সিগারেটের বাঁট, এয়ার ক্লিনিং ব্রিক, ইলুমিনেটিং সিমেন্ট, কুলিং ব্রিক, সেলফ হিলিং কংক্রিট, প্রোগ্রামেবল সিমেন্টসহ আরও অনেক উপকরণ। যদিও এসব উপকরণ আবিষ্কৃত বা উদ্ভাবিত হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। দেখা যাক, এরপরও কেন এগুলো সম্ভাবনায় এগিয়ে?
ইলুমিনেটিং সিমেন্ট
২০১৯ সাল তথা এ বছর থেকেই নির্মাণশিল্পে যুক্ত হতে যাচ্ছে ইলুমিনেটিং বা আলোকিত সিমেন্ট। বিশেষ করে রাস্তা নির্মাণে এটি রাখতে পারে যুগান্তকারী ভূমিকা। দিনের আলোতে এই সিমেন্ট আলো সংগ্রহ করে সেই আলোয় রাতে আঁধারে নিজেকে আলোকিত করে তোলে। এটা যে শুধু রাস্তাতেই ব্যবহার করা যাবে তা কিন্তু নয়। রাস্তাসহ রাস্তার বিভিন্ন নিরাপত্তা চিহ্ন, সুইমিংপুল, পার্কিং লটসহ আরও অনেক জায়গায় এর ব্যবহার রয়েছে। এই সিমেন্ট ব্যবহারের ফলে রাতে বৈদ্যুতিক বাতির ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমবে বলে মনে করেন এর উদ্ভাবক ড. জোসে কারলোস রুবিও আভালোস। তিনি মনে করেন, বালু, কারখানার বর্জ্য, সিলিকা, পানি ও এলকালির (ক্ষার) মতো অতি সাধারণ উপাদান দিয়েই এ ধরনের সিমেন্ট তৈরি করা সম্ভব।
এয়ার ক্লিনিং ইট
কোনো আদর্শ ভবন বা স্থাপনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর ভেতর প্রয়োজনীয় নির্মল বায়ু চলাচলের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কোনো কারণে এ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে তা মানুষের জন্য ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এ কারণে ভবন বা স্থাপনার ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোনো ভবনে রাখা হয় বড় বড় জানালা, কোনো স্থাপনায় ব্যবহার করা হয় কৃত্রিম বায়ুপ্রবাহ। অর্থাৎ যেখানে যেটা ব্যবহারের উপযুক্ত সেখানে সেটাই ব্যবহার করা হয়। তবে সব ব্যবস্থারই কিছু সুবিধা-অসুবিধা রয়েছে। কিন্তু সব ব্যবস্থারই সাধারণ একটা সমস্যা হচ্ছে প্রকৃতিতে নির্মল বা বিশুদ্ধ বায়ু পাওয়ার। খুব সাধারণ যে জিনিসটি বাতাসের সঙ্গে সব সময় আমরা পাই তা প্রধানত ধুলা; বিশেষত রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য শহরে বিষাক্ত ধোঁয়ার সঙ্গে রয়েছে আরও কত-কী! এই ধুলা, ধোঁয়া থেকে মুক্তি পেতে হলে এয়ার ক্লিনিং ইট হতে পারে উপযুক্ত সমাধান। এ ধরনের ইট এমনভাবে তৈরি, যা দেয়ালের প্রয়োজনীয়তা পূরণের পর দরজা-জানালা বন্ধ অবস্থায়ও বাইরের বাতাসকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় সহজেই। অনেকটা সাধারণ ভেন্টিলেটারের মতো। তবে অবশ্যই তা থেকে দূষিত জিনিস বাদ দিয়ে। এদিক থেকে চিন্তা করলে এটাকে শুধু ইটের দেয়াল না বলে এয়ার ফিল্টার বললেও একটুও কম বলা হবে না। একটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার যেভাবে কাজ করে অনেকটা সেভাবেই এটি কাজ করে। এর মধ্যে এমন একধরনের ব্যবস্থা আছে, যা বাতাসের যাবতীয় ভারী দূষিত পদার্থ একটি হপারের মধ্যে জমা করে শুধু বাতাসটাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়। আগামীর নির্মাণকাজে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই বিশ্বাস এর উদ্ভাবকদের।
কুলিং ব্রিক
নির্মাণশিল্পের আগামীর সময়ে কুলিং ব্রিক বা হাইড্রো সিরামিক ব্রিকই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে। এই ইট কাদা এবং হাইড্রোজেল নামক বিশেষ একধরনের উপাদানে তৈরি। এটিকে যদিও ইট বলা হচ্ছে কিন্তু এটি সাধারণ কোনো ইট নয়। এই ইটকে মূল দেয়ালের বাইরে আরেকটি আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আবার এই ইট তৈরির প্রক্রিয়াটিও সাধারণ ইটের তুলনায় ভিন্ন। প্রথমে একটি কাদা বা কংক্রিটের আস্তরের ওপর হাইড্রোজেলের স্তর দেওয়া হয় এরপর আরেকটি ছোট ছোট ছিদ্রবিশিষ্ট কাদার স্তর দিয়ে তা ঢেকে দেওয়া হয়। এই ছিদ্র দিয়ে যখন ভেতরে বাতাস ঢোকে তখন হাইড্রোজেল বাতাস থেকে পানি শোষণ করে ভেতরে জমা করে রাখে। এই জমানো পানি দেয়ালের ভেতরকে ঠান্ডা রাখতে সহায়তা করে। নির্মাণশিল্পে এটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এই কারণে যে প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় হয় শুধু ভবনকে ঠান্ডা রাখতে। কুলিং ব্রিককে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে এই বিশাল অর্থ খরচ নির্মাণশিল্পে অনেকখানি কমে আসবে।
প্রোগ্রামেবল সিমেন্ট
নতুন নতুন নির্মাণ উপাদান উদ্ভাবিত হলেও পুরোনো সিমেন্টকে রাতারাতি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। সিমেন্টের তৈরি কোনো স্থাপনাকে আরও শক্ত ও মজবুত এবং নতুন নির্মাণ উপাদানের সমকক্ষ করে তুলতে চলছে নিরন্তর গবেষণা। এর ফলে তৈরি হয়েছে প্রোগ্রামেবল সিমেন্ট। আসলে এই সিমেন্ট পুরোনো সিমেন্টেরই নতুন রূপ। সিমেন্ট তৈরির কাঁচামালকে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যেন এর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলোকে ইচ্ছেমতো আকার দেওয়া যায়। সিমেন্টের মূল উপাদান ক্যালসিয়াম সিলিকেট হাইড্রেটকে ভেঙে একধরনের ক্রিস্টাল তৈরি করা হয়। এই ক্রিস্টালের আকারের ওপর নির্ভর করে এর আশপাশে আরও ক্রিস্টাল তৈরি হয় এবং একটি বড় আকারের কংক্রিটে পরিবর্তিত হয়। ফলে সাধারণ কংক্রিটের ভেতর যেমন ছোট ছোট ছিদ্র থাকে, তেমন ছিদ্র এই সিমেন্টের তৈরি কংক্রিটে থাকে না। আবার ক্রিস্টালটিকে ইচ্ছেমতো আকার দেওয়ার ফলে এটাকে যেকোনোভাবে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করা যায়, তাতে স্থাপনার স্থায়িত্বে কোনো প্রভাব পড়ে না। এই সিমেন্টের অন্যতম গুণ হচ্ছে এটা আগুন প্রতিরোধী, বাঁকা করা যায় এবং নিজেই নিজেকে মেরামতে সক্ষম।
সিগারেট বাঁট
বিশ্বে প্রতিবছর ছয় ট্রিলিয়ন সিগারেট উৎপাদিত হয় আর ১ দশমিক ২ মিলিয়ন টন সিগারেটের বাঁট বা ফিল্টারের মতো বিষাক্ত উচ্ছিষ্ট আমাদের পরিবেশে যুক্ত হয়। এই সংখ্যা আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে বেড়ে হবে দেড় গুণ, এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিষাক্ত বস্তু পরিবেশে কী ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলে তা সাধারণ মানুষ চিন্তাই করতে পারবে না। আমাদের চারপাশে যে বিপুল পরিমাণ সিগারেটের বাঁট ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, তা ধ্বংস করাও সহজ ব্যাপার নয়। অবশ্য আমাদের দেশের মতো অনেক দেশই এটাকে ধ্বংস করা বা অন্য কাজে ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। তাই নীরবে নিঃশব্দ আততীয় হয়ে এই উপকরণটি আমাদের পরিবেশের ক্ষতি করে চলছে অব্যাহতভাবে। পরিবেশে যুক্ত করছে আর্সেনিক, সীসা, নিকেল, ক্যাডমিয়াম, টলুইনসহ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সব রাসায়নিক।
তবে এই দায়িত্ববান ক্ষতিকারক আর খুব বেশি দিন ক্ষতি করতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ, অস্ট্রেলিয়ার রয়েল মেলবোর্ন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আরএমআইটি)-এর একজন গবেষক এটার চমৎকার সমাধান বের করেছেন। তিনি দেখাতে সক্ষম হয়েছেন যে ইট তৈরির সময় যদি কাদার সঙ্গে শতকরা একভাগ এই বিষাক্ত উচ্ছিষ্ট যুক্ত করা হয়, তবে পরিবেশগত দিক থেকে যেমন এটি উপকারী, তেমনি ইটের জন্যও সমান কার্যকর। পরিবেশের জন্য উপকারী এই জন্য যে এসব বাঁট নষ্ট হয়ে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে অনেক সময় লাগে। তাই একে ইটের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেললে একদিকে যেমন এর মধ্যে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই বন্দী করে ফেলা হয়, তেমনি আগুনে পুড়ে, দীর্ঘদিন ইটের মধ্যে থেকে পরিবেশের ক্ষতিও করতে পারে না। অন্য দিকে এসব বর্জ্য ইটের সঙ্গে মেশানোর ফলে ভেতরে থাকা দাহ্য পদার্থ ইটকে দ্রুত পুড়তে সাহায্য করে এবং তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তোলে বলে মনে করেন অস্ট্রেলিয়ার আরএমআইটি ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. আব্বাস মোহজেরানি। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখান, এতে ইটকে পোড়াতে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয় হয়। এসব ইট একদিকে যেমন হালকা তেমনি এর তাপ পরিবহন ক্ষমতা অনেক কম। ফলে ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এটি বেশ সহায়ক।
মাস টিম্বার
বছরের পর বছর ধরে বড় বড় নির্মাণক্ষেত্রে কাঠের ব্যবহার ধীরে হলেও উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। বিগত শতাব্দী থেকে কংক্রিট আর লোহা নির্মাণকাজে খুব গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো এর ভারবহন ক্ষমতা এবং আগুন থেকে অনেক বেশি নিরাপদ। তবে কাঠের এই অপাঙ্্ক্তেয় অবস্থা আর থাকছে না। কারণ, লেমিনেট করা কাঠের প্যানেল এখন শক্তি ও আগুনে টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জন করায় কংক্রিট আর লোহার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আবার আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে ব্যবহার শুরু হতে যাচ্ছে।
কাঠের ব্যবহার কমে যাওয়ার বা বন্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ এর আগুনে টিকে থাকার অক্ষমতা। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফায়ার ল্যাবরেটরি ইতিমধ্যেই নিশ্চিত করেছে যে এসব লেমিনেট করা কাঠের প্যানেল অ্যালকোহল, সিগারেটের আগুনসহ বিল্ডিং কোডে বর্ণিত সব ধরনের আগুনে কংক্রিট বা লোহার মতোই উপযোগী। তাদের একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে এই প্যানেল ১৮০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় তিন ঘণ্টা ছয় মিনিট পর্যন্ত টিকে থাকতে সক্ষম হয়।
এর আরেকটি সুবিধা হচ্ছে কংক্রিটের চেয়ে এটি অনেক হালকা, মাত্র পনেরো ভাগের এক ভাগ। এ জন্য কাঠের বিল্ডিং তৈরি করতে গেলে ভিত্তির খরচ হয় অনেক কম, কিন্তু ভূমিকম্প সহনশীলতা কংক্রিটের বিল্ডিংয়ের মতোই থাকে। কংক্রিট ও লোহা ব্যবহার করে একটি ভবন তৈরি করতে আমরা যে পরিমাণে কার্বন বায়ুমন্ডলে যুক্ত করি, তার চেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ হবে লেমিনেট করা কাঠের প্যানেল দিয়ে তৈরি ভবনে। একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে লোহা বা কংক্রিটের ভবনের তুলনায় কাঠের তৈরি ভবনে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কম কার্বন নিঃসরিত হয়ে বাতাসে মেশে। আর সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে কাঠের ব্যবহারে কংক্রিট ও লোহার তুলনায় খরচ হবে অনেক কম। কারণ, লোহা বা কংক্রিটের চেয়ে ২৫ শতাংশ দ্রুততার সঙ্গে কাজ সম্পন্ন করা যায় এবং শ্রমিক কম লাগে ৯০ শতাংশ।
বিগত কয়েক বছরে এসব নির্মাণ উপাদান ছাড়াও আরও অনেক নতুন নতুন উদ্ভাবন রয়েছে। নির্মাণশিল্পে এসব আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। আজকে যেটি আলোচিত নয়, হয়তো ভবিষ্যতেই তা স্থায়ী অবস্থান করে নেবে। আসলে কোন আবিষ্কার বা উদ্ভাবনটি বাজারে টিকবে আর কোনটি হারিয়ে যাবে তা নির্ভর করে অনেক কিছুর ওপর। যেমন, সহজলভ্যতা, মূল্য, স্থায়িত্বের মতো বিষয়ে। যেহেতু নির্মাণ খাত সারা বিশ্বে একটি শিল্প, কাজেই এখানে লাভ-ক্ষতির বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজকে যেটাকে খুব লাভজনক মনে হচ্ছে, নতুন কিছু বাজারে আসার পর কাল সেটাকেই আর তেমন লাভজনক মনে নাও হতে পারে। তাই নিশ্চিত করে কিছু বলতে না পারলেও সম্ভাবনার কথাটি তো বলা যেতেই পারে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৮তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১