যখন কোনো কিছুর চাহিদা বা প্রয়োজন পড়ে, তখন তা উদ্ভাবন বা তৈরি করে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। একসময় জিনিসটির প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে বা কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেললে তা আমরা ফেলে দিই কিংবা তা পরিত্যক্ত হয়। এরপর এর হয়টা কী? উত্তরটা খুব সাধারণ যা আমরা সবাই জানি, এটি একটি দীর্ঘসময় পাড়ি দিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে মিশে যায়। কিন্তু এটা খুব সাধারণ চিত্র হলেও পরিবেশে এর প্রভাব মোটেই সাধারণ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হিসেবে যত কিছু বিবেচনায় আনা হয়, এর মধ্যে এসব ফেলে দেওয়া বা পরিত্যক্ত জিনিস হচ্ছে অন্যতম। আসলে এটাই আমাদের প্রচলিত অর্থনীতির সাধারণ চিত্র। তবে এই সাধারণ চিত্রের বাইরে যদি বেরিয়ে আসতে চাই, তবে আমাদের অবশ্যই বৃত্তাকার অর্থনীতি বা সার্কুলার ইকোনমিতে (Circular Economy) যেতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই বৃত্তাকার অর্থনীতি কী বা প্রচলিত অর্থনীতির সঙ্গে এর তফাতটা কোথায়?
একেবারে সহজভাবে বলা যায়, বৃত্তাকার অর্থনীতি বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক মডেলকে বোঝায়, যার উদ্দেশ্য টেকসই উপায়ে পণ্য ও পরিসেবা উৎপাদন করা; যেখানে কাঁচামাল, পানি, শক্তি ও সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও ন্যূনতম ব্যয় নিশ্চিত করা হয় সর্বনিম্ন বর্জ্য উৎপাদন করে। প্রচলিত বা লিনিয়ার অর্থনীতির সঙ্গে এর মূল পার্থক্য হচ্ছে, লিনিয়ার অর্থনীতিতে কোনো পণ্য উৎপাদন করা হয়, এরপর তা ব্যবহার হয় এবং প্রয়োজন শেষে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু সার্কুলার ইকোনমিতে প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে পণ্য বা যন্ত্রটিকে ফেলে না দিয়ে এটিকে পুনর্ব্যবহার করা হয়। এটা টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত আর এটাই এখন সবুজ পৃথিবী তৈরির অন্যতম কৌশল হিসেবে বিবেচিত।
নতুন এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের লড়াইয়ে রিনিউঅ্যাবল এনার্জি শিল্পকে অবশ্যই সার্কুলার ইকোনমির প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। এটা যদি না করে তাহলে সোলার প্যানেল, বায়ুকল, ইলেকট্র্রিক যানবাহন বা বহুল ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রাকৃতিকভাবে অপ্রতুল কিছু কাঁচামাল একসময় সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। অর্গানিক পলিমার সোলার সেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নেক্সটজেন ন্যানো-এর বাণিজ্যিক পরিচালক ম্যাথিউ স্টোন মনে করেন, আমাদের খুব শিগগিরই এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। তবে এই পরিস্থিতি হতে উত্তরণের উপায়ও আছে আমাদেরই হাতে। এর সমাধান হতে পারে সার্কুলার ইকোনমির মাধ্যমে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে।
১৯৯০ সালে সারা বিশ্বে যে পরিমাণ গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসৃত হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ২০৫০ সালে তা শতকরা ৮০ থেকে ৯৫ ভাগ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্টে তারা একটি রূপরেখাও প্রণয়ন করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের অ্যাগ্রিমেন্টে এই মর্মে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে তাদের বাজেটের কমপক্ষে শতকরা ২০ ভাগ অর্থ ব্যয় করবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য গবেষণা ও বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন খাতে। ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ হবে আনুমানিক ১৮০ বিলিয়ন ইউরো। এদিক থেকে নেদারল্যান্ড খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ নিয়েছে রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য। এটাই প্রথম দেশ, যারা ২০৩০ সালের মধ্যে শিল্পক্ষেত্রে কয়লার ব্যবহার পুরোপুরি বাদ দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভর করবে। ২০১৭ সাল থেকে তারা তাদের এই প্রচেষ্টা শুরু করেছে এবং ইতিমধ্যে তাদের সমুদ্র উপকূলে বায়ুকলের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গিয়েছে। কয়লা বাদ দিয়ে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমিয়ে আনবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, রিনিউঅ্যাবল এনার্জি উৎপাদনের জন্য ডাচদের এসব পদক্ষেপ আপাতদৃষ্টিতে বেশ ইতিবাচক মনে হলেও যদি সারাবিশ্ব তাদের মতোই পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে তা টেকসই রূপান্তর নাও হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডের মতো দ্রুতগতিতে যখন সবাই তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে একই ধরনের নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করবে, তখন অবশ্যই কাঁচামালসহ বিভিন্ন ধরনের অনুষঙ্গের ঘাটতি দেখা দেবে।
আগেই বলা হয়েছে যে রিনিউঅ্যাবল এনার্জি উৎপাদনের যন্ত্রপাতি তৈরিতে বিশেষ ধরনের বিরল ধাতু ব্যবহার করা হয়, যা কেবল হাতে গোনা কয়েকটি দেশ থেকে উত্তোলন ও সরবরাহ করা হয়। পুরো ইউরোপ এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ধাতু সংগ্রহের জন্য প্রায় সম্পূর্ণরূপে এই গুটিকতক দেশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের সক্ষমতা তারা যত বাড়াতে চাচ্ছে, ততই তাদের নির্ভরশীলতা বাড়ছে। ফলে একসময় দেখা যাবে, তাদের এসব চাহিদা মেটাতে গিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে সরবরাহকারী দেশের কাছে তারা জিম্মি হয়ে পড়বে। কাজেই সারা বিশ্বের জন্য যে পরিমাণ সোলার প্যানেল বা উইন্ড টারবাইন ব্যবহৃত হবে তা উৎপাদনের জন্য যে পরিমাণ দুর্লভ ধাতুর প্রয়োজন হবে তার তুলনায় সরবরাহ যে অবশ্যই অপর্যাপ্ত হবে, এ বিষয়টি এখনই মাথায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের এসব উপকরণের উপযুক্ত বিকল্প উপকরণ খুঁজে বের করতে হবে। অন্যদিকে রাষ্ট্রকেও পুনরুৎপাদন পদ্ধতির দিকে খেয়াল রাখতে হবে যেন এ ধরনের যেকোনো প্রকল্পের ডিজাইন, রক্ষণাবেক্ষণসহ সবকিছুই পুনর্ব্যবহারযোগ্য হয়। আর এটাই হচ্ছে বৃত্তাকার অর্থনীতি বা সার্কুলার ইকোনমির বৈশিষ্ট্য।
সম্প্রতি নেক্সটজেন ন্যানো কর্তৃক আবিষ্কৃৃত অর্গানিক সেমিকন্ডাকটর এমনই একটা উদ্ভাবন। পলিমার সোলার সেল তৈরিতে অর্গানিক সেমিকন্ডাকটর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বলা যেতে পারে, এটিই হচ্ছে পলিমার সোলার সেল তৈরির মূল উপাদান। কার্যকারিতার দিক থেকে এই সোলার সেল প্রচলিত অন্যান্য সোলার সেলের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে। শুধু তা-ই নয়, এই সোলার সেলগুলো অনেক নমনীয়, হালকা, পাতলা ও আধা স্বচ্ছ। ফলে যেকোনো প্রয়োজনে যেকোনো স্থানে খুব সুন্দর ও কার্যকরভাবে স্থাপন করা যায়। ওজনে হালকা ও নমনীয় নেক্সটজেন ন্যানোর পলিপাওয়ার নামের এই অর্গানিক পলিমার সোলার সেল ভবিষ্যতের সস্তা নবায়নযোগ্য শক্তি (সৌরশক্তি) সংগ্রহের একটা জনপ্রিয় উপাদান হিসেবে গণ্য হবে বলে মনে করেন এর উৎপাদকেরা। কারণ, প্রচলিত ফটোভোলটাইক সোলার প্যানেলগুলো আকারে অনেক বড়, ভারী এবং ভঙ্গুর; পক্ষান্তরে নতুন ধরনের এই সোলার সেলগুলো হালকা, নমনীয় এবং প্রচলিত সোলার সেলের মতো ভঙ্গুর নয়। কিন্তু কার্যকারিতার দিক থেকে কোনো অংশেই কম নয়।
এই সেলগুলোর আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সিলিকননির্ভর সেলের মতো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, এটি একটি পরিবেশবান্ধব উপাদান। সিলিকন সোলার প্যানেল তৈরির সময় এবং ব্যবহার-পরবর্তী ধ্বংসের সময় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ আমাদের পরিবেশে যুক্ত হয়ে পরিবেশ দূষিত করে ফেলে। এসব সেল থেকে যে ধরনের রাসায়নিক পরিবেশে যুক্ত হয়, তার মধ্যে ক্যাডমিয়াম যৌগ, সিলিকন টেট্রাক্লোরাইড, হেক্সাফ্লুওরইথেন এবং সীসার মতো প্রাণিদেহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পদার্থ। পক্ষান্তরে অর্গানিক পলিমার প্যানেল উৎপাদনের সময় বা ব্যবহারের ফলে কার্যকারিতা হারিয়ে গেলে নতুন করে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার সময় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এই ধরনের কোনো পদার্থ পরিবেশে যুক্ত করে না। তাই এটিকে পরিবেশবান্ধব বলে বিবেচনা করা যেতে পারে।
জীবাশ্ম জ¦ালানির ব্যবহার কমিয়ে ফেলে কার্বন নিঃস্বরণ কমানোর জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া যেকোনো অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। কিন্তু একই সঙ্গে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে যে কী ধরনের নীতিমালা তৈরি করা হবে। কীভাবে এর বাস্তবায়ন হবে এবং বর্তমানে যে ধরনের প্রযুক্তি ও ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, তা নতুন প্রযুক্তি দিয়ে সহজভাবে প্রতিস্থাপন করা যাবে। রিনিউঅ্যাবল এনার্জির ওপর কোনো দেশ পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে চাইলে সরকারকে অবশ্যই একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সেই সঙ্গে তা বাস্তবায়নেরও সক্ষমতা থাকতে হবে। তা না হলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে ও জনগণের কাছে তা অযোগ্য বলে প্রমাণিত হবে।
এটা আশার কথা যে অর্গানিক পলিমার সোলার সেলের মতো নতুন একটা জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী রিনিউঅ্যাবল এনার্জির ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে পূরণ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। সেই সঙ্গে প্রচলিত সিলিকন সোলার প্যানেলের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে আমাদের ও আমাদের পরিবেশকেও নিরাপদ রাখা সম্ভব বলে আশা করাই যায়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২০।