সময়সাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর নির্মাণকাজকে যথাসম্ভব কম সময় আর শ্রমে সম্পন্ন করতে উদ্ভাবিত হচ্ছে নানান প্রযুক্তি। তা সত্ত্বেও ভবন বা স্থাপনা নির্মাণের এমন কিছু কিছু পর্যায় আছে যেখানে চাইলেও দ্রুত কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। যেমন, কলাম বা ছাদ ঢালাই হওয়ার পর এর দৃঢ়তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু নির্মাণের এমন কিছু পর্যায় রয়েছে যা দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও শ্রম ও সময় নির্ভরতার কারণে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। যেমন, দেয়াল প্লাস্টার ও রঙের কাজ এর মধ্যে অন্যতম। তবে রঙের কাজটি এখন অনেক ঝামেলামুক্তভাবে দ্রুততর সময়ে করা সম্ভব হচ্ছে স্প্রে, রোলারসহ বিভিন্ন ধরনের বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবনের ফলে। কিন্তু প্লাস্টার নিয়ে বিড়ম্বনা এখনও রয়েই গেছে। কংক্রিটের ফেয়ার ফেইস ও ইট দেয়াল এখন অনেকটাই প্লাস্টার করার ঝামেলামুক্ত। তবে স্থাপনার সৌন্দর্যবর্ধন আর প্রকৃতির বিরূপ আবহাওয়া থেকে দেয়াল সুরক্ষার জন্য প্লাস্টার অত্যন্ত কার্যকর। ধীরগতির এই কাজটির গতিময়তা আনতে আর নিখুত ভাব নিশ্চিত করতে সম্প্রতি ব্যবহৃত হচ্ছে অটোমেটিক প্লাস্টারিং মেশিন।
বাংলাদেশে এই অটোমেটিক প্লাস্টারিং মেশিনের ব্যবহার এখনও শুরু না হলেও বিশে^র অনেক দেশ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কার্যক্ষমতা ভেদে এসব মেশিন প্রতি মিনিটে ২ বর্গ ইঞ্চি থেকে ৫০ বর্গ ইঞ্চি পর্যন্ত প্লাস্টার করতে সক্ষম। দেয়াল প্লাস্টারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে এতে তুলনামুলকভাবে শ্রমিক খরচ হয় অনেক বেশি আর প্লাস্টার সামগ্রীর অপচয়ও হয় বেশ। কিন্তু অটোমেটিক প্লাস্টারিং মেশিন ব্যবহার করলে শ্রমিক খরচ কমে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ।
প্লাস্টারের কাজটা শ্রমসাধ্য হলেও এর অটোমেশনের ভাবনাটা মাত্র অল্প কিছুদিনের। পঞ্চাশ দশকের শুরুর দিকে এ কাজের জন্য তৈরি করা হয় একটি মেশিন। যদিও এই মেশিনটি প্লাস্টারের কাজকে অনেক দ্রুত করতে সাহায্য করেছিল, তারপরও এ মেশিন দিয়ে কাজ শেষে অনেক কিছুই হাত দিয়ে করতে হতো। কিন্তু ষাটের দশকে ‘রুমা-১ (RUMA 1)’, ‘পাটজমেইস্টার কেএস-১’ (Putzmeister KS 1) এর মতো মেশিনগুলো বাজারে আসার পর অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্লাস্টার করা সম্ভব হয়। যেটাকে নির্মাণ শিল্পে বড় ধরনের বিপ্লব বলা যায়। আরো বেশ ক’বছর পর ‘আমপা’ নামে একটি মেশিন চালু হয় যা আগের মেশিনের চাইতে আরো বেশি স্বংয়ংক্রিয়। কিন্তু কোন কারণে এটি তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি ফলে নির্মাতারা এর উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। রোবটিকস্ আর অটোমেশন টেকনোজির উন্নয়নের সাথে সাথে এ ধরনের মেশিন হতে থাকে আরো উন্নত। বর্তমানে বাজারে যে ধরনের মেশিন পাওয়া যায় তা নির্মাণ আর ব্যবহারের দিক থেকে অনেক সহজ।
আধুনিক অটোমেটিক প্লাস্টারিং মেশিন সাধারনতঃ তিনটি অংশের সমন্বয়ে কাজ করে-
- মেকানিক্যাল পার্ট
- ইলেট্রিক/ইলেকট্রনিক্স পার্ট
- সফটওয়্যার
এই মেশিনের প্রায় শতকরা ৭০ ভাগই হচ্ছে মেকানিক্যাল পার্ট। এখানে একটি মটর ফানেল ব্যবহার করা হয়, যেখানে সিমেন্ট বা মর্টার ঢেলে দেয়া হয়। এরপর ইলেকট্রিক মটর পাম্পটি একটি নমনীয় পাইপের মধ্য দিয়ে মেশিনের হপারে পাঠানো হয়। পাইপটি থাকে যথেষ্ট পরিমানে নমনীয় যেন হপারের সাথে সাথে নড়াচড়া করতে পারে। অন্যদিকে প্লাস্টারিং মেশিনের একটা অংশ মূল কাজ তথা প্লাস্টারিং এর কাজে ব্যবহৃত হয়।
একটি আনুভূমিক ও একটি উলম্ব রেল গাইডের উপর এটি বসানো থাকে। ফলে এটি যেমন প্রয়োজন অনুযায়ী ডানে বা বামে চলাচল করতে পারে তেমনি উলম্ব রেল গাইডের উপর দিয়ে সহজেই উপরে নিচে উঠানামা করতে পারে। ফানেল হতে আসা সিমেন্ট বা প্লাস্টারিং ম্যাটেরিয়াল হপারে এসে জমা হলে তা একটা সিলিন্ডারের চেরা অংশ দিয়ে সমানভাবে বেরিয়ে এসে দেয়ালে লেপ্টে যায়। একই সাথে একটি ধাতব সিট উপরের অংশটিকে সমান করে দেয়।
ইলেট্রিক/ইলেকট্রনিক্স অংশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে সার্ভো বা স্টেপার মটর যা মেশিনটিকে প্রয়োজন অনুযায়ী ডানে-বামে বা উপরে নিচে সরাতে পারে। আর পাম্পিং মটরের ব্যাপারটা আগেই বলা হয়েছে। এছাড়া পুরো মেশিনটি নিয়ন্ত্রন করার জন্য দুটি মাইক্রো কন্ট্রোলার ব্যবহার করা হয়। মূলতঃ এর একটি মেশিনের প্লাস্টারকে নিয়ন্ত্রন করে, অন্যটি সিমেন্ট বা যে বস্তুটি প্লাস্টার হিসাবে ব্যবহৃত হবে তা নিয়ন্ত্রন করে। প্লাস্টার কন্ট্রোলার দিয়ে মেশিনের স্টেপার মটরকে নিয়ন্ত্রন করা হয় যেন প্রয়োজন মতো হপারকে ডানে/বামে বা উপরে/নিচে নেওয়া যায়। আবার এই কন্ট্রোলার দিয়েই কতোটুকু সিমেন্ট পাম্প করতে হবে তা নির্ধারন করা হয়। অবশ্য সিমেন্ট পাম্পকে নিয়ন্ত্রনের জন্য এখানে একটি সেন্সরের সাহায্য নেয়া হয়। অন্যদিকে সিমেন্ট কন্ট্রোলার দিয়ে কতটুকু সিমেন্ট নজেল বা স্লিট দিয়ে বের হবে, কখন ফানেল হতে হপারে সিমেন্ট প্রবেশ করবে তা নিয়ন্ত্রন করে। আর পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সফটওয়্যার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানে বলে রাখা ভালো যে, সব মেশিনের ডিজাইন যে এক রকম হয় তা কিন্তু নয় নির্মাতা কোম্পানি ভেদে এর পরিবর্তন হতে পারে। এরকম বহু মেশিনই রয়েছে বাজারে যার অনেক কিছুই ম্যানুয়ালি অপারেট করতে হয়।
তবে মেশিন যেমনই হোক না কেন এর সুবিধা তো অবশ্যই রয়েছে। যেমন সময় লাগে কম তাই শ্রমিক খরচও কম হয়। এ জন্য কোন দক্ষ নির্মাণ শ্রমিকের প্রয়োজন হয় না। এক পরিসংখ্যান বলছে, এতে শ্রমিকের খরচ শতকরা ৮৫ ভাগ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। হাতের কাজে ছোটখাট অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি থাকতেই পারে কিন্তু মেশিনের কাজে সে রকম ত্রুটি বিচ্যুতি থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অটোমেটিক প্লাস্টারিং মেশিন সুক্ষভাবে ৫ হতে ৩৪ মিলি মিটার পর্যন্ত প্লাস্টার করতে পারে। তুলনামুলক অনেক কম নির্মাণসামগ্রীর অপচয় হয়। তাই এদিক দিয়েও সম্ভব অনেক খরচ বাঁচানো। সবচাইতে বড় সুবিধা হচ্ছে এ ধরনের মেশিন ব্যবহারে ঝুঁকি অনেক কমে আসে। নির্মাণ ক্ষেত্রে এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে অনেক সময় শ্রমিকরা মৃত্যুঝুঁকির মাঝে কাজ করে। এরকম স্থানে অটোমেটিক প্লাস্টারিং মেশিন হতে পারে কার্যকর সমাধান।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৪তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৮।