সড়ক নির্মাণ বেশ অর্থ, সময় ও শ্রমসাপেক্ষ ব্যাপার। নির্মাণের প্রতিটি ধাপে যে পরিমাণ সময় ও শ্রমের প্রয়োজন হয় তা অনেক সময় নানা কারণে আমাদের দেশে এই খরচ উঠে আসার আগেই সড়কটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বস্তুত তিনজন দক্ষ ও পেশাদার শ্রমিক গড়ে প্রতিদিন ইট বা কংক্রিট ব্লকের রাস্তা তৈরি করতে পারেন সর্বোচ্চ ৭৫ থেকে ১০০ বর্গমিটার, যা সময় ও শ্রমের বিবেচনায় অনেক কম। তাই খরচ ও শ্রম কমাতে ‘টাইগার-স্টোন’ নামের নির্মাণ সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবন করেছে রোড প্রিন্টার মেশিন; যা পেভিং মেশিন নামেও পরিচিত। এ মেশিনের সাহায্যে দুই বা তিনজন মানুষ প্রতিদিন ৪০০ বর্গমিটার ইট বা কংক্রিট ব্লকের রাস্তা তৈরি করতে পারবে।
রাস্তা ব্যবহারের প্রচলন কখন থেকে শুরু হয় তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। ধারণা করা হয়, আদিম যুগে বিভিন্ন সময় প্রাণীদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়মিত চলাচলের কারণেই রাস্তার সৃষ্টি। যদিও প্রচলিত এ ধারণার সঙ্গে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেন। তারপরও অনেক মতের মধ্যে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত মত। রাস্তার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রায় ১০ হাজার খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দে কাঁচা সড়কপথে পথচারীরা চলাচল করতো। বিশ্বের প্রাচীনতম পাকা রাস্তার একটির অস্তিত্ব পাওয়া যায় মিশরে। অনুমান করা হয় এটি নির্মিত হয়েছিল খ্রিষ্ট-পূর্ব ২৬০০ থেকে ২২০০ সালের মধ্যে। খ্রিষ্ট-পূর্ব ৪০০০ অব্দে মধ্যপ্রাচ্যের উর শহরে পাথর দিয়ে তৈরি পাকা রাস্তার সন্ধান পাওয়া গেছে। আর সবচেয়ে ব্যয়বহুল রাস্তা নির্মিত হয়েছিল পারস্যে। প্রথম দারিয়ুস খ্রিষ্ট-পূর্ব ৫০০ অব্দে ‘রয়েল রোড’ নামের এই রাস্তা নির্মাণ করেন। সে সময় এটি সবচেয়ে সুন্দর মহাসড়কের স্বীকৃতি লাভ করে। এরপর ৩১২ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দে রোমানরা তাদের সাম্রাজ্যে সোজা ও মজবুত পাথর দিয়ে ৭৮ হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে একটি পাকা সড়ক বা রাস্তা নির্মাণ করে। বর্তমানেও এ রকম হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা তৈরি হচ্ছে। খালি চোখে আমরা শুধু এসব রাস্তার সুবিধাটুকুই দেখতে পাই। কিন্তু এসব রাস্তা তৈরির পেছনে কী পরিমাণ শ্রম ও সময় ব্যয় হয়েছে তার হিসাব কতটুকু রাখি!
যান চলাচলের ধরন, অবস্থান ও ভূমির ধরনসহ আরও অনেক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে রাস্তা তৈরি হয় বিভিন্নভাবে। কোথাও এসফেল্ট, কোথাও কংক্রিট, কোথাও শুধু ইট দিয়ে রাস্তা তৈরি হয়। তবে রাস্তা তৈরির কাজে ইটের ব্যবহার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। আমাদের দেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে প্রচুর ইটের তৈরি রাস্তা ব্যবহৃত হচ্ছে। এ রকম রাস্তা তৈরির কাজটি আবহমানকাল থেকে মানুষ তার হাতেই করে আসছে। তাই কাজটি যেমন শ্রমসাধ্য তেমনি এতে সময়ও লাগে বেশ। বিশেষ করে ইট বিছানোর কাজই যাঁদের একমাত্র পেশা, তাঁরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পিঠ ও হাঁটুর সমস্যায় ভোগেন। এ কারণে প্রকৌশলীরা সব সময়ই ব্যস্ত থাকেন কীভাবে স্বল্প সময়ে ও শ্রমে সহজেই এ ধরনের রাস্তা নির্মাণ করা যায়। কেননা, এ ধরনের রাস্তার অনেক সুবিধা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে ইট বা কংক্রিট ব্লক মেরামতের জন্য যেকোনো সময় পরিবর্তন করা যায়, এমকি চাইলে উঠিয়েও ফেলা যায়। কিন্তু এসফেল্টে বানানো রাস্তায় এ ধরনের অন্য কোনো বস্তু দিয়ে বানানো রাস্তায় তা এতটা সহজ কাজ নয়। তা ছাড়া যেখানে যান চলাচল কম, বড় রাস্তার পাশের ফুটপাত কিংবা বাড়ির লন অথবা ড্রাইভওয়ের মতো জায়গায় ইটের রাস্তার বিকল্প আর কী হতে পারে?
পোড়ামাটির ইট বা কংক্রিট ব্লকের আরেকটি বিশেষ সুবিধা হচ্ছে, আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটির আকার বা আয়তনের তেমন পরিবর্তন হয় না। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, তুষারপাত যা-ই হোক, কোনো পরিবেশেই সাধারণত আকারের তেমন পরিবর্তন হয় না বা কোনো ফাটল দেখা দেয় না। এ ধরনের রাস্তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ইট বা ব্লক বিছানোর সময় যেসব কারুকার্য ফুটিয়ে তোলা সম্ভব, তা প্রচলিত রাস্তা তৈরির আর কোনো উপাদানে সম্ভব নয়। কিন্তু এই নান্দনিক ও অতিপ্রয়োজনীয় কাজটি যাঁরা করেন, তাঁরা বিরাট এক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে থাকেন। ২০০৯ সালের দিকের এক জরিপ বলছে ৯০ শতাংশ শ্রমিকই তাঁদের ক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ করায় অল্প সময়েই পিঠ ও হাঁটুর সমস্যায় কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।
অতিরিক্ত সময় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর জন্য যে ধরনের মেশিন বা যন্ত্রপাতি প্রাথমিক পর্যায়ে আবিষ্কৃত হয়েছিল তা ব্যবহার করতে গিয়ে দেখা যায় খরচ অনেক বেশি পড়ে। তাই এমন একটা সমাধান দরকার, যা কি না বর্তমান সমস্যারও সমাধান করবে এবং একই সঙ্গে খরচও কমিয়ে আনবে। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে ভাংকু মেশিনবৌ (Vanku Machinebouw)-এর টাইগার-স্টোন (রি) পেভিং মেশিন বা রোড প্রিন্টার এখন পর্যন্ত হতে পারে একটা ভালো সমাধান।
টাইগার-স্টোন রোড প্রিন্টার একসঙ্গে সর্বোচ্চ ছয় মিটার রাস্তার ধারের ফিনিশিংসহ বিভিন্ন প্যাটার্নে ইট বা কংক্রিট ব্লক বিছিয়ে ফেলতে পারে। মেশিনটি যেভাবে এই জটিল কাজটি করে সে তুলনায় এর অপারেশন অনেক সহজ। একজন সাধারণ মানুষ এর অপারেশন পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যেই আয়ত্ত করে ফেলতে সক্ষম। এই রোড প্রিন্টারকে কাজ করানোর জন্য মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগানো হয়েছে খুব কার্যকরভাবে। ইট বা ব্লক মাটিতে বিছানোর জন্য কোনো যান্ত্রিক সুবিধাকে কাজে না লাগিয়ে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সাহায্যে ভূমিতে নেমে আসে। ফলে মাটিতে বিছিয়ে যাওয়ার পর ডিজাইন বা প্যাটার্ন নিয়ে হাত দিয়ে করার মতো আর কোনো কাজ থাকে না। ইট বা ব্লকের রাস্তার অন্যতম জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ হচ্ছে রাস্তার দুই পাশ মেলানো। এ কাজটিও মেশিনের মধ্যেই খুব সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়। তাই রাস্তা বিছানোর কাজটি একবারেই সম্পন্ন হয়।
মজার বিষয় হচ্ছে রোড প্রিন্টারের কাজটি যত জটিল বলে মনে হচ্ছে মেশিনটি তত জটিল নয়। ইট বা ব্লকের মতো বড় বড় জিনিস নিয়ে কাজ করার জন্য এর মেইনটেন্যান্স বা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনেক কম। তা ছাড়া এটি নির্মাণের দিক থেকে অনেক সহজ সরল। ইট বা ব্লক সাজানোর জন্য তেমন জটিল কোনো মেকানিক্যাল যন্ত্র ব্যবহার করা হয় না। তাই এটি একদিকে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ যেমন সহজ তেমনি এই মেশিন পরিবেশবান্ধবও বটে। মূলত মেশিনের শব্দকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে টাইগার স্টোন রোড প্রিন্টার চালনার জন্য কোনো ডিজেল বা পেট্রল ইঞ্জিন ব্যবহার না করে ইলেকট্রিক মোটর ব্যবহার করা হয়। এটি একটি ইলেকট্রিক মোটরের সাহায্যে বেল্ট বা ক্যাটারপিলার ট্র্যাকের ওপর দিয়ে চলাচল করে। প্রায় আড়াই টন ওজনের এই মেশিনটি চলার জন্য চাকার চেয়ে ক্যাটারপিলার ট্র্যাক অনেক কার্যকরভাবে এর লোড ডিস্ট্রিবিউট করতে পারে। এই ট্র্যাকটি একটি সেন্সরের সাহায্যে রাস্তার সীমানাকে অনুসরণ করে। আর মেশিনটি সেই অনুসারে সাধারণভাবে ব্যবহৃত প্রায় সব রকম নকশা বা প্যাটার্ন তৈরি করে ইট বা ব্লক সাজাতে থাকে। মেশিনটির উপরিভাগ সাধারণত খোলা থাকে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী এর ওপর শেড বা ক্যানোপি বসানোর ব্যবস্থা রয়েছে যেন যেকোনো আবহাওয়ায় কাজ করা যায়।
টাইগার-স্টোন (রি) পেভিং মেশিন বা রোড প্রিন্টারের মতো মেশিনের ব্যাপারে অনেকেই বেশ উৎসাহ দেখাচ্ছে। বাজারেও এর চাহিদা রয়েছে বেশ। শুধু যে অল্প সময়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারে সে কারণে নয়, বরং রাস্তা তৈরিতে শ্রমিকদের শারীরিক বিষয়টিকেও এখানে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এটার একটা বাস্তবসম্মত সমাধানের অপেক্ষায় ছিল। এখন অনেক প্রতিষ্ঠানই চিন্তা করছে পুরোপুরি মেশিননির্ভর হওয়ার। এ কারণে টাইগার স্টোনও অনেক আশাবাদী। এখন তাঁরা মনে করছেন, এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর চিন্তা বাস্তবায়নে আর কোনো বাধা রইল না। তাদের রোড প্রিন্টারের বর্তমান সীমাবদ্ধতা দূর করার সঙ্গে সঙ্গে আরও নতুন নতুন সুবিধা যুক্ত করে আধুনিকায়ন করা সম্ভব।
বর্তমানে এই রোড প্রিন্টার সর্বোচ্চ ছয় মিটার চওড়া পর্যন্ত ইট বা ব্লক বিছাতে পারে। বিভিন্ন ডিজাইন ও প্যাটার্নের সঙ্গে সঙ্গে এটি বাইসাইকেল সাজেশন স্ট্রিপসহ বিভিন্ন রঙের লেন ডিভাইডার মার্ক দিতে পারে। তবে তা অবশ্যই ছয় মিটার বা তার নিচে হতে হবে। প্রকৃতপক্ষে মেশিনের ভেতর ইট বা ব্লকগুলো সাজানো হয় হাত দিয়েই। একটি মিনি লোডার মেশিনের পেছনের বাংকারে ইট বা ব্লকগুলো ঢেলে দেয় আর দুই বা তিনজন শ্রমিক তা হাত দিয়ে একটি স্লাইডিং বোর্ডের ওপর সাজাতে থাকে। অবশ্য রাস্তার শুরু হতে প্রথম দু-এক মিটার হাত দিয়েই সাজিয়ে মেশিনের শিয়ার বোর্ড অবধি উঠিয়ে দেওয়া হয় এরপর স্লাইডিং বোর্ডের ওপর পর্যন্ত উঠিয়ে দেওয়া হয়। তারপর শুরু হয় পুরো রাস্তা বিছানোর কাজ। রোড প্রিন্টার রাস্তার দুই পাশের লকিং ব্যান্ডকে একটি সেন্সরের সাহায্যে অনুসরণ করে পেছনের দিকে চলতে থাকে। আর শিয়ার বোর্ড থেকে সাজানো ব্লক রাস্তার ওপর বিছানো হতে থাকে। রাস্তার প্রস্থ আনুযায়ী তিনজন পর্যন্ত শ্রমিক প্রিন্টারের ওপর ইট বা ব্লক বিছিয়ে দিতে থাকে। যেখানে তিনজন শ্রমিক এক দিনে সর্বোচ্চ ৭৫ হতে ১০০ বর্গমিটার রাস্তা তৈরি করতে পারে, সেখানে রোড প্রিন্টার যেকোনো আবহাওয়ায় তৈরি করে ৪০০ বর্গমিটার রাস্তা।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৩তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৮।