নির্মাণে প্রিফেব্রিকেটেড স্টিলের গুরুত্ব

আমাদের দেশে কংক্রিটের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি হওয়ায় প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল চলমান এই প্রতিযোগিতায় আশানুরূপ এগিয়ে যেতে পারেনি। অবশ্য বিগত কয়েক বছরে প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল ভবন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ায় সবাই এখন এ সম্পর্কে জানতে পারছে। আগে শিল্প ও কলকারখানা ছাড়া স্টিলের ভবন প্রায় দেখাই যেত না। তবে এখন শহুরে এলাকায় বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও মানুষ প্রিফেব্রিকেটেড স্টিলের দিকে ঝুঁকছে। এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক।

স্টিলের তৈরি অবকাঠামোর প্রতি সবার আগ্রহের অন্যতম প্রধান কারণ এটি নির্মাণে খরচ ও সময় দুই-ই লাগে অনেক কম। তদুপরি স্টিলের ভবনের ওজন কংক্রিটের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় এর ফাউন্ডেশন খরচও কম। যেমন- একটি ছয় তলা ভবন কংক্রিটে করলে যে খরচ হয়, তার তুলনায় স্টিলে নির্মিত হলে খরচ কমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। কংক্রিটের বেলায় ওই ভবন তৈরিতে সময় লাগে প্রায় দুই বছর, অথচ স্টিলে করলে তা ছয় থেকে আট মাসেই সম্পন্ন করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সময় সাশ্রয় হয় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এগুলোর পাশাপাশি স্টিলের পুনর্ব্যবহারযোগ্যতার বৈশিষ্ট্যও একে সাধারণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

কংক্রিটের স্থাপনার সঙ্গে আমরা কমবেশি পরিচিত হওয়ায় এর উপাদান এবং গুণাগুণ সম্পর্কেও যথেষ্ট পরিচিত সবাই। যেমন: কংক্রিটের মূল যে তিনটি উপাদান অর্থাৎ সিমেন্ট, বালু ও পাথরÑএ সম্পর্কে সবাই কমবেশি জানে। এমনকি বর্তমানে রড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনের সৌজন্যে টিএমটি বার বা ৫০০W শক্তিসম্পন্ন রডের সঙ্গেও সবাই কমবেশি পরিচিত। কিন্তু স্টিল কাঠামোয় নির্মিত স্থাপনার ক্ষেত্রে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাধারণের মাঝে একধরনের ধোঁয়াশা দেখা যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত এই ধোঁয়াশার জায়গাটি পরিষ্কার না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ক্ষেত্রটির আশানুরূপ উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক আর প্রচার মাধ্যম সবাইকেই কতগুলো সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে হবে।

অনেক ক্ষেত্রে বলতে শোনা যায়, স্টিলের তৈরি কাঠামোর ভারবহন ক্ষমতা (Load Bearing Capacity) কংক্রিটের তুলনায় কম। এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় সব সুউচ্চ ভবন বা স্থাপনার মূল কাঠামো স্টিলের তৈরি। বিশেষত ভূমিকম্প সহনীয় করতে এ ধরনের কাঠামোর অভ্যন্তরীণ কঙ্কাল কাঠামোটি স্টিলে তৈরি করা হয়। এ ছাড়া কংক্রিটের ক্ষেত্রে ডিজাইন অনুযায়ী এর শক্তি (Strength) নিশ্চিত করার জন্য গুণগতমান নিয়ন্ত্রণ  (Quality Control) এবং নির্মাণকাজের সঠিক প্রক্রিয়া (Construction Workmanship) বজায় রাখাটা খুব জরুরি। লক্ষণীয় যে দক্ষ প্রকৌশলী দ্বারা ডিজাইন করিয়ে এবং ভালো মানের নির্মাণসামগ্রী (রড, বালু, পাথর এবং সিমেন্ট) ব্যবহারের পরও শুধু নির্মাণসংক্রান্ত পদ্ধতিগুলো ঠিকভাবে অনুসরণ না করায় সম্পূর্ণ বিষয়টি পড়ে যায় অনিশ্চয়তার মধ্যে। স্টিলের ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা তুলনামূলক কম। কেননা যেসব আনুষঙ্গিক উপাদান দিয়ে স্টিলের ভবন নির্মিত হয়, সেগুলোর গুণাগুণ নিশ্চিন্ত করতে পারলেই অনিশ্চয়তার ব্যাপারগুলো অনেকাংশে কমে। এরপর ডিজাইন অনুযায়ী সঠিকভাবে ফেব্রিকেশন করা এবং জয়েন্টের জায়গাগুলোতে কোড অনুযায়ী ঝালাই (Welding) করা গেলে আর কোনো অনিশ্চয়তাই থাকে না। ইরেকশনের ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো নিরাপত্তা। কারণ, স্টিলের বড় বড় কলাম বা বিমগুলো যখন ক্রেন দিয়ে ওপরে উঠিয়ে জোড়া লাগানো হয়, তখন আশঙ্কা থাকে দুর্ঘটনার। কাজেই ইরেকশন চলাকালীন নিরাপত্তার ব্যাপারগুলো নিশ্চিত করতে পারলেই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি নিরবচ্ছিন্ন নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

কালিকা স্টিল

আমাদের দেশে বর্তমানে স্টিল স্ট্রাকচার ডিজাইন করতে জানা প্রকৌশলীর সংখ্যা হাতে গোনা। এর প্রধান কারণ অবশ্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্নাতক পর্যায়ের পাঠ্যক্রম। স্টিল সম্পর্কে স্নাতক পর্যায়ের শেষের দিকে যে সামান্য একটু ধারণা দেওয়া হয় তা মোটেও বাস্তবক্ষেত্রে ডিজাইনের জন্য যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে পাঠ্যসূচিতে আরও বিশদভাবে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি যদি কিছু কোর্স চালু করা যায় ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি)-এ সফটওয়্যার ও বাস্তবিক জ্ঞানদানের জন্য। তবে সদ্য ডিজাইনার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করতে যাওয়া প্রকৌশলীদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ খুব সহায়ক। যেহেতু শিল্পকারখানার পাশাপাশি আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও স্টিল অবকাঠামো দ্রুত প্রসার লাভ করছে, কাজেই এ ক্ষেত্রে বাড়ছে পেশাদার ডিজাইনারদের কাজের পরিসরও। স্টিল অবকাঠামো নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে ডিজাইনার হিসেবে কাজ করার সুযোগ থাকছে নিজের পেশাদারি দক্ষতাকে আরও বিকশিত করতে।

যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিগত বেশ কয়েক বছরে এক প্রকার বিপ্লব ঘটেছে। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, ফ্লাইওভার থেকে শুরু করে রেল যোগাযোগব্যবস্থারও উন্নতি হয়েছে ব্যাপক যা এখনো অব্যাহত। এসব অবকাঠামোর অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে স্টিল। বিশেষ করে রেল সেতুগুলোর প্রায় পুরোটাই নির্মিত হচ্ছে স্টিলে। এসব অবকাঠামোতে দেশীয় প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল ব্যবহারে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ দেওয়া উচিত। তাহলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ওপর থেকে নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। পাশাপাশি দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রকৌশল ও কারিগরি দিক থেকে হবে আরও দক্ষ ও পারদর্শী।

যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের হাত ধরে দেশে ভবিষ্যতে তৈরি হবে আরও শিল্পকারখানা। ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্রবন্দর, নৌবন্দর, বিমানবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, পর্যটনশিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রচুর অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্টিলের তৈরি অবকাঠামোগুলো সুনিশ্চিতভাবে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে। কাজেই এই ক্ষেত্রটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আর এ জন্য সব থেকে যেটা বেশি প্রয়োজন, তা হলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে স্টিল সম্পর্কে আরও বেশি পরিচিত এবং সচেতন করতে দরকার সঠিক ও সুনির্দিষ্ট প্রচারণা।

ইপ্যাক

আগে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থপতি ও প্রকৌশলীর সাহায্য ছাড়া অনেক কাজ হলেও বর্তমানে এটি প্রায় অচিন্তনীয় ব্যাপার। মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। একটা সময় ছিল যখন প্রায় সব ধরনের নির্মাণে ব্রিক ফাউন্ডেশনের ভবন তৈরি করা হতো। অথচ এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও নির্মিত হচ্ছে আরসিসি ভবন। মানসিকতার এই পরিবর্তন প্রকৌশলজগতের একটি বড় সাফল্য। সাফল্যের এই ধারা মানুষকে গতানুগতিক কংক্রিটের কাঠামোর ধারণা থেকে বেরিয়ে স্টিল অবকাঠামোর দিকে আগ্রহী করে তুলবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। এই খাতটি খুব অচিরেই সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও বেশি গুরুত্ব, মনোযোগ এবং পৃষ্ঠপোষকতা পাবে বলেই বিশ^াস আমাদের।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৬তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৮।

প্রকৌশলী এ এসএম আতিকুর রহমান
+ posts